somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাউলের মূর্তি সরানোয় মুসলমানি সাফল্য: আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের পুনর্পাঠ, পর্ব ৩

১৯ শে অক্টোবর, ২০০৮ সকাল ৮:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পর্ব ১: Click This Link
পর্ব ২: Click This Link

মুসলমানিত্ব

পাঁচশ বছরের মুসলমান শাসনের সময়ে দেখা গেছে সমাজে শাসকদের চাইতে সুফি দরবেশদের প্রভাবই বেশি ছিল। এমনকি শাসকরা সুফিদের সমীহ করতো, তাদের ধর্মপ্রচারের সুবিধার্থে শাসকরা জমিবরাদ্দ করে দিত। সুফিরাও সমাজের মানুষের নাড়ীর স্পন্দন ভালো বুঝতেন, স্থানীয় অনেক আচার-বিশ্বাসকে তাদের মূলনীতিতে আত্তীকরণ করেন। এমনকি অবাঙালি হলেও তারা বাঙালি রমণীদের বিয়েশাদী করে স্থানীয় হবার চেষ্টা করেছেন। শাসকদের চাইতে তাদের প্রভাব বেশি থাকায় শাসকদের তরবারী দীর্ঘ শাসনামলে খুব কমই উদ্ধত হয়েছে। তরবারী দিয়ে বঙ্গ দখল হয়েছে, কিন্তু পরবর্তী শাসকরা সেই তরবারী কোষমুক্ত তেমন করেননি। আবার বহিরাগত শাসকদের শাসনকার্যের জন্য স্থানীয় হিন্দু রাজা বা সামন্তদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হয়েছে। বহিরাগত শাসকরা স্থানীয় বাঙালি সাহিত্য সংস্কৃতির ব্যাপক পৃষ্ঠপোষণাও করেন। এই সময়কাল এক অর্থে ছিল ইন্দো-মুসলিম শাসন। এমনকি সুলতানী আমলের নির্বিবাদী আড়াইশো বছরের মাথায়, পঞ্চদশ শতকে হিন্দু রাজা গনেশ সালতানাত দখল করলেও তার নিজ সন্তান যদুকে জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ নামে মুসলমান বানিয়ে মসনদে বসান। হিন্দুদের দিক থেকেও উগ্র হবার সুযোগ ছিলনা। বঙ্গে এককভাবে কোনো ধর্মের মানুষেরই প্রাধান্য বিস্তার করার উপায় ছিলনা।

তবে ব্রিটিশ আমলে ব্রিটিশ সরকারের গৃহীত কিছু নীতি, হিন্দু চরমপন্থা এবং ইসলামী সংস্কার আন্দোলনের কারণে এতদিন বাঙালিত্বে বিশ্বাসী মুসলমানদের একটি অংশ খাঁটি আরব-ইসলামের দিকে ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়ে।

ইসলামী সংস্কার আন্দোলন

ব্রিটিশরা ভারতের শাসন ছিনিয়ে নেয় মুসলমানদের কাছ থেকে। তাই ব্রিটিশদের সঙ্গে হিন্দুদের চাইতে মুসলমানরাই প্রথম পর্যায়ে বেশি শত্র“ভাবাপন্ন ছিল। তাদের ব্রিটিশবিরোধিতা প্রকাশ পায় সর্বভারতীয় ওয়াহাবী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। এই ওয়াহাবী আন্দোলন ছিল আসলে এক ধরনের জিহাদ, যার উৎপত্তিস্থল আরব দেশ এবং ভারতে ব্রিটিশবিরোধিতা এই জিহাদের অন্তর্গত ছিল। তবে বিশেষত বঙ্গে তা ফরায়াজী আন্দোলনরূপে ঊনবিংশ শতাব্দিতে প্রকাশিত হয়। এর প্রবর্তক হাজী শরীয়তুল্লাহ দীর্ঘদিন আরবদেশে শিক্ষাগ্রহণ করেন এবং ওয়াহাবী মতের সঙ্গে পরিচিত হন। ফরায়াজী ও একই ধাঁচের কয়েকটি আন্দোলন বঙ্গে খাঁটি ইসলামের ধারণার জন্ম দেয় ও প্রসার লাভ করে এবং লোকধর্মপ্রভাবিত বঙ্গীয় ইসলাম হুমকির মুখে পড়ে। বিশেষত বৌদ্ধিক তান্ত্রিকতা, সুফিবাদ প্রভাবিত যাবতীয় লোকধর্ম চর্চাকারীরা এই পিউরিফিকেশনের শিকার হয়। বাউল ধ্বংসের ফতোয়া দেয়া হয়, তাদের তৎপরতাকে অনৈসলামিক ঘোষণা করা হয়, বাউলদের ঝুঁটি কেটে নেয়া হয়, সমাজের মূলধারা থেকে বাউলরা প্রান্তিক ধারায় চলে যায়। শহুরে শিক্ষিতদের বাঙালিপনা আর্থিক-রাজনৈতিক-শিক্ষাগত কারণে ক্ষমতাবান হবার কারণে তেমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।

ইসলামী সংস্কার আন্দোলনের একটা ইতিবাচক দিক হলো এর ব্রিটিশবিরোধিতা। কারণ হিন্দুরা যখন কেরানি হবার মানসে ইংরেজি পড়ালেখা শুরু করে দিয়েছে, কিন্তু মুসলমানরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লেগে গেছে। আর এর নেতিবাচক ফল হলো এই যে গ্রামভিত্তিক বাঙালি সমাজে যে সমতার, উদারতার, সহনশীলতার একটা পরিবেশ ছিল, মোল্লাতন্ত্রের বিকাশে তা চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বাউলতত্ত্বের সঙ্গে মোল্লাতন্ত্রের বিরোধ তাই ঐতিহাসিক। এইবেলা বাউলমূর্তি সরানোর জঙ্গিপনাকে আমরা স্মরণে আনতে পারি। বাউলগুরু লালনের মূর্তি বলে কথা! পৌত্তলিকতা, হাজীদের অসম্মানের যুক্তিগুলো বাহ্যিক, মূলে রয়েছে এই চিরকালীন বিরোধ। লালনের মৃত্যুদিনের প্রাক্কালেই এই ঘটনা ঘটেছে, সেটাও স্মর্তব্য।

সুফিবাদ প্রভাবিত বাউলতত্ত্বের সঙ্গে মোল্লাতন্ত্রের বিরোধের ক্ষেত্র কোনগুলো, তা আলোচনার পরবর্তী পর্যায়ে আলোকপাত করা হবে।

[চলবে]
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে অক্টোবর, ২০০৮ সকাল ৮:৫৩
২৭টি মন্তব্য ২১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×