আমার আব্বু প্রায়ই মজা করে একটা কথা বলেন "নিন্দাইলে পিনতে হয়।" অর্থাৎ আপনি যদি কোন কিছুর নিন্দা করেন তাহলে নিয়তির খেলায় একদিন না একদিন সেই জিনিসটির কাছেই আপনাকে হার মানতে হবে। আব্বুর ক্ষেত্রে কথাটা ১০০% সত্য । আব্বু ছাত্র বয়সে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তিনি জীবনেও নবাবগঞ্জ এর মেয়ে বিয়ে করবেন না, কিন্তু তাঁর সেই কথা শুনে মনে হয় বিধাতা উপর থেকে মুচকি হেসেছিলেন। তাই আমার বাবার ভাগ্যে নবাবগঞ্জ এর মেয়েই জুটেছিল, তাও নিজে পছন্দ করে (উল্লেখ্য আমার মায়ের দেশের বাড়ি নবাবগঞ্জ )।
যাই হোক , আজ আমি আব্বুর দুর্দশার কথা বলতে আসিনি। তবে আমার ক্ষেত্রে ঘটনা অন্য । যদিও নিয়তি তার খেল ঠিকই দেখিয়ে যাচ্ছে ।
আমি কখনও সিগারেটখোরদের পছন্দ করতাম না (এখনো করিনা, আমি বিশ্বাস করি পৃথিবীতে মহা বোকা প্রাণী এরাই, কারন সব জেনেশুনেই তারা দিনের পর দিন বিষ খেয়ে চলে। ) যারা এই সাদা শলাকা খেত তাদের কখনও মন থেকে গ্রহণ করতে পারতাম না , তা সে যতই কাছের মানুষ হোক । এমনকি এই সিগারেট খাওয়ার জন্য আমি এক জনের সাথে বন্ধুত্তের বন্ধনও ছিন্ন করেছিলাম (সে আরেক কাহিনি!)
কিন্তু গত ৪/৫ মাসে আমার কি হল জানি না , কেন জানি জিনিসটার প্রতি একটা দুর্বলতা তৈরি হল । না, আসলে আমি জানি কেন। ওই যে , যার সাথে আমার বন্ধুত্ব ছিন্ন হয়েছিল, সে যে কারনে সিগারেট ধরেছিল, আমিও একই কারণে ধরতে চেয়েছিলাম । খুব খারাপ হয়ে যেতে ইচ্ছা করত। মনে হত সিগারেট খেলে হয়ত মনোযোগটা একটু হলেও অন্যদিকে চলে যাবে । অথচ, এই আমিই একসময় বলতাম, কি বোকার মত চিন্তাভাবনা, সিগারেট খেলে কি কখনও কষ্ট ভোলা যায়? কম বকা দেইনি আমি ওই প্রাক্তন বন্ধুকে। কিন্তু আমি ওর পজিশনে গিয়ে বুঝতে পারলাম কি মানসিক যন্ত্রণায় ও এই সাদা শলাকা ধরেছিল।
যাই হোক, আমার এক পাগলা বন্ধু আছে। ও আমার কষ্টের কথা জানতো । ওর কাছেই প্রথম ঘ্যাঁনঘ্যাঁন করা শুরু করি সিগারেট খাওয়ানোর জন্য। আসলে দোকানে নিজে গিয়ে কেনার সাহস আমার হয়নি। ও অবশ্য পাত্তা দিত না, ভাবত মজা করছি। যাই হোক, ওর কাছ থেকে সাদা শলাকা খেতে ব্যর্থ হই । (ব্যাপারটা এমন না যে ও আমার ভাল চায় তাই খাওয়ানি, ওই হয়ত ভয় পেয়েছিল একটা মেয়ে ওর সামনে কিভাবে সিগারেট খাবে এই ভেবে !!!!)
তারপর আমার আবৃত্তি দলে একজন বড় ভাই আছেন, খুব সুন্দর আবৃত্তি করেন। তার সব কিছুই ভাল , এই একটা জিনিস ছাড়া, তিনি ধূমপায়ী । তো আমরা আড্ডা মারার সময় যখন তিনি সাদা শলাকা টানতেন , তখনো তার কাছে বলতাম "ভাইয়া, আমিও খাব!" বলা বাহুল্য , উনিও আমার এই নিরিহ(!) আবদারকে কখনই পাত্তা দেননি । সবসময় বলেন, তুমি সিগারেট খেলে আমার কোন আপত্তি নেই,কিন্তু আমার কাছ থেকে কখনও না। মানেটা হল, উনি নিজে পাপ করলেও আরেকজনকে পাপের পথ দেখাবেন না (মহাপুরুষই বলতে হবে!)
