somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পাকিস্তানে গণহত্যা: বিদেশী পত্রিকায় মুক্তিযুদ্ধ, পর্ব ৪০

১০ ই জুলাই, ২০০৮ সকাল ৮:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দি সানডে টাইমস্
২০ জুন, ১৯৭১।

[গত সপ্তাহে সানডে টাইমস পূর্ব-পাকিস্তানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নিপীড়ন সম্পর্কিত এন্থনি ম্যাসকারেনহাসের প্রতিবেদন ছাপিয়েছিল। এখন আমাদের হাতে পূর্ব-পাকিস্তান সংশ্লিষ্ট আরও সাম্প্রতিক ও সম্ভবত আরও ভয়ংকর তথ্য রয়েছে। এই তথ্যগুলো এন্থনি ম্যাসকারেনহাসের দেয়া নয়, কিন্তু এসব তথ্য আমরা পেয়েছি শিক্ষায়তনিক ও প্রফেশনাল সূত্র থেকে যাদের দেয়া তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে সংশয় থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই।]

পূর্ব-পাকিস্তানে সহিংসতার নতুন অভিযান শুরু হয়েছে। রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার জন্য হানিকর যেকোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি বা যেকোনো রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের অস্তিত্বকে পুরোপুরিভাবে নির্মূল করার জন্যই এই অভিযান। ঢাকায় সেনা সরকার বাংলাদেশী শক্তিকে পরাজতি করার জন্য দুই দফার আদেশ জারি করেছে। প্রথমত, সব সরকারী চাকুরে শিক্ষক লেখক সাংবাদিক ও শিল্পপতিদের চিহ্নিত করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, সম্ভাব্য বিপজ্জনক ব্যক্তিকে 'নির্মূল' করে দেয়া হয়েছে। সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগ ইতোমধ্যে শিক্ষক, সাংবাদিক ও অন্যান্য প্রভাবশালী বাঙালিদের ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা শুরু করেছে। সন্দেহভাজন ও বিচ্ছিন্নতাবাদী আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীলদের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তাদের তিনটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে -- সাদা, ধূসর ও কালো। সাদাদের কিছু বলা হবে না। ধূসররা তাদের চাকরি হারাবেন বা তাদের জেলে পাঠানো হতে পারে এবং কালোদের হত্যা করা হবে।

সিভিল সার্ভিসের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু হয়েছে। ৩৬ জন বাঙালি ম্যাজিস্ট্রেটকে হয় হত্যা করা হয়েছে অথবা তারা ভারতে পালিয়ে গেছে। কুমিল্লা, রংপুর, কুষ্টিয়া, নোয়াখালী, ফরিদপুর ও সিরাজগঞ্জে যখন সেনাবাহিনী প্রবেশ করে তখন কর্মরত ম্যাজিস্ট্রেট ও এসপিকে তৎক্ষণাৎ হত্যা করা হয়েছে। ধূসর তালিকার সরকারী কর্মকর্তাদের পশ্চিম পাকিস্তানে বদলী করা হয়েছে। এদের মধ্যে আছেন পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল তসলিম আহমেদ। ২৫ মার্চের রাতে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকায় আক্রমণ করে তখন পুলিশ বাহিনী বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং ১৮ ঘণ্টাব্যাপী এক যুদ্ধে লিপ্ত হয়।

সন্ত্রাসী শাসনব্যবস্থায় একটি নতুন উপাদান হলো গেস্টাপো-স্টাইলের ধরপাকড়। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য যাদের দরকার তাদের সবার সামনে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদের ক্যান্টনমেন্টে ডেকে পাঠানো হয়েছে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। তাদের বেশিরভাগই আরে ফিরে আসেন নি। যেসব গোপন এজেন্টরা এই ধরপাকড়ে সহায়তা করে থাকে তারা 'রাজাকার' নামে পরিচিত। রাজাকার প্রত্যয়টি সর্বপ্রথম ব্যবহৃত হয় হায়দ্রাবাদের নিজামের স্বেচ্ছাসেবকদের সম্পর্কে, ভারত ১৯৪৮ সালে রাজ্যটিকে অধিগ্রহণ করতে চাইলে যারা বাধাপ্রদান করে। রাজাকার শব্দের অর্থ হলো রাজার বা রাষ্ট্রের আদেশ পালন করা। ঢাকার রাত ও দিনের বিভিন্ন অংশে এখন সৈন্যরাই রাজত্ব কায়েম করেছে এবং তাদের কাজ হলো “হিন্দু, আওয়ামী লীগার ও ছাত্র”-দের খুঁজে বের করা। সবাইকে একটি পরিচয়পত্র বহন করতে হচ্ছে। যত্রতত্র বসানো চেকপোস্টে গাড়িকে থামানো হচ্ছে।

