somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অন্যরকম উদ্যোক্তা ‘মাহমুদুল হাসান সোহাগ’

১৪ ই এপ্রিল, ২০১২ দুপুর ১২:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গণিত অলিম্পিয়াডের শুরুর দিকের কথা। আমি বুয়েটের আইআইসিটিতে কাজ করি আর সারা দেশে গণিত অলিম্পিয়াডকে সংগঠিত করছি। আমার ছোট্ট রুমে একদিন কয়েকজন বুয়েটের শিক্ষার্থী দেখা করতে এসেছে। তাদের ইচ্ছা, ময়মনসিংহ শহরে তারা একটি গণিত অলিম্পিয়াড করবে। বললাম, ‘সিইং ইজ বিলিভিং।’ কয়েক দিন পরই জাতীয় উৎসব। উৎসবে যোগ দিলেই জানা হয়ে যাবে সব। এভাবেই গণিত অলিম্পিয়াডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় বুয়েটের তড়িৎকৌশল বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান। পরিচিত মহলে তার পরিচিতি সোহাগ নামে। পরের বছরই সোহাগ হয়ে যায় গণিত অলিম্পিয়াডের অন্যতম পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এবং একাডেমিক দলের কান্ডারি। প্রশ্ন করা, খাতা দেখার টিম ঠিক করা, তাদের জড়ো করে আনা আর প্রশ্নোত্তর পর্বে সামাল দেওয়া—সবটাতেই সোহাগকে দেখা যায়। ও এখন আমাদের একাডেমিক কাউন্সিলর।
এর মধ্যে বুয়েটের পড়াশোনাও শেষের দিকে চলে এসেছে। চাকরি করবে না বলে মনস্থির করেছে আগেই। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইলেকট্রনিকস নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা থেকে আইআইসিটির পরিচালক ড. লুৎফুল কবীরের তত্ত্বাবধানে শুরু করে একটি ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন তৈরির কাজ। সঙ্গে সতীর্থ মাসুম হাবীব ও রাজিব মিকাইল। ২০০৫-০৬ সাল থেকে এর কথা আমরা শুনেছি। ওই কাজ করতে করতে শেষ হয় শিক্ষাজীবন। গবেষক হিসেবে যোগ দেয় আইআইসিটিতে। প্রি-পেইড এনার্জি মিটার আর স্মার্ট কার্ড নিয়ে কাজ। তবে বাঁধাধরা কাজে মন টিকল না। বের হয়ে এসে গঠন করল নিজেদের প্রতিষ্ঠান, পাইল্যাবস বাংলাদেশ। মাসুম, মিকাইল আর আবুল হাসান সঙ্গে। ঠিক করল পাইল্যাবসের লভ্যাংশ কখনো নিজেরা নেবে না। এটি পুনর্বিনিয়োগ হতে থাকবে গবেষণা ও উন্নয়নে। ইভিএমের গবেষণার বৃহত্তর বিনিয়োগ পাইল্যাবসের। এ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব নির্বাচন ইভিএমে হয়েছে, সবই নির্মিত হয়েছে পাইল্যাবসে!
সোহাগদের প্রথম বাণিজ্যিক কাজের গল্পটিও চমকপ্রদ! পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে তারা একদিন হাজির হয় এক ভদ্রলোকের কাছে। বিজ্ঞাপনদাতা রি-রোলিং মেশিনের জন্য একটি সেন্সর খুঁজছিলেন। তাঁর মেশিনটির অনেকখানি ম্যানুয়াল। হাতে লিভার টানাটানি করতে করতে সময়মতো সবকিছু করা হয় না। সোহাগদের সমস্যাটা দিয়ে বললেন, কাজটা পারবেন কি না, সেটি কয়েক দিন পরে এসে জানাতে। তিনি ধরেই নিয়েছিলেন ওরা আর ফিরবে না। কারণ, এর আগে বেশ কয়েকটি দল তাঁর সঙ্গে দেখা করে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু কয়েক দিন পর যখন সোহাগরা ফিরে আসে, তখন তিনি যুগপৎ অবাক ও বিস্মিত হলেন। কারণ, ওরা কোনো কাগজপত্র নিয়ে আসেনি, যন্ত্রটি বানিয়ে তবেই এসেছে!!!
