somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হামীম গার্মেন্টস এ আগুন: গার্মেন্টস না লাশের কারখানা?

১৫ ই ডিসেম্বর, ২০১০ রাত ১২:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আগুন নিভেছে কিন্তু লাশের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। এখন পর্যন্ত লাশের প্রকাশিত সংখ্যা ৩১। আগু‌নে পোড়া লাশ, ধোয়ায় দম বন্ধ হয়ে মরা লাশ, লাফিয়ে পড়ে মরা লাশ। তা বাড়ুক। এ আর নতুন কি। এগুলোতো উচ্ছৃংখল গার্মেন্টস শ্রমিকের লাশ , এদের মৃত্যুতে কি যায় আসে? বছর বছর এরকম অগ্নিকান্ড না ঘটলে তো নাগরিকেরা বৈদেশিক মুদ্রা উতপাদনের কারখানার উত্তাপটুকু টের পাবেনা! আজকে হামীম গার্মেন্টস এ লেগেছে, এর আগে গরীব এন্ড গরীব গার্মেন্টস এ লেগেছিল, তারও আগে কেটিএসএ। এরকম লাগেই, লাগতেই থাকে। মন্দ কি, শাপে বর হিসাবে গরীব পরিবারগুলো তো ক্ষতিপূরণ হিসেবে দুটো কাচা পয়সার মুখ দেখবে।


আশুলিয়ার নরসিংহপুরে বহুতল ওই কারখানা ভবনে মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে আগুনের সূত্রপাত ঘটে বলে স্থানীয়রা জানায়।
গত বছরের জুন মাসে একই স্থানে এ প্রতিষ্ঠানের আরেকটি কারখানায় আগুন লাগে। বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সভাপতি একে আজাদ হা-মীম গ্র"পের কর্ণধার। আগুনে পুড়ে ও লাফিয়ে পড়ে আহত শতাধিক শ্রমিক রাজধানী ঢাকা ও সাভারের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে শতাধিক শ্রমিক এখনো কারখানার ভিতরে আটকা রয়েছে বলে দাবি করছেন শ্রমিকরা। তাদের আশংকা নিহতের সংখ্যা আরও বাড়বে।


মনে আছে, এর আগে এবছরই ২৫ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার রাতে "গরীব এন্ড গরীব" গার্মেন্টেস এ অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ধোয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনায় ক্ষতিপূরণের ঘোষণা শুনে নিহতদের একজন জরিনা বেগমের ছেলে মো.জুয়েল বিলাপ করে উঠেছিলেন-

“এক লাখ টাকা দাম দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলো আমার মায়ের। বোনের লাশের দামও এক লাখ। আর লাশ বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য দেবে আরও ১৫ হাজার করে। গরিব গার্মেন্টসে কাজ করে আমার মা আর বোন যে এখন অনেক বড়লোক হয়ে গেছে!"


আমরা জানিনা গরীব এন্ড গরীব গার্মেন্টস এর লাশেরা বড়লোক হতে পেরেছিলো কি-না, তবে হামীম গামের্ন্টস উতপাদিত লাশের ভাগ্যেও ইতোমধ্যেই জুটে গেছে ২ লক্ষ টাকার প্রতিশ্রুতি। বিজিএমইএ'র সভাপতি সালাম মুর্শেদী সাংবাদিকদের বলেছেন, আগুনের ঘটনায় নিহত প্রত্যেকের জন্য এক লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। এছাড়া লাশ পৌঁছানোর জন্য আরো ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। তিনি আরো জানান, হা-মীম গ্রুপের পক্ষ থেকে নিহত প্রত্যেকের জন্য আরো এক লাখ টাকা ও আহতদের জন্য ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে।
(বিস্তারিত খবর: বিডি নিউজ২৪ Click This Link
বাঙলানিউজ ২৪ Click This Link)

আহা! কি শ্রমিক দরদী আমাদের বিজিএমই, কি শ্রমিক কল্যাণী হামিম গার্মেন্টস!

কিছু পুরানো গান আমরা আবার শুনবো। যথাযথ ক্ষতিপূরণের আশ্বাস, সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার "গভীর শোক" প্রকাশ, মালিকদের প্রতি ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে "প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা গ্রহনের আহবান" এবং আহতদের "যথাযথ" চিকিৎসার ব্যাবস্থার নির্দেশ ইত্যাদি ঘুমাপাড়ানি গান কি আমরা আগে শুনিনাই?


