somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অন্তঃস্বারশূন্য ভাবনা ।

১১ ই অক্টোবর, ২০১৮ রাত ১১:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আমার জন্ম নব্বই দশকের মাঝামঝি । গ্রামে বড় হয়েছি । আর্থিক অবস্থা মোটামুটি স্বচ্ছল ছিল বলে বাড়িতে সাদাকালো টিভি ছিল । তখন বিংশ শতাব্দীর শুরুর গল্প । টিভি কেনার আগে বাড়িতে রেডিও ছিল । রেডিও তে তখন দুপুর বেলায় বাংলা ছায়াছবির গান শোনার যুগ ছিল । আমার বয়স ছোট ছিল কিন্তু গান শুনে আমার খুব ভাল লাগত। । আমরা তিনবোন ও দুইভাই । আমার জন্মের ৬ মাস আগেই বর বোনের বিয়ে হয়ে যায় ,তার সাথে ছোটবেলায় শৈশবে স্মৃতি নেই । আমার শৈশবে সবচেয়ে ভাল লাগত আমার মেজবোনকে,মেঝ বোন এককথায় আমার সবচেয়ে পছন্দের মানুষ ছিল ।মায়ের থেকেও মনে হয় তাকেই বেশি ভালবাসতাম ।
এই কথা তাকে যদিও কখনো বলা হয়নি । মেজবোন তখন রেডিওতে গান শুনত ,আমিও তার সাথে শুনতাম ।
তার কাছেই ঘুমাতাম ।যদিও সে আপত্তি করত ,আমি জোর করেই ঘুমাতাম ।ছোট বেলায় আমারে মাঝে মাঝেই জ্বর হত ,তখন মেজ আপার খুব কষ্ট করতে হত আমাকে নিয়ে ।

তবে তৃতীয় শ্রেনীতে পড়া অবস্থায় মেজ বোনের বিয়ে হয়ে যায় । আমি তখন খুব একাকি ফিল করতাম ,খুব কষ্ট পেয়েছিলাম ।কাউকে বলতেও পারছিলাম না । কিছুদিন একাকী চোখের পানিও ফেলছিলাম ।।তবে সেই বোনের প্রতি এখন আর আগের আবেগ নেই । সে ফোন দিলে এখন অনেক গড়িমসি করে ধরি ,মাঝে মাঝে কথাও বলি না ।এখন তার নিজেরেই তিনটা সন্তান আছে । ছোটবেলার সেই ভাইবোনের সম্পর্ক তখন তার বিয়ে হবার সাথে সাথেই শেষ হয়ে গিয়ছিল । যখন ছোটবেলায় এর দুবছর পর মেজ বোনের শ্বশুর বাড়িতে বেড়াতে গেছিলাম ,তখন তার মাঝে আগের মত আর ভালবাসা আবেগ ছিলনা । সময় আর স্থানের সাথে সাথে সব কিছুই পরিবর্তন হয়েছিল ।



তখন চিঠির যুগ ছিল । আত্মীয় স্বজনরা দূর-দূরান্ত থেকে চিঠি লিখত । কোন চিঠি আসলে বেশ মজা লাগত , চিঠি পড়া ,তার উত্তর দেওয়া একটা যেন একটা উৎসব ছিল । কোন আত্মীয় স্বজন আসলে আনন্দ যেন উপচে পড়ত । তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই খারাপ ছিল । নানাবাড়ি যেতে ৬-৭ কিলো হেঁটে যেত হত । কিন্তু নানাবাড়ি যাবার মজাই আলাদা ছিল । তখন মানুষ ডিজিটাল ছিলনা কিন্তু মানুষের ভিতর মানুষের প্রতি অনেক টান ছিল । এখন মানুষ মেকি উচ্ছ্বাস দেখায় ,তখন কোন আত্মীয় বাড়িতে গেলে খুবই ভাল লাগত । খুব আন্তরিকতা দেখাত অন্তর থেকে । হয়ত আমি ছোট ছিলাম ,কিন্তু এই ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পেরেছি । এখন কারো আত্মীয় বাড়িতে গেলে আপনি নব্বই কিংবা বিংশ দশকের শুরুতে যে আন্তরিকতা ছিল টা পাবেন না । আত্মীয় স্বজন দেখলে তখন মানুষের অন্তর থেকে যেন ভালবাসা উৎসরিত হত ।


