বাংলাদেশে দিন বদলের সনদ এবং বর্তমান বাস্তবতা
মো: ইসমাইল হোসেন
দিন বদলের সনদ ঘোষনা দিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ সরকার গঠন করেছে। বাংলাদেশের মানুষ পরিবর্তনের একটা আশা নিয়ে মহাজোটকে বিজয়ী করেছে।মহাজোট সরকারের এক মাস অতিবাহিত হলো কিন্ত জনগনের সে আশা কতটুকু পুরন হলো তা ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে। মহাজোট সরকার গঠন করার পরপরই সরকার সমর্থক ছাত্রসংগঠন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোতে নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। ক্যাম্পাসে বিরোধী দলীয় কোন ছাত্র সংগঠন না থাকলে ও নিজ দলীয় কর্মী সমর্থকদের মধ্যে হল দখল পাল্টা দখল নিয়ে যে তুলকালাম কান্ড ঘটে চলেছে তা দেখে কে বলবে বাংলাদেশে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে? দেশের বড় বড় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে।প্রায় প্রতিদিন এ সম্পর্কিত খবর পত্র পত্রিকায় বের হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিলেও তাতে কোন কাজ হচ্ছে না। বেসামাল হয়ে পড়েছে ছাত্রলীগ। তাদের নিয়ন্ত্রন করার ক্ষমতা যেন কারো নেই। ছাত্ররা হল ছেড়ে বাইরে অবস্থান করছে। ক্লাস রুমেও তাদের কোন নিরাপত্তা নেই। শুধু বিরোধী শিবিরের ছাত্র নয়, শিক্ষকরাও লাঞ্ছিত হচ্ছেন। পত্রিকার খবরে এসেছে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতার হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তার কারন হল মেরামতের কাজে তিনি তাদের অন্তর্ভূক্ত করেননি। প্রশ্ন হলো, হল মেরামতের কাজ তাদের নিয়ে করতে হবে কেন? তারা কেন শিক্ষকের উপর চড়াও হলো? এর একটাই কারন সেটা হলো এ কাজে তারা ভাগ পায়নি । চাদা বাজি আর টেন্ডার বাজি না হলে দিন চলবে কিভাবে!
গত এক মাসে মহাজোট সরকার মুখে মুখে নিরপেক্ষতার কথা বললেও তাদের কাজে কর্মে তার কোন প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছেনা।ক্ষমতা গ্রহনের পর পর দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর ভিসি পরিবর্তন করার কাজ শুরু হয়েছে । দলীয় লোকদের বসানোর জন্য মেয়াদ পুর্তীর আগেই এসব পরিবর্তন করা হচ্ছে। মন্ত্রনালয়গুলোর জন্য সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হলো। দশ সদস্যের কমিটিতে মাত্র একজন বিরোধী সদস্য রাখা হয়েছে যাতে তিনি তেমন কোন ভুমিকা রাখতে না পারেন। সংসদের আসন বন্টন নিয়ে ও সরকারি দল উদারতার পরিচয় দেয়নি। বর্তমানে বিরোধী দল আসন পুনরুদ্ধারের দাবিতে সংসদ বর্জন করে চলেছে। গত কয়েক দিন ধরে সে সমস্যার এখনও কোন সমাধান হয় নি। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর ঘোষনা করেছিলেন, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পীকার নির্বাচিত করা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেরাই তা দখল করেছেন । সারা দেশে বিরোধী দলের কর্মী সমর্থকদের উপর যেভাবে অত্যাচার নির্যাতন শুরু হয়েছে তা কোন পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে না। বাগেরহাটে বিএনপি কর্মীর চোখ তুলে নেয়া হয়েছে। চৌগাছায় জামায়াত করার অপরাধে তার ছেলেকে জখম করা হয়েছে, কুস্টিয়ায় বিএনপি কর্মীর বয়স্ক পিতাকে মারপিট করা হয়েছে। এরকম হাজারো ঘটনা ঘটে চলেছে। এ যেন এক আজব দেশ! ঘরে বাইরে কোথাও নিরাপত্তা নেই। দেশ যেন শুধু সরকারি দলের আর কারও থাকার অধিকার নাই!
তাহলে আমরা কিভাবে বলব বাংলাদেশে দিন বদলের সনদ বাস্তবায়ন হচ্ছে? হা, দিন বদল হয়েছে ঠিক তবে সেটা হলো এই যে, চার দলীয় জোটের রাজত্ব থেকে মহাজোটের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। সাধারন মানুষের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি ।জানি না, এটা দিন বদলের সনদের সংগার মধ্যে পড়ে কিনা।
আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা সুস্থ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে পারিনি। প্রতিহিংসা পরায়ন রাজনীতি থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারছিনা। যে দলই সরকারে যায় সে দলই দমন পিড়নের পথ গ্রহন করে। বিগত সময়ের অত্যাচার নির্যাতনের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। এই ধারা থেকে যেকোন ভাবে বেরিয়ে আসা দরকার। সুস্থ্য রাজনীতি চর্চার পরিবেশ না থাকায় দেশের সম্ভাবনাময় মুখগুলো বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। বিদেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অবদান রাখলেও দেশ তাদের কাছ থেকে লাভবান হতে পারছেনা। যেকোন একটা দলকে এই নতুন ধারা সৃষ্টি করা দরকার। তা না হলে প্রতিহিংসা পরায়ন রাজনীতির মুখে বাংলাদেশ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। সুস্থ্য রাজনীতি চর্চার পরিবেশ তৈরী করতে না পারলে এই সম্ভাবনাময় দেশটি একদিন আফগান বা সিকিম এ পরিনত হতে পারে।
বাংলাদেশের মানুষ একটা স্বপ্ন নিয়ে পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে। সে স্বপ্ন হলো দেশে আর প্রতিহিংসার রাজনীতি থাকবে না, দেশ দূর্নীতি মুক্ত হবে, স্বল্প আয়ের মানুষ দুবেলা দুমুঠো ভাতের নিশ্চয়তা পাবে, একদিনের জন্য হলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হবে না। দিন শেষে রাত্রিতে একটু শান্তিতে ঘুমাতে পারবে। মহাজোট সরকার তাদের দিন বদলের সনদ বাস্তবায়নের জন্য সে পরিবেশ সৃষ্টি করবে আমরা সে আশাই রইলাম।
লেখক: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক । বর্তমানে নেদারল্যান্ডে উচ্চশিক্ষারত। ই-মেইল, [email protected]
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

