দু:খী সবুজ পাতা প্রথম পর্ব
দু:খী সবুজ পাতা দ্বিতীয় পর্ব
দু:খী সবুজ পাতা তৃতীয় পর্ব
দু:খী সবুজ পাতা চতুর্থ পর্ব
৭
বুলবুলিটার ঠোঁটে রূপালী জলের ফোটা। পুকুর থেকে তুলে নিয়ে এসেছে ছিটে পাতার ছোট ভাইটার জন্য। পানির ফোটা মুখে ছিটেয়ে দিতেই শিশুপাতাটা চোখটা বুঁজে কেঁপে ওঠে, যেন তাকে লেবুর রস চিপে দেয়া হয়েছে।
লতানো পাতার মা বলে, "এই, বেশী পানি দিসনে ও খুব ছোট, কষ্ট হয়"। বুলবুলিটা ছিটে পাতাকে জ্ঞান দেয় যে, "মুখে মধু দিতে পারলে কথা মধুর মতো মিষ্টি হয়। মধু খেতে কষ্ট হবে বলে পানি এসেছে।"
মানুষ জন্মের পর পর মুখে মধু দেয়। তাতে তাদের ব্যবহারে মিষ্টতা থাকে, কথাও বলে সুন্দর করে। অবশ্য ছিটে পাতা যতগুরো মানুষ দেখেছে তাদের কোনটিকেই মিষ্টি স্বভাবের মনে হয়নি। হয়তো তাদের বাবা মা মধু দেয়নি। দিলে কি আর পান গাছের নিরীহ পাতা দানবের মতো কচ কচ করে খায়? পানিই এর চেয়ে ভাল।
অবশ্য প্রায়ই ছিটের গায়ে ফোটা ফোটা মধুর ঝরে পড়ে। তেতুলগাছের একডাল ওপরে মৌমাছিরা চাক করেছে। সাদা ফুলের রস থেকে ভাল মধু হয়। তাই মৌমাছিরা তেতুলগাছে বাসা বেঁধেছে।
মৌমাছিল চাকটা শুরুতে লিচুর মতো ছোট ছিল। পতঙ্গগুলো খুব পরিশ্রম করতে পারে। চাকটা মধু জমিয়ে তারা বিরাট করে ফেলেছে। মৌমাছিরা ফুলের রস নিয়ে বিনিময় উপকার করে। তারা ফুলে ফুলে ডাকপিয়নের মতো খবর পৌছে দেয়।
লতানো গাছগুলো মৌমাছির জ্বালায় অতিষ্ঠ । মৌমাছিরা বনের নিয়ম জানে না। রাতে ভোঁ ভোঁ শব্দ করে। শব্দে ঘুম আসে না। প্রথমে ছিটে পাতার মাও খুব বিরক্ত ছিল। তার সবচেয়ে ছোটটা তো পুকুরে পানির শব্দেই ঘুম থেকে উঠে যায়।
দু'দিন পর মৌমাছিদের প্রধান, মানে রানীমা ছিটে পাতার ভাইটাকে দেখতে আসে। কালো শরীর, চোখে চশমার কিছু একটা। পাতারা মৌমাছিদের রাতে শব্দ করার অভিযোগটা জানায়। রানীমা খুব গম্ভীর গলায় বলে, "আমাকে ক্ষমা করবেন। মধু যোগাড় করতে নতুন কর্মী এসেছে অন্যচাক থেকে। ওরা সারাদিন কাজ করে ।তার পর রাতে একসঙ্গে খেতে বসি আমরা। বুঝতেই পারেন দিন শেষে খেতে বসলে কতটা উৎফুল্ল থাকতে পারে। তবুও বলবো যাতে যতটা সম্ভব কম হৈ চৈ হয়"।
রানীমা ছিটে পাতার ভাইয়ের জন্য মধুর মোমের বালিশ নিয়ে এসেছিল। ছোট্ট শিশুপাতাটা যাতে বাতাসে না নড়ে, তেতুলের বাকলে সেটা লাগিয়ে দেয়া হয়েছে।
