somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিদেশী পত্রিকায় মুক্তিযুদ্ধ: পর্ব ৪

২২ শে মে, ২০০৮ রাত ১০:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

'তারা ইদানীং দাড়িওয়ালাদের দেখে নিচ্ছে'

গ্যাভিন ইয়াং
দি অবজারভার, ৫ ডিসেম্বর, ১৯৭০।

করাচি, ৫ ডিসেম্বর। রাস্তা-ঘাটে লাউডস্পিকার-ভ্যান থেকে দীর্ঘ বক্তৃতা শুনতে পাবেন, সংবাদপত্রে রাজনৈতিক অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ আপনাকে সন্ত্রস্ত করে তুলবে। সেনাবাহিনী রয়েছে সহিংসতা রোধ করার জন্য। সোমবার ছিল পাকিস্তানের ইতিহাসে স্মরণীয় একটি দিন; ২৩ বছরের মধ্যে প্রথম ৫৬ মিলিয়ন ভোটারে জন্য সাধারণ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং এ-নির্বাচনই নির্ধারণ করবে সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় থাকবে কি থাকবে না। এটা সম্ভবত তার চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তান পৃথক হয়ে যাবে কি না, যদিও এটা নির্ভর করছে বাংলার অনলবর্ষী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর; তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের দ্বারা পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান হবার মাধ্যমে বিচ্ছিন্নতার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

পাকিস্তানের বামেরা লড়াইয়ের পথে আছে। লাহোরের ওল্ড গার্ডেন সিটির একটি প্রাসাদোপম বাড়ির একটি লম্বা ডাইনিং টেবিলে একজন পাঞ্জাবী মিলিওনিয়ার ও একজন উদীয়মান আইনজীবীর (যিনি সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর পক্ষে শহরে সাধারণ নির্বাচনী প্রচারাভিযান চালাচ্ছেন) সঙ্গে বসে ছিলাম। মিলিওনারটি এতো ধনী যে তাকে কাজ করতে হয় না, যদিও তারা দু'জনেই কেমব্রিজে ছিলেন। তারা ক্লান্ত হাতে খাবার তুলে নিলেন; এইমাত্র তারা তাদের পেছনে একের পর এক দাঁড়িয়ে থাকা চাকরদের কাছে বামপন্থী লিফলেট বিতরণ করেছেন। খাবার মুখে নিয়ে তমিজের সঙ্গে চিবুতে থাকা তরুণ মিলিওনিয়ারটি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির একজন নেতা, যে-দলটি ভুট্টোর বামপন্থী দলের চাইতে বেশি বামপন্থী। ভুট্টোর সঙ্গে দলটির পার্থক্য কী? ক্লান্ত চোখের ওপর ক্লান্ত চোখের পাতা ফেলে তিনি বলেন, 'কিছু অদ্ভূত কারণে ভুট্টো সুকর্নর ভক্ত। আমরা অবশ্য মাও সে তুং-এর অনুসারী।'

তিনি শান্তভাবে একটি লম্বা হোল্ডারে সিগারেট নেভালেন। 'ভুট্টো মুসলমানদের নিয়ে খেলছেন বলে মনে হচ্ছে।' তিনি আইনজীবীর দিকে তাকিয়ে বলরেন, 'শ্রমিকরা এখন কাঁচা-পাকা দাড়িওয়ালা মৌলভীদের দেখে নিচ্ছে, আপনি হয়তো লক্ষ করেননি।' আইনজীবী উত্তর দিলেন যে, পাকিস্তান এখনও খুবই সনাতনপন্থী ধর্মীয় দেশ -- একই ধর্ম পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তনের মধ্যকার সংযোগ সেতু -- ইসলাম ও সমাজতন্ত্র ব্যবহার একটি যৌক্তিক কৌশল। মূলস্রোতের বাইরে এ-ধরনের পরিস্থিতিতে বামপন্থীদের ভোটাররা অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে; পরবর্তী কয়েকটি সপ্তাহে তারা শুধু এটাই জানবে যে তারা কী পেয়েছে।

