somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

ফাহমিদুল হক
মাধ্যম ও সংস্কৃতি অধ্যয়নের পাঠশালা

চলচ্চিত্র-শিল্পের সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতি: 'অশ্লীলতা'

১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ বিকাল ৪:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

[বইমেলায় গীতি আরা নাসরীন ও ফাহমিদুল হকের প্রকাশিতব্য 'বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প: সঙ্কটে জনসংষ্কৃতি' শীর্ষক গ্রন্থের একটি অধ্যায় ধারাবাহিকভাবে পোস্ট করা হচ্ছে। আজ প্রথম পর্ব। গ্রন্থটি শেষ সপ্তাহে বইমেলায় আসার কথা।]

শূন্য দশকে বাংলাদেশের জনপ্রিয়ধারার চলচ্চিত্র গভীর সঙ্কটে নিপতিত হয়। চলচ্চিত্রের মানের চরম অবনতি, আধেয়তে সহিংসতা ও পর্নোগ্রাফিক উপাদানের ব্যাপক বৃদ্ধি, ব্যবসায়িক মন্দা, এফডিসি ও সেন্সরবোর্ডে চরম দুর্নীতি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায় যেখান থেকে ফিরে আসা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ২০০৭ সালের শেষদিকে সরকারের অশ্লীলতাবিরোধী অভিযান এবং কিছু সামাজিক ছবির ব্যবসাসফলতা এই সঙ্কটের সাময়িক সমাধান এনে দেয়। এছাড়া এই দশকেই টেলিভিশন চ্যানেল চলচ্চিত্রনির্মাণে এগিয়ে আসে যা ইতোমধ্যে চলচ্চিত্র-ডিসকোর্সে একটি গুরুত্বপূর্ণ আসন দখল করে নিয়েছে।
মূলধারায় এই সময়ে কোনো অফ-বিট বা শৈল্পিক ছবি নির্মিত হয়নি। কিন্তু স্বাধীনধারার চলচ্চিত্রকাররা বেশ কিছু চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সাফল্য তুলে আনেন। স্বাধীনধারার চলচ্চিত্রকাররা বৈশ্বিক চলচ্চিত্র বাজারে বাংলাদেশী ছবির কিছুটা হলেও জায়গা সৃষ্টি করতে পেরেছেন। এই ধারায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হলো তারেক মাসুদের 'মাটির ময়না' (২০০২)। চলচ্চিত্রটি কেবল কান চলচ্চিত্র উৎসবে সমালোচক পুরস্কারই পায়নি, অস্কার প্রতিযোগিতায় প্রথম বাংলাদেশী চলচ্চিত্র হিসেবে আমন্ত্রিত হয়। আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো মাটির ময়না ইউরোপ আমেরিকায় বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি পেয়েছে এবং পরিচিতি অর্জন করেছে। আমেরিকা থেকে ছবিটির ডিভিডিও বাণিজ্যিকভাবে রিলিজ হয়। স্বাধীন ধারার আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হলো তানভীর মোকাম্মেলের 'লালসালু' (২০০১), আবু সাইয়ীদের 'শঙ্খনাদ' (২০০৪) ও 'নিরন্তর' (২০০৬), মোরশেদুল ইসলামের 'খেলাঘর' (২০০৬), গোলাম রব্বানী বিপ্লবের 'স্বপ্নডানায়' (২০০৭), তৌকীর আহমেদের 'জয়যাত্রা' (২০০৫), এনামুল করিম নির্ঝরের 'আহা!' (২০০৭)। স্বাধীনধারার কোনো কোনো পরিচালক চ্যানেল আইয়ের অঙ্গসংগঠন ইমপ্রেস টেলিফিল্মের প্রযোজনায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করে নিয়মিত থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্বাধীনধারা ধীরে ধীরে হলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একটি অবস্থান তৈরি করছে, যদিও দেশের অভ্যন্তরে এসব চলচ্চিত্রের সীমিত পরিবেশনা, বৃহত্তর জনগোষ্ঠী থেকে একে বিচ্ছিন্ন করে রাখছে। তবে জনপ্রিয়ধারার চলচ্চিত্রকে ঘিরে বেশ কয়েকটি প্রবণতা ও লণ দেখা গিয়েছে যা এই ধারার ক্রমাগত ব্যর্থতাকেই নির্দেশ করেছে। এখানে জনপ্রিয়ধারার চলচ্চিত্রের সা¤প্রতিক গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
অশ্লীলতা
সা¤প্রতিক চলচ্চিত্র শিল্পের সবচাইতে আলোচিত বিষয় হলো ছবিতে পর্ণোগ্রাফিক উপাদানের উপস্থিতি। যদিও সা¤প্রতিক ছায়াছবি বিষয়ক আলোচনা ও লেখায় শুধুমাত্র ‘অশ্লীলতা’ শব্দটি দিয়ে পর্ণো উপাদানের সমাবেশকে বোঝানো হয়ে থাকে। ‘অশ্লীলতা’ শব্দটির ওপর ভিত্তি করেই চলচ্চিত্রের ‘অশ্লীলতা’ বিরোধী আন্দোলন, বা টাস্কফোর্সের অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। আমাদের মতে ‘অশ্লীলতা’ শব্দটি অত্যন্ত ধোঁয়াটে এবং আপেকি। শব্দটি ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত পর্ণোগ্রাফিক উপাদানের মাত্রা প্রকাশ তো পায়ই না, বরঞ্চ বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একধরনের নীতিবাগিশতা প্রকাশ পায়। অশ্লীলতার সংজ্ঞা নির্ধারণ নিয়ে বিজ্ঞ সমাজের বাগাড়ম্বরের সুযোগে সিনেমার পোস্টারও রচনা হয়েছে। মোহাম্মদ হোসেন পরিচালিত ‘নিষিদ্ধ নারী’ ছবির পোস্টারে একজন নারীর মুণ্ডিত মস্তকের ছবিসহ লেখা ছিল, ‘নগ্নতাই অশ্লীলতা নয়’।
শুধুমাত্র যৌন-উত্তেজনার উদ্রেক করবার জন্য যখন চলচ্চিত্রে (বা অন্য কোন টেক্সটে) কোন দৃশ্য বা ইমেজ দেখানো হয়, কিম্বা যখন নগ্নতা ও যৌনকর্ম দেখানো হয় তাকে পর্নোগ্রাফি বলে (হেওয়ার্ড, ২০০০:২৬৬)। পর্ণোগ্রাফি যদি সমাজের কোন তি না করতো, তবে এ নিয়ে আলোচনা বা উদ্বেগ প্রকাশের দরকার হতো না। কিন্তু পর্নোগ্রাফি যদি নারী বা শিশু নির্যাতনমূলক হয়, যদি সামাজিক সম্পর্ক ও পারিবারিক জীবনের তির কারন হয়, তবে পর্নোগ্রাফির উপস্থিতি নিয়ে সচেতন হয়ে উঠতেই হবে। সবচেয়ে বড় কথা সিনেমা একটি গণমাধ্যম যা সমাজের সব শ্রেণী, বয়স ও লিঙ্গের মানুষের জন্য প্রদর্শিত হয়। সমাজের কোন অংশের জন্য যদি পর্ণোগ্রাফিক উপাদান দর্শন-উপযোগী না হয়, তবে সেটি জনপরিসরে প্রদর্শন করা মানবাধিকারকেই ক্ষুণ্ন করে।
এ গবেষণার আওতায় যতগুলো চলচ্চিত্র দেখা হয়েছে তার সিংহভাগেই নারী প্রধানত যৌন উপকরণ হিসেবে উপস্থাপিত। এছাড়া ধর্ষণের মতো একটি ভয়ঙ্কর যৌন-অপরাধকে প্রধানত যৌন-উত্তেজনা প্রদানের জন্য বারংবার ব্যবহার করা হয়েছে।
শূণ্য দশকে এসে চলচ্চিত্রে পর্নোগ্রাফিক উপাদানের উপস্থিতি আরও বৃদ্ধি পায়, এবং সহিংসতার সঙ্গে সঙ্গে এটিকে ছবির বাণিজ্যিকীকরণের মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ২০০৭ সালের অক্টোবর মাস থেকে র‌্যাপিড একশন ব্যাটেলিয়ান (র‌্যাব) নামক বিশেষ ফোর্সের সদস্যদের নিয়ে গঠিত অশ্লীলতা ও ভিডিও পাইরেসি বন্ধের জন্য বিশেষ টাস্কফোর্সের অভিযানের পর থেকে সাময়িকভাবে এধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ বন্ধ হয়। নয়তো নব্বই দশকের শেষভাগ থেকে প্রায় এক দশক জুড়ে বাংলাদেশের জনপ্রিয়ধারার চলচ্চিত্রে পর্নোগ্রাফিক দৃশ্য সংযোজনের হার উতরোত্তর বেড়ে চলছিল।