তখন মানুষের প্রচুর সময় ছিল হাতে । মানুষ প্রকৃতির উপর অনেকটা নির্ভর করত । এখন তো সব যান্ত্রিক হয়ে গেছে ,আমাদের ভালবাসাটাও এখন যান্ত্রিক ময় । যন্ত্র ছাড়া মানুষ এখন অচল । মানুষের ভিতরেও তাই যান্ত্রিকতা এসে গেছে । তখনকার সংস্কৃতি ,চিত্তবিনোদনের যে মাধ্যম ছিল সেগুলো আমার কাছে এখনকার চেয়ে উত্তম মনে হয়েছে , হ্যা এখনকার যোগাযোগের মাধ্যম ভাল হয়েছে । সে সময় খুব দ্রুত সব কিছু জানা যেত না ,কিন্তু জীবন তো চলত । বেশ ভালভাবেই চলত ।

ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল , কিন্তু দিনে ২৪ ঘন্টার মাঝে ৪-৫ ঘন্তাও থাকত না আরকি । বিকেল বেলায় কিংবা স্কুল ছুটির দিনে বাড়ির সব ছেলে মেয়ে (শিশু,কিশোর ,এমনকি আমাদের বড় আপুরাও ) একসাথে খেলতে নামতাম বাড়ির উঠানে । বউচি ,গোল্লাছুট , সাত মার চাড়া , মাংস চুরি এরকম অসংখ্য খেলা ছিল । তখন মোবাইল ছিলনা ,ইন্টারনেট ছিলনা । সবাই একসাথে মিলেমিশে খেলতাম । সন্ধ্যাবেলায় চাচা চাচিদের কাছ থেকে রূপকথার গল্প শুনতাম ,একই গল্প বারবার শুনতাম আর অবাক হতাম ।
এক চাচাত নানি ছিল সে খুব সুন্দর করে গল্প বলতে পারত । এখন কার যুগে এসব গল্প আর নেই ,ফুরিয়ে গেছে । যারা রুপকথার গল্প বলত তাদের ভিতর শুধু একজন বেঁচে আছে ।


টিভি আসার পর সংস্কৃতির পরিবর্তন আসে । টিভির প্রতি ঝুঁকে পড়তে থাকে মানুষ । টিভিতে বৃহস্পতিবার ,শুক্রবার বাংলা সিনেমা , রবিবার ছায়াছন্দ গান , শুক্রবার আলিফ লায়লা সবাই একসাথে দেখতাম । কি মজার দিন ছিল ! তারপর এক চাচার ঘরে সিডি প্লেয়ার কিনে আনে ,সেখানে একই সাথে বাংলাদেশি,ভারতীয় সিনেমা দেখা হত (সেটা আরেকটু বড় হলে ) । এখন আর সেই আমেজ নেই । বাড়ির ছোট ছেলেমেয়েরাও এখন মোবাইল চালাতে পটু । তারা এখন ভার্চুয়াল গেমস খেলে ।

আমাদের বাড়ির সামনে মাধ্যমিক স্কুল ,সেখানে বড় মাঠ । ছোটবেলায় সেখানে খেলার চান্স পেতাম না । মাঠের বাইরে বসে বল টোকাতাম । (তখন আরেকটু বড় হয়েছি) । শুকনা মৌসুমে এলকার ইয়াং ছেলেপেলেরা ক্রিকেট , বর্ষার দিনে রেগুলাতর ফুটবল খেলত ।
বিভিন্ন লীগ চলত , দূর দূরান্ত থেকে লোকজন আসত । স্কুল মাঠে গ্যালারি না থাকলেও চারপাশে লোকারন্যে ভরে ঊঠত সেমিফাইনাল কিংবা ফাইনাল ম্যাচে । দুঃখের বিষয় হলেও সত্যি ,এখন প্রায় সময় ,মাঠ খালি থাকে । এলাকার তরুন প্রজন্ম এখন রাজনীতি করে(যদিও রাজনীতির ক খ কিছুই বুঝেনা ) ,১০ -২০ টাকার জন্য পাতি নেতাদের পিছে ঘুরে ,সেই টাকা দিয়ে বিরি খায় কিংবা অন্য নেশা করে ।

