দু:খী সবুজ পাতা প্রথম পর্ব
দু:খী সবুজ পাতা দ্বিতীয় পর্ব
দু:খী সবুজ পাতা তৃতীয় পর্ব
৬
ভোর হলে বনমোরগ ডেকে ওঠে। বালিহাস আকাশে দলবেঁধে চিঁচিঁ শব্দ করে উড়ে যায়। কিচির মিচির করে লাফায় চড়াই। তারপর আসে ডাহুক আর মুনিয়া। মাছরাঙা ঘুম ভেঙে ডালে বসে মাছ খুঁজতে থাকে। পানিতে বুদবুদ তোলে কাঁকড়া। পাখীরা দেখে পুরনো তেতুলের এক পাশ ফাঁকা।
কাজে যাবার সময় তেতুলের দিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। প্রতিদিনই বনের গাছ গুলো কমে যায়।চড়াই আর ঘুঘু নিচু গলায় আলাপ করে, মানুষেরা সব পারে। আমার ভাইকে ওরা ফাঁদ পেতে ধরে নিয়ে গেছে। মানুষেরা এত খেতে পারে, চড়াইটা বিরক্তি নিয়ে বলে, এমন কি আমাদের মত ছোট শরীরকেও ওরা ছাড়ে না।
পাখীরা পাকা তেতুল খেতে ব্যস্ত হয়। খুব যত্ন করে ফলের গোড়ায় ঠোকরায়। পাতা ছিঁড়ে যায় না, ডালে ব্যথা হয় না। আর ঠোঁট দিয়ে ফল খাওয়ার সময় গাছকে জিজ্ঞেস করে নেয়, বিচিটা কোথায় ফেলার ইচ্ছে। পাখীরা সেই ইচ্ছে আনুযায়ী বিচিটাকে বয়ে নেয় দুরের কোন জঙ্গলে, হাওর অথবা নদীর পারে।
যে বুলবুলিটা এখন তেতুল নিচ্ছে তার বাসা কাছেই। দুই গাছ পরে কৃষ্ণচূড়ার ডালে থাকে সবাই মিলে। বুলবুলিটা বয়স বেশী না। সে ছিটে পাতার সমবয়সী। মাঝে মাঝে ওর ভাই বোন সবাই আসে। বুলবুলিদের গলা মিষ্টি হয়। ছোট বুলবুলি সময় হলে ছিটে পাতাকে গান শোনায়। লজ্জাবতী শিশুটাও বুলবুলির গানের ভক্ত।
বুলবুলিটা আজকে একটা মরুভূমির গান গেয়েছে। পাতা প্রায় বলতে যায়, পাহাড়ী হাতির গান শোনানোর জন্য। ঠিক এমন সময় লজ্জাবতী ডাকে,এই ছিটে পাতা তুই একটা গান শোনা। বুলবুলি ছিটে পাতা নামটা জানতো না।
বুলবুলিটাও কম দুষ্টু না। ভীষণ মজা পেয়ে সে বলে, তাই তো আজ থেকে আমিও ডাকবো - ছিটে পাতা। এত ছোট নাম আগে তো জানিনা।
ছিটে পা-তা, ছি-টেপাতা, তা-তা-তা-তা ... বুলবুলিটা গান ধরে। ছিটেপাতাটার তখন ইচ্ছে হয় লজ্জাবতীর ডাল ধরে জোরে ঝাঁকি দেয়। সব পাতা বুঁজিয়ে শাস্তি না দিলে ও ঠিক হবে না। কিন্তু বেশী রাগ হয়ে সে আর কিছুই পারে না।
তেতুলের ডালে সপ্তাহ দুই আগে একটা লতানো গাছ এসেছে। কলাপাতার মতো পাতা আর থোকা থোকা সাদা ফুল। গাছটায় অনেক ফুল ফোটে আর সঙ্গে সঙ্গে নাকে মিষ্ট গন্ধ ভেসে আসে। লজ্জাবতী ফিস ফিস করে ছিটে পাতাকে বলে, দ্যাখ, মধু খেতে কত রঙের প্রজাপতি এসেছে? নীল, বাদামী আর কমলা তাদের রঙ। আচ্ছা ছিটে তোদের কি ফুল হয়"? ছিটে পাতা মায়ের কাছে শুনেছে তার কোন ফুল হয়না। মধু নেই, তাই তাদের কাছে প্রজাপতিরা আসে না।
সন্ধা নামে আবারও কিন্তু বন অন্ধকার হয়না। পুর্নিমার আলো টলমল করছে পুকুরে। বৃষ্টি হয়েছে আজ। ঝির ঝিল বৃষ্টির আঁচ থেমে যায়নি। পাতাগুলো জলের ছোঁয়া পেয়ে তাজা সবুজ হয়ে যায়। বনে একটা উৎসব উৎসব ভাব।দুরে দেবদারুর পাতার গান ভেসে আসে, মান্দার, শীল কড়ই - চাঁদের ।আলোয় বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে গুন গুন করে এক সঙ্গে গেয়ে আনন্দ করে।
ছিটে পাতার হঠাৎ মনে হয়, সব কষ্টের কিছু ভাল দিক থাকে। গাছের আড়ালে চাঁদটা ঢেলে থাকতো। মগডাল না থাকায় খোলা আকাশ দিয়ে চাঁদের আলো সরাসরি তার চোখে পড়ছে। আলোয় মায়ের পত্ররেখা চক চক করছে।
এমন সময় সবুজ লতানো পাতার মা একটা দারুণ সুসংবাদ দেয়, "বাচ্চারা, তোমাদের একটা ভাই হয়েছে। সে আমাদের পরিবারে এক নতুন অতিথি"।
ছিটে পাতা, তার মেজ বোন, সেজ বোন সবাই দেখতে পায় মায়ের লতিকায় বেড়ে উঠেছে একটা ছোট কুঁড়ি। ছোট হলুদ-সবুজ মেশানো তার শরীরের রং ।তুলতুলে, হালকা চিকন সবুজ পাতার শিরা। আর কি মজা! পাতাটাও বিন্দু চোখে পিট পিট করে দেখছে তাদের।
ছিটে পাতার একটু মন ভার হয়, তার ভাইটার চেহারার সঙ্গে বড় বোনেরই মিল বেশী। পরের মুহুর্তেই একটা নতুন ভাই পাওয়ার আনন্দে সব ভুলে যায়। তাকে আপু ডাকবে - এই খুশিতে হঠাৎ দুচোখে শিশির ঝরতে থাকে।
এই খবরটা ভোরের মধ্যে জেনে যায় সবাই। তেতুলগাছ সন্তানদের হারিয়ে নিশ্চুপ ছিল। সেও ছিটে পাতার মাকে অভিনন্দিত করে। আর বিকেলে তপসে ফড়িং নাচে, গঙ্গা ফড়িং উড়ে বেড়ায় ঘুরে ঘুরে। আর বুলবুলি, টিয়া, ময়না সবাই তাদের ঘিরে নেচে নেচে গান করে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