বাম হলো অদ্ভূত এক জিনিস, অপ্রচলিতভাবে নানারঙা ও বহুধাবিভক্ত, এটা মাওবাদ থেকে সুকর্ণবাদ পর্যন্ত বিস্তৃত এবং শেষে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রে ফিরে আসে। এর নেতাদের বেশিরভাগই সচ্ছল। কেউই শ্রমজীবী শ্রেণীর নয়। ডান ও কেন্দ্রের ইসলামপন্থী-দল-বিরোধী বামপন্থী-তারকারা শেষ সময়ে সক্রিয় -- মুজিব পূর্বে বিজয়ের অপেক্ষা করছেন, ভুট্টো পশ্চিমে সনাতনপন্থার বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। এদিকে মুজিবের মিটিংয়ে লাখ লাখ মানুষ জয়ের জন্য একত্রিত হচ্ছে; ভুট্টো একই সঙ্গে পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, নির্বাচনী আইন তাকে সে সুযোগ দেয়।

মুজিবের সমস্যা কীভাবে জয়ী হতে হবে, তা নয়, জয়ের পর তিনি কী করবেন সেটাই হলো সমস্যা। তার আন্দোলন তাকে ছয় দফা অনুসারে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন বাস্তবায়নের কথা বলে। ছয় দফা অনুসারে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে প্রতিরা ও পররাষ্ট্র থাকবে কিন্তু রাজস্ব গ্রহণের মতা কেন্দ্র হারাবে। এটা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার মতো মিলিটারি-ব্যক্তিত্ব, যিনি জাঁদরেল কিন্তু বেকুব নন, মেনে নেবেন না। রাজনৈতিকভাবে পশ্চিম পাকিস্তানীরা অবিশ্বাস করলেও ভারতের বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ হিসেবে তাদের অনুমোদন করে; তারাও কাউকে তাদের বাজেট নিয়ে পরীক্ষঅ-নিরীক্ষা করতে দেবে না। নব-নির্বাচিত আইনপরিষদ যখন নতুন একটি সংবিধান প্রবর্তন করতে যাবে তখন মুজিব ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘাত বাধার সম্ভাবনা রয়েছে। সংবিধানটি অনুমোদন না করা পর্যন্ত সেনাবাহিনী মতা পরিত্যাগ করবে না।

পূর্বের এই উদীয়মান তারকা একজন অপ্রতিরোধ্য, তীব্রভাষী, অন্তপ্রাণ রাজনীতিবিদ -- যার ভরাট কণ্ঠ এবং তীব্রভেদী চোখ রয়েছে। ঢাকার তুলনামূলকভাবে সাদামাটা একটি বাড়িতে রমজান মাসে দেখা করতে গেলে তাকে পাইপে তামাক খেতে দেখা যায় এবং খুব গুরুত্ব দিয়ে সব বিষয়ে আলাপ করতে দেখা যায়। তিনি ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্স, শিপিং-এর জাতীয়করণের কথা বলেন এবং জানান এতোদিন ধরে পশ্চিম পাকিস্তানের 'উপনিবেশ' পূর্ব পাকিস্তান ভারতের পশ্চিম বাংলার সঙ্গে বাণিজ্য-সম্পর্ক স্থাপন করবে। কেউ জানে না কী ধরনের প্রধানমন্ত্রীত্ব তিনি তৈরী করবেন। তার নানা ধরনের সহকর্মী রয়েছে, তাদের মধ্যে অনেকে তার চাইতে বামপন্থা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করেন, এবং তাদের দক্ষতাও অনিশ্চিত।

ভুট্টো হলেন একমাত্র ভোটপ্রার্থী যার সত্যিকারের আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। তিনি সৌজন্যপ্রিয়, বর্ণিল এবং তার মধ্যে অভিজাত্য রয়েছে। তার অনুসারীরা হাস্যোজ্জ্বলভাবে দলীয় ক্যাপ ও পতাকা নিয়ে মিছিল করে। যদিও তার মতা সিন্ধু প্রদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, কিন্তু তিনি তার সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। তিনি অনেক কিছু করতে পারেন। তিনি ইতোমধ্যে পাঞ্জাব ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে অনুসারী তৈরি করতে পেরেছেন। তিনি একজন রহস্যাবৃত ব্যক্তি। তিনি চাষীদের মধ্যে ভূমি বণ্টন করতে চান -- এবং ভূস্বামীদের সনাতন প্রাধান্য খর্ব করতে চান। আজ পাকিস্তানে সম্পদ ও সমাজতন্ত্র পরস্পরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় অথবা নিজেদের দ্বিধাগ্রস্তভাবে ঐক্যবদ্ধ করে।

