৭ বছর বয়সী শিশুর আয়ে চলে একটি পরিবার!
বেঁচে থাকার তাগিদে বাধ্য হয়ে মানুষ ভিক্ষাবৃত্তিতে নামে। সাধারণত দারিদ্র,পারিবারিক অবহেলা, মনস্তাত্বিক কারণেই মানুষ ভিক্ষাবৃত্তি গ্রহণ করে থাকে। এ ছাড়া দৃশ্যত যে সামাজিক উপাদানগুলো আমাদের দেশে ভিক্ষাবৃত্তির কারণ হিসেবে চিহ্নিত তা হলো, অতি নিম্ন আয়, ভূমিহীনতা, অশিক্ষা, বসতবাড়ির অভাব, জনসংখ্যার চাপ, মহিলাদের প্রতি নির্যাতন এবং তাদের পরিত্যাগ। আমার ধারনা-বর্তমানে ঢাকা নগরীতে ৪০/৫০ হাজার লোক ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত। তবে প্রতিবছর দুই ঈদে ভিক্ষুকের সংখ্যা দ্বিগুণ/তিনগুণ ছাড়িয়ে যায়। সমাজকল্যাণ অধিদল্পতরের এক পরিসংখ্যান থেকে যেনেছিলাম, সারাদেশে প্রায় ৭ লাখ ভিক্ষুক রয়েছে। এদের মধ্যে মৌসুমী ভিক্ষুকদের একটা অংশ ঘর গৃহস্থালীর ফাঁকে ফাঁকে ভিক্ষা করে থাকে। এদের বলা হয় মৌসুমী ভিক্ষুক। এরা ৩ মাস ভিক্ষা করে।শুধু ভিক্ষাকরে অনেক ভিক্ষুকই ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছে। বাড়ি, গাড়ি জমি জমার মালিকও নাকি হয়েছে কেউ কেউ। আবার কেউ একাধিক বিয়ে করে ভিক্ষা বৃত্তিতে জনশক্তি বৃদ্ধি করেছে। কৌতুহলি হয়ে আমি নিজেই ভিক্ষুকদের সাথে কথাবলে এবং বিভিন্ন সোর্স লাগিয়ে এই নগরীর ভিক্ষা বৃত্তির জানা-অজানা নানা কাহিনী ও বিচিত্র চিত্র পাঠকদের সাথে শেয়ার করছি-
রোজার শুরু থেকেই ধানমন্ডি ১০ নম্বর রোড সংযোগ কাল্ভার্ট ব্রীজের ফুটপাথে এবং নামাজের সময় একটু দুরেই মসজিদের সামনে অন্যান্য ভিক্ষুকদের সাথে একটি প্রতিবন্ধী শিশুকে ভিক্ষা করতে দেখি। শিশুটি সব সময় শুধু একদিকে অবশ ঘাড় কাতকরে থেকে মানুষের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।হাসি হাসি মুখ থেকে অনবরত লালা ঝরছে।জীর্ণ শীর্ণ শরির কিন্তু চোখ দুটিতে অনেক মায়া। হাতের কাছে একটা ভিক্ষার জন্য ভাঙ্গা পাত্র।সকাল থেকে সন্ধ্যা, রোদে-বৃস্টিতে শিশুটি ভিক্ষা করেই যাচ্ছে।
আমি শিশুটিকে লক্ষ করছিলাম। যারা ভিক্ষা দেয়-তাদের প্রায় সকলেই ঐ শিশুটিকে ভিক্ষা দেয়। অনেক টাকায় ওর ভিক্ষার পাত্র পুর্ণ।কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই আর টাকাগুলো নাই-দেখি!কে নেয় টাকাগুলো, কি ভাবে এখানে শিশুটি আসে, আবার কিভাবে শিশুটি মসজিদের নিকট থেকে ব্রীজের কাছে চলেযায়, কখন যায়, কখন আসে, কি নিয়ে যায়-ইত্যাদি।
আমি কৌতুহলী হয়ে বারবার অপেক্ষা করি-শিশুটির টাকা কে নেয়-দেখার জন্য। একসময় পেয়েও যাই-শিশুটির অবিভাবক মা-বাবা দুজনকেই। ইয়াসীনের পাশেই বোরকা পরে মাজেদা বেগমও ভিক্ষা করে। ইয়াসীন নামের শিশুটি জন্ম প্রতিবন্ধী। এ ছেলেটি কথা বলতে পারেনা, হাটতে পারেনা। গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের নয়া বাজার। নদীর ভাঙনের কারণে তারা শহরে এসেছে বছর তিনেক হয়। মা, বাবা আর বোনের সাথে থাকে রাজা বাজার সংলগ্ন বৌ বাজার বস্তীতে। রাজধানীর ধানমন্ডি-নিউমার্কেট-ফার্মগেটেই মূলত ওর ভিক্ষাবৃত্তি জোন। এ কাজে সহযোগিতা করে তার মা মাজেদা বেগম (৩৫), বাবা বাবুল মিয়া(৪০) আর বড় বোন রুপা(১২/১৩)। ভিক্ষার উদ্দেশ্যে একেকদিন তার ছেলেকে একেক জায়গায় নিয়ে যান। ওর মা জানালো-প্রতিদিন ৪০০-৫০০ টাকা আয় হয়(কিন্তু আমার ধারনা শিশুটির আয় প্রতিদিন কমপক্ষে ১০০০ টাকা)।