somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নাজাকাত এবং ব্যাংলেদেস!!

১৬ ই জানুয়ারি, ২০০৮ সকাল ৯:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

০৯ ই জানুয়ারি, ২০০৮ রাত ১১:৪৭

(published in today’s jajadi with a li’l bit change. All credits of this writing goes to the blogger ‘procheththo’, thanx for him)

১-
নাজাকাতের সাথে প্রথম দেখ কিচেনে। আমার ক্লাস সিডিউল বেটাইমে হয়ে যাওয়ায় প্রায়ই দেখা যেত আমি যখন কিচেনে তখন প্রায় সবার রান্না শেষ! এতে অবশ্য আমার সুবিধাই হত। পুরো কিচেনটাতেই আমি ঘুরে ফিরে আরাম করে রান্না করতে পারতাম। তারপর আস্তে ধীরে টেরেসে বসে খেতাম আর প্রকৃতি দেখতাম।

একদিন কিচেনে দেখি, নতুন এক মেয়ে। আমারই সমান। ব্লন্ড চুল। লালচে ছোপ ছোপ সাদা চামড়া। বুঝলাম ইউরোপীয়ান। কিন্তু এমন ক্ষুধা পেয়েছিল, সেদিন আর কথা বলা হলনা।
একদিন, দু’দিন, তিনদিন…
জিজ্ঞেস করলাম, তোমার লাঞ্চ করতে প্রায় দেরী হয় দেখি!
ও বলল- তোমারও তো!
হেসে ফেললাম।
ব্যাস, এভাবেই শুরু কিচেন ফ্রেন্ডশীপের।
জানলাম ও রাশান মুসলিম। কিন্তু সমস্যা বাধলো আমার দেশ নিয়ে। ও কিছুতেই আমার দেশ চিনেনা। চিনেনা ভাল কথা, কিন্তু উচ্চারণও করতে পারেনা! খালি বলে- ‘ব্যাংলেদেস!’
- নোওও, বাংলাদেশ!
- ব্যাং লে এ দে স স স !
- নো নাজাকাত, ইটস বাং লা দে এ এ এ শ শ!
- ওওওহ, আই কান্ট হেল্প ইট! ব্যাংলেদেসসস! ইজ ইট ওকে নাউ?

আমার মাথা প্রায় খারাপ করে ফেলে ও ব্যাংলেদেস করতে করতে। আমি একটা জিনিষ কিছুতেই বুঝিনা, বাংলাদেশ শব্দটা এমন কী কঠিন যে বেশীরভাগ বিদেশীই কিছুতেই ঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারেনা?
নিজেই ক্লান্ত হয়ে উচ্চারণ শিখানোতে যতি টানলাম। এবার নতুন প্রশ্ন- এটা কি ইন্ডিয়ার অংশ?
আমি এমনভাবে ‘নোওও’ বলে উঠলাম যে ও বেশ ভয়ই পেয়ে যায়! তাড়াতাড়ি আবার বলি- না ভাই, ইন্ডিয়া আর বাংলাদেশ সম্পূর্ন আলাদা দু’টো দেশ!

এরপর ওকে বাংলাদেশ নিয়ে একেকদিন একেক গল্প বলতাম।
বলতাম, আমার দেশে গ্রীষ্মে কতরকম ফল হয়। গ্রামে দুষ্টু ছেলেরা কীভাবে পাথর ছুঁড়ে অন্যের গাছ থেকে ফল পেড়ে খায়। বর্ষায় টিনের চালে যখন ঝুম বৃষ্টি পড়ে তখন কেমন সুর করে গেয়ে উঠে পুরো প্রকৃতি। শরতে আকাশ কেমন বিশাল একটা ক্যানভাস হয়ে যায় হাল্কা নীল আর সাদা মেঘ কোলে নিয়ে। হেমন্তে ধানের গন্ধে পুরো গ্রাম কেমন মাতাল হয়ে যায়। শীতে ভোরে কুয়াশার চাদর গায়ে খেজুর রস খেতে কেমন স্বর্গীয় অনুভূতি হয়। বসন্তে কত হাজার রকম ফুলে হেসে উঠে বাংলাদেশ!
ও বলত- আ’ম জেলাস! ইউ গট সাচ এন ওন্ডারফুল কান্ট্রি!
আমি খুশীতে ঝলমল করে উঠতাম।

তারপর একদিন হঠাত কিচেনে এসেই নাজাকাতের বিস্ময়ভরা প্রশ্ন- হ্যাই, ইউ ডিন্ট টেল মী এবাউট ইউর ফ্লাড এন্ড মসকুইটো!!
আমি অবাক হলাম না। শুধু জিজ্ঞেস করলাম- কোথা থেকে শুনলে?
বলল- ক্লাসে স্যার এশিয়ান জিওগ্র্যাফিতে বলেছে। তোমাদের পুরো দেশটাইতো ফ্লাডে ডুবে যায়! আর সবাই নাকি সবসময় মসকুইটোর জন্যে নেটের ভিতর ঢুকে থাকো!!
দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। তারপর বললাম- বন্যা হয়, কিন্তু পুরো দেশ ডুবেনা। তাছাড়া এ বন্যাটা আমাদের প্রকৃতিরই অংশ।আমরা সাহসী জাতি, প্রতি বছর তাই এমন সিভিয়ার বন্যার পরও আমরা আবার মাথা তুলে দাঁড়িয়ে যাই আগের মত। আর মশাও আছে। তবে শুধু রাজধানীতে বেশী। কিন্তু নেট তো শুধু রাতে প্রয়োজন হয়। দিনে মশা থাকেনা!