সোহাগদের বিলের দাবি ছিল ২৫ হাজার টাকা। ভদ্রলোক দিয়েছিলেন এক লাখ টাকা। এই আমাদের মাহমুদুল হাসান। ১৯৮১ সালের ৭ জুন জামালপুর জেলার সরিষাবাড়িতে শিক্ষক বাবা আবুল হোসেন ও ডাক বিভাগের কর্মকর্তা মনোয়ারা বেগমের তৃতীয় সন্তান হিসেবে জন্ম। বড় দুই বোন আশরাফুন নাহার ও জেসমিন নাহার এখন গৃহবধূ। কি পড়ালেখায়, কি গান-বাজনায়, কি বিজ্ঞান প্রকল্প বানানো—সবটাতেই সোহাগ ছিল অগ্রগণ্য। ১৯৯৮ সালে সরিষাবাড়ি থেকে ঢাকা বিভাগের এসএসসি পরীক্ষায় পঞ্চম হওয়া, জাতীয় শিশু প্রতিযোগিতার জাতীয় পর্যায়ে চলে আসা, স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে স্কুলের নেতৃত্ব দেওয়া—সবই তার কিছু প্রকাশ মাত্র। ২০০০ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসিতে চতুর্থ হয়ে বুয়েটের তড়িৎকৌশলে পড়তে আসা।
ইলেকট্রনিকস নিয়ে কাজ করার প্রতিষ্ঠান পাইল্যাবস সোহাগ ও তার সঙ্গীদের প্রথম উদ্যোগ। তাদের ধারণা, মুনাফার সর্বোচ্চায়ন নয়, সমাজের উন্নতি হওয়া উচিত ব্যবসার লক্ষ্য। ‘সমাজ ভালো থাকলেই না আমরা ভালো থাকব।’ সোহাগ বলে। এ কারণে পাইল্যাবসের লভ্যাংশ ব্যয় হয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গবেষণায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অন্যরকম বায়োইনফরমেটিকস ল্যাবরেটরি সেই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টারই একটি অংশ মাত্র।
পাইল্যাবসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেনি নিজেদের। গড়ে তুলেছে সফটওয়্যারের প্রতিষ্ঠান অন্যরকম সফটওয়্যার, আমদানি-রপ্তানির অন্যরকম সলিউশনস, ইন্টারনেট নিয়ে অন্যরকম ওয়েব সার্ভিস, সৃজনশীল পুস্তক প্রকাশের
অন্যরকম প্রকাশনী আর ওয়েস্টার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল। এসব নিয়ে তাদের অন্যরকম গ্রুপ। মাহমুদুল হাসান তার চেয়ারম্যান আর আবুল হাসান লিটন তার ব্যবস্থাপনা পরিচালক। বন্ধু এবং সঙ্গীদের মধ্যে মানিকজোড়ের আরেকজন লিটনের কথা বলে। ‘লিটন খুব ঠান্ডা মাথায় কাজগুলো শেষ করতে পারে।’ গ্রুপের বাইরে রয়েছে তার নিজের ইনট্র্যাক নামের প্রোডাকশন হাউস।
চলার পথে অনুপ্রেরণার কথা জানতে চাইলে স্টিভ জবসের উদ্ভাবনী শক্তি ও লেগে থাকার কথা বলার পাশাপাশি জাফর স্যার (মুহম্মদ জাফর ইকবাল) আর গণিত অলিম্পিয়াডের সাধারণ সম্পাদকের কথা জানায় সোহাগ।
তার স্বল্প কাজের জীবনে লক্ষ করেছে দেশে যোগ্য মানুষের বড় অভাব। তাই সে কাজেই মনোনিবেশ করতে চায় মাহমুদুল হাসান। এই কাজের জন্য প্রথমত দরকার ভালো ভালো বই সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া। দুর্ভাগ্যবশত ‘ঢাকার বাইরে সহজেই কোনো ভালো বই পাওয়া যায় না।’ সেই অভাব দূর করার জন্য গড়ে তুলেছে দেশের সবচেয়ে বড় অনলাইন বইয়ের দোকান রকমারি ডট কম (http://www.rokomari.com)। বাংলাদেশের যেকোনো জায়গা থেকে রকমারিতে বই কেনা যায়। মাত্র ৩০ টাকা সার্ভিস চার্জ নিয়ে কুরিয়ার সার্ভিসে বই পৌঁছে যায় ক্রেতার কাছে। বই পেয়েই বাহকের হাতে মূল্য পরিশোধের ব্যবস্থা। নিজেদের তৈরি করা কিছু শিক্ষা ভিডিও ওরা বিতরণ করে বিনা মূল্যে। তবে প্রাপককে আবার এর দুই কপি বিতরণ করতে হয়, বিনা মূল্যে!
সোহাগের ইচ্ছা অন্যরকম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার। যে প্রতিষ্ঠান কেবল জিপিএ ফাইভ-প্রত্যাশী শিক্ষার্থী গড়ে তুলবে না, বরং তাদের আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে। তারা চাকরি খুঁজবে না, চাকরি দেবে। বণিক জাতির দুর্নাম ঘুচিয়ে বিশ্বের সামনে সৃজনশীল উদ্যমী জাতি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করবে।
Reference
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×