ইউরোপীয় ধারণার স্বদেশ হচ্ছে পিতৃভূমি; আর আমরা, বাংলাদেশসহ ওরিয়েন্টাল কালচারের লোকেরা বলি মাতৃভূমি। একটি স্বাধীন দেশ তার অধিবাসীদের পিতার মতো রক্ষা করে—এ কল্পনা থেকে পিতৃভূমির কনসেপ্ট এসেছে। দেশ তার সন্তানদের (অধিবাসীদের) মায়ের মতো আগলে রাখে—এ ধারণা দেশমাতৃকা শব্দের উত্স। জন্মভূমিকে জননীরূপে বর্ণনা করা প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্য থেকে আধুনিক বাংলা রচনা পর্যন্ত সবখানেই ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান। দ্বিজেন্দ্র লাল গান লিখেছেন—‘ভাইয়ের মায়ের এত স্নেহ কোথায় গেলে পাবে কেহ/ওমা তোমার চরণ দু’টি বক্ষে আমার ধরি/আমার এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি।’
বাংলাদেশকে বলা হয় নদীমাতৃক দেশ। দেশের আগে নদীমাতৃক বিশেষণ যোগ করে আমরা স্বীকার করে নিয়েছি যে, ছোট-বড় হরেক আকৃতির ও প্রকৃতির নদী বাংলাদেশকে সজীব ও সচল রেখেছে মাতৃস্নেহে। আবহমান কাল থেকে বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল নদীপথনির্ভর। পাল যুগেরও আগে থেকে শুরু করে ব্রিটিশ আমলের শেষ পর্যন্ত এ ধারার কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। ব্রিটিশ আমলে রেল নেটওয়ার্ক গড়ে উঠলেও পূর্ব বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশ) যোগাযোগের সুয়োরানী ছিল নদীপথ। পরিস্থিতি পাল্টে গেল পাকিস্তান আমলে, বিশেষ করে সেনাপতি আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর থেকে। বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ আমাদের দাতাগোষ্ঠী সেজে বসল। অতিসহজ শর্তে হু হু করে ডলার আসতে লাগল। ‘দাতা গোষ্ঠীর’ নির্দেশ—টেকসই উন্নয়ন করতে হবে। আর টেকসই উন্নয়নের ভিত হিসেবে ভৌত অবকাঠামো বাড়াতে হবে। ভৌত অবকাঠামো বাড়াতে গিয়ে শহরে ও গ্রামেগঞ্জে পড়ে গেল রাস্তা নির্মাণের ধুম। জলাশয় ভরাট করে, খালে বাঁধ দিয়ে, নদীর গতিপথ সংকুচিত করে সড়ক যোগাযোগ বাড়তে থাকল। সেই গতি বাংলাদেশ আমলে এমন বেগবান হয়ে উঠল যে, সড়ক নির্মাণের মহাযজ্ঞে জীবন আহূতি দিতে হলো বহু খাল এবং নদীর। যেগুলো টিকে রইল সেগুলোও হয়ে পড়ল ক্ষীণকায়। ফলে নৌপথে যোগাযোগ কমে গেল, ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠল। সড়কপথে বেড়ে গেল যাত্রী ও মালবাহী গাড়ির চলাচল। প্রায় প্রতিদিন একাধিক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় পথের আরাম হারাম হওয়ার পর অনেক দেরিতে আমরা বুঝতে পারলাম, নদীপথ ছেড়ে সড়ক যোগাযোগে আমাদের উত্সাহিত করার পেছনে ছিল বিদেশিদের বেনিয়া বুদ্ধি। তাদের কার, ট্রাক, বাস, মিনিবাস, পিকআপ ইত্যাদি বিক্রির জন্য বাংলাদেশ যাতে রমরমা বাজার হয়ে ওঠে তার জন্যই সড়ক উন্নয়নের এত নসিহত। এমন কাণ্ড দেখা গিয়েছিল ইউরোপে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর। সে সময় ইউরোপজুড়ে চলছিল নারী মুক্তি আন্দোলনের জোয়ার। এর সপক্ষে পত্রিকার পাতাজুড়ে থাকত সচিত্র বিজ্ঞাপন। সে সব বিজ্ঞাপনে দেখা যেত নারী মুক্তির প্রতীক হিসেবে পুরুষের পাশাপাশি নারীও সমানতালে সিগারেট ফুঁকছে। অ-নে-ক পরে জানা গেল, এসব ছিল বড় বড় সিগারেট কোম্পানির কারসাজি। ছেলে ধূমপায়ীর পাশাপাশি মেয়ে ধূমপায়ীর সংখ্যা বাড়ানোই ছিল তাদের মতলব। এ কাজে তারা এতটাই সফল হয়েছিল যে, আজ পর্যন্ত ইউরোপে শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে ছেলে ধূমপায়ীর চেয়ে মেয়ে ধূমপায়ীর সংখ্যাই বেশি।
