somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্বপ্নযাপনঃ সূচনা পর্ব

১৬ ই জুন, ২০১২ রাত ৮:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

যেকোনো বিশেষজ্ঞের কাছে যান এবং জিজ্ঞেস করুন স্বপ্নের দৈর্ঘ্য কতক্ষণ? তিনি হয়তো বলবেন বড়জোর কয়েক সেকেন্ড। এখনি উনার কথা ঠিক ধরে নেবেন না। আপনাকে আরও একটু কষ্ট করতে হবে। আপনাকে পৌঁছাতে হবে পলাশীতে। পলাশীর প্রান্তরে না অবশ্য, ঢাকাস্থ আজিমপুরের পলাশীতে। সেখানে আছে একটা বিশ্ববিদ্যালয় যার মূল ফটক দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে আপনি হয়তো দেখবেন কিছু ছেলে মেয়ে রাজ্যের ক্লান্তি নিয়ে হেঁটে আসছে; হয়তো সকাল আটটা থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত ক্লাস আর ল্যাব করে পর্যুদস্ত অথবা ক্লাস টেস্টে কপালে জুটেছে একটা অশ্বডিম্ব। তাদেরকে জিজ্ঞেস করুন স্বপ্নের দৈর্ঘ্য কতক্ষণ; ক্লান্তি-মাখা মুখগুলোতে ফুটে উঠবে একটা সূক্ষ্ম হাসির রেখা। তারা বলবে স্বপ্নের দৈর্ঘ্য হচ্ছে পুরো বুয়েট জীবন।

মানুষ হিসেবে সবার কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। আমার ক্ষেত্রে সেটা হচ্ছে স্মৃতিশক্তির কমজোরি। মাঝে মাঝে স্কুল, কলেজের বন্ধুরা এমন কিছু স্মৃতি রোমন্থন করে যেখানে আমি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত অথচ বেমালুম ভুলে বসে আছি। এখন যে স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, ঠিক জানি সে স্বপ্নের অনেকটুকুই হয়তো ভুলে যাব সময়ের সাথে তাল মেলাতে যেয়ে। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়টা ভুলে যাওয়ার মতো অন্যায় করা সমীচীন হবে না ভেবে ঠিক করলাম কিছু কিছু করে লিখে রাখব এই অদ্ভুত মায়াবী ঘোরলাগা সময়ের কথা। জীবন যখন খুব অর্থহীন মনে হবে তখন ফিরে ফিরে আসব এইসব স্মৃতির কাছে আর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলব একদিন আমারও জীবন ছিল।

স্বপ্ন দেখার জন্য আপনাকে প্রথমে বিছানা পর্যন্ত যাত্রা করতে হবে, তাই আজ লিখতে চাই এই স্বপ্ন-তরীতে অংশ নেয়ার যাত্রার কথা। তখন বড়জোর সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি। ভালো ছাত্র হিসেবে আস্তে আস্তে একটা অবস্থানও তৈরি হচ্ছে। মতামত চাপিয়ে না দিলেও মধ্যবিত্ত বাবা-মা, সন্তান প্রকৌশলী বা চিকিৎসক হলেই যে বেশী তৃপ্ত হবেন তা বুঝতে বেগ পেতে হয় না। বুয়েটের কথা প্রথম শুনলাম ঐ বয়সটাতেই। দেশের সবচেয়ে মেধাবীরা নাকি ঐখানে পড়ে। তার মানে ঐখানে পড়তে পারলে আমাকেও সবাই মেধাবী ভাববে এই প্রলোভনটাই আমার কিশোর মনকে আকর্ষিত করে থাকবে বলে মনে হয়। আর চিকিৎসক হতে হলে অনেক বেশী পড়াশোনা করতে হবে এই আতঙ্কটাও আমার বুয়েটে পড়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। স্বীকার করতে কোন লজ্জা নেই যে, আমি আসলেই কি হতে চাই, সেটা না বুঝেই, শুধু ভালো ছাত্র হিসেবে অবস্থান পাকাপাকি করতে আর কম খাটুনির লোভেই বুয়েট আমার লক্ষ্যে পরিণত হয়। যদিও পরবর্তীতে দু'টি আশার কোনটাই পূরণ হয় নি।

