১৭ আগস্ট’৯৮, কিছু ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীর ছাত্রী ধর্ষনের খবর প্রথম পত্রিকায় প্রকাশিত হয় । ২০ তারিখ থেকে শুরু হয় সংঘবদ্ধ আন্দোলন । গণতান্ত্রিক ছাত্র ঐক্য’র নেতৃতে ছাত্র সমাজ সাধারন ছাত্র ঐক্য’র ব্যানারে সংগঠিত করেছিল প্রথম ধর্ষন বিরোধী আন্দোলন । আন্দোলন চলাকালে ২৩ আগস্ট ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা নৃবিজ্ঞান বিভাগের তৎকালীন অধ্যাপক রেহনুমা আহমেদকে লাঞ্চিত করে । তার আভিযোগের প্রেক্ষিতে পৃথক একটি কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী পরবর্তীতে দুজনকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার করে প্রশাসন । কিন্তু ধর্ষকের বিচারের দাবি প্রলম্বিত করার চেষ্টা চালায় প্রশাসন । আন্দোলনের মুখে প্রশাস্ন সত্যতা যাচাই কমিটি গঠন করলেও টালবাহানার আশ্রয়ে তারা ধর্ষকদের পক্ষ অবলম্বন করে । ৩ সেপ্টেম্বর কমিটির রিপোর্ট প্রকাশের কথা ছিল । কিন্তু পরিবর্তিত হয়ে প্রথমে ১৩, তারপর ২২ এবং ২৪ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত হয় রায় প্রকাশের দিন । অন্য দিকে আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকেই ক্যাম্পাসে অনবরত চলতে থাকে ছাত্রলীগের হুমকি ভয়-ভীতি । ছাত্রসমাজের আন্দোলনকে অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট ডেকে দোষীরা নিজেদের রক্ষার ঢাল বের করে । স্যুটলিস্ট-রেপলিস্ট- হিটলিস্ট বানিয়ে আন্দোলনকে দূর্বল করার চেষ্টা করে মুখোশ পরা সন্ত্রাসীরা । প্রশাসনও দেয় প্রত্যক্ষ্ মদদ । এর মধ্যেই ঘটে যায় স্মরণাতীতকালের মহাপ্লাবী বন্যা । এর পরও ছাত্র সমাজ দুর্বার গতিতে, অসীম সাহসীকতায় বিজয়ের স্বপ্নে আন্দোলন চালিয়ে গেছে ।
২৪ সেপ্টেম্বর’৯৮, সেদিন ছিল দিনব্যাপী সিন্ডিকেট সভা । আন্দোলনরত ছাত্ররা ঘেরাও করে সিন্ডিকেট । অন্যদিকে প্রশাসনিক ভবনের সামনে দিয়ে চালাতে থাকে সশস্ত্র শো-ডাউন । দুপুরে সিন্ডিকেট সদস্যরা সভা মুলতবী রেখে খাবার খেতে বের হলে তাদের অনিরাপদে রেখে ভিসি আলাউদ্দিন আহমেদকে প্রশাসনিক ভবন ত্যাগ না করার অনুরোধ জানায় আন্দোলনকারীরা । কিন্তু তিনি অনুরোধ উপেক্ষা করে কয়েকজন ছাত্রীকে পদপিষ্ট করে প্রশাসনিক ভবন ত্যাগ করেন । সভা চলার এক পর্যায়ে রাত ৯টায় সিন্ডিকেট সদস্য এ. এন. রাশেদা প্রশাসনিক ভবন ত্যাগ করতে চাইলে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা তাকে লাঞ্চিত করে । অবস্থা প্রতিকুল দেখে তিনি আবার সভায় যোগ দেন । সভা শেষে রাত ১টার দিকে ভিসি ৭ জন ধর্ষণকারী ও ৬ জন সহযোগীসহ মোট ১৩ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট প্রদান করতে সিন্ধান্ত দেন । কিন্তু ২৮ তারিখের সিন্ডিকেট পূর্ববর্তী সভার রায় পরিবর্তন করে । ককটেল পার্টি আর মিষ্টি বিতরনের মধ্য দিয়ে ‘ধর্ষণ সেঞ্চুরী’ উদযাপন করা নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ছাত্র এবং জা.বি শাখা ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক যৌন সন্ত্রাসী জসীমউদ্দিন মানিকসহ মাত্র ৫ জনকে শাস্তি প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন । বহিষ্কার করা হয় শুধু মানিককে । অন্যদের ‘গুরু পাপে লঘু দন্ড’ দেওয়া হয় । এমনকি একজনকে সদাচরনের জন্য তার শাস্তি স্থগিত করা হয় । কিন্তু এসব ছাত্রসমাজকে পিছু হটাতে পারিনি ।
