আমার জন্যে যাপিত জীবন নিয়ে কিছু লেখার শখ হওয়া গরীবের ঘোড়া রোগ হওয়ার চেয়েও বড় রোগ ! কারণ আমার অতীত স্মৃতি রোমন্থনের শখ কোনও মহান আত্মজীবনিকার এর চেয়ে কোনও অংশে কম না আবার আমার স্মৃতিশক্তি গোল্ডফিশের চেয়ে খুব একটা বেশিও না। কিন্তু প্রথমটা অপেক্ষাকৃত বেশী প্রকট বলে লিখতে বসে গেলাম। প্রথমেই একটা সরল স্বীকারোক্তি দিয়ে শুরু করি আর সেটা হচ্ছে স্মৃতিচারণা করার সময় কিছু কিছু ঘটনায় স্বল্প থেকে মাঝারি মানের রঙ চরতে পারে, তা চরুক না , এতে না হয় আমার শৈশবটা আরও একটু রঙ্গিন হয়েই ধরা দেবে, দোষের তো কিছু নয় !
জীবন শুরু হয় জন্ম দিয়ে। সুতরাং আমিও আমার জন্ম থেকেই শুরু করতে চাই। অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে যে আমার জন্মের ঠিক নেই (!!!) না না ঘাবড়াবেন না, আসলে ঘটনা হচ্ছে সরকারিভাবে আমার যে জন্মতারিখ নিবন্ধিত আছে সেটা ভুয়া (জানি এরকম অবস্থা অনেকেরই ) যাই হোক যখন এরশাদ নামক এক মহান শাসকের (!) পতনের দাবীতে সারা বাংলা উন্মাতাল ঠিক তখনই ফেব্রুয়ারী মাসের ১৫ তারিখে এ ধরণীর বুকে আরেক মহামানবের আগমন। ছোটবেলায় আমি আহামরি রকমের ডানপিটে ছিলাম এরকম দাবি করতে পারলে আহ্লাদিত হতাম কিন্তু মিথ্যা বলা হবে তাই বলতে পারছি না,আমার দেহের তুলনায় মাথা একটু বেশী বড় ছিল বলে মাথা যে কোনও এক দিকে কাঁত হয়ে থাকত, ছোটবেলা থেকেই আমার খাদ্যপ্রীতির কথা দিগ্বিদিক ছরিয়ে পরে সেজন্য কলোনিতে কারও বাসায় ভাল রান্নাবান্না হলে আমার দাওয়াত পাওয়াটা এক রকম নিশ্চিত ছিল। আমি কারও সঙ্গে মারামারি করছি আর সে কারণে বাসায় নালিশ আসছে এরকম কখনই ঘটে নি ,তবে এর মানে এই না যে আমি খুব ভাল ছেলে ছিলাম, আসলে মারামারিতে লিপ্ত হওয়ার মত শক্তি আর সাহস কোনটাই আমার ছিল না! তবে উপরে বর্ণিত বৈশিষ্ট্যগুলো আমার নিজের মনে নেই, সম্পূর্ণটাই লোকমুখে শোনা সুতরাং সেগুলো অবশ্যই তদন্তসাপেক্ষ !
