somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

"ধর্ষন বিরোধী আন্দোলন"- জাবি'র ইতিহাসের সোনালী অতীত ।।

২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০১১ বিকাল ৩:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পাচুটিয়া গ্রাম যেদিন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে গিয়েছিল সেদিন কেউ বুঝেনি ২৮ কি ২৯ বছর পর অনন্য এক ইতিহাস সৃষ্টি করবে এই বিদ্যাপীঠ । ১৯৯৯ সালের ২রা আগস্ট । এ বিশবিদ্যালয়ের ছাত্র সমাজ অসামান্য এক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে লিখল এক নতুন সকালের গল্প । পুরো নব্বই দশক জুড়ে যে বিশবিদ্যালয়ের ছাত্র অন্দোলন অন্যায়-প্রতিক্রিয়াশীল-শোষন-প্রতিবন্ধকতা-নীপিড়নের বিরুদ্ধে বাংলাদেশকে দিশা দেখিয়েছে, তারই অনিবার্য পরিনতি ২রা আগস্টের সেই সকাল । ২রা অগস্ট হটাৎ ঘটে যাওয়া কোন ইতিহাস নয় । ছাত্র সমাজের ধারাবাহিক আন্দোলনের ফসল এই দশ দিক কাপানো দিনটি ।

১৭ আগস্ট’৯৮, কিছু ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীর ছাত্রী ধর্ষনের খবর প্রথম পত্রিকায় প্রকাশিত হয় । ২০ তারিখ থেকে শুরু হয় সংঘবদ্ধ আন্দোলন । গণতান্ত্রিক ছাত্র ঐক্য’র নেতৃতে ছাত্র সমাজ সাধারন ছাত্র ঐক্য’র ব্যানারে সংগঠিত করেছিল প্রথম ধর্ষন বিরোধী আন্দোলন । আন্দোলন চলাকালে ২৩ আগস্ট ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা নৃবিজ্ঞান বিভাগের তৎকালীন অধ্যাপক রেহনুমা আহমেদকে লাঞ্চিত করে । তার আভিযোগের প্রেক্ষিতে পৃথক একটি কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী পরবর্তীতে দুজনকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার করে প্রশাসন । কিন্তু ধর্ষকের বিচারের দাবি প্রলম্বিত করার চেষ্টা চালায় প্রশাসন । আন্দোলনের মুখে প্রশাস্ন সত্যতা যাচাই কমিটি গঠন করলেও টালবাহানার আশ্রয়ে তারা ধর্ষকদের পক্ষ অবলম্বন করে । ৩ সেপ্টেম্বর কমিটির রিপোর্ট প্রকাশের কথা ছিল । কিন্তু পরিবর্তিত হয়ে প্রথমে ১৩, তারপর ২২ এবং ২৪ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত হয় রায় প্রকাশের দিন । অন্য দিকে আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকেই ক্যাম্পাসে অনবরত চলতে থাকে ছাত্রলীগের হুমকি ভয়-ভীতি । ছাত্রসমাজের আন্দোলনকে অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট ডেকে দোষীরা নিজেদের রক্ষার ঢাল বের করে । স্যুটলিস্ট-রেপলিস্ট- হিটলিস্ট বানিয়ে আন্দোলনকে দূর্বল করার চেষ্টা করে মুখোশ পরা সন্ত্রাসীরা । প্রশাসনও দেয় প্রত্যক্ষ্ মদদ । এর মধ্যেই ঘটে যায় স্মরণাতীতকালের মহাপ্লাবী বন্যা । এর পরও ছাত্র সমাজ দুর্বার গতিতে, অসীম সাহসীকতায় বিজয়ের স্বপ্নে আন্দোলন চালিয়ে গেছে ।

২৪ সেপ্টেম্বর’৯৮, সেদিন ছিল দিনব্যাপী সিন্ডিকেট সভা । আন্দোলনরত ছাত্ররা ঘেরাও করে সিন্ডিকেট । অন্যদিকে প্রশাসনিক ভবনের সামনে দিয়ে চালাতে থাকে সশস্ত্র শো-ডাউন । দুপুরে সিন্ডিকেট সদস্যরা সভা মুলতবী রেখে খাবার খেতে বের হলে তাদের অনিরাপদে রেখে ভিসি আলাউদ্দিন আহমেদকে প্রশাসনিক ভবন ত্যাগ না করার অনুরোধ জানায় আন্দোলনকারীরা । কিন্তু তিনি অনুরোধ উপেক্ষা করে কয়েকজন ছাত্রীকে পদপিষ্ট করে প্রশাসনিক ভবন ত্যাগ করেন । সভা চলার এক পর্যায়ে রাত ৯টায় সিন্ডিকেট সদস্য এ. এন. রাশেদা প্রশাসনিক ভবন ত্যাগ করতে চাইলে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা তাকে লাঞ্চিত করে । অবস্থা প্রতিকুল দেখে তিনি আবার সভায় যোগ দেন । সভা শেষে রাত ১টার দিকে ভিসি ৭ জন ধর্ষণকারী ও ৬ জন সহযোগীসহ মোট ১৩ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট প্রদান করতে সিন্ধান্ত দেন । কিন্তু ২৮ তারিখের সিন্ডিকেট পূর্ববর্তী সভার রায় পরিবর্তন করে । ককটেল পার্টি আর মিষ্টি বিতরনের মধ্য দিয়ে ‘ধর্ষণ সেঞ্চুরী’ উদযাপন করা নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ছাত্র এবং জা.বি শাখা ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক যৌন সন্ত্রাসী জসীমউদ্দিন মানিকসহ মাত্র ৫ জনকে শাস্তি প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন । বহিষ্কার করা হয় শুধু মানিককে । অন্যদের ‘গুরু পাপে লঘু দন্ড’ দেওয়া হয় । এমনকি একজনকে সদাচরনের জন্য তার শাস্তি স্থগিত করা হয় । কিন্তু এসব ছাত্রসমাজকে পিছু হটাতে পারিনি ।