যদি চেকপোস্টে কারো পরিচয়পত্র না পাওয়া যায়, ও কেউ যদি জওয়ানদের কথা শুনছে না বলে মনে হয় তবে তাকে ক্যান্টনমেন্টে ধরে নিয়ে যাওয়া হতে পারে। ঢাকায় মাঝে মাঝেই বোমা বিস্ফোরিত হচ্ছে এবং তার পর থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর লোকজন নিরাপত্তাব্যবস্থা কড়াকড়ি করে মূলত 'দুস্কৃতিকারী'-দের খুঁজে বেড়াচ্ছে, যাদের তারা নাম দিয়েছে মুক্তি ফৌজ (মুক্তিযোদ্ধ)। সেনাবাহিনী যে-এলাকা 'দুস্কৃতিকারী'-মুক্ত করে ফেলছে সেখানে তাদের পরিবর্তে মিলিশিয়ারা স্থান দখল করছে। এরা সেনাবাহিনীর লোকজনের চাইতেও নিষ্ঠুর, কিন্তু তাদের চাইতে কম নিয়মনিষ্ঠ। তাদের দৈনিক তিন রুপি করে দেয়া হচ্ছে এবং পূর্ব পাকিস্তানে লোভ দেখিয়ে আনা হয়েছে যে, লুটের ভাগ তাদের দেয়া হবে।

পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দু সংখ্যালঘু ও বেঁচে-যাওয়া বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের ওপর নিষ্ঠুর অত্যাচার চালানো হয়েছে। জগন্নাথ কলেজের তরুণ ছাত্র শংকর ২৭ মার্চ কাছাকাছি একটি গ্রামে লুকিয়ে ছিল। তার ঠাটারি বাজারের বাড়িচি কী অবস্থায় আছে তা দেখার জন্য সে দু-মাস পরে একাই ফিরে আসে। অবাঙালিরা তাকে চিহ্নিত করে এবং "হিন্দু, হিন্দু" বলে চিৎকার করে তাড়া করে এবং তাকে ধরে দল বেঁধে মসজিদে নিয়ে গিয়ে তার জিহ্বা কেটে ফেলে। ভোলার ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল আওয়ালের অনুগত সরকারী কর্মকর্তা বলে খ্যাতি ছিল। যখন আওয়ামী লীগের লোকজন বিক্ষুব্ধ হয়ে আক্রমণ করে তখন তিনি অবাঙালিদের তাদের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন এবং মুক্তিফৌজ পুলিশ স্টেশনে হামলা করলে স্টেশনের অস্ত্র-শস্ত্র তাদের হাত থেকে রক্ষা করেন। সেনাবাহিনী যখন পহেলা মে আক্রমণ করে তখন তিনি তাদের অভ্যর্থনা জানাতে গিয়েছিলেন। এ-অভিযানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার তাকে তার দায়িত্ব আবার বুঝে নেবার জন্য নির্দেশ করেন, কিন্তু নির্দেশ পেয়ে তিনি পেছনে ঘুরতে না ঘুরতেই সেপাইয়ের গুলিতে মারা যান।

ডজন খানেক বাঙালি অফিসারকে পশ্চিম-পাকিস্তানে বদলি করা হয়েছে। তারা তাদের পরিবারকে বিদায় জানিয়েছিলেন এবং করাচির উদ্দেশে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ওঠেন বলে জানা গিয়েছিল। কিন্তু তাদের পরিবারের সদস্যরা সেনাসদরে জানতে গেলে তাদের বলা হয় অফিসাররা চলে গেছে। কিন্তু একজন মেজরের ছিন্নভিন্ন লাশ তার পরিবারকে দিয়ে দেয়া হয় এবং বলা হয় তিনি আত্মহত্যা করেছেন।

