কমলগঞ্জের প্রায় ৩ কিলোমিটার আগে একেবারে রাস্তার পাশে রয়েছে হীড বাংলাদেশের (HEED Bangladesh) চমৎকার কয়েকটি গেষ্ট হাউজ। ইচ্ছে করলে আগে থেকে যোগাযোগ করে(ওদের ওয়েবসাইটে ঢুকে কণ্টাক্ট নাম্বার যোগাড় করা যাবে) যে কেউ বুকিং দিতে পারে। সাধারণ ও ভিআইপি দুই ধরনের রুম পাওয়া যাবে ওখানে। খাবার ব্যবস্থাও আছে। গেষ্ট হাউজ সম্পর্কে দুটো কথা না বললেই নয়, গেষ্ট হাউজ গুলো টিলার উপর অবস্থিত এবং প্রত্যেকটি আলাদা আলাদা ইউনিট। চারিদিকে বন, অনেক বড় বড় গাছ, ঝোপ ঝাড়। ওখানে থাকলে বনের মধ্যে রাত কাটানোর খানিকটা অভিজ্ঞতা হবে আপনার। পাহাড়ি মশার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য প্রতিটি জানালা ও দরজায় সুক্ষ্ম তারের স্ক্রীন আছে। এখন বাইরে প্রচন্ড ঠান্ডা, তবে অন্য ঋতুতে ওখানে চাঁদনী রাত কাটানো একটা স্মরণীয় স্মৃতি হতে পারে মনে হয়।
যাইহোক, আসল কথায় আসি। মিজান ভাই আগেই ওদের সাথে যোগাযোগ করে রুম বুকিং দিয়ে রেখেছিলেন। আমরা ওখানে রাত কাটালাম। খুব ভোরে উঠে চারপাশটা একটু ঘুরে দেখলাম। নাস্তা সেরে আমরা বেরিয়ে গেলাম লাউয়া ছড়ার উদ্দেশ্যে। লক্ষ্য খুব ভোরে বনের মধ্যে ঢোকা। দেরি হলে নাকি লোক গিজ গিজ করে। তখন নির্জন বনের মধ্যে হাঁটার মজাটাই মাটি হয়ে যায়। আমরা নয়টার দিকে বনের প্রবেশ পথে গিয়ে পৌঁছলাম। উল্লেখ করা প্রয়োজন, হীড বাংলাদেশ থেকে লাউয়া ছড়া জাতীয় উদ্যানের গেট মাত্র কয়েক মিনিটের পথ। আমরা টিকেট নিলাম। জানতে চাইলাম আমাদের আগে আর কেউ বনে প্রবেশ করেছে কিনা। শুনলাম একদল বিদেশী পর্যটক ঢুকেছে আমাদের আগে। আমরাই দ্বিতীয় দল। ওখানে গেটে অনেক গাইডের ফোন নম্বর, তাদের চার্জ টাঙ্গানো আছে। আমরা দু’একজন গাইডের সাথে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলাম। আশাহত হলাম, কারো ফোনে ঢুকছে না (ওখানে নেটওয়ার্ক ভাল কাজ করে না), কেউ বুক্ড। মিজান ভাই বললেন এই কাজটা আগে সেরে রাখা ভাল ছিল। যাইহোক আমরা গেট দিয়ে ভেতরে এগোলাম।
তখন প্রচন্ড কুয়াশা। একটু দূরে পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে না। বৃষ্টির মত টুপটাপ করে পানি পড়ছে গাছের পাতার উপর। আমার ক্যামেরাটা গলায় ঝুলানো, ভাবলাম কি হয় কে জানে, ছবি তুলেই লেন্স ক্যাপ আটকিয়ে রাখছি। তবে ছবি তুলতে গিয়ে আজও আশাহত হলাম, কুয়াশায় কিছুই যে পরিস্কারভাবে দেখা যাচ্ছে না। কিছুদূর যেতেই আমাদের আগে ঢোকা পর্যটক দলের সাথে দেখা হল। আমরা গাইডের কাছে জানতে চাইলাম তার কাছে অন্য কোন গাইডের কণ্টাক্ট নম্বর আছে কিনা। সে একটা নাম্বার দিল, যোগাযোগ করে জানলাম সে ও বুকড। এই ফাঁকে মিজান ভাই তার কাছে ফাও কিছু জানার চান্স নিলেন। মিজান ভাই জানতে চাইলেন কোন ট্রেইলে গেলে ভাল হবে(উল্লেখ্য মিজান ভাই আগে এই বনে মধ্যে ঢুকেছেন এবং তার কিছুটা ধারণা আছে)। গাইড খানিকটা ভাব নেওয়ার চেষ্টা করে বললেন অমুক দিকে যাবে না ওদিকে ছিনতাইয়ের ভয় আছে, তমুক দিকে যাবেন না ও দিকটা খারাপ, আরো কত কি। তবে সে আমাদের আশ্বস্ত করল আমরা যদি এক ঘন্টা অপেক্ষা করি তাহলে সে ই আমাদের ঘুরিয়ে দেখাবে তার বর্তমান দলকে ঘুরিয়ে দেখানোর পর। আমার গাইডের কথা শুনে কেমন যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না ছিনতাইয়ের কথাটা। একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে একজনকে (ওখানকার কর্মরত কেউ হবে) জিজ্ঞেস করলাম বনের মধ্যে কোন ভয় আছে নাকি, ছিনতাইয়ের? তিনি জানালেন, না। তার কাছে থেকে আরো টুকটাক পথের ধারণা নিয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম নিজেরাই ঘুরব। যেহেতু মিজান ভাই আগে ভেতরে ঢুকেছেন তাই তার মনোবলটা দেখলাম বেশী।
গহীন বনের ভেতর পথ ঢুকে গেছে
অনেক গাছের গায়ে ঝুলানো আছে এর নাম।
বনে মধ্যে বিভিন্ন স্থানে পর্যটকদের সুবিধার জন্য আছে এরকম পাখির পরিচিতিমুলক বোর্ড, ম্যাপ ও টিপ্স সম্বলিত সাইনবোর্ড।
চোখে পড়বে এরকম সুউচ্চ গাছ।
কত রকমের গাছ যে রয়েছে এই বনে। গাছ চেনার নেশা আছে যাদের তাদের জন্য এ এক চমৎকার জায়গা হতে পারে।
এখানে রয়েছে বাঁশ, পাহাড়ী বেত সহ কত প্রজাতির যে গাছ পালা!