দেশের কথায় ফিরে আসা যাক। সড়ক পথের প্রসার ঘটাতে গিয়ে নদীপথকে অবহেলার খেসারত আমাদের এখন দিতে হচ্ছে। পাকিস্তান আমলে নদী পথের দৈর্ঘ্য কমতে শুরু করলেও ১৯৬২-৬৭ সালের নেডেকোর জরিপ অনুযায়ী নাব্য নৌপথের দৈর্ঘ্য ছিল ১৩ হাজার ৭৭০ কিলোমিটার। পক্ষান্তরে ১৯৮৭-৮৮ সালের ডাচ ডিএইচডি কর্তৃক সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী নাব্য নৌপথের মোট দৈর্ঘ্য বর্ষাকালে মাত্র ৬০০০ এবং শুষ্ক মৌসুমে মাত্র ৩৮২৪ কিলোমিটারে কমে এসেছে। এটা হচ্ছে ২৩ বছর আগের হিসাব। এখন যে নাব্য নৌপথের অবস্থা অনেক বেশি খারাপ তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বর্তমানে ৬০০০ কিলোমিটার নৌপথ নাব্য রাখাই আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, নিয়মিত ড্রেজিং ছাড়া নাব্য নৌপথ নিশ্চিত করার আর কোনো উপায় নেই। বাংলাদেশের যমুনা ও পদ্মা নদী বিশ্বের বড় নদীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক ও দুর্বোধ্য আচরণকারী হিসেবে গণ্য। এ দু’টি নদীর পলিমাটির পরিমাণ বছরে প্রায় দু’শ’ কোটি টন। বাকি সব নদী মিলিয়ে বাংলাদেশে নদীবাহিত পলির পরিমাণ বছরে চারশ’ কোটি টনের কম হবে না। এই বিপুল পরিমাণ পলিমাটি ঠিকমত অপসারণ করা না গেলে নাব্য নৌপথ নিয়ত সংকুচিত হবার কথা। বাস্তবে হচ্ছেও তাই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিপুল পলিমাটি ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নিয়মিত অপসারণের জন্য কমপক্ষে ৫০টি ড্রেজার দরকার। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন দেশ থেকে ৮টি ড্রেজার সংগ্রহ করেছিল। এই ৮টি ড্রেজারকে সম্বল করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ সাড়ে তিন দশক ধরে পলি অপসারণের এক অসম যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এই পটভূমিতে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্স নেদারল্যান্ডসের ভোস্টা এল এমজি’র সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্বে বিশ্বমানের অত্যাধুনিক ড্রেজার নির্মাণ শুরু করেছে। এই প্রতিষ্ঠানের নির্মিত ৩টি ড্রেজার বছর দেড়েক আগে বিআইডব্লিউটিএ’র কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এমন একটি প্রয়োজনীয় খাতে বিনিয়োগের জন্য দেশীয় উদ্যোক্তারা আরও আগে এগিয়ে এলেন না কেন, সেই রহস্যের উত্তর নানান প্রতিকূলতার মধ্যে নিহিত। এ ধরনের উদ্যোগকে উত্সাহিত করা হলে অদূর ভবিষ্যতে শত ড্রেজারের পলি অপসারণ নাব্য নদীপথের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে পারে। তখন আবার আমরা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারব : ‘নদীমাতৃক বাংলাদেশ’—কথাটা মিছা নয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