ব্রিগেডিয়ার মজুমদার ছিলেন একজন বিখ্যাত বাঙালি অফিসার। কিন্তু তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। চট্টগ্রামে বাঙালি সৈন্যরা যখন বিদ্রোহ করে, তখন তিনি তার পাঞ্জাবি সহকর্মীদের সঙ্গে অবস্থান করছিলেন। তার পরিবার তার সম্মন্ধে জানতে চাইলে তাদের বলা হয়, যেকোনো ধরনের জিজ্ঞাসা বিপদ নিয়ে আসতে পারে। ২ জুন রাতে ঢাকার ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায় সেনাবাহিনীর জিপ প্রবেশ করে। হক নামের একজন সরকারী কর্মকর্তাকে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে আসা হয় এবং কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টের উদ্দেশে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। তার স্ত্রী পূর্ব পাকিস্তান সরকারের বেসরকারী প্রধান শফিউল আজমকে ফোন করেন। তিনি সেনাবাহিনী সদরদপ্তরে ফোন করলে তাকে জানানো হয় হক নামের কাউকে নিয়ে আসা হয়নি।

রণদা সাহা নামের একজন শিল্পপতিকে বলা হলো তার মির্জাপুরের গ্রামের বাড়িতে সেনা অফিসারদের জন্য উৎসব-সন্ধ্যার আয়োজন করতে। তিনি আয়োজনের ব্যাপারে আলাপ করতে গিয়ে আর ফিরে আসেন নি। সৈন্যরা আমিন নামের একজন বেসামরিক কর্মকর্তার বাড়ি ঘিরে ফেলে। তাকে বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী ও তিন সন্তানসহ সৈন্যদের একটি ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয়। তার আর্মি অফিসার ভাই বেঙ্গল রেজিমেন্টে ছিলেন। বেঙ্গল রেজিমেন্ট বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল এবং বর্তমানে তিনি কুমিল্লার কাছে বাংলাদেশের জন্য প্রতিরোধ-যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আমিন-পরিবার দুই দিন পরে ফিরে আসে আমিনকে ছাড়াই।

১৫ নভেম্বর একজন ক্যাপ্টেন ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালে দু’জন সৈন্য নিয়ে আসলেন এবং দুই নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে ডাঃ রহমান ও তার সহকর্মীকে নিয়ে গেলেন। তাকে বলা হলো ময়মনসিংহে তাকে কাজ করতে হবে। তাদের খবরাখবর এখন আর জানা যায় না। অন্য সৈন্যরা আমেরিকা পরিচালিত হলিফ্যামিলি হাসপাতালে গেল, কিন্তু সেখানে কোনো শল্যচিকিৎসক ছিলেন না। হাসপাতালটি বন্ধ করে দেয়া হবে বলে এখন ভাবা হচ্ছে। কারণ বিখ্যাত শিশু বিশেষজ্ঞ ডাঃ এম এন হকসহ অনেকেই পালিয়েছেন।

সিলেট শহরে যখন সেনাবাহিনী প্রবেশ করে তখন প্রধান শল্য-চিকিৎসক ডাঃ শামসুদ্দিন ছাড়া সকলেই সীমান্ত অতিক্রম করে পালিয়ে গেছেন। ডাঃ শামসুদ্দিনকে অপারেশন থিয়েটারে পাওয়া যায় এবং একজন মেজর তাকে গুলি করে হত্যা করেন। পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের অনেক অনেক সিনিয়র বাঙালি অফিসারকেই পাওয়া যাচ্ছে না। এদের মধ্যে আছেন উপমহাব্যবস্থাপক ফজলুল হক এবং প্রধান সেক্টর পাইলট ক্যাপ্টেন সেকেন্দার আলি। সেনাবাহিনী ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে এয়ারলাইনটি ২,০০০ বাঙালিকে বরখাস্ত করেছে। রাজাকাররা মেজর খালেদ মোশাররফের দুই সন্তানকে আটকে রাখে। বাচ্চা দু-টির বয়স ছিল ছয় ও চার। তাদের মা রক্ষা পেয়েছিলেন এবং এখন ভারতে অবস্থান করছেন। বাচ্চা দু-টিকে ছেড়ে দেয়া হয় এবং তাদের এরপর গ্রহণ করা হয়।