বিদ্যালয়ে প্রথম দিন এমনিতেই মানুষ মনে রাখে আর বোনাস হিসেবে আমার একটা স্বরণীয় ঘটনাও আছে। কথা ছিল ক্লাস শেষ হওয়ার পরে বাসা থেকে কেউ না কেউ আমাকে নিতে আসবে । তো ক্লাস শেষ হওয়ার পর আমি নির্ধারিত স্থানে গিয়ে দাঁড়ালাম কিন্তু বেশ কিছু সময় পার হওয়ার পরও কারও দেখা না পাওয়ায় চিন্তা করলাম স্কুলে ভর্তি হওয়া মানেই বড় হয়ে যাওয়া সুতরাং আমাকে একলাই বাসায় যেতে হবে , যেই ভাবা সেই কাজ ,হাঁটা শুরু করলাম। যে যে পথ ধরে স্কুলে আসছিলাম সেই পথ চিনে চিনে বাসায় ফিরলাম বড় হয়ে যাওয়ার আনন্দ নিয়ে কিন্তু বাসায় ফিরে অস্বাভাবিক এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হলাম, দেখি আমার মামনি কান্নাকাটি করে আশেপাশের কয়েক বাসার লোক জড় করে ফেলসে এবং আব্বু আর অন্যান্য প্রতিবেশীরা তাঁকে নানাভাবে অভয় বাণী শোনানোর ব্যর্থ চেষ্টা করতেসে। এরপর দৃশ্যপটে আমি হাজির হতেই মামনি আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্নাকাটি শুরু করল , তাঁর ছেলে সুস্থ আছে সেইটাই তাঁর কাছে ঐ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় খবর। তবে আমার কাছে সেটা কিছুটা ভন্ডামি মনে হল কারণ যেই রমণী আগের দিন রাতেই ‘অ’ এবং ‘আ’ এই দুটি অক্ষরের মধ্যে গণ্ডগোল বাঁধিয়ে ফেলার লঘু অপরাধে আমাকে শারীরিক এবং মানসিকভাবে লাঞ্ছিত করেছিল সেই রমণীই কিনা এখন আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে ? আজ এত বছর পরে এসে ঐ ভণ্ডামিটাকেই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সত্য বলে মনে হয়!
স্কুল জীবনে আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল মেনন। ওকে আল্লাহ আমার জন্যেই সম্ভবত সৃষ্টি করেছিলেন। কারণটা এ বেলা বলে রাখি, ও টিফিন হিসেবে আনত লোভনীয় সব ফাস্টফুড আর আমি আনতাম রুটি সবজি ভাজি এ ধরনের জিনিস । কিন্তু কেন জানি না ওর আমার খাবারের প্রতি আকর্ষণটা বেশী ছিল আর এই সুযোগে আমার তো পোয়াবারো । পরবর্তীতেও ওকে আমি প্রচুর খসাইছি এবং সে হাসিমুখেই ‘হাতেম তাঈ’ সেজে গেছে। মনে আছে একবার আমার পাশে বসতে পারবে না এ কারণে ক্লাসে কান্নাকাটি শুরু করছিল । তখনকার ঐ অবুঝ ,ছেলেমানুষি বন্ধুটাই এখন উত্তাল সাগরের অবাধ্য ঢেউকে পোষ মানানো ম্যারিন ইঞ্জিনিয়ার ,ভাবলেই কেমন জানি একটা অনুভূতি হয়। সময় আসলে অনেক বড় জাদুকর !!!
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মনে রাখার মতো আর খুব বেশী স্মৃতি নেই আমার। যা আছে টুকরো টুকরো খাপ ছাড়া। যেমন গানের ক্লাসে আমি সবচেয়ে ভয়ে থাকতাম ,কখন জানি স্যার আমাকে অসাধ্য সাধন করার (গান গাওয়ার) নির্দেশটা দিয়ে বসে । তাই অনেক হিসেব নিকেশ করে বিভিন্ন বেঞ্চে বসতাম তবুও সব সময় শেষ রক্ষা হত না। মেয়েদের সঙ্গে আমার তেমন যোগাযোগ ছিল না , শুধু জানতাম খারাপ ছেলেরাই মেয়েদের সাথে কথা বলে। অন্তর্যামী আমার মনোভাব বুঝতে পেরে আমার অদৃষ্টে পরবর্তীতে বয়েজ স্কুল, বয়েজ কলেজ এবং প্রায় (!) বয়েজ ইউনিভার্সিটিতে পড়ার তৌফিক দান করেন।
এ পর্যায়ে এসে সবাই বলে থাকেন যে আপনাদের আগ্রহ থাকলে এই সিরিজ চলবে। কিন্তু আমার ব্যাপারটা একটু ভিন্ন, আমার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আমার ক্ষয়িষ্ণু স্মৃতিশক্তির উপর আমার বিশেষ আস্থা নেই বলে আরও বিস্মৃত হওয়ার আগেই সংরক্ষণ এর একটা ব্যবস্থা করা এবং আমার অনাগত সন্তান যখন তাঁর অপদার্থ পিতার অতীত সম্বন্ধে জানার আগ্রহ প্রকাশ করবে তখন হয়ত এই লেখাটা কিছু উপকার করলেও তো করতে পারে , নাকি?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



