এই লিস্টে সবার আগে আমি নাম রাখবো আমাদের বাংলাদেশী সিনেমা 'সীমানা পেরিয়ে'।
১.সীমানা পেরিয়েঃ
খুব বড়লোকের মেয়ে জয়শ্রী কবির মায়ের মৃত্যুর পর সে শোক ভুলতে আর চরিত্রহীন বাবার নিজের বান্ধবীর সাথে প্রেম করতে দেখে সহ্য করতে না পেরে চলে আসে গ্রামে। বন্ধু-বান্ধব নিয়ে বের হয় সমুদ্র ভ্রমণে। কিন্তু কিছু দূর যেতেই প্রচন্ড ঝড় উঠে। সেই ঝড়ে বাকি সবাই ফিরতে পারলেও জয়শ্রী কবিরের ফেরা হয় না। সে গিয়ে আটকা পড়ে তীর থেকে বহু দূরের এক পরিত্যক্ত দ্বীপে। তবে একা নয়, গ্রামেরই বোকা-সোকা, একটু তোতলা যুবক বুলবুল আহমেদও আটকা পড়ে সেখানে।
শুরুতে শ্রেণীগত সংঘাত থাকে, ধনীর প্রতি ধনহীনের, নীচের প্রতি উঁচুর একটা জাতিগত বিদ্বেষ থাকে, উচ্চশিক্ষাপ্রাপ্ত মেয়েটির সাথে অক্ষরজ্ঞানহীন ছেলেটির শিক্ষাগত দূরত্ব থাকে। কিন্তু তারপরও সবকিছু ছাপিয়ে যৌবনের স্বাভাবিক ধর্মে নির্জন দ্বীপে পাশাপাশি থাকা দুটো মানুষ একসময় গভীরভাবে প্রেমে পড়ে যায়।
তাদের আটকা পড়া, সমস্ত বাধা ঠেলে একে অপরের প্রেমে পড়া, এবং সমাজ যখন পরবর্তীতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তখন সব উপেক্ষা করে সেই নির্জন দ্বীপেই নিজেদের স্বর্গ গড়ে তোলার স্বপ্ন.........সমস্ত মিলে পুরো সিনেমাটা এত অদ্ভুত সুন্দর আর ঘোর লাগা! সিনেমাটির পরিচালক আলমগীর কবির সম্পর্কে এতটুকুই বলতে পারি তিনি তাঁর সময়ের চেয়ে অনেকখানি এগিয়ে থাকা একজন ছিলেন।
আজগুবি ঘোরলাগা সিনেমাগুলোর মধ্যে বরাবর এটা নাম্বার ওয়ানেই থাকবে। আর এখানেই আছে সেই কালজয়ী গান
বিমূর্ত এই রাত্রি আমার
মৌনতার সূতোয় বাধা
একটি রঙিন চাদর......
সর্বকালে সেরা রোমান্টিক গানগুলোর একটি।
২. কহো না প্যায়ার হ্যায়ঃ
বাবা রাকেশ রোশনের পরিচালনায় ঋত্বিক রোশনের প্রথম সিনেমা। এরচেয়ে আজগুবি কাহিনী খুব কম সিনেমারই আছে (তবে বলিউডের কথা আলাদা, সেখানে আজগুবিরই জয়জয়কার)। যথারীতি নায়িকা অনেক বড়লোকের মেয়ে আর নায়ক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। কিন্তু মেয়েটা পাগলের মত প্রেমে পড়ে যায় ছেলেটার। কলেজের সবাই মিলে জাহাজ ভ্রমণে গেলে ওরা দুইজন একটা নৌকার দড়ি ছিঁড়ে করে গভীর রাতে ভেসে যায়। আটকা পড়ে নির্জন এক দ্বীপে। সেখানে দারুণ নাচা-গানা করে প্রেম হয়ে যায়। নায়িকার বাবা সেই প্রেম মানবে না। লোক লাগিয়ে খুন করে নায়ককে। সেই দুঃখ ভুলতে নায়িকাকে পাঠিয়ে দেয় দেশের বাইরে চাচার কাছে। কিন্তু সেখানে গিয়েও নিস্তার নেই। অবিকল সেই চেহারার একজন সামনে এসে হাজির। এমনও কি হয়!
তারপর সেই দ্বিতীয় নায়ক নায়িকাকে নিয়ে ফিরে আসে ইন্ডিয়ায়। নায়িকার প্রথম নায়ক হত্যার প্রতিশোধ নেয় এবং অতঃপর উহারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে শুরু করে।
এমন আজগুবি হাস্যকর কাহিনী কয়টা সিনেমার আছে? কিন্তু ছোটবেলার প্রেম বলে কথা। এখনও যদি হঠাৎ কোন চ্যানেলে দেখি এই সিনেমাটা দেখানো হচ্ছে আমি হা করে বসে দেখতে শুরু করি।
৩. কোই মিল গ্যায়াঃ
ঋত্বিক রোশনের সত্যিকারের অসাধারণ একটা সিনেমা। বাবার এলিয়েনদের সাথে যোগাযোগের গবেষণায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় গর্ভে থাকা ঋত্বিকের মস্তিষ্ক। তার মানসিক বৃদ্ধি হয় না। পরিপূর্ণ যুবক হয়েও ঋত্বিক অভিনয় করে একজন বালকের। কি অসাধারণ যে হয়েছিল তার অভিনয়!