ছোট বেলায় শুনতাম এখানে ওখানে যাত্রা পালা হচ্ছে , সার্কাস হচ্ছে । যদিও সার্কাসে যাওয়া হয়নি । যাত্রাপালায় একবার গেছিলাম,আর সেটা এখনো মাথায় স্মৃতিতে গেঁথে আছে । এখন আর এসব হয়না । এখন তো সবার ঘরেই টিভি আছে । সার্কাস আর যাত্রাপালা হয়েছিল টিভি আসার আগে । টিভি আসার পরই যাত্রা সার্কাস বন্ধ হয়ে যায় ।

তখনকার প্রেম গুলাও রোমান্টিক ছিল , দুই একটা চিঠি আদান প্রদান করাই ছিল প্রেম ।প্রেম ছিল তখন সমাজের নিষিদ্ধ বস্তু ।
তারপরেও আড়ালে প্রেম চলত । লম্বা লম্বা চিঠি চালাচালি হত । বেশি হলে প্রেমিক প্রেমিকার হাত ধরতে পারত ।যে প্রেমিক প্রেমিকার হাত ধরতে পারত সে নিজেকে স্বার্থক প্রেমিক মনে করত । যদিও বেশিরভাগ প্রেম অসফল হত । তবে আমাদের বাড়িতেই প্রেম করে দুইজন সফল হয়েছিল ।একজন আমার চাচাত ভাই ,আর একজন চাচাত বোন ।
আমার মেঝ বোনের কাছেও চিঠি আসত । আর এখনকার প্রেম কেমন টা আর না হয় নাই বললাম । তখনকার প্রেমটাকে আমার এখনকার চেয়ে বেশ বিশুদ্ধ মনে হয় ।





আমাকে যদি কেউ বলে এই যুগ না নব্বই দশকের যুগ যে কোন একটা বেছে নিতে হবে ।আমি অবশ্যই নব্বই দশকের যুগ বেছে নিতাম ।

এখন বর্তমান যুগে মানুষের টিভি দেখাও বেশি হয়না ,সবাই ভার্চুয়াল সাইট গুলাতে ব্যস্ত । আমি নিজেও দিনের অনেকটা সময় ভার্চুয়াল সাইটেই কাটাই । কিন্তু সত্যি বলতে ভার্চুয়াল জগত আমাদের সাময়িক বিনোদন দেয় ঠিকই কিন্তু বাকি সময়টাকে পুরো মাটি করে ফেলে । মানুষ এখন খুব একাকী হয়ে যাচ্ছে দিন দিন । যান্ত্রিকতার কষাঘাতে মানুষের সাথে মানুষের বন্ধন কমে যাচ্ছে ।
এখন দেখবেন ,স্বামী সারাদিন বাইরে থেকে এসে ঘরে বসে মোবাইল নিয়ে ফেসবুক-ইউটিউব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে । বঊ ও ফেসবুক ,ইন্সটাতে ফেমাস হতে পড়ার জন্য ঊঠেপঠে লাগে ,অথচ এগুলো সবই অন্তস্বারশূণ্য কাজ ,আমাদের আরো বেশিও যান্ত্রিক ,একাকীত্বে ঢেলে দিচ্ছে এই ডিজিটাল যান্ত্রিকতা ।

নব্বই দশকের কথা ভাবুন ,খানিকটা সময় অবসর পেলে কি রকম আড্ডাবাজি চলত ! এখন মানুষ আড্ডাতেও মোবাইল টেপে ,সেলফি তোলে ,গেমস খেলে । তাহলে আড্ডাবাজি কোথায় হল ? ডেটে গিয়েও ম্যান্সেজারে চ্যাট করে ।

