দশ শর্ত মানলেই কেবল মুক্তি পেতে পারেন নিখোঁজ বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী। এর মধ্যে পাঁচটি শর্ত মানতে কিছুটা সম্মত হলেও বাকি শর্তগুলো কঠিন হওয়ায় মানতে নারাজ বিএনপি হাই কমান্ড। শর্তগুলোর মধ্যে ইলিয়াস আলী মুক্তি পাওয়ার পর সংবাদ সম্মেলন করে নিজ থেকে স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে থাকার দাবি, বিদায়ী রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএসের ঘটনায় তার ড্রাইভারের প্ররোচনা, রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হওয়া অন্যতম বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। প্রকাশ্যে ইলিয়াস আলীকে উদ্ধারের অভিযান চললেও পর্দার আড়ালে চলছে শর্ত নিয়ে দেনদরবার। সমঝোতার প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হলে যে কোনো মুহূর্তে মুক্তি পেতে পারেন সাবেক এ সাংসদ। তবে ইলিয়াস আলী ঢাকা থেকে নয়, সিলেট থেকে মুক্তি পেতে পারেন। এ লক্ষ্যেই শনিবার রাতে ইলিয়াসকে ঢাকা থেকে সিলেট নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে সূত্রে জানা গেছে। এদিকে ইলিয়াস আলীর খোঁজে গাজীপুরের গজারিয়া গ্রামে, টাঙ্গাইল, মুন্সীগঞ্জ ও মানিকগঞ্জে গতকাল সন্ধ্যায় অভিযান চালায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ইলিয়াসের আইনজীবী আহসান হাবিবকেও গতকাল ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে র্যাব।
সূত্র জানায়,ইলিয়াসের মুক্তির জন্য বিএনপি হাই কমান্ড ও ইলিয়াসকে ১০টি শর্ত দেওয়া হয়েছে। সব শর্তের বিশদ জানা যায়নি। তবে সব শর্ত মেনে নেওয়া বিএনপি ও ইলিয়াসের জন্য কঠিন। কয়েকটি শর্ত মানলে রাজনৈতিকভাবে বিএনপি ও ইলিয়াসের অনেক ক্ষতি হবে। এ কারণে সব শর্ত মেনে নিতে রাজি নন দলটির হাই কমান্ড ও ইলিয়াস আলী। তুলনামূলকভাবে দল ও ইলিয়াসের কম ক্ষতি হবে_ এমন পাঁচটি শর্ত মেনে নিতে রাজি হাই কমান্ড। তাতে ইলিয়াসকে ছাড়া হবে কি-না, তা নিশ্চিত নয়। বিএনপি হাই কমান্ড আপাতত লাগাতার হরতাল ও অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি দিয়ে সরকারের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে ইলিয়াসকে মুক্ত করার কৌশল নিয়েছে। একই সঙ্গে দাতা দেশ ও সংস্থাগুলো দ্বারা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে তারা।
সূত্র জানায়,ইলিয়াস আলীকে খুঁজে বের করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে গতকাল রোববারের হরতাল প্রত্যাহারের অনুরোধ করেছিল সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেছেন, যারাই ইলিয়াসকে ধরে নিয়ে যাক না কেন, তারা তাকে উদ্ধার করে দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। তবে বিএনপি হাই কমান্ড থেকে বলা হয়, আগে ইলিয়াসকে হাজির করা হোক, তারপর হরতাল প্রত্যাহার। এ পরিস্থিতিতে হরতালের আগের রাতে গাজীপুরের পূবাইলে ইলিয়াসকে উদ্ধারে র্যাব ও পুলিশের অভিযানের খবরে হরতাল প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিতে দলের সিনিয়র নেতাদের গুলশান কার্যালয়ে ডেকেছিলেন খালেদা জিয়া। শেষ পর্যন্ত ইলিয়াসকে উদ্ধার করতে ব্যর্থ হওয়ায় হরতাল প্রত্যাহার করা হয়নি। আজ সোমবারও হরতাল দিয়েছে দলটি।
বিএনপি সূত্র জানায়, নিখোঁজ ইলিয়াসের সন্ধানে প্রভাবশালী দুটি দেশের সহযোগিতা নিতে দলের দুজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ওই দুজন নেতার সঙ্গে দুদেশের বিভিন্ন পর্যায়ে সুসম্পর্ক রয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই নেতা এরই মধ্যে প্রভাবশালী দেশ দুটির সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক ও যোগাযোগ করেছেন। একটি সূত্র জানায়, একটি দেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইলিয়াস আলী যদি জীবিত থাকেন তাহলে তাকে ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে সর্বাত্মক সহায়তা করবেন তারা। অন্য একটি দেশের কর্মকর্তারা ইলিয়াসকে খুঁজে বের করার ব্যাপারে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছেন।
এদিকে শনিবার রাতে র্যাবের সঙ্গে যাওয়ায় ইলিয়াসের স্ত্রী লুনার ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো ফাঁদে পা না দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন তাকে। এ পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল পুলিশ ও সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি লুনা।