অথচ হামীম গামেন্টস এ অগ্নিকান্ডের এই ঘটনাটি এরকম আরো অসংখ্য ঘটনার মতোই নিছক দুর্ঘটনা নয়- মালিক, কারখানা পরিদর্শন বিভাগ ও সরকারের অবহেলায় ঘটা হত্যাকান্ড। ইতিপূর্বেও একই ভাবে আগুনে শ্রমিক নিহত হয়েছে। প্রতিবারই বের হয়েছে কারখানা ভবনের ত্রুটিপূর্ণ ডিজাইন, যথাযথ অগ্নী নির্বাপন ব্যাবস্থা না থাকা, নিয়মিত ফায়ার ড্রিল না হওয়া, আগুন লাগার সময় কারখানা গেট বন্ধ থাকা ইত্যাদি কারণেই এইরকম ঘটনাগুলো ঘটছে। এভাবে রাষ্ট্রের অবহেলায় বিভিন্ন সময় ভবন ধ্বসে ও অগ্নিকান্ডে গার্মেন্টসেক্টরেই ১৫০০'র বেশি শ্রমিক নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে হাজার হাজার। তারা পঙ্গুত্বের যন্ত্রণা নিয়ে বেচে আছে। কিন্তু এই সমস্ত মৃত্যুর জন্য দায়ী মালিকদের আজ পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দেয়া হয়নি।


কলকারখানায় পণ্যের পাশাপাশি বিষাক্ত বর্জ্য উৎপাদনের মতোই আগুনে পুড়ে কিংবা ধোয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে শ্রমিকের লাশ হওয়াটা আমাদের কাছে ইতিমধ্যেই খুব স্বাভাবিক ঘটনার মতো হয়ে গেছে এবং সেই সাথে বোধহয় "নেসেসারি ইভিল" হয়ে উঠেছে- কারখানায় পণ্য উৎপাদন করতে চাইলে যেমন বর্জ্য উৎপাদন অবশ্যম্ভাবি! ভাবটা এমন, যেন কারখানা থাকলে, হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে চাইলে এই সব একটু আধটু তো সইতে হবেই! ফায়ার এলার্ম সিস্টেম নাই তো কি হয়েছে- ধোয়ার গন্ধ তো আছে- কুত্তার মতো শুকে শুকেই তো শ্রমিক বুঝতে পারে আগুন লেগেছে, এর জন্য "আমাদের" ঘাম ঝরানো পয়সা খরচ করে ফায়ার এলার্ম সিস্টেম রাখার কি দরকার! প্রতি ফ্লোরে কলাপসিবল গেট তালাবদ্ধ থাকে? তালাবদ্ধ থাকবে না তো কি সদর-ঘাট বানিয়ে রাখতে হবে যেন শ্রমিকরা ইচ্ছামত বাইরে আসা যাওয়া করতে পারে, গার্মেন্টস পণ্য বাইরে পাচার করতে পারে! গেটের দারোয়ান? দারোয়ানদের কি আর বিশ্বাস করা যায়, ওরাও তো শ্রমিকদের মতোই হাড় হাভাতে।

দুইটাকার শ্রমিক যার নূন্যতম বেতন মাত্র ৩০০০ টাকা(তাও সেটা পাওয়ার জন্য তাকে রক্ত ঝরাতে হয়), সে হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আনুক আর যাই করুক, সে তো শেষ বিচারে শ্রমিকই, এলিট শ্রেণীর তো কেউ না! তাই গার্মেন্টস শ্রমিকদের পুড়িয়ে মারার অপরাধে দোষ স্বীকার করেও মাত্র ১,৫০০ টাকা জারিমানা দিয়ে ছাড়া পায় মালিক পক্ষ! ২০০৬ সালের ২৩ ফেব্র“য়ারিতে চট্টগ্রামের কেটিএস গার্মেন্টসে অগ্নিকান্ডে সরকারী হিসেবেই ৫৪ জন গার্মেন্টস শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনার ২মাস পর মেজিষ্ট্রেট কোর্টে এই হত্যাকান্ডের দায় স্বীকার করলেও রাষ্ট্রপক্ষের দিক থেকে ঠিক ঠাক অভিযোগ দাখিল না করার কারণে কারখানার দুই পরিচালক এবং এক ম্যানেজারকে জনপ্রতি ১,৫০০ টাকা করে অর্থাৎ সর্বমোট ৪,৫০০ টাকা জরিমানা করে বেকসুর খালাশ দেয়া হয় (সূত্র: ডেইলিস্টার, মার্চ ১, ২০১০)।