২৮ সেপ্টেম্বর’৯৮, সাধারন ছাত্র ঐক্য সংবাদ সম্মেলনে রায় প্রত্যাখান করে ‘রেপিস্ট গ্রুপের’ ঐ কুখ্যাত ১৩ জনকেই ক্যাম্পাসে অবাঞ্চিত ঘোষনা করে । ছাত্রসমাজের অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে নতি স্বীকার করে ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য হয় ধর্ষকরা । ২৯ তারিখ পূজার ছুটিতে শুরু হয় হল ত্যাগ । ক্যাম্পাস খুললে অন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয় । বহু লড়াকু মুহুর্তকে সঙ্গী করে সফল হয় ৪০ দিনোধিক স্থায়ী প্রথম ধর্ষক প্রতিরোধ আন্দোলন ।
এরপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মদদে ১০ মাসের জন্য ক্যাম্পাসে দখলদারিত্ত্ব কায়েম করল সন্ত্রাসী কাঁকরের নেতৃত্তাধীন ‘কিলার গ্রুপ’ । ১৯৯৭ সালে ছাত্রলীগের অন্য গ্রুপের নেতা আনন্দ হত্যার পেছনে যারা প্রত্যক্ষ ভুমিকা রেখেছিল তাদের কুকর্মে ক্যাম্পাস আবারও ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে । নতুন কলাভবনের টেন্ডার নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠল ক্যাম্পাস ।

৩০ জুলাই’৯৯, বহিরাগত সন্ত্রাসী আর অস্ত্র নিয়ে ‘রেপিস্ট গ্রুপ’ ফিরে আসে ক্যাম্পাসে । দখল করে নেয় মাওলানা ভাসানী, কামালউদ্দিন ও সালাম-বরকত হল । পালিয়ে যায় কিলার গ্রুপ । রেপিস্ট গ্রুপের ভাঙচুর, লুটপাট আর সশস্ত্র মহড়ায় আবারও আতঙ্কিত হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস । ছাত্রসমাজ তখন চুপচাপ বসে থাকেনি । দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া ছাত্র-ছাত্রীদের রক্তে তখন প্রতিরোধের লাল সূর্য । তারা আবারও ঐক্যবদ্ধ হয় ধর্ষন-সন্ত্রাস-দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে । বরাবরের মতোই প্রশাসনের আবস্থান ছিল ধর্ষক-সন্ত্রাসীদের পক্ষে । ১লা আগস্ট তল্লাশি চালানো হয় ছাত্র হলগুলোতে । কিন্তু পরিহাস, সেটা ছিল শুধুই লোক দেখানো ।

ছাত্রদের লক্ষ্য স্থির । ধর্ষক খুনিদের কবল থেকে ক্যাম্পাসকে মুক্ত করতেই হবে । ২রা আগস্ট সকালে ট্রান্সপোর্ট থেকে বের হলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকালের আলোড়ন সৃষ্টিকারী অবিস্মরনীয় মিছিল । দুঃসাহসী মিছিলের সামনের কাতারে থেকে সকল প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে তেজস্বী ছাত্রীরা কামালউদ্দিন হলের তালা ভেঙ্গে ঢুকে পড়ে হলের ভেতর । ঠিক সেই মুহুর্তে মিছিলের শেষাংশ কেবল পার হচ্ছিল রেজিস্ট্রার বিল্ডিং । দখলমুক্ত হলো কামালউদ্দিন হল । এরপর মাওলানা ভাসানী ও সালাম-বরকত হলে স্লোগান উঠল –
“খুনি-ধর্ষক ভাই ভাই, জাবি ক্যাম্পাসে ঠাঁই নাই”
ঐ সকালেই ছাত্রসমাজের অভ্যুত্থান, তেজ এবং জঙ্গিত্ব দেখে কাপুরুষের মত পেছন দিয়ে পালিয়ে গেল দাম্ভিক ধর্ষক-সন্ত্রাসীর দল । শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মচারীদের মাঝে তখন মুক্তির আনন্দ । ছাত্র আন্দোলনের সুতীকাগার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে যোগ হলো আর একটি মহেন্দ্রক্ষন ।
কিন্তু আজ ধর্ষনবিরোধী আন্দোলনের প্রায় ১২ বছর পর এখনও আমার মনে প্রশ্ন জাগে আমরা কি আসলেই আমাদের এই আপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিচরন ভূমি জাবি ক্যাম্পাস থেকে সেই সকল খুনী-ধর্ষকদের পুরোপুরি ভাবে বিতাড়িত করতে সক্ষম হয়েছি নাকি তারা এখনও রয়েছে মুখোশের আড়ালে কিংবা ঐসব ধর্ষক মানিকদের পুনঃজন্ম হচ্ছে নতুন রূপে নতুন আঙ্গিকে ?

(তথ্যগুলো ২রা আগস্ট’২০১১ জাবি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়ন কর্তৃক প্রকাশিত প্রচারপত্র থেকে সংগৃহিত)
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০১১ বিকাল ৪:০৭
৮টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×