র্যাব কর্মকর্তা ইলিয়াস আলীর বাসায়ঃ গতকাল নিখোঁজ ইলিয়াস আলীর বাসায় গিয়ে তার স্ত্রী লুনার সঙ্গে কথা বলেছেন র্যাব-১-এর উপ-অধিনায়ক মেজর মোস্তাক। প্রায় এক ঘণ্টা তিনি ওই বাসায় অবস্থান করেন। এ সময় সংবাদকর্মীদের ইলিয়াসের বাসায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। বাসা থেকে বের হওয়ার পর মেজর মোস্তাক সাংবাদিকদের বলেন, ইলিয়াস আলীকে খুঁজে বের করার জন্য আমরা চেষ্টা করছি। সবাইকে সুসংবাদ দেওয়ার জন্য দিনরাত কাজ করে যাচ্ছি।
গতকাল র্যাব-১-এর সদস্যরা দুপুর দেড়টার দিকে ইলিয়াস আলীর বনানীর বাসায় প্রবেশ করেন। এক ঘণ্টা কথা বলার পর আড়াইটার দিকে তারা বাসা থেকে বের হন। সাংবাদিকরা কথা বলতে চাইলে মেজর মোস্তাক দ্রুত বাসা ত্যাগ করেন। যাওয়ার আগে খুব সংক্ষেপে কিছু কথা বলেন। সূত্র জানায়, ইলিয়াসের বাসার অন্য বাসিন্দাদের সঙ্গেও কথা বলেন র্যাব সদস্যরা।
এদিকে বনানী থানার ওসি মামুন-অর রশিদ নিখোঁজ বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর সঙ্গে দেখা করতে বনানীর বাসায় যান। ওসি মামুন ইলিয়াসের স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চাইলে তিনি দেখা করেননি।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার প্রধান কমান্ডার এম সোহায়েল বলেন, ইলিয়াসের খোঁজে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। ইলিয়াস আলীর পরিবারের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার পর আমরা শনিবার রাতে গাজীপুরে ত্রিমুখী অভিযান চালিয়েছি। সেখানে আমরা ইলিয়াসকে পাইনি। তবে আমাদের একাধিক টিম বিভিন্ন দিক থেকে বিষয়টি তদন্ত করছে। তদন্তে আমরা প্রযুক্তিও ব্যবহার করছি।
এদিকে র্যাবের একটি টিম রূপসী বাংলা থেকে সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করে তদন্ত করে দেখছে। ফুটেজে দেখা যায়, নীল শার্ট পরিহিত এক ব্যক্তি রূপসী বাংলা থেকে বের হওয়ার পর ইলিয়াসকে বিদায় দিচ্ছেন। এতে নিশ্চিত হয়েছে, ওই ব্যক্তি যুবদল নেতা ইলিয়াসের বিশ্বস্ত মীর নেওয়াজ আলী। গতকাল ইলিয়াসের আইনজীবী আহসান হাবিবকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে র্যাব। মঙ্গলবার রাতে আহসান হাবিবের জন্য দীর্ঘ সময় হোটেল রূপসী বাংলায় অবস্থান করেন ইলিয়াস। তবে হাবিব রূপসী বাংলায় ইলিয়াসের সঙ্গে দেখা করতে আসেননি।
ইলিয়াসের বাসায় বি.চৌধুরীঃ বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীর পরিবারকে সমবেদনা জানাতে গতকাল সন্ধ্যায় ইলিয়াসের বাসায় যান বিকল্পধারার চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তিনি তার বাসায় প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থান করেন। পরে সাংবাদিকদের বি.চৌধুরী বলেন, ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে দেশ। এ অবস্থা চলতে দেওয়া যায় না। ইলিয়াসের মতো নেতা নিখোঁজ হওয়াকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন তা শিশুসুলভ।
এ ছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মোসাদ্দেক আলী ফালু, সাংবাদিক শফিক রেহমান, সাবেক উপমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুও ইলিয়াসের বাসায় যান।
কেন রূপসী বাংলা হোটেলে যান ইলিয়াসঃ বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীর আইনজীবী আহসান হাবিব এক মিডিয়াকে জানান, মঙ্গলবার রাত ৯টা ২ মিনিটের দিকে আমার সঙ্গে ইলিয়াসের সর্বশেষ কথা হয়। তিনি আমাকে বলেন, রূপসী বাংলায় আসবেন না। এ খবর জানার পর আমি কর্নস্যুপ খেয়ে পৌনে ১০টার দিকে রূপসী বাংলা থেকে বের হয়ে যাই। বাসায় গিয়ে ঘুমের ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়ি। পরে দেখি রাত সাড়ে ১০টার পর ইলিয়াস ভাইয়ের নম্বর থেকে আমার মোবাইলে দুতিনটি মিসড কল উঠে আছে। এছাড়া মোনায়েম মুন্নার নম্বর থেকে আসা একটি মেসেজও ছিল। আমার মোবাইলের রিংটোন বন্ধ থাকায় কল করার বিষয়টি টের পাইনি।
আহসান হাবিব আরও বলেন, আমি রূপসী বাংলা হোটেল থেকে চলে যাওয়ার কথা বলে কাদের প্ররোচনায় কেন তিনি পরে রূপসী বাংলা হোটেলে গেলেন, এটা আমি বুঝতে পারছি না। ওয়ান-ইলেভেন থেকে ইলিয়াস ভাইয়ের সব মামলার বিষয় দেখভাল করি। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্য তাকে জিজ্ঞাসাবাদের বিষয় অস্বীকার করেছেন হাবিব।
শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি জানান, শ্রীপুরের রাজাবাড়ী ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী আত্মগোপনে রয়েছেন, রোববার দিনভর এমন গুঞ্জনের পর সংবাদকর্মীরা ওই এলাকায় ছুটে যান। তবে ইলিয়াস আলীকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। শ্রীপুর থানার ওসি আক্তারুজ্জামান বলেন, ইলিয়াস আলী গজারিয়া গ্রামে আছেন,এমন খবর পাওয়ার পর সেখানে নিয়মিত পুলিশের টহলের পাশাপাশি অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
সূত্রঃ সমকাল
হায়রে আমার আললাদ...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