নিখোঁজ লোকজনের আত্মীয়রা মনে করেন রাজাকার এবং জুনিয়র সেনা অফিসাররা অবাঙালিদের নিয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করছে। কিছু পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে কিন্তু টাকা দেবার পরও ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। রাজাকাররা তাদের কর্মকাণ্ড হত্যাকাণ্ড থেকে পতিতা-সরবরাহ পর্যন্ত বি¯তৃত করেছে। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে তারা একটি ক্যাম্প চালাচ্ছে যেখান থেকে রাতে কমবয়েসী মেয়েদের সিনিয়র অফিসারদের পাঠানো হয়। তারা তাদের কাজের জন্য মেয়েদের অপহরণও করছে। কেউ কেউ ফিরে আসে নি। একজন প্রথম সারির গায়িকা ফেরদৌসীর বাসায় অফিসাররা প্রবেশ করে, তিনি অল্পের জন্য বেঁচে যান। তার মা একজন পরিচিত জেনারেলের কাছে ফোন করেন এবং তার নিরাপত্তার জন্য মিলিটারি পুলিশ নিয়োগ করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা উন্নতি হলো যুক্ত সরকারের বিরুদ্ধে মার্চের প্রথম দিকে শেখ মুজিবের অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকা গোয়েন্দা বিভাগের কিছু কর্মকর্তা কাজে ফিরে এসেছেন। এখন তারা সেনাবাহিনীর জন্য 'অনাকাঙ্ক্ষিত' লোকদের নাম বলে দিতে বাধ্য। এভাবে ২৫ ও ২৬ মার্চের মতো ভুল লোককে ধরার ব্যাপারাটি আর থাকছে না। ঐ দুই রাতে সেনাবাহিনী ২০ জনেরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষককে হত্যা করেছিল। এদের মধ্যে বাংলা বিভাগের মনিরুজ্জামানের পরিবর্তে পদার্থবিদ্যা বিভাগের মনিরুজ্জামানকে হত্যা করা হয়েছে। বাংলা বিভাগের মুনীর চৌধুরীর পরিবর্তে ইংরেজি বিভাগের মি. মোনায়েমকে হত্যা করা হয়েছে। সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল টিক্কা খানের প্ররোচনায় কিছু শিক্ষক পহেলা জুন কর্মক্ষেত্রে যোগ দেন কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ কেউ রাজাকারদের হাতে পড়েন।

সেনা-প্রশাসন খোলাখুলি অনুমোদিত না হলেও রাজাকারদের কর্মকাণ্ড তাদের সবই জানা। কখনো কখনো তারা ভাবনার বিষয়। সম্প্রতি ঢাকার কয়েকশ’ পাটশ্রমিককে কাজে যোগ দিয়ে উৎপাদন শুরুর ব্যাপারে রাজি করানো হয়েছিল। ২৯ মে তাদের তিনজন ট্রেড ইউনিয়নের নেতাকে সেনাবাহিনীর জিপে তোলা হয়। পরের দিন শ্রমিকরা পালিয়ে যায়।

৬০ লাখ শরণার্থীর ফিরে আসার সমস্যাটির সমাধান খুবই কঠিন। ঢাকা, যশোর, রংপুর, ঈশ্বরদী, খুলনা ও চট্টগ্রামে তাদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট অবাঙালিরা দখল করে নিয়েছে। সেনাবাহিনীর সাহায্য নিয়ে তারা মিরপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকা পরিস্কার করে ফেলেছে। তাদের চলে যাবার জন্য সতর্ক করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু যারা থেকে গিয়েছে তাদের প্রত্যেককে হত্যা করা হয়েছে। এই দুটি আবাসিক এলাকা ঢাকার ১৫ বর্গ কিলেমিটার জায়গা জুড়ে বি¯তৃত। যশোরে আওয়ামী লীগের নেতা ও জাতীয় পরিষদের সদস্য মশিউর রহমানের বাড়ি সেনাবাহিনী ঘিরে ফেলেছিল এবং অবাঙালি বেসামরিক লোকরা গিয়ে প্রত্যেককে হত্যা করেছে। দোতলার জানালা দিয়ে ১০ বছর বয়সী এক কিশোর লাফ দিয়েছিল এবং শূন্যে থাকা অবস্থায়ই একজন সেপাই তাকে হত্যা করে।

দেশবিভাগের সময় পূর্ব পাকিস্তানে আসা শরণার্থীদের জন্য কাজ করে এরকম সংগঠন হলো 'শান্তি কমিটি', যারা রাজাকার সমর্থিত। তারা বাঙালিদের রেখে যাওয়া বাড়ি ও দোকানপাট 'বরাদ্দ' নেয়ার জন্য আবেদনপত্রের আহ্বান জানিয়ে সংবাদপত্রে নোটিশ দিচ্ছে। চট্টগ্রামে লালদীঘি ও রিয়াজউদ্দিন বাজারের দোকানপাটের তালা ভেঙ্গে সেনাবাহিনী সেগুলো অবাঙালিদের হাতে তুলে দিয়েছে। দখল নেয়া সকল সম্পত্তিতে এখন পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষা উর্দুতে সাইনবোর্ড ঝুলছে।