তারপরও সুযোগ খুঁজছিলাম কোন ভাবে ম্যানেজ করে একটা হলেও চেখে দেখার। কিন্তু সমস্যা হল সিগারেট জোগার করতে পারলেও কই খেতাম? কারন বাসায় কেউ খায় না, খেলেও গন্ধ ছড়াতই! আমাদের নিচতলার বাসিন্দা যখন সাদা শলাকা টানেন, তখন তা আমার বারান্দা হয়ে লিভিং রুম পর্যন্ত গন্ধ চলে আসে। আজব ব্যাপার সেই গন্ধেও আমার একসময় বমি আসত , এখন তা ভাল লাগে !!!
আজ এসেছিল সেই সুযোগ! আমি সম্প্রতি নিজের পরিবার ছেড়ে চাচাদের কাছে চলে এসেছি । চাচারা তো সারাক্ষণ এগুলোই খাচ্ছে! প্রথম দিন দেখেই আমার মাথায় ঢুকল , চাচা কোথায় সিগারেট রাখে দেখতে হবে। আজ চাচাচাচি দুজনেই বাইরে যাবার পর ঘরটা একটু খুঁজতেই পেয়ে গেলাম । তাড়াতাড়ি চাচাতো বোনটা চলে আসার আগেই সালোয়ারে গুঁজে ফেললাম ! রুমে আসার পর দেখি মসৃণ সিগারেটটা কুঁচকে গেছে ! প্রথমে ভাল করে গন্ধ শুঁকলাম ওটার ! আঃ, কি সুন্দর ঘ্রাণ ! (মিথ্যা বলব না, তামাকের এই ঘ্রাণটা আমার আগে থেকেই ভাল লাগত,
আমি প্রায়ই সিগারেটের খালি প্যাকেট শুঁকতাম!) কিন্তু সমস্যা দেখা দিল আমার কাছে ম্যাচ নেই। আবার চুলা থেকে জ্বালাতে গেলেও কার চোখে পরে যাবার সম্ভাবনা আছে। কি করি?
রান্নাঘরে গিয়ে কফি বানালাম। বড় ভাইরা সবসময় বলে চা এর সাথে নাকি সিগারেট দারুন জমে! আমি নাহয় কফিই খেলাম । বানানো শেষ হলে আস্তে করে ম্যাচটা ওড়নায় ঢেকে নিয়ে রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলাম । আমার উত্তেজনা বাড়ছে। আশেপাশের শব্দ শুনে আরও টেনশন বাড়ছে। জানালাটা খুলে ডান হাতে সিগারেট আর বাম হাতে ম্যাচ নিলাম । আগুন জ্বেলে সিগারেটের মাথায় লাগালাম , কিন্তু কই, কিছু তো হল না, খালি সিগারেটের মাথাটা পুড়ে কালো হয়ে গেল। ওহ , এবার মাথায় আসলো আগুন জ্বেলে সাথে সাথে মুখ দিয়ে টানতে হবে। আবার জ্বালালাম ম্যাচ। মুখ দিয়ে সাথে সাথে টানার আগেই নিভে গেল আগুন। ধুর, আবার চেষ্টা করলাম, আবার। এভাবে আমার প্রথম সিগারেট জ্বালাতে লাগলো ৫ টা ম্যাচের কাঠি ! যাক ,এবার টানার পালা। এক বন্ধুর কাছে তার প্রথম সিগারেট খাওয়ার অভিজ্ঞতা শুনেছিলাম বলে জানতাম কিভাবে খেতে হয়। তবে প্রথমে অভ্যস্ত হবার জন্য মুখ দিয়ে টেনে নাক দিয়ে ছেড়ে দিলাম । ২/১ বার এরকম ইনহেল করে অল্প একটু ধোঁয়া গিলে নিলাম.. না, আমার বিকট কাশি হয়নি! গলাটা একটু জ্বলল , খুক খুক করে কাশলাম এইত। তারপর আস্তে আস্তে টানার পরিমাণ বাড়াতে থাকলাম। ধুর , বেশির ভাগ ধোঁয়াই ফুসফুসে ঢোকার আগেই নাক দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছিল, অনভ্যস্ততার কারনেই হয়ত । তবে এরপরে যতই টানছি , ততই বাড়ছে কাশির পরিমাণ। ভেবেছিলাম, প্রথমে কাশি হবে, পরে ঠিক হয়ে যাবে। আর পুরোটা না খেয়ে ফেলতেও ইচ্ছা করছিল না। কিন্তু পারলাম না, জোরজার করে ৩ ভাগের ২ ভাগ খেয়ে ক্ষান্ত দিলাম শেষ পর্যন্ত !!!
এই ছিল আমার প্রথম সিগারেট খাওয়ার অভিজ্ঞতা! এটা ছিল নেহায়েতই চেখে দেখার জন্য। ভবিষ্যতে নেশা করার কোন চান্স নেই।
যা বলে শুরু করেছিলাম 'নিন্দাইলে পিনতে হয় ।' আমার জীবনের অন্যতম প্রিয় প্রবাদবাক্য বলা যায় এটি । তাই কোন কথা বলার বা সিদ্ধান্ত নেবার আগে কথাটা সবসময় মাথায় রেখে চলি। কারন নিয়তির চক্করে পরে কখন কি হয় বলা যায় না ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