তারপরে বাবার যন্ত্রটা ঠিকঠাক করে ভিনগ্রহবাসীদের সাথে সে যোগাযোগ করে। তারা আসেও পৃথিবীতে, কিন্তু ভুলক্রমে তাদের একজনকে রেখেই আবার স্পেসশীপ চলে যায়। সেই ভিনগ্রহবাসীকে খুঁজে পায় ঋত্বিক নিজেই। পিচ্চি-পাচ্চার দল মিলে তার নাম দেয় জাদু। তারা জাদুকে আগলে রাখে লোভী বড় মানুষদের হাত থেকে। এবং তাদের সবার চেষ্টায় জাদু আবার ফিরে যায় নিজের গ্রহে।
খুবই অবাস্তব আজগুবি একটা কাহিনী। কিন্তু ঋত্বিকের অভিনয় আর বাকি সব মিলে কি যে অসাধারণ লাগে সিনেমাটা আমার! বারবার দেখলেও পুরনো হবে না।
৪. Sweet November:
অতি উচ্চ মাত্রার কেরিয়ারিস্ট এক লোকের হঠাৎ করে দেখা হয়ে গেল পাগলাটে এক মেয়ের সাথে। সেই মেয়ে এমনই নাছোড়বান্দা যে কিছুতেই তার পিছু ছাড়ে না। ধীরে ধীরে সে দখল করে নিল তার সমস্তই। নিজের কেরিয়ার, উচ্চাকাঙ্খা, কাজ সব ছেড়ে গোটা নভেম্বর কাটিয়ে দিল পাগলিটার সাথে। বদলে গেল তার জীবন-যাত্রার ধরন, জীবনের প্রতি দৃষ্টি-ভঙ্গী সমস্তই। পাগলের মত সে প্রেমে পড়ল মেয়েটার।
কিন্তু.......বেশিরভাগ অমর প্রেম কাহিনীর মতই এটাও একটা বিয়োগাত্মক কাহিনী। মেয়েটা ক্যান্সারে মারা যায় শেষ পর্যন্ত। সিনেমাটা শেষ করার পরে কি যে মনটা খারাপ হয়, বলার মত না।
৫. Serendipity:
এইটার মত আজগুবি সিনেমা কমই আছে। ক্রিসমাসের আগে একজোড়া গ্লাভস কিনতে গিয়ে নায়ক-নায়িকার দেখা হয়ে গেল। তারপরে তারা পুরো সন্ধ্যাটা একসাথে সময় কাটাল। স্বভাবতই একজনের প্রতি আরেকজনের তীব্র আকর্ষণ জন্মাল। নায়ক চাইল সেটাকে আরো কিছুদূর এগিয়ে নিতে। ফোন নাম্বার চাইল সে নায়িকার। কিন্তু নায়িকা অতিমাত্রায় ভাগ্যে বিশ্বাসী। সে নানানরকম খেলা শুরু করল। দুইজন দুই লিফটে উঠে যদি এক ফ্লোরে নামতে পারে, তাইলে ফোন নাম্বার দিবে...হেন তেন আরো কত কি!
একটা পাঁচ ডলারের নোটে নিজের ফোন নাম্বার লিখে তাই দিয়ে চুইংগাম কিনে খেয়ে ফেলল। কোনদিন, কোনভাবে নায়ক যদি সেই পাঁচ ডলারের নোট পেয়ে যায় তাইলেই আবার যোগাযোগ হইতে পারে। অথবা সে একটা পুরনো বইয়ে নাম, ফোন নাম্বার লিখে পুরনো বইয়ের দোকানে বিক্রি করে দিবে। যদি নায়ক খুঁজে পায়! কার এত ঠ্যাকা এত কাহিনী করার! কিন্তু দেখা গেল সত্যি নায়কের ঠ্যাকা বেশ ভাল রকমেরই।
কয়েক বছর পরে যখন সে তার গার্লফ্রেন্ডকে বিয়ে করবে, পারিবারিকভাবে এনগেজমেন্ট হয়েও গেল, তখন তার সেই ভূত আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। একই কাহিনী নায়িকারও। সে তার বাগদত্তকে ফেলে রেখে চলে আসল নায়ককে খুঁজতে। তারপরে বহুৎ নাটক-সিনেমা করে শেষ-মেষ দুইজনের দেখা হল, তারা বিয়ে করল আর সুখে-শান্তিতে বাস করতে লাগল।
আমার দুঃখ লেগেছিল নায়কের প্রেমিকা আর নায়িকার প্রেমিকের জন্য। তারা সত্যি সত্যি এই দুই অভাগাকে জান-প্রাণ দিয়ে ভালবাসতো। এইভাবে দুই বেচারাকে ছ্যাঁকা খাওয়ানো মোটে উচিৎ হয় নাই।
সিনেমাটার বলিউডি ভার্সন দেখার আগ পর্যন্ত আমার এটা অতি অসাধারণ লাগতো। কিন্তু ফালতু বলিউডি ভার্সনটা আসল সিনেমাটার প্রতিও চরম বিরক্তি নিয়ে আসছে।
৬. The Lake House:
একজন নিঃসঙ্গ ডাক্তার আর নিঃসঙ্গ আর্কিটেক্ট কাকতালীয়ভাবে একই বাড়ির মালিক থাকে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে। লেকের ধারে অতি মনোরম পরিবেশে অবস্থিত বাড়িটার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে তারা বাড়ির সামনের ডাকবাক্সে চিঠি আদান-প্রদান করতে থাকে। সবকিছুই ঠিক ছিল। কিন্তু গোল বাধল তারিখ নিয়ে। দেখা গেল আর্কিটেক্ট তারিখটা দিচ্ছে দুই বছর আগের। কি করে সম্ভব!