গ্রামে বাড়িগুলো বিতরণ করা হয়েছে ডানপন্থী দল জামাতে ইসলামী ও মুসলিম লীগের সদস্যদের মধ্যে, যারা গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিল। সন্দেহভাজন আওয়ামী লীগের সমর্থক ও হিন্দুদের ব্যাংক একাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। ঢাকাস্থ ব্রিটিশ ন্যাশনাল ও গ্রিন্ডলেজ ব্যাংকের ব্যবস্থাপক ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি যারা এআদেশের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

প্রধান রেলওয়ে, বন্দর ও ডকগুলোতে বাঙালিদের কাজ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পহেলা মে তারিখে যখন চট্টগ্রামের ৫,০০০ ডক শ্রমিক কাজে যোগ দিতে ফিরে আসে তখন তাদের তাড়িয়ে দেয়া হয়। স্থাপনাগুলো এখন সেনাবাহিনীর সদস্য ও অবাঙালিদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। চট্টগ্রামের সিনিয়র রেলওয়ে কর্মকর্তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং শ্রমিক-কলোনি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। ঢাকা, ঈশ্বরদী ও সৈয়দপুরে কোনো বাঙালি ঢোকার সাহস পাচ্ছে না। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে বাঙালিদের স্থান পূরণ করতে ২৫০ জন বন্দর-কর্মীকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আনা হয়েছে। তিন হাজার পাঞ্জাবী পুলিশ এখন ঢাকায় টহল দিচ্ছে এবং ঢাকার বাইরে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের খাইবার রাইফেলস্ ও পশ্চিম পাকিস্তান বর্ডারের রেঞ্জাররা একই কাজ করছে।

পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের বিদ্রোহী ১০,০০০ আধা-সামরিক সদস্য হয় সীমান্ত অতিক্রম করে চলে গিয়েছে অথবা গ্রামে লুকিয়ে আছে। যারা ১৫ মে একটি সাধারণ ক্ষমার ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকায় আত্মসমর্পন করেছিল, তাদের চোখ ও হাত পিছমোড়া করে বাঁধা অবস্থায় খোলা ট্রাকে করে নিয়ে যেতে দেখা গেছে। কিছুদিন পরে বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীতে শত শত শবদেহ ভাসতে দেখা যায় যাদের চোখ হাত বাঁধা ছিল। পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের নাম পরিবর্তন করে এখন রাখা হয়েছে পাকিস্তান ডিফেন্স ফোর্স এবং শত শত বিহারীকে সেখানে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তাদের এখন পিলখানায় বন্দুক ও মেশিনগানসহকারে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।

২৮ মে ঢাকার খিলগাঁওয়ে একটি অবাঙালি দোকানো বোমা বিস্ফোরিত হলে ১০০ জন সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়। মতিঝিলে একজন অবাঙালি তার প্রতিবেশীর কাছ থেকে ১০,০০০ রুপি (প্রায় ৬০০ পাউন্ড) দাবি করে এবং ২৪ ঘন্টার মধ্যে এই অর্থ প্রদান করা না হলে সেনাবাহিনীর কাছে ধরিয়ে দেয়া হবে বলে হুমকি দেয়া হয়। ঢাকার স্টেডিয়াম মার্কেটের একজন রেডিও ও ক্যামেরা বিক্রেতা গত ১২ মে তার দোকানের জিনিসপত্র চুরি হয়ে গেলে সে ঘটনাটি সামরিক আইন সদর-দফতরে জানায়। সেই রাতে কারফিউর সময় তার দোকানে আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়।

বেগম মাজেদা নামের একজন গৃহিণী রাস্তার একটি ট্যাপ থেকে পানি নিচ্ছিল। দু’জন পাঞ্জাবি পুলিশ চেষ্টা করছিল তাকে ট্রাকে উঠিয়ে নেয়ার জন্য। গৃহিণীটি চিৎকার দিলে পাঞ্জাবি পুলিশ দু’জনকে লাঠি ও পাথর দিয়ে মারধর করা হয়। সেরাতে পুরো বাসাবো এলাকায় আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। ঢাকার রাস্তায় এখন হাতঘড়ি পরাও ঝুঁকিপূর্ণ এবং রেডিও ও টেলিভিশন এখন সবাই ঘরের কোণায় লুকিয়ে রাখে। সৈন্যরা লুট করা ট্রান্সিসটর, টেলিভিশন সেট ও ঘড়ি রাস্তায় ৩ পাউন্ড থেকে ৬ পাউন্ডে বিক্রি করছে।