গাছে ঝুলে আছে কত রকমের লতাজাতীয় উদ্ভিদ।
সুউচ্চ গাছ বেয়েও উঠে গেছে এরা
কত রকমের পরগাছা যে আছে বড় বড় গাছ গুলোর গায়ে জড়িয়ে!
অনেক ধরনের মাকড়া চোখে পড়ে বনের মধ্যে।
মাকড়সার জালে রোদ পড়লে কেমন চক চক করে।
মাটির গর্তের ভেতর ও মাকড়সা বাসা বানায়।
বনের মধ্যের স্মৃতি ধরে রাখতে কার না ইচ্ছে হয়
বনের মধ্য দিয়ে পাখির ডাক আর শিশির পড়ার টুপ টাপ শব্দ শুনতে শুনতে আমরা পৌঁছালাম খাশিয়া পল্লীতে। এটা ওদের বাড়িতে ওঠার একটা সিঁড়ি। আমরা ওদের ওখানে গিয়ে ওদের সাথে আলাপ করলাম।
পাহাড়ি গাছে পান চাষ খাসিয়াদের অন্যতম আয়ের উৎস।
খাসিয়া পল্লী থেকে বের হয়ে পেলাম রেলপথ। এর পাশে চোখে পড়ল ঝাউয়ের বন।
এভাবে হাত ধরে রেল পথের উপর দিয়ে পাহাড়ী জনপদের নারীরা বের হয় কাজের সন্ধানে।
সারা বন ঘুরে দেখলাম কয়েক জাতের নুতন পাখি। শুনলাম অনেক অচেনা পাখির কলতান, কালো কাঠ বিড়ালী। শেষমেস দেখা পেলাম বানরের। ছবি তুলতে গিয়ে দেখি ওমা, আমার ক্যামেরা লেন্স বের হয় না। জুম করতে গেলেই হ্যাং। ততক্ষণে বুঝতে পারলাম কুয়াশার কেরামতি। জুম ছাড়াই তুলে নিলাম বানর মামার ছবি।
আমরা প্রায় ২ঘন্টা ধরে বনের ভেতর দিয়ে হাঁটলাম। কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা, কি শিহরণ! এত অল্প পরিসরে বলা কোনভাবেই সম্ভব নয়। যখন বের হচ্ছি তখন দলে দলে আসছে পর্যটকরা। বুঝলাম দেরীতে আসলে নির্জন বনে ঘোরার মজাটাই পেতাম না। আর একটা বিষয় মনে হল, যে পরিমান দর্শক প্রতিদিন বনের ভেতর ঢোকে, যে পরিমান পথ দেখলাম বনের ভেতর তাতে ঐ সংরক্ষিত বনের প্রাণীরা কতটুকু নির্বিঘ্নে যে বসবাস করতে পারে কে জানে? পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে বলা হলেও বনের ভেতর অনেক জায়গায় চোখে পড়ল খাবারের প্যাকেট, পলিথিন ইত্যাদি। অমূল্য সম্পদ এই বনের জীব বৈচিত্র রক্ষা করতে হলে আরো সচেতনতামুলক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী বলে মনে হল আমার। বন থেকে বের হয়ে আমরা গাড়িতে চড়ে বসলাম। আমাদের গাড়ি ছাড়ল মাধব কুন্ডের উদ্দেশ্যে। মিজান ভাই বললেন দাদা গান ছেড়ে দেন....
(চলবে)
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া-২ (ঘুরে দেখলাম চা বাগান) (ছবি ব্লগ)
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া-১ (দেখলাম চা উৎপাদন প্রক্রিয়া)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০০৯ রাত ১:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