আধুনিক ও অসমাপ্ত রাজধানী ইসলামাবাদে আমি ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেণ্ট আইয়ুব খানের সঙ্গে দেখা করি। তিনি তার বাসার লনে রোদে বসে চা খাচ্ছিলেন। তিনি এখন অতীত, ব্যর্থতা, একাকীত্ব ও পরিত্যাজ্যতার প্রতীক। সাবেক বন্ধু ও শুভার্থীরা তাকে পরিত্যাগ করেছে যাদের মধ্যে একজন হলেন ভুট্টো। ভুট্টো এবং পশ্চিম পাকিস্তানী অন্য যেকোনো বামপন্থীর জন্য এবার সত্যিকারের ক্ষমতালাভের সম্ভাবনা নেই। কিন্তু পাশ্চাত্য-বিরোধী মনোভাব এবং পিকিং-য়ের প্রতি সহানুভূতি পাকিস্তানকে বামপন্থীদের জন্য একটি উর্বর ভূমিতে পরিণত করেছে। এরকম একটা বিপদের সম্ভাবনা আছে যে, নির্বাচন-পরবর্তী মতাহীনতা বামপন্থী নেতাদের সবকিছু থেকে অনেক দূরে ঠেলে দেবে। যদি ইয়াহিয়া খানের শক্তিশালী ব্রিগেড আবার মতা দখল করে তবে মুজিব, ভুট্টো এবং অন্যান্য হতাশ নেতৃবৃন্দ বহুলপ্রতিক্ষীত রাজনৈতিক স্বাধীনতা না পেয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদ বা গৃহযুদ্ধ কিংবা উভয়কেই বেছে নেবে।



সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে মে, ২০০৮ রাত ১১:৩৫
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সাইয়েমা হাসানের ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’

লিখেছেন নান্দনিক নন্দিনী, ৩০ শে মার্চ, ২০২০ রাত ৮:২৯



এদেশের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিরাপদ রাখতে সরকার সরকারি-বেসরকারি অফিসগুলোতে দশদিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছেন। যেহেতু কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস জনিত রোগ তাই দশদিনের সাধারণ ছুটির মূল উদ্দেশ্য জনসাধারণ ঘরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বের রাজধানি এখন করোনার রাজধানি।( আমেরিকা আক্রান্তের সংখ্যায় সবাইকে ছাড়িয়ে প্রথম অবস্থানে চলে এসেছে)

লিখেছেন রাফা, ৩০ শে মার্চ, ২০২০ রাত ১০:৪৫



যে শহর ২৪ ঘন্টা যন্ত্রের মত সচল থাকে।করোনায় থমকে গেছে সে শহরের গতিময়তা।নিস্তব্দ হয়ে গেছে পুরো শহরটি।সর্ব বিষয়ে প্রায় প্রথম অবস্থানে থেকেও হিমশিম খাচ্ছে সাস্থ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

কারো লেখায় মন্তব্যে করার নৈতিক মানদন্ড। একটু কষ্ট হলেও লেখাটি পড়ুন।

লিখেছেন সৈয়দ এমদাদ মাহমুদ, ৩০ শে মার্চ, ২০২০ রাত ১১:০২

সম্মানিত ব্লগারদের দৃষ্টি আকর্শন করে বলছি ব্লগারদের লেখা পড়ে মন্তব্য করবেন শিষ্টাচারের সঙ্গে। মন্তব্য যেন কখনো অন্যকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য না হয়। মন্তব্য হবে সংশোধনের লক্ষ্যে। কারো কোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

করোনাময় পৃথিবিতে কেমন আছেন সবাই?

লিখেছেন রাফা, ৩০ শে মার্চ, ২০২০ রাত ১১:২৪



পোষ্ট লিখলাম একটা ক্ষুদ্র কিন্তু প্রথম পাতায় এলোনা ।সেটা জানতে এটা পরিক্ষামূলক পোষ্ট।সব সেটাপ'তো ঠিকই আছে তাহলে সমস্যা কোথায় ? আমি কি সামুতে নিষিদ্ধ নাকি?

ধন্যবাদ। ...বাকিটুকু পড়ুন

পোষ্ট কম লিখবো, ভয়ের কোন কারণ নাই

লিখেছেন চাঁদগাজী, ৩১ শে মার্চ, ২০২০ সকাল ৮:০১



আপনারা জানেন, নিউইয়র্কের খবর ভালো নয়; এই শহরে প্রায় ৫ লাখ বাংগালী বাস করেন; আমিও এখানে আটকা পড়ে গেছি; এই সময়ে আমার দেশে থাকার কথা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×