কর্নেল বারী নামের একজন অফিসার পাকিস্তান স্টেট ব্যাংকে এক কোটি টাকা (৮৩৩,০০০ পাউন্ড) জমা করেছেন। এখন শহরগুলোকে সাফ করার জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কারণ মে মাসে বিদেশী সাংবাদিকদের একটি ছোট দল ঢাকা সফর করার কথা। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের জগন্নাথ ও ইকবাল হল থেকে মৃতদেহ সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এছাড়া শাঁখারিপট্টি, ঠাঁটারিবাজার, শান্তিনগর ও রাজারবাগে শেল নিক্ষেপের কারণে সৃষ্ট গর্তগুলোকে পূরণ করা হয়েছে। স্কুল ও কলেজগুলোকে আবার খুলে দেয়া হয়েছে কিন্তু খুব কম ছাত্রই সেখানে রয়েছে। যুদ্ধের পূর্বে একটি স্কুলের ছাত্রসংখ্যা ছিল ৮০০ জন, কিন্ত আবার খুলে দেবার পর সেখানে ছাত্র আছে মাত্র ১০ জন। ১৬ থেকে ২৬ বছরের বেশিরভাগ তরুণ জনগণ সীমান্ত অতিক্রম করে চলে গেছে মুক্তিফৌজ প্রশিক্ষণ-শিবিরে যোগ দেবার জন্য। তাদের মধ্যে এই ভয় ব্যাপকভাবে কাজ করছে যে পূর্ব পাকিস্তানে তরুণ অবস্থায় থাকা অর্থ মৃত্যুবরণ করা ...।

সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুলাই, ২০০৮ সকাল ৮:৩৩
৬টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নদী ও নৌকা - ১৫

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ২৩ শে মে, ২০২২ দুপুর ১২:২৫


ছবি তোলার স্থান : কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ, কক্সবাজার, বাংলাদেশ।
ছবি তোলার তারিখ : ০১/১০/২০২০ ইং

নদী, নদ, নদনদী, তটিনী, তরঙ্গিনী, প্রবাহিনী, শৈবালিনী, স্রোতস্বতী, স্রোতস্বিনী, গাঙ, স্বরিৎ, নির্ঝরিনী, কল্লোলিনী, গিরি নিঃস্রাব, মন্দাকিনী,... ...বাকিটুকু পড়ুন

পুরানো সেইদিনের কথা (ছেলেবেলার পোংটামি)

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ২৩ শে মে, ২০২২ রাত ৮:১১

শেকল
এলাকার এক ভাবীর সাথে দেখা। জিগ্যেস করলেন, বিয়েশাদি করা লাগবে কি না। বয়স তো কম হলো না।
একটু চিন্তা করে বললাম, সত্যিই তো। আপাতত একটা করা দরকার।
তো এই ভাবী... ...বাকিটুকু পড়ুন

কে কেমন পোশাক পড়বে মোল্লাদের জিজ্ঞেস করতে হবে ?

লিখেছেন মোহাম্মদ গোফরান, ২৩ শে মে, ২০২২ রাত ৮:৫২




কয়েকদিন আগে আমরা পত্রিকায় পড়েছি পোশাকের কারণে পোশাকের কারণে হেনস্থা ও মারধরের শিকার হয়েছেন এক তরুণী। চিন্তা করতে পারেন!! এদেশের মোল্লাতন্ত্র কতটুকু ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে? কোরানে একটা আয়াতও কি এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেন এত জ্বলে !!

লিখেছেন নূর মোহাম্মদ নূরু, ২৩ শে মে, ২০২২ রাত ৯:১৮


কেন এত জ্বলে !!
© নূর মোহাম্মদ নূরু
(মজা দেই, মজা লই)

সত্য কথা তিক্ত অতি গুণী জনে বলে,
সত্য কথা কইলে মানুষ কেনো এত জ্বলে?
তাঁদের সাথে পারোনা তাই আমার সাথে লাগো,
সত্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

যাহা দেখি, তাহাও ভুল দেখি!

লিখেছেন সোনাগাজী, ২৪ শে মে, ২০২২ সকাল ১১:২৫



আমার চোখের সমস্যা বেড়ে গেলে, আমি অনেক কিছুকে ডবল ডবল দেখি; ইহা নিয়ে বেশ সমস্যা হয়েছে সময় সময়, এটি ১টি সমস্যার কাহিনী; বেশ আগের ঘটনা।

আমাদের এলাকায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×