বিশ্বাস কর সোনা, মা কখনোই এত ভীতু ছিল না। সবকিছুতেই কি আসে যায় একটা ভাব নিয়েই চলতো। মরে যাবে, বিপদ হতে পারে.....এমন চিন্তা কখনো মার মাথায় আসতোই না। একবার কি হয়েছে জানিস? রেললাইনে বাস আটকা পড়ে গেছে। ওদিকে ট্রেন আসছে। সবাইতো হুড়মুড় করে বাস থেকে নামছিল। কিন্তু মা কি করেছে জানিস? যেখানে বসে ছিল সেখানেই চুপটি করে বসে অলস চোখে ছুটে আসতে থাকা ট্রেনের দিকে তাকিয়ে ছিল। বাসটাকে ধাক্কা দেবার অল্প কয়েক সেকেন্ড আগে বহুকষ্টে ট্রেনটা ব্রেক করতে পেরেছিল। মা কিন্তু সেদিন একটুও ভয় পায় নি। আরেকবার দোতলা একটা বাস ট্রাকের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটছিল। এই ধাক্কা লাগে তো, সেই উল্টে পড়ে অবস্থা। বাসের ভেতর সবাই ভয়ে চিৎকার, ড্রাইভারকে বকাঝকা। মা কিন্তু ওই বিষম ছুটে চলায় অন্নেক মজা পেয়েছিল। আর এখন!!
আমার সোনা, জানিস না সারাক্ষণ আমি ভয়ে কুনো হয়ে থাকি। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে-নামতে মেপে মেপে একটা একটা করে পা ফেলি। যাতে কোনভাবেই ঝাকি লেগে তোর কষ্ট না হয়। বাস একটু জোরে ছুটলেই আমি ভয়ে সিঁটিয়ে যাই আর প্রাণপণে আল্লাহকে ডাকতে থাকি। রিকশা ভাঙা রাস্তা দিয়ে গেলে ঝাকি লাগবে বলে আমি রিকশাতেই চড়ি না, তারচেয়ে বরং হেঁটে যাওয়া ভাল। আর যদি কখনো চড়তেই হয়, ভাঙা বা উঁচু-নিচু এলে আমি একেবারে দাঁড়িয়ে যাই যাতে কোনভাবেই তোর ঝাকি না লাগে। আমার আজকাল বড় ভয় হয়েছে। আমি সবকিছুকেই ভয় পাই, এমনকি বাতাসকেও। কোনভাবে, কোনভাবেই কেউ যেন তোর ক্ষতি না করতে পারে।
জানিস, সবসময় একটা কথা খুব শুনে এসেছি। আমি নাকি খুব গোঁয়াড় আর জেদী, আর বোকাও। এইসব অর্থহীন জেদ বা বোকামির জন্য নিজের নাকি অনেক ক্ষতিও করে ফেলেছি কত বার। কিন্তু তারপরও আমি চাই তুই আমার মতই জেদী, একগুঁয়ে হবি। আমি চাই তুই আমার মতই খুব আবেগী আর বোকা একটা মেয়ে হবি। মানুষ হিসেবে তোর পরিচিতি তৈরি হয়ে গেছে। ছোট্ট ছোট্ট আঙুলের মাথায় তোর আঙুলের ছাপও তৈরি হয়ে গেছে এর মধ্যেই। তবে লিঙ্গ বৈষম্য এখনও তোকে স্পর্শ করে নি। বোঝা যাচ্ছে না তুই মেয়ে নাকি ছেলে। কিন্তু আমি আজকাল খুব করে চাই তুই মেয়ে হবি। ঠিক মায়ের মতই।
কেউ তোকে দুটো কথা শুনিয়ে গেলে তুই ফিরে ঝগড়া করবি না। বরং গোঁ ধরে নিজের কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করবি তুই কি আর কি করতে পারিস। তুই শান্ত, চুপ-চাপ, নরম থাকবি কিন্তু প্রয়োজনে ভীষন কঠোরও হবি। কিছুতেই যেন তোকে ভাঙতে না পারে কেউ। তোর হাসিমুখটাই যেন সবাই সবসময় দেখে। কিন্তু প্রয়োজনে তোর মানসিক বল হবে সবার চেয়ে বেশি। হাসিমুখে, শান্তভাবেই সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতি সবচেয়ে সহজে সামলে নিবি। সবার সাথে খুব সহজে মিশে গেলেও তোর ব্যক্তিত্ব যেন তোকে সবার থেকে আলাদা করে রাখে।
তুই আবার ভাবিস না তোর ওপরে সব চাপিয়ে দিচ্ছি যা মন চাইছে তাই। খুব খুব কঠিন একটা জায়গায় আসছিস তুই পাখি। এখানে কেউ তোকে সাহায্য করবে না। নিজের জন্য চারপাশ চেয়ে তুই কেবল নিজেকেই পাবি। তাই তোকে শিখতে হবে এখন থেকেই।
আমি জানি এখন তোর জন্যই আমাকে অনেক হাসি-খুশি আর আনন্দে থাকতে হবে। কোনরকম মন খারাপ, দুঃশ্চিন্তাই করা যাবে না। ভয় পাওয়াতো একেবারেই নিষেধ। কিন্তু গত কয়দিন ধরে এমন সব ভয়ংকর ঘটনা ঘটছে আশে পাশে, কিছুতেই পারছি না নিজেকে স্থির রাখতে। এমনকি তোর সাথে কথাও বলা হয়ে উঠছিল না। তুই বুঝি ভাবছিস তোর প্রতি মনযোগ কম দিচ্ছি? খুব অভিমান হচ্ছে নিশ্চয়ই তোর। একদম মার মতই। কক্ষণো এমন ভাববি না লক্ষ্মী সোনা। তোর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই নাই আমার। এইতো কদিন একটু মন খারাপের বাতাস গেল। দেখবি কাল সকাল থেকেই মা খুব লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে গেছে। আর আগের মতই তোর সাথে অনেক মজার মজার গল্প করছে।
আমার সোনা মানিক, তোর জন্যই আমাকে যেমন ভাল থাকতে হবে। তোকেও ঠিক একইরকমভাবে মার জন্য ভাল থাকতে হবে। মনে হচ্ছে বুঝি এই লম্বা একটা পথ পাড়ি দিচ্ছিস তুই। মোটেই না। এইতো আর কদিন। এরমধ্যেইতো তুই তিন ভাগের এক ভাগ পথ পার হয়ে এসেছিস। বাকি সময়টুকুও দেখতে দেখতেই চলে যাবে। আর আমি জানি সেটা তুই ভালভাবেই করতে পারবি। সেই সাহস তোর আছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


