হুমকির মুখে স্বাধীনতা-পাগলের প্রলাপ
সান জোসেপ
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ আর মারকিন সাম্রাজ্যবাদকে আমি বলি যথাক্রমে স্বশারীরিক ও অশারীরিক। অর্থাৎ, ব্রিটিশরা স্বশরীরে হাজির হয়ে শাসন ও শোষন করেছে আর মারকিনীরা জায়গায় বসে করছে। এর নমুনা হচ্ছে হামিদ কারজাই, নুরে আল মালিকি, পারভেজ মুশারফ, হুসনি মুবারাক। ২০০৮ এর প্রথম দিকে আমার এক বন্ধুকে বললাম আমাদের দেশ কিন্তু এখন ফখরউদ্দিনের ব্রেনে চলছে না- চলছে দাদা বাবুদের ব্রেনে। উনি আমার সাথে দ্বিমত পোষন করে বললেন আমেরিকার খেয়ে দেয়ে আর কাজ নাই বাংলাদেশের মত একটা দেশ নিয়ে মাথা গামায়, কি আছে বংলাদেশে যে আমেরিকা দখল করবে। আমি উনাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম আমার কয়েকটা প্রশ্নের জবাব দেন- অর্থনৈতিক দিক দিয়ে কে শক্তিশালী আফগানিস্থান না বাংলাদেশ? প্রাকৃতিক সম্পদ কার বেশী? শিক্ষা, স্বাস্হ্য, প্রযুক্তিতে কে এগিয়ে তালেবানরা না বাংলাদেশীরা? বন্ধুর সবকটি উত্তরই ছিল বাংলাদেশের পক্ষে।পরে উনাকে বললাম তাহলে এবার আমাকে বলুন আমেরিকার আফগানিস্থান দখল করার প্রয়োজন হল কেন? আসলে আমেরিকা কিন্তু অর্থনৈতিক, প্রাকৃতিক সম্পদ বা অন্য কোন সম্পদের লোভে আফগানিস্থান দখল করেনি, দখল করেছে ভুরাজনৈতিক কারনে। আফগানিস্থানের এক পাশে রয়েছে পাকিস্থান- পারমাণবিক শক্তিধর এক মাত্র মুসলিম কান্ট্রি, অন্য পাশে আছে অর্থনৈতিক ও নিউক্লিয়ার শক্তিতে বেড়ে উঠা ইরান এবং ঔ অঞ্চলে রয়েছে তেল সমৃদ্ধ দেশগুলো যারা বিশ্বের ৭০% এনারজী সাপ্লাই করে।এসব দিক বিবেচনায় আফগানিস্থান ছিল উযুক্ত কেননা ঐ অঞ্ছলে এটিই ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা পুর্ন একটি রাষ্ট্র। মনে রাখতে হবে তালেবান বা লাদেন ছিল উপলক্ষ্য মাত্র, যদি তাই না হবে তাহলে ৭ বছরে আমেরিকার মত একটা পরাশক্তি লাদেন নামক একজন ব্যাক্তিকে খুজে বের করতে পারছে না এটা বিশ্বাস করা কঠিন আর যারা বিশ্বাস করেন তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি তথা চারদলীয় জোট হেরে যাওয়ার কারন হিসেবে অনেকে দুর্নীতিকে দায়ী করছেন। কিন্তু দুর্নীতি প্রশ্নে আওয়ামীলিগ ও বিএনপির মধ্যে কি খুব বেশী পার্থাক্য আছে? যেখানে স্বয়ং শেখ হাছিনার বিরুদ্ধে ডজনের বেশী দুর্নীতির মামলা ছিল। স্বাধীনতা বিরুধী ইস্যুটিও বড় ফেকটর ছিলনা। কেননা মানুষ যদি ফ্রিডম ফাইটার দেখে ভোট দিত তাহলে আর কাদের সিদ্দিকী, মে. জে. ইব্রাহিম, মে. জে. জেড এ খান ফেল করতেন না বা জামানত হারাতেন না। আসলে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আওয়ামীলিগ আপস করেছে বলেই তাদের বিজয় সহজ হয়েছে। জানিনা সেটা বুঝতে পেরেই খালেদা জিয়া দেশবাসীকে ‘দেশ বাচাঁও, মানুষ বাচাঁও’ ডাকে উদ্ভুদ্দ করতে চেয়েছিলেন কিনা।
ভারত-মারকিনিরা কেন বাংলাদেশে ‘কারজাই’ সরকার চায়?
