অন্য কোনো বিষয়ে না পারলেও সড়ক দুর্ঘটনার দিকে থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের সব দেশকে অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে। দৈনিক আমার দেশ-এর এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত বছর ২০১১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচ হাজার ৯২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। বছরের বিভিন্ন সময়ে গুরুতর আহত হয়েছেন ১১ হাজারের বেশি, যাদের অনেকে পঙ্গু হয়ে গেছেন। নিহত ও আহতদের প্রকৃত সংখ্যা অবশ্য অনেক বেশি। কারণ, হিসাব করা হয়েছে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে। নিরাপদ সড়ক চাই-এর পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, নিহত ও আহতদের প্রায় ৫৪ শতাংশই পথচারী। অর্থাত্ দুর্ঘটনার পেছনে তাদের তেমন দোষ ছিল না। সড়ক দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে খুবই কৌতূহলোদ্দীপক একটি তথ্য বেরিয়ে এসেছে বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণায়। এতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে তুলনা করা হয়েছে তা দেখলে স্তম্ভিত না হয়ে পারা যাবে না। কারণ, বাংলাদেশে যেখানে প্রতি এক হাজার মানুষের বিপরীতে মাত্র দুটি গাড়ি রয়েছে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রে হাজার পিছু মানুষের জন্য গাড়ির সংখ্যা ৭৬৫টি। দু’ দেশের দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান কিন্তু সম্পূর্ণ উল্টো। বাংলাদেশে যেখানে প্রতি ১০ হাজার গাড়ির দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে অন্তত ৬০ জন সেখানে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুর সংখ্যা মাত্র দুই। ইউরোপের ব্রিটেন ও নিউজিল্যান্ড থেকে এশিয়ার জাপান পর্যন্ত সব দেশকেই পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। প্রতি ১০ হাজার গাড়িতে ব্রিটেনে মাত্র ১.৪, নিউজিল্যান্ডে ৩.৩ এবং জাপানে মাত্র ১.৭ জনের মৃত্যু হয়। এমনকি ভারত ও পাকিস্তানেও এই সংখ্যা যথাক্রমে ২৫ এবং ১৯।
সড়ক দুর্ঘটনায় পৃথিবীর সব দেশকে পেছনে ফেলে দেয়ার খবরটি নিঃসন্দেহে ভীতিকর। এ যেন বারো হাত বাঙ্গির তেরো হাত বীচির মতো ব্যাপার-স্যাপার! বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া দরকার। কারণ, বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে বাংলাদেশে গাড়ির সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে। সুতরাং দুর্ঘটনা কমানোর জন্য বেশি জোর দিতে হবে যানবাহন ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে। এর শুরু হতে হবে বিআরটিএ থেকে, যেখানে ঘুষের বিনিময়ে ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি চলাচল করার অনুমতি এবং গাড়ি চালানোর লাইসেন্স দেয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে আসে চালকদের প্রশিক্ষণের বিষয়টি। গাড়ি শুধু চালাতে পারলে চলবে না, অতিরিক্ত গতিতে চালানো, ওভারটেকিং করা, পেছনের গাড়িকে সাইড না দেয়া, ট্রাফিক সিগনাল না মানা, চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা এবং ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী ও মালামাল ওঠানোর মতো বিভিন্ন কারণ রয়েছে, যেগুলোর জন্য দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। এসব বিষয়ে চালকদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে এবং যথেষ্ট সময় নিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া দরকার। অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে, ব্যক্তিগত পর্যায়ে তো বটেই এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠান বিআরটিসিও মাত্র এক মাসের মধ্যে সব মিলিয়ে মাত্র ১১ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ দিয়েই লাইসেন্সের জন্য চালকদের বিআরটিএর কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছে। বিআরটিএও যাকে-তাকে লাইসেন্স দিচ্ছে। লাইসেন্স পাওয়া যাচ্ছে দালালের মাধ্যমে এবং ঘুষের বিনিময়েও। এভাবে কোনো রকমে গাড়ি চালানো শিখে যারা দেশের সড়কপথে নেমে আসছে তাদের কারণেই ঘটছে বেশিরভাগ দুর্ঘটনা।
এমন অবস্থা অবশ্যই চলতে পারে না। চালকদের বোঝানো দরকার, শুধু চালাতে পারাটাই যোগ্যতা প্রমাণ করে না। বড় কথা হচ্ছে আইন মেনে এবং কারও যেন কোনো রকম ক্ষতি না হয় সেসব দিকে লক্ষ্য রেখে অতি সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালানো। ‘সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি’ কথাটা প্রায় সব গাড়িতেই কেন লেখা থাকে তার কারণও চালকদের বুঝিয়ে দেয়া দরকার। দ্রুত না চালালে কিংবা সামনের গাড়িকে ওভারটেক না করলে যে দুনিয়া উল্টে যাবে না সে কথাটাও তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে হবে। এ কথাও বোঝানো দরকার যে, তার নিজের এবং স্ত্রী-সন্তান ও স্বজনদের মতো অন্যদের জীবনেরও সমান মূল্য রয়েছে। তাকে মানুষ হত্যার লাইসেন্স দেয়া হয়নি। ট্রেড ইউনিয়নের নামে চালকদের যারা লাই দিয়ে ঘাড়ে উঠিয়ে চলেছেন তাদেরও উচিত মানুষের জীবনের মূল্য নিয়ে চিন্তা করা এবং জীবন বাঁচানোর জন্য সচেষ্ট হওয়া। প্রসঙ্গক্রমে পুলিশ এবং পথচারীদের দায়িত্ব সম্পর্কে কিছু কথা না বললেই নয়। ঘুষ খেয়ে ছেড়ে দেয়া ধরনের পুরনো ও প্রতিষ্ঠিত অভিযোগ স্মরণ করিয়ে দেয়ার পরিবর্তে বলা দরকার, কর্তব্যের প্রতি পুলিশ যদি একটু আন্তরিক হয় তাহলেই দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। পথচারীদেরও উচিত সড়ক পারাপারের সময় ট্রাফিক সিগনাল মেনে চলা এবং কোনা দিক থেকে কোনো গাড়ি আসছে কিনা তা লক্ষ্য করা। হাইওয়েতে ভটভটি ও নসিমন-করিমন ধরনের যানবাহন চলাচলও বন্ধ করা দরকার।
আমরা আশা করতে চাই, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু কমিয়ে আনার ব্যাপারে চালক, মালিক ও সরকার পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সবাই তত্পর হয়ে উঠবেন। আমরা প্রতিদিন মৃত্যুর খবর শুনতে চাই না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