আমি আসলে এর ভিতর কোন মজা খুঁজে পাইনা । সব কিছু হাতের মধ্যে থাকলে আর মজাটা কোথায় ?
ব্লগে একটা ব্যপার ভাল করেছে ,এখানে পারসোনাল মেসেজ করা যায়না । চাইলেই নিজের পরিচয়টা হাইড করা যায় ।কিছুটা অনিশ্চয়তা ,রহস্যতা আছে । আমি এখনো নব্বই দশক কে খুব মিস করি । সারাদিন অপেক্ষা করে দুপুর বেলায় আধাঘণ্টা গান শোনার মধ্যে যে আবেগ ছিল এখন সারাদিন সেই গান শুনেও সেই অনুভুতি পাওয়া যায়না । এখন কার গানের চেয়ে আমার নব্বই দশকের গান বেশ ভাল লাগে । জেমস ,আইয়ুব বাচ্চু , মাইলস ,ওয়ারফেজ , রঞ্জন দত্ত ,মৌসুমী ভৌমিকের গান গুলো শুনে এখনো আশ্চর্য লাগে
গানে মারাত্মকভাবে জীবনবোধ তুলে ধরে হয়েছে ।

তাছাড়া নব্বই দশকে হুমায়ন আহমেদের হিমু,মিসির আলী,বাকের ভাই তো ছিলই । সে সময় টাকে বাংলাদেশের স্বর্নযুগ বলা চলে ।এটা আমার একান্ত মন্তব্য ।












সর্বশেষ এডিট : ১১ ই অক্টোবর, ২০১৮ রাত ১১:৪১
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমারে বড় ঢাকাতে নিয়া যাও আল্লাহ! ( অণুগল্প)

লিখেছেন কাইকর, ১৩ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ দুপুর ১:২৬


অমন কথা কইয়েন না মহাজন। আপনার দুইডা পায়ে পরি। আমার পেটে লাথি মাইরেন না। নাজমার মা কইছে, ঢাকা থাইক্যা ফেরত আইসা আপনার হগল পাওনা মিটাইয়া দিবো। মহাজন আমার কান্নাকাটি দেইখ্যা... ...বাকিটুকু পড়ুন

—— এই তো জীবন!! —-

লিখেছেন ওমেরা, ১৩ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ দুপুর ২:২০



হেমন্তের হিমেল হিমেল হাওয়ায় গাছের পাতাগুলো একে একে ঝরে যাচ্ছে, আস্তে আস্তে দিনগুলো ছোট হয়ে আসছে ।এই সময়ে মনটা এমনিতেই উদাস উদাস লাগে রাইনার। ইউরোপের ব্যস্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রিয় ব্লগার শ্রদ্ধেয় খায়রুল আহসান ভাইয়ার জন্মদিনে শুভেচ্ছা..........

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৩ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ বিকাল ৩:১৩



অবসরের ফাঁকে ফাঁকে তিনি লিখে যান কবিতা
কত শত সুখ শব্দে ভরা কবিতা, ভালো লাগে সবই তা!
ভ্রমনে মন রেখে তিনি ছুটে যান এখানে সেখানে অথবা সমুদ্দুরে
তিনি হেঁটে বেড়ান প্রকৃতির বুকে, কখনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপি কি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকবে

লিখেছেন ডার্ক ম্যান, ১৩ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ বিকাল ৫:৫১

দেশে বিএনপির সমর্থক কম নয় । সামু ব্লগে বিএনপির সমর্থক বেশ ভালই আছে। বিএনপি ভেবেছিল কামাল হোসেন এর কাঁধে বন্দুক রেখে আওয়ামীলীগকে ঘায়েল করবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি পতাকার জন্য-০৩

লিখেছেন হাবিব স্যার, ১৩ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ সন্ধ্যা ৬:৪০



উৎসর্গ: শহীদ বুদ্ধিজীবিদেরকে.......

জমিরের বাপ সগিরের ভাই এগিয়ে আসলো যখন,
বোনটাকে তোমার বাড়িতে আমার কোনমতে আনি তখন।
সেই থেকে তাকে চোখে চোখে রাখি অঘটন যদি ঘটায়!
সাধ্যমতো তারে আদর যত্ন করে সুস্থ করে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×