এইরকম অসম্ভব একটা কাহিনীর সিনেমাই The Lake House। দেখার সময়ে সমস্ত যুক্তি-তর্কের ঊর্ধ্বে উঠে দেখতে হবে। একমাত্র তাহলেই এই মুভির আসল মজা পাওয়া সম্ভব।
শেষ পর্যন্ত তাদের দেখা হল কি না, দুই বছরের দূরত্ব তারা অতিক্রম করতে পারল কি না...এইসব হাবিজাবি চিন্তা করতে গিয়ে শেষের পনর মিনিট আমিতো দম আটকে বসেছিলাম। আজগুবি হলেও এই মুভিটা খুবই হৃদয়ছোঁয়া।
৭. 50 First Dates:
নায়িকার শর্ট টার্ম মেমরি। নায়ক যখন তাকে দেখল, তখনইতো একেবারে কাত। যাকে বলে "প্রথম দর্শনেই প্রেম"। প্রথম দিন বেশ খাতিরও জমিয়ে ফেলল। কিন্তু দ্বিতীয় দিন কথা বলতে যেয়েই বিশাল ধরা। মেয়েতো আর তাকে চেনে না। তারপর ধীরে ধীরে জানতে পারল বেচারির তার বাবার জন্মদিনে গাড়ি এক্সিডেন্টে তার এ অবস্থা। চব্বিশ ঘন্টার বেশি সে নতুন স্মৃতি ধরে রাখতে পারে না। রাতে ঘুমালেই সারাদিনের সব ঘটনা ভুলে যায় আর জেগে উঠে সেই শনিবারে, তার বাবার জন্মদিনে। তাই তার বাবা আর ভাই রোজ তার সেই পিঙ্ক টপসটা ধুয়ে রাখে যাতে পরের দিন ওটা পরে রেস্টুরেন্টে খেতে যেতে পারে, ঘরের দরজায় একই খবরের কাগজ রেখে দেয়। নায়ক বেচারা আর কি করে, রোজ তার সাথে নতুন করে খাতির জমায়। আর নায়িকাও বেশিরভাগ দিনই তার প্রেমে পড়ে যায়।
কিন্তু এইভাবে আর কদিন যায়! তাই নায়ক নতুন পদ্ধতির আশ্রয় নিল। একটা ভিডিও তৈরি করল, যেখানে তার এক্সিডেন্ট আর তার পরবর্তী সমস্ত ঘটনা সংক্ষেপে দেখানো হয়। সবশেষে সে নিজেরও পরিচয় দেয়, যে তাদের মধ্যে প্রেম চলছে। রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে নায়িকা ভিডিওটি দেখে, সে দুঃখে কাঁদে, খুশিতে হাসে আর নতুন করে দিন শুরু করে। রোজ সে নায়ককে চুমু খেয়ে বলে, 'Nothing is as sweet as first kiss!' এইভাবে শেষ পর্যন্ত তারা বিয়েও করল, তাদের একটা মেয়েও হল আর তারা সুখে-শান্তিতে দিন কাটাতে লাগল।
আহা এমন ভালবাসা কয়জনের ভাগ্যে জোটে! আর এমন উদ্ভট ঘটনাই বা কয়জনের জীবনে ঘটে! এ্যাডাম স্যান্ডলারের কমেডি, ড্রু বেরিমোরের সৌন্দর্য আর আজগুবি সুন্দর রোমান্টিসিজম.......সব মিলে মুভিটা বড়ই উপভোগ্য।
এই পোস্টের মুভিগুলো তাদের জন্যই যারা সমস্ত যুক্তি-তর্কের ঊর্ধ্বে উঠে শুধু অন্ধ আবেগকেই গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। বাকিদের কাছে এই মুভিগুলো চরম ফালতু ছাড়া আর কিছু নয়

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