আগুনে পুড়িয়ে শ্রমিক হত্যা প্রতিরোধ করার জন্য কি করা হয়েছে বা হচ্ছে? নতুন আইন তো দূরের কথা প্রচলিত আইন মানার ব্যাবস্থা গ্রহণ এবং প্রয়োজনে ফ্যাকটরি অর্ডিন্যান্সকে আপগ্রেড করা এবং তা বাস্তবায়ন করার কোন পদক্ষেপই তো দেখছি না। যথাযথ বিল্ডিং কোড মেনে কারখানা তৈরী করা হয়েছে কি-না, কারখানায় যথাযথ অগ্নিনির্বাপন ব্যাবস্থা আছে কি-না, ফায়ার এক্সিট আছে কি-না, থাকলে সেটা সবসময় খোলা থাকে কি-না, নিয়মিত ফায়ার ড্রিল হয় কি-না ইত্যাদি সাধারণ রুটিন মূলক কাজগুলো নিশ্চিত করার জন্য ফ্যাক্টরি ইন্সপেক্টর দিয়ে নিয়মিত ফ্যাক্টরি পরিদর্শনের ব্যাবস্থা করা এবং এসব ব্যাবস্থা না থাকলে মালিকপক্ষকে যথাযথ শাস্তি প্রদান করা ইত্যাদির ব্যাপারে রাষ্ট্রের তো কোন মাথা ব্যাথা দেখি না।

মালিক শ্রেনী নিশ্চিন্তে থাকুন কারো কোন শাস্তি হবে না, বিচার হবে না, প্রতিরোধ হবে না-কারণ আপনারা তো স্বাধীন, আপনাদের জন্য নিশ্চিন্তে শোষণ, লুটপাট, খুন আর আগুনে পোড়ানোর স্বাধীনতা এনে দিতেই তো এই বিজয়ের মাস।



৩৩টি মন্তব্য ১৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পেঁয়াজ নিয়ে বৃটিশ রাজকবির কবিতা

লিখেছেন , ১৯ শে নভেম্বর, ২০১৯ সকাল ৭:৪২


কবিতা - ভ্যালেন্টাইন -
*********************
কোন লাল গোলাপ কিংবা স্নিগ্ধ হৃদয় নয়,
তোমাকে একটি পেঁয়াজ দেবো
এটি বাদামি কাগজে মোড়ানো একটি চাঁদ,
তাতে আলোর প্রতিজ্ঞা থাকবে
যেন অতি সর্তক অনাবৃত প্রেম।

এখানে
এটা অশ্রুপাত দিয়ে,তোমাকে অন্ধ করে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগার পদাতিক চৌধুরীর সাথে কোলকাতায় দেখা

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৯ শে নভেম্বর, ২০১৯ সকাল ৯:২৯



আমাদের সামু ব্লগের ব্লগার পদাতিক চৌধুরী।
তার ভালো নাম তাইমূর চৌধুরী। দাদা সময় সুযোগ পেলেই তার পরিবার নিয়ে খুব ঘুরে বেড়ান। তার ছেলের নাম শ্রন্থন (মেঘ)। খুব সুন্দর নাম।... ...বাকিটুকু পড়ুন

অপূর্ণ জীবন

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৯ শে নভেম্বর, ২০১৯ দুপুর ১:৪৪


অপূর্ণ জীবন
-------------
মোঃ রফিকুল ইসলাম
=========
এক পথহারা পাখি খুঁজে ফেরে নীড় ,
পাওয়া না পাওয়ার মাঝে শত যাতনার ভীড় ।
অবশেষে যখন রাত্রি পোহালো ,
দেখে জীবনটি তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসলামী বইমেলা-২০১৯খ্রি:-দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর উপায় কী?

লিখেছেন হাবিব স্যার, ১৯ শে নভেম্বর, ২০১৯ দুপুর ২:৩৯



এতটা অপমান মেনে নেওয়া সত্যিই কঠিন। ইসলামি সাহিত্য নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য দেখে আকাশে দিকে তাকিয়ে ভাবি—অনেক দূরের পথ বাকি। এর কারণ কি? নিম্ন মানের ইসলামী সাহিত্য নাকি নিম্ন মানসিকতা?

বায়তুল মোকাররম... ...বাকিটুকু পড়ুন

লবন

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৯ শে নভেম্বর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:৫৫


কি হচ্ছে কি, কি যে হলো
বুঝতেছিনা কিছু ।
পেঁয়াজ ছেড়ে জনগন এবার
নিলো লবনের পিছু ।।

হায়! হায় !! পেয়াজ ছাড়া
তাও তো মূলা চলে ।
লবন তো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×