ও কি বুঝে কে জানে, চুপ করে থাকে।

আরেকদিন বলে- আই স’ ইউর কান্ট্রিজ পিক্স ইন ইন্টারনেট। বাট অল আর পুওর পিপলস দেয়ার!
আমি আবারো দীর্ঘশ্বাস ফেলি।বলি- দেখো, সব দেশেই গরীব আছে। খোদ উন্নতদেশগুলোতেই প্রচুর মানুষ রাস্তায় ঘুমায়। আমাদের দেশে হয়তো একটু বেশী আছে। কিন্তু মিডিয়া শুধু গরীবদেরকে তুলে ধরার মানে এই নয় যে আমরা শুধু গরীব! ইটস জাস্ট মিস-প্রেজেন্টেশান অব মিডিয়া।
এবারও ও চুপ করে থাকে।

আমি আর দেশের টপিক্স তুলিনা। নাজাকাতও না। অনেকদিন পর শুধু একবার বলে- ইউ ম্যান লভ ইউর কান্ট্রি ভেরী মাচ! লাকি কান্ট্রি গট পিপল লাইক ইউ!
আমার চোখে পানি চলে আসে। আমি রান্না হয়েছে কিনা দেখার ভান করে ঢাকনা তুলে মুখ লুকাই। চোখের পানি রান্নার বাষ্পের সাথে মিশে যায়।
নাজাকাতকে বলা হয়না, আমার দেশটা বড় দূর্ভাগা। এখানে গ্রীষ্মে ফল হয় ঠিকই, কিন্তু তা শুধু পয়সাওয়ালারাই কিনতে পারে। এখানে বর্ষায় বৃষ্টি বিলাসের চেয়ে বৃষ্টিতে ভিফে রিকশা চালানোর মানুষ বেশী। শরতে আকাশ দেখার সৌভাগ্য হয়না গার্মেন্টস’র মেয়েদের। ওরা ভোরে খোঁয়ারে ঢুকে, সন্ধ্যা পেরুলে বের হয়। হেমন্তে ধানের গন্ধ দূরে থাক, অনেক পরিবার ভাতের মাড়টুকুও পায়না। শীতে ছালা পেচিয়ে রাস্তায় ঘুমায় অগনিত মানুষ। বসন্ত কখন আসে কখন যায় টের পায়না রাস্তার পাশে ফুটপাতে বড় হওয়া বাচ্চাগুলো………

২-
নয়মাস হয়ে গেল দেশে ফিরেছি।
সেদিন ব্লগে প্রচেত্য’র পোষ্ট পড়েই প্রথম জানলাম খবরটা। পৃথিবীর প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যের নমিনেশন ভোট হচ্ছে। এবং কক্সবাজার দুই নাম্বার আর সুন্দরবন তিন নাম্বার অবস্থানে! আমি দ্রুত সবাইকে মাইল করি আমার দেশের এই দুই প্রাকৃতিক সম্পদকে নমিনেশন সিলেকশান লিষ্টে ভোট দেয়ার জন্যে। মেইল লিষ্টে নাজাকাতের এড্রেসও ছিল।

দু’দিন পর নাজাকাতের মেইল আসে- হ্যাই ম্যান, আই ভোটেড ফর কক্সবাজার, দ্য লংগেস্ট সী-বিচ অব দ্য ওয়ার্ল্ড! নাউ, আ’ম রিয়েলী কনফিউজড হোয়েদার ইউর কান্ট্রি ইজ লাকি এজ ইট গট পিপল লাইক ইউ, অর ইউ পিপল লাকি গট আ কান্ট্রি লাইক ব্যাংলদেস!

এই প্রথম নাজাকাতের ব্যাংলেদেস বলাতে আমার মন খারাপ হয় না। বরং আমার চোখে পানি চলে আসে। একটা রাশিয়ান মেয়ে আমার কথায় ভোট করেছে আমাদের কক্সবাজারের জন্যে!

যারা এখনো ভোট দেননি, এখনি লগ ইন করুন-
http://www.new7wonders.com/nature/en/vote on nominees/
ভোট বক্সে এশিয়া ক্লিক করুন। ভোট দিন কক্সবাজার এবং সুন্দরবঙ্কে। অনলাইন জরিপ নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বললেও এর গুরুত্ব কিন্তু মোটেও কম নয়! পরিচিত সবাইকে বলুন। বাংলাদেশের আরেকটি পরিচয় উঠে আসুক। আমাদের গর্বে আরেকটি নতুন মাত্রা যুক্ত হোক।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জুলাই, ২০০৮ সকাল ৮:১০
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×