সেন্সরবোর্ডের সদস্যরা একদিকে যেমন পর্নোউপাদান সংবলিত চলচ্চিত্র অনুমোদন করেছেন, তেমনি অননুমোদিত দৃশ্যও প্রোগৃহে প্রদর্শিত হয়েছে। এইসব অননুমোদিত দৃশ্যগুলো ‘কাটপিস’ নামে পরিচিত। কাটপিস হলো মূল প্রিন্টের সঙ্গে উপস্থাপিত নয় এরকম কোনো ফুটেজ। কিন্তু পরিবর্তিত অর্থে, কাহিনীর-সঙ্গে-একেবারে-সম্পর্কহীন, জুড়ে দেয়া পর্নোগ্রাফিক রিলকেই আমরা কাটপিস বুঝে থাকি। এটি ছবির যেকোনো পর্যায়ে দেখানো হতে পারে, সাধারণত মাঝামাঝি, বিরতির আগে বা পরে এটি দেখানো হয়ে থাকে। সাধারণত এটি একটি গানের দৃশ্য হয়ে থাকে, তবে স্নানের দৃশ্যও হতে পারে; এমনকি সঙ্গমের দৃশ্যও হতে পারে। এসব কাটপিসের পাত্র-পাত্রী এদেশীয়, এগুলো শুটিং ও এডিটিং-এর কাজ এফডিসি বা ডিএফপি ল্যাবেই হয়েছে।
পর্নোগ্রাফির প্রকোপ বেড়ে যাবার কারণ অনুসন্ধান করলে, সাধারণভাবে বলা যায় ক্রমাগতভাবে বিমুখ দর্শককে সিনেমাহলে আকৃষ্ট করবার জন্য চলচ্চিত্র শিল্পের কিছু মুনাফালোভী মানুষ অন্য কোন সৃজনশীল বা পরিশ্রমসাধ্য প্রচেষ্টা গ্রহন না করে সহজে মুনাফার এই পন্থা নেয়। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প যথাযথভাবে তাদের প্রত্যাশা পূরণ না করার ফলে চলচ্চিত্র দর্শকরা একটু একটু করে দেশি-সিনেমা-বিমুখ হ্িচ্ছলেন। এর মধ্যে নব্বই দশকের শুরু থেকে স্যাটেলাইট চ্যানেল, ডিভিডি-ভিসিডি ইত্যাদি প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদেশী, বিশেষত, হলিউড ও বলিউডের চলচ্চিত্র সহজলভ্য হয়ে যাবার কারণে দর্শক ঘরে বসেই পছন্দসই চলচ্চিত্র দেখতে শুরু করে। এভাবে প্রেক্ষাগৃহে-গিয়ে-ছবি-দেখার অভ্যাসটি কমে আসে এবং নব্বই দশকের মাঝামাঝি থেকেই চলচ্চিত্র-ব্যবসায় মন্দা নেমে আসে। আর ভিডিও পাইরেসির সুযোগে এমনকি দেশের চলচ্চিত্রও ঘরে বসে দেখা সম্ভব হয়ে ওঠে। বড়ো শহরভিত্তিক দর্শকের বিরাট অংশই প্রোগৃহে যাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। চলচ্চিত্রের দর্শক হিসেবে অবশিষ্ট থাকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছোট শহর বা গ্রামের মানুষ। এদের মধ্যে তারাই প্রোগৃহে যাওয়া অব্যাহত রাখে যাদের প্রোগৃহ ছাড়া আর কোনো বিকল্প বিনোদনমাধ্যম নেই। এই মুষ্টিমেয় দর্শককে নিশ্চিত করতে এবং লগ্নীকৃত টাকা তুলে আনবার একটি সহজ পন্থা হিসেবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে যৌনতা ও সহিংসতা বাড়িয়ে তোলেন প্রযোজক-পরিচালকরা। এধরনের অতি নিম্নমানের চলচ্চিত্রগুলোই ‘অশ্লীল ছবি’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। এই ধরনের ছায়াছবির দর্শকের গণ্ডি আরও ছোট হয়ে আসে - নারী ও বয়সী দর্শকরাও এবার বাদ পড়েন।
