somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শুয়া উড়িল উড়িল রে..(ঘেটুপুত্র কমলাঃ মুভি রিভিউ )

১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০১২ রাত ৯:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এমনিতেই হুমায়ূন আহমেদ এর চলচ্চিত্র নিয়ে একটা বাড়তি আগ্রহ থাকে তারপরে আবার এটা তাঁর শেষ চলচ্চিত্র। সুতরাং ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ নিয়ে আগ্রহ এবং প্রত্যাশার পারদ দ্রুতই উপরের দিকে উঠছিল। মুক্তির দিনে বিকেলে বন্ধুদের নিয়ে বলাকায় গিয়ে বিফল মনোরথ হয়ে ফিরতে হল। কারণ আর কিছুই না, আমার মতো আরও অনেকেই মুখিয়ে ছিল সিনেমাটির জন্য; ফলাফল বিশাল লাইন এবং হাটিকেট পরিস্থিতি। এরপর গতকাল হুট করেই নেয়া সিদ্ধান্তে বলাকাতে গিয়েই চক্ষু কর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করে আসলাম।

ছবির কাহিনী নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। অনেক বছর আগে ঘেটুগান নামক সংগীতের এক রহস্যময় এবং বিচিত্র ধারা নিয়েই কাহিনী আবর্তিত। হাওর অঞ্চলে পানি-বন্দী সময়টুকুতে বিনোদনের জন্য শৌখিন জমিদারেরা ঘেটুগানের ব্যবস্থা করত। ধীরে ধীরে ঘেটুপুত্রকে শারীরিকভাবে ব্যবহারের কুপ্রথা গড়ে ওঠে। তাই জমিদারের স্ত্রীরা ঘেটুপুত্রকে সতীন হিসেবে দেখতে শুরু করে। এমতাবস্থায় জমিদার পরিবারে সৃষ্ট মানসিক টানাপড়েন এবং কিশোর কমলার অমানবিক অভিজ্ঞতাই চলচ্চিত্রটির উপজীব্য।

প্রধান চরিত্র মূলত দু’টি; জমিদার চরিত্রে তারিক আনাম খান এবং ঘেটুপুত্র চরিত্রে মামুন। দুইজনই দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। এছাড়া জমিদার-পত্নীর চরিত্রে মুনমুন আহমেদও অনবদ্য। তবে জমিদারের ভাড়াটে চিত্রকর হিসেবে আগুনের অভিনয় ভালো লাগলেও চরিত্রটিকে আমার কাছে অগভীর মনে হয়েছে। নৃত্য প্রশিক্ষক হিসেবে প্রাণ রায় এবং ঘেটুদলের প্রধান হিসেবে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ও উতরে যান। জমিদারের দাসী চরিত্রে শামিমা নাজনিনও বেশ ভালো অভিনয় করেছেন।

আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা মনে হয়েছে সেটা হল সিনেমাটির যে বিষয়, তা বর্তমান সময়ের সাপেক্ষে ভীষণভাবে অফ টপিক। হুমায়ূন আহমেদের কৃতিত্ব বোধ হয় এই খানেই যে, সিনেমাটি দেখতে শুরু করার পর ব্যাপারটা আর মাথায় থাকে না। দর্শক মানসিকভাবে ঐ সময়েরই একজন হয়ে যান এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই কমলার দুঃখ-কষ্টের সমব্যথী হয়ে ওঠেন।

হুমায়ূন আহমেদের অনুসারী মাত্রই জানেন, মানুষের দ্বৈত-সত্ত্বা তাঁর আগ্রহের অন্যতম বিষয়। এজন্য তাঁর হাতে তৈরি কোন চরিত্রই সর্বান্তকরণে ভালো বা মন্দ হয় না। তিনি যেমন নেতিবাচক চরিত্রের ইতিবাচক দিকের উপরে আলো ফেলেন তেমনি ইতিবাচক চরিত্রগুলোর ক্ষুদ্রতাও এড়িয়ে যান না। এই সিনেমার জমিদার চরিত্রটিতেও তাই আমরা দেখা পাই সেই দ্বৈত-সত্ত্বার। ধর্মীয় অনুশাসনে কঠোর এবং দানে বীর এই জমিদার একজন কিশোরের সাথে সমকামিতায় লিপ্ত হতে তাই পিছপা হন না। সিনেমার শেষ পর্যন্ত গিয়েও তাই তাঁর পক্ষে বা বিপক্ষে সুদৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করা যায় না।

হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যকর্ম এবং চলচ্চিত্র দেখলে আমার সবসময় একটা কথা মনে হয় যে,ভদ্রলোক একজন সত্যিকারের ‘মুহূর্ত নির্মাতা’। সাধারণ এবং চাইলেই এড়িয়ে যাওয়া যায় এমন অনেক দৃশ্যকে তিনি তাঁর সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টি এবং অতুলনীয় রসবোধ দিয়ে অসামান্য করে তোলেন। তাঁর চলচ্চিত্রের কোন চরত্রিকেই আপনি অবহেলা করতে পারবেন না। ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ সিনেমার ক্ষেত্রেও কথাটি সত্য বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। নিয়মিত বিরতিতে হাস্যরসের উপস্থিতি আপাত দৃষ্টিতে গুরুগম্ভীর এই সিনেমাটিকে ক্লান্তিকর করে তোলার হাত থেকে বাঁচিয়েছে।

আলাদা করে তাঁর প্রশংসা করতে হয় লোকেশন নির্বাচনের জন্য। তিনি এমন একটি পুরনো জমিদার বাড়ি নির্বাচন করেছেন যা অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে হাওর অঞ্চলের পানি-বন্দী এবং পানি নেমে যাওয়ার পর সৃষ্ট দুটি বিপরীত চিত্র খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।

সিনেমাটোগ্রাফি চলনসই তবে দুই একটা দৃশ্য ছাড়া দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো না। বাংলা সিনেমায় ফ্ল্যাশ-ব্যাকে যাওয়ার একটা অতি প্রাচীন পদ্ধতি আছে। ক্যামেরা ধীরে ধীরে স্মৃতিচারণকারীর মুখের কাছে যেতে থাকবে এবং তিনি অন্য একটি দিকে তাকিয়ে থাকবেন তারপর পর্দায় দেখান হবে তাঁর স্মৃতিচারণকৃত পুরনো অংশটুকু। আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে এই ফর্মুলাটি অত্যন্ত ক্লিশে মনে হয় কিন্তু দুঃখজনক-ভাবে হুমায়ূন আহমেদ এই চলচ্চিত্রটিতে কয়েকবার এই প্রাচীন পথে হেঁটেছেন।

স্মৃতিশক্তি প্রতারণা না করলে সিনেমাটিতে চারটি গান রয়েছে। তন্মধ্যে ‘যমুনার জল দেখতে কালো’ ইতিপূর্বে তাঁর অনেক নাটকে ব্যবহৃত, তাছাড়া ঘেটুগান হিসেবে তা আমার কাছে নতুন কোন আবেদন সৃষ্টি করতে পারে নি। কিন্তু শেষ দৃশ্যে প্রান্তির গাওয়া ‘শুয়া উড়িল উড়িল জীবেরও জীবন’ গানটি আমার মতো আবেগ প্রতিবন্ধী মানুষেরও গায়ে কাঁটা দেয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। সব মিলিয়ে একটা দেখার মতো ছবি।

সিনেমার শেষে কমলার করুণ পরিণতি মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে। কিন্তু আরও বেশি খারাপ লাগতে থাকে যখন অনুভব করি, এরকম ব্যতিক্রমী কাহিনী বলার মতো, ছোট ছোট দৃশ্য দিয়ে আমাদের জীবনের টুকরো কথাগুলো সেলুলয়েডের পর্দায় তুলে ধরার মতো মানুষটাই আর নেই...
৪টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×