৮
সামান্য শীত পড়ছে। বাতাস শুকিয়ে যেতে থাকে। মাস খানেকের মধ্যে কন কনে ঠান্ডা পড়বে। অবশ্য সকালে রোদটা বেশ লাগে। কুয়াসায় দুরের গাছগুলো ছায়া ছায়া লাগে। বনের পথে মানুষের আনাগোনা কমে যায়। কাঠুরে ছাড়া হাতে গোনা লোক আসে। গায়ে চাদর মোড়ে।
ছিটে পাতা তার ভাইটাকে বড় হতে দেখে। শীতকালে পানির অভাবে মা অল্প করে পানি দেয়। শিশু ভাইটা তো আর বোঝে না। সে মাঝে মাঝে বেশী পানি খেয়ে ফেলে।
অন্য ভাইবোনেরা এজন্য তাকে বকে না। কুঁড়ির থেকে শিশুপাতার শরীরটা পাতা পাতা হতে থাকে। কাঠবিড়ালী যখন জোরে লাফিয়ে এ ডাল ও ডাল যায়, ছোট ভাইটি যেন ভয়ে কেঁদে দিত। তবে এখন আর কাঁদেনা। জেগে থাকলে বারবার তৃষ্ণা পায়। ছিটে পাতার মা পাতাদের ঘুমিয়ে থাকতে বলে।
সকাল থেকেই ছিটে পাতা গভীর ঘুমে অচেতন থাকে। সেদিন হঠাৎ মনে হলো তার পিঠ কে কেউ পুড়ে ফেলছে আর তার চারদিকে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ছার খার করে দিচ্ছে। সে ঘুম ভেঙে মৌমাছিদের চিৎকার শুনতে পায়। একটা মই দিয়ে গামছায় মুখবাঁধা একটা উপরে উঠে আর খড়ের বেনীতে আগুন জ্বেলে চারদিক ঘুরায়। উজ্জল কমলা আলোয় ভরে গেছে চারদিক। একটা রামদার মতো কিছু সমানো কোপাতে থাকে মৌচাকে।
তার মা নিজেও এমন দেখেনি। তারা ও লজ্জাবতীরা ঠক ঠক করে কাঁপতে থাকে। মৌচাকটা ভেঙে চুড়ে পড়তে থাকে। রানী মৌমাছিটা আগুনে পুড়ে যায়।
হঠাৎ ছিটে পাতা পিঠে জোরে একটা আঘাত পায় । সে মা বলে চিৎকার করে। তারপর তার আর কিছু মনে নেই।
৯
জ্ঞান হারানোর পর লতানো সবুজ পাতাটার মেরুদন্ডে ব্যথা হয়। শরীর প্রায় অবশ। সে মা বলে অস্ফুট ডাকে। মা - মা -মাগো। কোন উত্তর নেই।
সে নিজেকে পুকুরের পানিকে ভাসতে দেখে।বড় পাবদা মাছের গলা শুনতে পায়, আহ,হারে - তুমি বোধ হয় তেতুল গাছে ছিলে।
কষ্ট বেড়ে গেলে মানুষ পাথর হয়ে যায়। পাতারাও কষ্টে জমাট বাঁধে। ছিটে পাতা তার মা, বোন, তার ছোট্ট ভাই, তেতুল গাছ, লজ্জাবতীর কথা ভেবে হু হু করে কাঁদতে থাকে। এদিকে তার খুব তেষ্টা পায়। মা ছাড়া সে তেষ্টা মিটাতে জানে না।
ছোট মাছেরা তাকে ঘিরে আছে। মৌরলা, চাপিলা, স্বরপুটি মাছের শিশুরা তাকে দেখে ভীড় করেছে। একটা ছোট মৌরলা বলে, মা, এই সবুজ মাছটা কি সবাইকে কামড়ায়? তার মুখ কোথায়? সে কী খায়?
