বাংলাদেশ সরকার মুজিবনগর
পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলাদেশের জন্ম ঘটনা অনন্য। দীর্ঘ প্রস্তুতি, একটি সশস্ত্র যুদ্ধ এবং এত মানুষের প্রাণহানির বিনিময়ে আর কোনো দেশ স্বাধীনতা অর্জন করতে পেরেছে বলে আমাদের জানা নেই। আর সেই যুদ্ধ যাঁর দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম আর সুযোগ্য নেতৃত্বের ফসল।
একটি আধুনিক রাষ্ট্রের সরকারের যেসব উপাদান থাকা দরকার তার সবটাই ছিল বাংলাদেশের প্রথম সরকারে। ছিল মন্ত্রিপরিষদ, ছিল শক্তিশালী একটি সচিবালয়। মন্ত্রিপরিষদের মন্ত্রণা অনুযায়ী সচিবালয় মাধ্যমে পরিচালিত হতো গোটা সরকার ব্যবস্থা। পরিচালিত হতো সশস্ত্র যুদ্ধ। যুদ্ধে অংশ নিয়েছে হাজার হাজার যুবক। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে থেকে সেক্টরভিত্তিক এই সশস্ত্র যুদ্ধ ছিল অত্যন্ত শৃঙ্খলাভিত্তিক। সচিবালয় পরিচালিত হয়েছে অকল্পনীয় শৃঙ্খলা আর নীতি-নিয়মের মাধ্যমে। এত বড় একটা যুদ্ধ, এত বড় শরণার্থী সমস্যা, গোলা-বোমা-আগুনে জ্বলন্ত একটি দেশ পরিচালনা করেছে সরকার। সেই সময়ে পরিচালিত ওই সরকারের বিরুদ্ধে টুঁ-শব্দটি হয়নি। এখানেই বোঝা যায়, সেই সরকার কতটা সফল। সর্বশেষ প্রমাণ তো দেশের স্বাধীনতা লাভ। সুতরাং বাংলাদেশের ইতিহাসে মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত সরকার সর্বকালের রেকর্ড সৃষ্টি করেছে, তা সর্বজন স্বীকৃত ও সত্য। সেই সরকারের একজন কর্মী হিসেবে তা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছে আমার। নিজের সাধ্য অনুযায়ী কাজ করার সৌভাগ্যের বিষয়টিও এখানে উল্লেখ্য। মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত সরকারকে হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করার কোনো উপায় নেই। তবে এটা ছিল নিরাপত্তা বজায় রেখে এবং নির্দেশনাসহ ক্রমাগত ও ধাপে ধাপে পরিচালিত একটি প্রক্রিয়া। এখানে কিছু বিষয়ের অবতারণা করা যেতে পারে। এটা আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হলেও ইতিহাসের আলোকে বিচার্য হতে পারে। মার্চ একাত্তরে আমি ছিলাম পাকিস্তান সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব। রাজশাহীর ডিসি হিসেবে কাজ করে ঢাকায় বদলি হয়ে এসেছি। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের নির্দেশনার আগেই দেশ ও সরকার পরিচালিত হচ্ছিল তাঁর কথামতো। তিনি মুখে যা বলতেন তাই সরকারি নির্দেশ হতো। জনসমাবেশ, ঘরে কিংবা সাংবাদিকদের সামনে যা-ই বলতেন, তা-ই সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মেনে নিত। সেই পরিস্থিতিতে ঢাকায় অবস্থানরত সিএসপি অফিসারদের একটি সভা হলো_ সিএসপি অফিসারদের করণীয় কী তা নির্ধারণ করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। সেই সভায় আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম পাকিস্তান সরকার নয়, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে সরকারের সব কাজ চলবে। পরবর্তী সময় তাই হয়েছে। এমনকি যাঁরা ঢাকা ছেড়ে যেতে পারেননি তাঁদেরও স্বল্পসংখ্যক ছাড়া সবাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন। এটাও তো ঐতিহাসিক সত্য। সুতরাং কোনো রকম হোমওয়ার্ক ছিল না যদি বলা হয় তা হবে ইতিহাসের প্রতি অবিচার। ইতিহাসকে অবজ্ঞা করা।
যা-ই হোক, সরকারের প্রথম দিকের কথা বলা যাক। তাজউদ্দীন আহমদকে সরকার সংগঠনের কথা বলার পর তিনি আমাদের নির্দেশ দিলেন, একটি কাঠামো রচনা করার জন্য। সেই সময়ের বেশ মজার একটি ঘটনা মনে পড়ে। সরকারে যোগ দিলাম কিন্তু নিয়োগপত্রের প্রশ্ন এলো। তিনি বললেন, নিয়োগপত্র টাইপ করে আনুন। পাশেই একজন টাইপিস্টের কাছ থেকে টাইপ করিয়ে আনা হলো। সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেব ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে (কেউ কেউ তাঁকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে উল্লেখ করেন, এটা ঠিক নয়। তিনি উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন। তেমনি কেউ মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ সরকারকে অস্থায়ী সরকার বলে উল্লেখ করেন। তাও উচিত নয়। কারণ সেই সরকার সম্পূর্ণ বিধিসম্মতভাবে গঠিত হয়েছিল। তা বাংলাদেশের প্রথম সরকার, অস্থায়ী সরকার নয়।) আমার নিয়োগপত্র সই করলেন।
পার্ক সার্কাস স্ট্রিটে হোসেন আলী সাহেবের অফিসে গেলাম আমরা। প্রথম অবস্থায় সেখানেই বসার ব্যবস্থা হলো। সচিবালয় এর জন্য একাধিক জায়গা নির্ধারণ হয়। এক জায়গায় বসতেন_তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কামরুজ্জামান, ইউসুফ আলী, মনসুর আলী, জেনারেল ওসমানী, এ কে খন্দকার, কর্নেল রব, এম এ সামাদ, আমি আরো অনেকে। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কিছু দফতর ছিল হাইকমিশনার হোসেন আলী সাহেবের অফিসে। ট্রেজারি গঠিত হয়েছিল। সেটিও ছিল হাইকমিশন অফিসে। ট্রেজারি পরিচালনা করার জন্য কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়েছিল মুজিবনগরে। সরকারের প্রধান কাজ ছিল মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করা। সে ক্ষেত্রে বিভিন্ন জায়গা থেকে সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন কর্মকর্তা যাঁরা বিদ্রোহ করে যুদ্ধ করছিলেন, তাঁদের সংগঠিত করার কাজটি করতে হয়েছে প্রথম থেকেই। যেমন মেজর শফিউল্লাহ জয়দেবপুরে মার্চ মাসের ২৫ তারিখের আগেই বিদ্রোহ করেছিলেন। খালেকুজ্জামান, খালেদ মোশাররফ, মেজর জিয়াউর রহমান, আবু ওসমান চৌধুরী, এম কে বাশার, মেজর জলিল, নুরুজ্জামান, সিআর দত্ত, রফিকুল ইসলামের মতো ও অন্যান্য সেনা ও ইপিআর কর্মকর্তারা যেভাবে আক্রমণ পরিচালনা করেন এবং যুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে যান তাকে সংগঠিত কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার কাজটি করতে হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে। জয়দেবপুরে বাঙালি সৈনিকদের প্রায় সবাই বিদ্রোহ করে ২৫ মার্চেরও আগে। সেখানে নেতৃত্ব দেন মেজর শফিউল্লাহ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মেজর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বাধীন বাঙালি সৈনিকরা যুদ্ধ শুরু করে, চট্টগ্রামে ইপিআর যুদ্ধে লিপ্ত হয় মেজর রফিকের নেতৃত্বে, পরবর্তী সময় মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাঙালি সৈন্যরাও পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এর কোনোটাই হঠাৎ কোনো ঘোষণার কারণে হয়নি। বলতে দ্বিধা নেই ১৬ ডিসেম্বরের পর পর দেশে যে অরাজকতা সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক ছিল তা হয়নি। এটা ঐতিহাসিকভাবে সত্য। প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয়েও ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে মুজিবনগরে। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনের জন্য প্রচুর অর্থের দরকার হবে। বাংলাদেশ সরকার জেনেছে, পাকিস্তানিরা বাংলাদেশ থেকে সোনার মজুদ নিঃশেষ করে দিয়েছে। তারা সেগুলো পাকিস্তানে পাচার করে দিয়েছে। টাকার নোট প্রকাশ্যে রাস্তায় পর্যন্ত আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে। সেই অবস্থায় দেশের টাকার জোগাড় করার ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা ছিল না দেশের। মালামাল আমদানি করার কোনো সুযোগ ছিল না। অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে অন্য দেশের মাধ্যমে আমদানি করার ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। সে কাজটি করতে হয়েছে সরকার দেশে স্থানান্তরের আগেই। আবার দেশে সরকার স্থানান্তর হওয়ার আগেই কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়। দেশের শিল্পসামগ্রী যাতে দ্রুত রফতানি করা যায়। সে ক্ষেত্রে কিছু বন্ধুপ্রতিম দেশে যোগাযোগ করা হয়_তাঁদের অনুরোধ করা হয় বাংলাদেশের চা, পাট যেন তাঁরা আমদানি করেন। যাতে করে বাংলাদেশের কিছুটা হলেও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হয়। এগুলো হয়েছে মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের প্রথম সরকারের সাফল্যের কারণেই।
খন্দকার আসাদুজ্জামান
লেখক : বাংলাদেশ সরকার, মুজিবনগরের
অর্থ সচিব ছিলেন। বর্তমানে জাতীয় সংসদ সদস্য এবং সংস্থাপন বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি
---------------------------------------------------------------------
ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস আজ
১৭ এপ্রিল। স্বাধীন বাংলার বিপ্লবী সরকার প্রতিষ্ঠার দিন, যা ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ৩৯ বছর আগে ১৯৭১-এর এই দিনে কুষ্টিয়া জেলার (বর্তমানে মেহেরপুর জেলা) বৈদ্যনাথতলায় বিপ্লবী সরকার শপথ নিয়েছিল। বর্তমানে তা ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকার হিসেবে খ্যাত। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভার সর্বশেষ বৈঠকে মুজিবনগর দিবসকে জাতীয় দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি ও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে গঠিত হয়েছিল বাংলাদেশের এই প্রথম সরকার। তবে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে করা হয় অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি। সেদিন বিপ্লবী সরকারের মন্ত্রিপরিষদের আনুষ্ঠানিক শপথ ছাড়াও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ ও মুক্তি বাহিনীর কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। বিপ্লবী সরকারের শপথের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও সরকার পরিচালনা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নেওয়া 'মুজিবনগর' খ্যাত সরকারের দক্ষ নেতৃত্ব ও কার্যকর রণ পরিচালনার কারণে ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সফল পরিণতি ঘটে। নিভৃত সেই আম্রকাননকে পরে 'মুজিবনগর' নামকরণ করে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করা হয়। ৯ মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম আর ৩০ লাখ শহীদের রক্ত এবং দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্ব্বর স্ব্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই এপ্রিল, ২০১০ রাত ২:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