২৮ সেপ্টেম্বর’৯৮, সাধারন ছাত্র ঐক্য সংবাদ সম্মেলনে রায় প্রত্যাখান করে ‘রেপিস্ট গ্রুপের’ ঐ কুখ্যাত ১৩ জনকেই ক্যাম্পাসে অবাঞ্চিত ঘোষনা করে । ছাত্রসমাজের অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে নতি স্বীকার করে ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য হয় ধর্ষকরা । ২৯ তারিখ পূজার ছুটিতে শুরু হয় হল ত্যাগ । ক্যাম্পাস খুললে অন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয় । বহু লড়াকু মুহুর্তকে সঙ্গী করে সফল হয় ৪০ দিনোধিক স্থায়ী প্রথম ধর্ষক প্রতিরোধ আন্দোলন ।
এরপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মদদে ১০ মাসের জন্য ক্যাম্পাসে দখলদারিত্ত্ব কায়েম করল সন্ত্রাসী কাঁকরের নেতৃত্তাধীন ‘কিলার গ্রুপ’ । ১৯৯৭ সালে ছাত্রলীগের অন্য গ্রুপের নেতা আনন্দ হত্যার পেছনে যারা প্রত্যক্ষ ভুমিকা রেখেছিল তাদের কুকর্মে ক্যাম্পাস আবারও ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে । নতুন কলাভবনের টেন্ডার নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠল ক্যাম্পাস ।
৩০ জুলাই’৯৯, বহিরাগত সন্ত্রাসী আর অস্ত্র নিয়ে ‘রেপিস্ট গ্রুপ’ ফিরে আসে ক্যাম্পাসে । দখল করে নেয় মাওলানা ভাসানী, কামালউদ্দিন ও সালাম-বরকত হল । পালিয়ে যায় কিলার গ্রুপ । রেপিস্ট গ্রুপের ভাঙচুর, লুটপাট আর সশস্ত্র মহড়ায় আবারও আতঙ্কিত হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস । ছাত্রসমাজ তখন চুপচাপ বসে থাকেনি । দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া ছাত্র-ছাত্রীদের রক্তে তখন প্রতিরোধের লাল সূর্য । তারা আবারও ঐক্যবদ্ধ হয় ধর্ষন-সন্ত্রাস-দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে । বরাবরের মতোই প্রশাসনের আবস্থান ছিল ধর্ষক-সন্ত্রাসীদের পক্ষে । ১লা আগস্ট তল্লাশি চালানো হয় ছাত্র হলগুলোতে । কিন্তু পরিহাস, সেটা ছিল শুধুই লোক দেখানো ।
ছাত্রদের লক্ষ্য স্থির । ধর্ষক খুনিদের কবল থেকে ক্যাম্পাসকে মুক্ত করতেই হবে । ২রা আগস্ট সকালে ট্রান্সপোর্ট থেকে বের হলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকালের আলোড়ন সৃষ্টিকারী অবিস্মরনীয় মিছিল । দুঃসাহসী মিছিলের সামনের কাতারে থেকে সকল প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে তেজস্বী ছাত্রীরা কামালউদ্দিন হলের তালা ভেঙ্গে ঢুকে পড়ে হলের ভেতর । ঠিক সেই মুহুর্তে মিছিলের শেষাংশ কেবল পার হচ্ছিল রেজিস্ট্রার বিল্ডিং । দখলমুক্ত হলো কামালউদ্দিন হল । এরপর মাওলানা ভাসানী ও সালাম-বরকত হলে স্লোগান উঠল –
“খুনি-ধর্ষক ভাই ভাই, জাবি ক্যাম্পাসে ঠাঁই নাই”
ঐ সকালেই ছাত্রসমাজের অভ্যুত্থান, তেজ এবং জঙ্গিত্ব দেখে কাপুরুষের মত পেছন দিয়ে পালিয়ে গেল দাম্ভিক ধর্ষক-সন্ত্রাসীর দল । শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মচারীদের মাঝে তখন মুক্তির আনন্দ । ছাত্র আন্দোলনের সুতীকাগার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে যোগ হলো আর একটি মহেন্দ্রক্ষন ।
কিন্তু আজ ধর্ষনবিরোধী আন্দোলনের প্রায় ১২ বছর পর এখনও আমার মনে প্রশ্ন জাগে আমরা কি আসলেই আমাদের এই আপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিচরন ভূমি জাবি ক্যাম্পাস থেকে সেই সকল খুনী-ধর্ষকদের পুরোপুরি ভাবে বিতাড়িত করতে সক্ষম হয়েছি নাকি তারা এখনও রয়েছে মুখোশের আড়ালে কিংবা ঐসব ধর্ষক মানিকদের পুনঃজন্ম হচ্ছে নতুন রূপে নতুন আঙ্গিকে ?
(তথ্যগুলো ২রা আগস্ট’২০১১ জাবি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়ন কর্তৃক প্রকাশিত প্রচারপত্র থেকে সংগৃহিত)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