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরে যথারীতি ভর্তি হয়ে গেলাম বুয়েট ভর্তি কোচিং এ। প্রথম ক্লাসের কথা ভুলতে পারি না। বুয়েটের একজন ভাইয়া এসেছিলেন ক্লাস নিতে। কি তার কথার মাধুর্য আর কি তার বুঝানোর দক্ষতা। উনি ভেক্টর শেখানোর পরে মনে হল, ধুর! গত দুই বছরে তো কিছুই শিখি নি। ক্লাস শেষে তিনি আমাদের কাছে রীতিমতো তারকা। তার সবকিছুর মাঝেই তখন অর্থবহতা খুঁজে পাই। ক্লাস শেষে তিনি বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিলেন, সেই দৃশ্য দেখেও চিরকাল সিগারেট-বিমুখ এই আমারও মনে হল, বাহ! সিগারেট খাওয়া জিনিসটা এতো সুন্দর হতে পারে? তবে বুয়েটে সুযোগ পাওয়ার পরে দেখলাম কোচিং এর সেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত জাদুবাস্তব কক্ষে যে ভাইকে বাঘ মনে হয়েছিল বুয়েটের প্রাণঘাতী পাঠ্যসূচীর দংশনে তিনি বিড়াল হয়ে গেছেন। কয়েকটি বিষয়ে প্রথমবারে উত্তীর্ণ হতে না পেরে এখন এককালে তার গুণমুগ্ধ ছাত্র ছিল, এমন অনেকের সাথে আবার ক্লাস করছেন। মনে বুঝিলাম, ইহারা অন্য জাতের মানুষ।

বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় আমার সিট পরেছিল ওল্ড একাডেমিক বিল্ডিং যা ও এ বি নামেই বেশী আলোচিত এবং সমালোচিত। সমালোচিত কারণ বিগ ব্যাং যুগের এই ভবনটি একটি মূর্তিমান গোলকধাঁধা। এর ঘুলঘুলিতে একবারও খেই হারিয়ে ফেলে নি এমন বুয়েটিয়ান খোঁজা, শাকিব খানের পৌরুষ খোঁজার মতোই নিষ্ফল কর্ম হবে। সুতরাং পরীক্ষার হল পর্যন্ত পৌঁছাতে বেশ একটা হ্যাপা পোহাতে হয়েছিল। একটা মজার এবং কাকতালীয় ব্যাপার হচ্ছে আমার বুয়েট জীবনের প্রথম ক্লাসটাও ঠিক সেই রুমেই হয়েছিল যেই রুমে আমি ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিলাম। ক্লাস করতে যেয়ে দেখি, আমার ভর্তি পরীক্ষার রোল নাম্বারটা এখনো একটা বেঞ্চির শোভা বর্ধন করছে।

পরীক্ষা দিয়ে বুয়েটে সুযোগ পাওয়ার ব্যাপারে একটা আত্মবিশ্বাস যদিওবা তৈরি হয়েছিল কিন্তু সুযোগ পাব কি পাব না এই দুশ্চিন্তা একেবারে সরিয়ে রাখার মতো মহামানব আমি কোনদিনই ছিলাম না। তারপর দুশ্চিন্তায় প্রলম্বিত দীর্ঘ কিছু দিন আর দীর্ঘ কিছু রাতের অবসানে একদিন এক রাত এলো। এক বড় ভাইয়ের মারফতে জানতে পারলাম সুযোগ পেয়েছি চার বছর(বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন) ধরে একটা স্বপ্নের ভেতর দিয়ে যাওয়ার। প্রকাশ করতে যদিও একটু সংকোচ বোধ করছি কিন্তু সত্য কথা হল বুয়েট ভর্তি পরীক্ষার মেধা-ক্রম আকাঙ্ক্ষার সাথে তাল মেলাতে ব্যর্থ হওয়ায়, ফলাফল জানার পর আশাভঙ্গের বেদনায় শিশুর মতো কেঁদেছিলাম বেশ কিছুক্ষণ। এখন অবশ্য সেই ছেলেমানুষি কন্নাকাটির কথা চিন্তা করলে হেসে নেই একচোট আর বুয়েট জীবনের প্রাপ্তিগুলোর কথা জাবর কেটে মনে মনে বলি,

“যা দেখেছি, যা পেয়েছি, তুলনা তার নাই”

(হয়তো চলবে...)
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×