ভৌগলিক দিক থেকে বাংলাদেশ এমন একটি অবস্থানে রয়েছে যার এক দিকে ভারত-দক্ষিন এশিয়ার লিডার, পারমানবিক শক্তিধর, অর্থনৈতিক দিক থেকেও অগ্রসরমান যে কিনা ভবিষতে এ অঞ্চলে মারকিন স্বার্থের অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে। অপর দিকে চীনও খুব বেশি দূরে নয়- যা কিনা আরেকটি দ্রুত অগ্রসরমান অর্থনৈতিক শক্তি, তাছাড়া নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হওয়ার সুবাদে ইতিমধ্যে দেশ দুটির মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ বর্তমান। ধারনা করা হয় বেইজিং অলিম্পিকের ঠিক আগমুহুর্তে তিব্বতে যে দাঙ্গা হয় তার পিছনে আমেরিকার ইন্দন ছিল। সবচেয়ে গুরুত্তপূর্ন বিষয় হল বাংলাদেশের রয়েছে বিশাল সমুদ্র এলাকা যার উপর আদিপত্য বিস্তার করতে ভারত-মারকিন দুজনই মরিয়া। ড. মু. ইউনুছ কে দিয়ে গভীর সমুদ্র বন্দর ইস্যুটি বাস্থবায়ন করতে চেয়েছিল আমেরিকা। যে কারনে দেশে হাজার সমস্যা থাকার পরেও ড. মু. ইউনুছ রাজনৈতিক দল গঠন করার পরপরই গভীর সমুদ্র বন্দর ইস্যুটিকে এক নাম্বারে নিয়ে আসেন। অনেকেরই বিশ্বাস মারকিনিদের কিছু এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্যই হিলারি ক্লিন্টনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ড. মু. ইউনুছকে শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার দেওয়া হয় (শান্তিতে অবদান না থাকা সত্ত্বেও)।
ভারতের স্বার্থগুলুর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ট্রান্জিট, গঙ্গার পানি হিস্যা, ছিটমহল দখল, বাংলাদেশের গ্যাস ব্যাবহার করে শিল্প স্থাপন (যা নন্দিগ্রামের মত অনেক জায়গাতে ভারত পারেনি),বানিজ্যিক ভারসাম্য হীনতা, সীমান্ত-সমস্যা । সংক্ষেপে বলতে গেলে শিল্প-বানিজ্জ,পানি সম্পদ ও পররাষ্ট্র বিষয়ক।
ফখরুদ্দিন সরকার=মারকিন সাপোরটেড=হাছিনা সরকার
ফখরুদ্দিন সরকারকে প্রথম থেকেই মারকিনি বলয় ও আওয়ামী বলয় সমর্থন জানিয়ে আসছে। চিকিৎসার নামে শেখ হাছিনা আমেরিকা- ব্রিটেন চসে বেরিয়েছেন আর তৎপরতা চালিয়েছেন বিদেশী প্রভুদের সমর্থন আদায়ের এবং সক্ষমও হয়েছেন, যার ফলশ্রুতিতে যে দাদা বাবুরা ২০০৭ সালে বলেছিলেন বড় একটি দল নির্বাচনে না গেলে সেটা গ্রহন যোগ্য হবেনা তারাই আবার সুর পালটিয়ে ২০০৮ সালে বললেন কোন দল নির্বাচনে আসল কি আসলনা সেটা নির্বাচন সুষ্ঠ হওয়ার মাপকাঠি নয়। কি চমৎকার কুটনৈতিক নীতি!