ফলে শূন্য দশকের শুরু থেকেই পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট এবং এফডিসির লোকজনের আন্দোলনের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অশ্লীলতার অভিযোগ জোরেসোরে উচ্চারিত হতে থাকে। তবে পত্রিকার রিপোর্ট এক্ষেত্রে কিছু ভুল জায়গায় আলোকপাত করে এবং এফডিসির লোকজনের আন্দোলনও উদ্দেশ্যহীন ও স্ববিরোধী বলে প্রমাণিত হয়। যেমন পত্রিকার রিপোর্টগুলোতে প্রাথমিকভাবে কিছু নায়িকাকে অশ্লীলতার জন্য দায়ী করা হয়ে থাকে। এভাবে ঐসব দৃশ্যের অভিনেতা এবং ঐসব চলচ্চিত্রের পরিচালক-প্রযোজক অভিযোগের বাইরে থেকে যায়। পুরুষতান্ত্রিকতার দোষে দুষ্ট পত্রিকার রিপোর্টগুলো পরবর্তী সময়ে এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠে। অভিযোগের তীর পরে প্রযোজক-পরিচালক এবং সেন্সরবোর্ডের সদস্যদের দিকে ছোঁড়া হয়।
এফডিসির অভ্যন্তরে অশ্লীলতাবিরোধী আন্দোলন আরও শঠতাপূর্ণ ও স্ববিরোধিতার অভিযোগে অভিযুক্ত। বস্তুত এই আন্দোলনের অগ্রভাগে অনেকেই ছিলেন যাদের বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ উত্থাপিত হতে পারে। যেমন অভিনেতা ডিপজলের মাধ্যমেই সহিংসতানির্ভর ছবিগুলোতে অশ্লীল খিস্তিখেউরের আমদানি ঘটে, এবং লুঙ্গি তুলে নাচাসহ নানাবিধ কদর্য নৃত্যদৃশ্যে তিনি অংশ নেন। কিন্তু তিনি আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন। মোহাম্মদ হোসেন পরিচালিত ফায়ার কে সম্পূর্ণতই পর্ণোগ্রাফিক চলচ্চিত্র বলা যায়। সেই ছবির নায়ক ছিলেন মান্না। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনি অশ্লীলতাবিরোধী আন্দোলনের সামনের সারির একজন ব্যক্তি। ২০০৬-০৭ সালের সামাজিক/পারিবারিক ছবির ‘ভ্যানগার্ড’ এফ আই মানিক ক’দিন আগেই অশ্লীল ছবি বানিয়েছেন। তার পরিচালিত 'বিদ্রোহী সালাউদ্দিন' (২০০৪) ছবির আধেয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে পঞ্চম অধ্যায়ে, তার ছবির পর্নোগ্রাফিক উপাদান ও সহিংসতার ধরন ও মাত্রা সেখানে প্রমাণস্বরূপ হাজির আছে।
চলচ্চিত্র-শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দুর্বৃত্তায়ন ও অসততা সহিংস ও পর্ণোভিত্তিক চলচ্চিত্রগুলোকে বাড়তে দিয়েছে। যেমন পরিচালক সমিতি তার কয়েকজন পরিচালকের সদস্যপদ বাতিল করে দেয়। সে হিসেবে তার ছবি নির্মাণের এখতিয়ার থাকেনা। কারণ এফডিসিতে ছবি নির্মাণ করতে গেলে পরিচালক সমিতিকে ২৫ হাজার টাকা ও প্রযোজক-পরিবেশক সমিতিকে ৮০ হাজার টাকা চাঁদা দিয়ে সদস্য হতে হয়। (টুটুল, ২০০৪) কিন্তু পরিচালক সমিতি থেকে বহিষ্কৃত সেইসব পরিচালক ঠিকই প্রযোজক-পরিবেশক সমিতির সমর্থনে চলচ্চিত্রনির্মাণ অব্যাহত রেখেছে।
সেন্সরবার্ডের সদস্যদের দুর্নীতি অশ্লীল ছবির আলোচনায় খুব বড়ো অভিযোগ আকারে সবসময় উত্থাপিত হয়েছে। দেখা গেছে অশ্লীল ছবির একজন পরিচালক-প্রযোজক এনায়েত করিম, দীর্ঘদিন সেন্সরবোর্ডের সদস্য ছিলেন। আর সদস্যদের ছবিপ্রতি ঘুষ নেওয়া একটি ‘ওপেন সিক্রেট’ বিষয়ে পরিণত হয়। বিশেষ করে শূন্য দশকে ভাইস চেয়ারম্যান আবু তাহেরের সেন্সরবোর্ডটিকে ঘিরে এই অভিযোগ বেশি এসেছে। সেই বোর্ড থেকে একজন সদস্য শহীদুল ইসলাম খোকন পদত্যাগ করেন। তিনি বলেন:
আমি আমার পদত্যাগপত্রে লিখে দিয়েছি যে যেদিন দেখলাম, খোদ রাজধানীর সিনেমা হলেই অশ্লীল ছবি প্রদর্শিত হচ্ছে এবং সারা ঢাকা শহর ছেয়ে গেছে অশ্লীল পোস্টারে, তখন এসব বন্ধ করার জন্য সেন্সরবোর্ডের সদস্যদের বললাম, দেখলাম কেউই ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তখন মনে হলো যদি কোনো সুধীজন সিনেমা হলে ঢোকেন, তখন তিনি মনে করবেন এটা সেন্সর অনুমোদিত, তিনি আমাকে গালি দেবেন এবং বলবেন, আমি ঘুষ খেয়েছি। তাই বিবেকের তাড়নায় সেন্সরবোর্ড থেকে পদত্যাগ করেছি। আমার কথা হচ্ছে, আমি যেহেতু ঘুষ খাইনা, তবে কেন এই দোষের ভাগীদার হবো? (খোকন, ২০০৪)
খোকনের মতো পরিচালক আমজাদ হোসেনও সেন্সরবোর্ডের কোনো কোনো সদস্যের ঘুষগ্রহণের অভিযোগ উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, তারা [প্রযোজকরা] ছবির সেন্সর করানোর জন্য আলাদাভাবে ১ থেকে দেড় লাখ টাকা রেখে দেন। (হোসেন, ২০০৪) এরপরও সেন্সরের কারণে কোনো কোনো ছবি আটকে যায়। এই পর্যায়ে প্রযোজকরা তাদের ছবিকে পাশ করানোর জন্য আদালতকে ব্যবহার করা শুরু করেন। বিশেষ করে নিম্ন আদালত থেকে প্রযোজকরা স্টে-অর্ডার আগাম নিয়ে আসেন যাতে বলা থাকে যে এই ছবিকে আটাকানো যাবেনা। শহীদুল ইসলাম খোকন বলেন, আমি সেন্সরবোর্ডে থাকাকালীন একের পর এক প্রতিবাদ করেছি, তখন একটা ছবি আটক করার পর নিষিদ্ধ করা হলেও নিম্ন আদালত থেকে ওইসব ছবির প্রযোজকরা স্টে-অর্ডার নিয়ে এসে হরদম ছবিগুলো প্রদর্শন করছে। সরকার কি পারতো না নিম্ন আদালাতের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করতে?” (খোকন, ২০০৪)
২০০৪ সালে খোকন যে-অভিযোগ করছেন, পরবর্তী কয়েকটি বছরে বিশেষ করে ২০০৬-০৭ সালে অপোকৃত দুর্নীতিমুক্ত সেন্সরবোর্ডের একটি বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে, এবং তা হলো, স্থানীয় আদালতের ঐ ধরনের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা।
যখন দায়িত্ব নেবার প্রসঙ্গ এসেছে, তখন কেউই এইসব ‘অশ্লীল’ চলচ্চিত্রের দায় নিতে চাননি। পরিচালক সমিতি দায়ী করেছে প্রযোজক সমিতি ও সেন্সরবোর্ডকে, সেন্সরবোর্ড দায়ী করেছে প্রদর্শকদের, যে তারা অননুমোদিত কাটপিস প্রদর্শন করে, প্রদর্শকরা সেই দায় এড়াতে চায় এই বলে যে ফিল্মের ক্যানে কী আছে তারা জানেননা, যা এসেছে তাই দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পকে পর্নোগ্রাফিক ইন্ডাস্ট্রি করে তুলবার জন্য এই সবগুলো গোষ্ঠীই দায়ী, কার দায়িত্ব বেশি আর কার কম, সেটা এক্ষেত্রে খুব বড়ো বিষয় নয়।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ৯:৩৫
১১টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কুমিল্লা ইস্যুতে আরও কিছু কথা,