মাজেদা বেগমের আয় প্রতি দিন ৩/৪ শত টাকা। এ টাকা থেকে কাউকে ভাগ দেয়া হয় না বলে জানালেন মাজেদা বেগম। প্রতিদিন খুব সকালে ছেলেকে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যান। ছেলেকে ফুটপাতে রেখে মা-বাবা ওকে লক্ষ্য করেন আড়ালে দাঁড়িয়ে। এ সময় কেউ তার কোন সমস্যার কারণ হয় কি-না জানতে চাইলে মাজেদা বলেন-‘যারা চিনে না তারা একটু সমস্যা করে, তবে কয়েকদিনের মধ্যে ছেলেটিকে কার্ড দেয়া হবে, তখন আর এ সমস্যা হবে না।’ কার্ডের জন্য “বস”কে দুই হাজার টাকা দিয়েছে। “বস” ক জানতে চাইলে তিনি চুপ করে থাকেন। এ থেকে ‘বস’ সম্পর্কে বাকী কিছু বুঝে নেয়ার জন্য অবশিষ্ট থাকে না। আমাকে কথা বলতে দেখে-এবার বাবুল মিয়াও হাজির। বাবুল মিয়া জানান, ইঙ্কাম বেশী মনে হইলেও মাসে ২/৩ হাজার টাকার বেশী জমাইতে পারিনা। ম্যালা খরচ! তার দুই সন্তানের জন্য বাড়িতে মাস্টার রাখেন। প্রতিদিন সকালে মাস্টার মেয়েটাকে কে ‘ক্লাস থ্রি’র বই পড়ায়।ছেলেকে আরবী পড়ায়-বেতন ২৫০০ টাকা। মেয়েটি স্কুলেও যায় আবার রোজার মাসে ভিক্ষাও করে। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধিতার জন্য ইয়াসীন স্কুলে যেতে পারে না বলেই এ ব্যবস্থা করেছেন। শিশুর মা-বাবা দুজনের কেউ কোন কাজ করেন না। কাজ না করার কারণ জিজ্ঞেস করলে বাবুল মিয়া বলেন, ছেলেকে সময় দেয়ার জন্য কাজ করতে পারি না। কেউ যদি তাকে কোন কাজ দেয় তিনি করবেন কি-না জানতে চাইলে মিনমিন স্বরে বাবুল মিয়া বললেন ‘পা-ই-লে ক-র-মু’। কিন্তু মাজেদা বেগম বাজখাই গলায় বলেন-“বাসা বাড়িতে কাম করলে মাস শ্যাসে পামু বড় জোর ২ হাজার টাকা। হ্যাই টাকায় কি হইবো-ঘর ভাড়াইতো লাগে ৪ হাজার টাকা।
প্রতিদিন দুপুরে মা, বাবা আর ছেলে হোটেলে দুপুরের খাবার খান-“একবেলা খানা খাইতেই লাগে দুই’শ-আড়াইশ টাকা"”। তাদের আফসোস-‘ছেলেটি মানুষের কাছে ভালভাবে চাইতে পারে না। চাইলে আরও অনেক টাকা পাইতো।’ কিন্তু মা-বাবা দুজনেই সুস্থ-সবল হওয়া সত্ত্বেও কোন কাজ করেন না। তাদের সামনে তাদেরই অসুস্থ্য ছেলে অন্যের কাছে ভিক্ষার হাত বাড়ায়-এ দৃশ্য দেখতে ওদের খারাপ লাগে কিনা জানিনা।জানিনা সুস্থ্য-সবল মা-বাবার অসুস্থ প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে তাদের ভিক্ষা নামের বাণিজ্য আর কতকাল চলবে।প্রতিবন্ধী এ ছেলেটি এখন টাকা কামাবার যন্ত্র।এভাবে শুরু হওয়া ছেলেটির জীবনের শেষ কোথায়?
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৪ ভোর ৬:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