ভারত-মারকিনিরা বুঝতে পেরেছে যে এক মাত্র আওয়ামি লীগকে দিয়েই তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন সম্ভম। দেশবাসীর ধারনা ফখরুদ্দিন সরকারকে যেমনি আগাম আশ্বাস দিয়ে রেখে ছিল যে, আওয়ামিলীগ ক্ষমতায় গেলে সব কাজের বৈধতা দিবে, দাদা বাবুদেরও তেমনি আশ্বাস দেয়া হয়েছে যে আমরা ক্ষমতায় গেলে আপনাদের সকল স্বপ্ন বাস্তবায়িত করে দিব। যার ফলশ্রুতিতে আমরা দেখছি
১। নির্বাচনের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে পরাজিত মারকিন প্রেসিডেন্ট ম্যাককেইন ও জাতিসংঘের মহাসচিব বাংলাদেশ সফরে আসেন। বাংলাদেশের ইলেকশান আমেরিকার কাছে কতটুকু গুরুত্বপূর্ন হলে পরে পরাজয়ের ঘা না শুকাতেই এক মাসের মধ্যে বুশের প্রতিনিধি হয়ে বাংলাদেশ সফরে আসতে হল ম্যাককেইনকে। নির্বাচনে হারার পর ম্যাককেইন-এর এটাই ছিল প্রথম বিদেশ সফর।
২।মন্ত্রী পরিষদ গঠনের এক সপ্তহার মধ্যে নৌপরিবহন মন্ত্রীর গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মানের ঘোষনা।
৩।কার পরামর্শে বা কার স্বার্থে শিল্প, পানি সম্পদ, ও পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব যথাক্রমে দীলিপ বড়ুয়া, রমেশ চন্দ্র সেন ও ডা. দীপু মনিকে দেয়া হয়েছে। উল্লেখ্য যে, উক্ত মন্ত্রনালয়ের সাথে ভারতের মূল স্বার্থগুলো জড়িত।
৪। মন্ত্রী পরিষদ গঠনের এক সপ্তহার মধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রীর ভারতকে ট্রান্জিট দেয়ার ঘোষনা।
জঙ্গিবাদ ইস্যু
মারকিনিরা যে অজুহাতে সাম্র্যাজ্যবাদের থাবা ফেলে সেটা হল লাদেন বা আলকায়েদা বা ইসলামী জঙ্গিবাদ। পাঠক নিশ্চয় আমার সাথে দ্বিমত করবেননা যে আওয়ামিলীগ বাংলাদেশকে একটি জঙ্গিবাদের আখাড়া হিসেবে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে। অর্থাৎ বলতে গেলে আমেরিকার সুর আর আওয়ামিলীগের সুর একই। আমি অস্বীকার করছিনা যে একটি বিপথগামী গোষ্ঠী কিছু জঙ্গি হামলা চালায়নি। এর চেয়ে মারাত্মক রকম ঘটনা তো ভারতে প্রতিনিয়ত ঘটছে, ঘটছে বৃটেন, ইন্দোনেশিয়া কিংবা পাকিস্হানেও তাই বলে কি কোন দেশের বিরুধী দল নিজের দেশকে জঙ্গিবাদের আখাড়া বলে মাতম করছে? করেনি, কারন তারা জানে জঙ্গিবাদ ইস্যুটি বর্তমান জামানায় সার্বভৌমত্বের সঙ্গে জড়িত। কেননা, আফগানিস্হান ও ইরাক দখল হয়েছে এই ইস্যুতে। আর এখন আওয়ামিলীগ ক্ষমতায় এসে দক্ষিন-এশিয় টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে ইন্দো-মারকিন সাম্র্যাজ্যবাদের পথকে সুগম করতে চাইছে। এর ফলে চুন থেকে পান খসলেই ইন্ডিয়া আর মারকিন দাদারা তদন্তের নামে এসে ঘাটি গেড়ে বসার সুযোগ পাবে। গত দু বছরে ইন্ডিয়াতে যতগুলো জঙ্গি হামলা হয়েছে তার সিকিভাগও ঘটেনি বাংলাদেশে , তথাপি দক্ষিন-এশিয় টাস্কফোর্স গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়নি ইন্ডিয়ার নিকট, প্রয়োজন হল বাংলাদেশের? একেই বলে খাল কেটে কুমির আনা। কথায় আছে রক্ষকই নাকি ভক্ষক হয়। যে আওয়ামিলীগ স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল সে আওয়ামিলীগ আজ এ কোন খেলায় মেতেছে ক্ষমতার নেশায়? পরিণতি দেখার অপেক্ষায় আমরা দেশবাসী।
লেখকঃ পিএইচডি গবেষক, ইতালি।
ই-মেইল , [email protected]
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