ছিটেপাতার দু:খের ভেতর হাসি পায়। চাপিলা মাছ সবাইকে বলে এ হলো গাছের পাতা। তারা আমাদের মতো খায় না। ওদের নিচে শেকড় হয়। পাতাটার এখনো শেকড় হয়নি। যখন হবে তখন সেই শেকড়ে সে পানি আর কাদা খাবে।" তারপর ওরা বলে, "চল সবাই মিলে পাতাটার বোঁটাটা পানিতে ঘুরিয়ে দেই"।
ছিটে পাতা বেঁচে থাকার আশায় যেন একটু হাল পায়। তার অবশ-ক্লান্ত-ব্যথায় আক্রান্ত শরীরটাকে মৌরি, কাজলা আর পাবদা মাছেরা ঘুরিয়ে দেয়। তৃষ্ণায় ক্ষুধায় আর সে তাকাতে পারছিলনা। পাতাটা বাতাসে ডগা ভাসিয়ে জ্ঞানহীন হয়ে পানিতে পড়ে থাকে।
১০
সকালে এক মাঝবয়সী খোলসে মাছ আসে। এসে তার গা ধুইয়ে দেয়। মাছেদের ছিটে দুর থেকে ভয়ই পেতো।
খোলসে বলে, "তুমি ভেবো না, অনেক পাতাই তোমার মতো বিপদে পড়ে ভেসে আসে । তাদের সেবা করে আমরা সারিয়ে তুলি। গাছ আর মাছ তো খুব ভাল বন্ধু। তুমি মায়ের জন্য কেঁদো না"।
খোলসে মাছ ছিটে পাতার চেহারা দেখে মায়া হয়। সে একটা গান ধরে -" রি রি রি দা না দা"। মাছদের এমন গানকে পাতার হিজিবিজি মনে হয়।
খোলসে মাছ বুঝতে পেরে বললো, "জানো, পাতা, তোমার মতো আমারও ভিতরটা কষ্টে আছে। আমার ১০০ টা ছেলে মেয়ে ছিল। জেলেরা জাল ফেলে গতমাসে তাদের ধরে নিয়ে গেছে। যদি মন খারাপ করে থাকি তাহলে তো আমরা বেঁচে থাকতে পারবো না। শালুকের সঙ্গে কথা বলো, ও তোমাকে সাহায্য করতে এসেছে"।
শালুক মাথা নেড়ে বললো, "শুনলাম তুমি নতুন এসেছে, ভয় পেয়ো না, পানিতে বেঁচে থাকার কিছু নিয়ম আছে। একবার শিখে গেলে মন্দ লাগবে না"। তারপর তাকে বুঝিয়ে দেয়,"তোমার পাতার ডগা দিয়ে ধীর ধীর পানি চুষে নাও"।
ছিপে পাতা শালুকের কথা মতো কাজ করে। পুকুর থেকে ধীর ধীরে পানি তার শিরায় ঢুকে যায়। সে সঙ্গে সঙ্গে শক্তি ফিরে পায়। মাত্র এক সপ্তাহ যেতেই ছিটে পাতার শিরায় ছোট ছোট শেকড়ে গজায়। পানি খেতে তখন আর জোরে চুষতে হয় না।
সময়ে নতুন পরিবেশ কে মেনে নেয় গাছ মানুষ পাখী সবার ধর্ম। খোলসে মাছ, পাবদা মাছ, শালুক, চিংড়ি মাছ - সবাইকে আপন করে নতুন জীবন, নতুন সংসার ফিরে পায় ছিটেপাতা। যদিও চাঁদের রাতে মায়ের কথা খুব মনে হয়। কেমন আছে তার বোনগুলো, আর সেই ছোট্ট তুল তুলে ভাইটা? ও কি বড় হয়ে গেছে, হাসতে পারে? ওর কি ছিটে পাতার কথা মনে পড়ে?
বনে কাঠুরেরা প্রায়ই আসে। গাড়ির শব্দ শুনলে ছিটে পাতা বুঝতে পারে সেটা। কিন্তু একদিন এক অপরিচিত গাড়ির শব্দ শুনতে পায় ছিটে পাতা। বিকট জোরে হর্ণ দেয় - পি----ই--প। আর চাকার আওয়াজে মাটি থর থর করে কাঁপতে থাকে।
(চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