লিখেছেন সরোজ মেহেদী, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২১ রাত ১০:৫২

অনেকেই সুর মেলাচ্ছেন সাম্প্রদায়িক অপশক্তির ষড়যন্ত্র, সাম্প্রদায়িক হামলা, সাম্প্রদায়িক ধ্বংশলিলা এসব আহ্লাদিত বাক্যমালার সাথে। আহ্লাদ করেন তবে ‘সাম্প্রদায়িক’ শব্দটার জায়গায় ‘রাজনৈতিক’ বসান। ক্ষমতালোভীও বসাতে পারেন (সে যে কোনো দল, এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

আফ্রিকায় টিকাও নেই, ভাতও নেই

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২১ রাত ১০:৫৪



আফ্রিকার গ্রামগুলো মোটামুটি বেশ বিচ্ছিন্ন ও হাট-বাজারগুলোতে অন্য এলাকার লোকজন তেমন আসে না; ফলে, গ্রামগুলোতে করোনা বেশী ছড়ায়নি। বেশীরভাগ দেশের সরকার ওদের কত গ্রাম আছে তাও... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবির সাথে সাক্ষাত

লিখেছেন স্বপ্নবাজ সৌরভ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২১ সকাল ১০:৪১



কবির সাথে দেখা হয়না অনেকদিন।
আগে দেখা হতো নিয়মিত।
সকালটাকে তিনি বিকেলের
চৌরাস্তায় নিয়ে যেতে পারতেন, তীব্র গ্রীষ্মে বর্ষা নামাতেন তুমুল তোড়ে।
রোদের আক্রোশে গা এলিয়ে তিনি ভাসতেন জোছনাবিহারে।
শহরের অবাঞ্ছিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামাজিক অনুষ্ঠান তথা বিয়ে বাড়ির খাওয়ার অভিজ্ঞতা....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২১ সকাল ১০:৪৯

সামাজিক অনুষ্ঠান তথা বিয়ে বাড়ির খাওয়ার অভিজ্ঞতা....

যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠানের মধ্যে আমাকে যেটা সবথেকে টানে সেটা হল খাওয়াদাওয়ার অনুষ্ঠান, তা যতটা না খাবার জন্য তার থেকে অনেক বেশী খাদকদের আচরণ দেখতে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পরিত্যাক্ত রেল স্টেশনের নাম ভরত খালি

লিখেছেন প্রামানিক, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২১ দুপুর ১২:৫৮


ভরত খালী স্টেশনের নাম ফলক এখনো অক্ষত আছে।

১৯৩৭ সালে ব্রিটিশ রেলওয়ে কোম্পানি যমুনা নদীর এপার ওপার ট্রেনের যাত্রী পারাপারের জন্য পূর্বপাড়ে জামালপুর অংশে বাহাদুরাবাদ ঘাট এবং পশ্চিম পাড়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×