somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

২০০৭ সালের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী ডরিস লেসিং

২১ শে অক্টোবর, ২০০৭ বিকাল ৩:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১১ অক্টোবর নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ঘোষণার পর অনেকে ভীষণ অবাক হয়েছেন। প্রথম প্রশ্ন, কে ডরিস লেসিং? কোথায় ছিলেন তিনি এতোদিন? কেন তার নাম বহুদিন নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের জন্য আলোচিত হচ্ছিল না? নোবেল কমিটির কাছে কি ডরিস লেসিং একজন বহিরাগত? এতো প্রশ্ন মাথায় নিয়ে লোকে ডরিস লেসিংয়ের খোজ নেয়া শুরু করেছিল। বলা বাহুল্য, বাঘা বাঘা ক্যান্ডিডেটদের নিয়ে জল্পনা-কল্পনা আপাতত এক বছরের জন্য স্থগিত। তাদের কথা তোলা থাকলো আগামী অক্টোবর পর্যন্ত। এখন ডরিস লেসিং প্রসঙ্গ বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে। অনেকেই বলছেন, না, যোগ্য ব্যক্তিটিকেই পুরস্কার দিল নোবেল কমিটি। পুরস্কারটি তার অনেক আগেই প্রাপ্য ছিল। ধীরে ধীরে জানা গেল এ মন্তব্যের তাৎপর্য। সাম্প্রতিক সাহিত্যিক বা সাহিত্য পাঠকদের কাছে লেসিং ততো পরিচিত মুখ না হলেও বিদগ্ধ ব্যক্তিদের কাছে তিনি মোটেও অপরিচিত নন। নোবেল কমিটির কাছে তো ননই। ইওরোপের প্রায় সব সাহিত্য পুরস্কার লেসিংয়ের ঘরে উঠেছে। কিন্তু সবচেয়ে আলোচিত পুরস্কারটি তার ভাগ্যে জোটেনি প্রায় ৪০ বছর ধরে শর্ট লিস্টে তার নাম আলোচিত হওয়ার পরও। বহু বছরের অপেক্ষার পর সবাই ধরে নিয়েছিলেন, লেসিং আর পাচ্ছেন না। ২০০৫-এ বৃটিশ নাট্যকার হ্যারল্ড পিন্টার পুরস্কার পাওয়ার পর কেউ কেউ মেনে নিয়েছিলেন যে, এবার বৃটিশ কোটা থেকে লেসিংয়ের নাম চিরতরে কাটা পড়লো। গার্ডিয়ান পত্রিকায় রবার্ট ম্যাকক্রাম লিখেছেন, কয়েক বছর আগে লেসিং সুইডেনে একটা সাহিত্যিক ডিনার পার্টিতে গিয়েছিলেন। সেখানে নোবেল কমিটির একজন কেউকেটা তার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলেছিলেন, আপনি কখনো নোবেল পাবেন না। কারণ আপনাকে আমরা পছন্দ করি না। তারপরও তিনি পুরস্কারটি পেলেন। ঘটনাটি ঘটলো ৮৮তম জন্মদিনের কয়েকদিন আগে। নোবেল কমিটি বললো তার মহাকাব্যিক নারী অভিজ্ঞতা, সংশয়বাদ, উত্তাপ, ভবিষ্যৎ দৃষ্টির কথা : যার মাধ্যমে তিনি বিভক্ত সভ্যতাকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। সত্যিকার অর্থে ডরিসকে কোনো একটা ধারায় ফেলাটা কঠিন। কোনো আদর্শ বা আদর্শবাদের ছাচে তাকে ব্যাখ্যাও করা যায় না। পোস্ট কলোনিয়ালিজম, কমিউনিজম, ফেমিনজিম, মিস্টিসিজম সহ বিভিন্ন ধারার কথা তার ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হলেও তিনি আসলে এর কোনো ধারাতেই পড়েন না। ফলে তাকে সংজ্ঞায়িত করা একটা কঠিন কাজই বটে। তার কাজের বৈচিত্র্য অনেক ব্যাপক। ডরিস লেসিংয়ের জন্ম ১৯১৯ সালের ২২ অক্টোবর। তৎকালীন পারস্য অর্থাৎ বর্তমানের ইরানের কেরমানশাহতে। তার বাবা ক্যাপ্টেন আলফ্রেড টেলর ও মা এমিলি মড টেলর দুজনই বৃটিশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণের এক পর্যায়ে তার বাবা ব্যাংকের কাজের সূত্রে ইরানে যান। সেখানেই লেসিংয়ের জন্ম হয়। পরে আফ্রিকার রডেশিয়াতে যান সপরিবারে। তৎকালীন রডেশিয়া বর্তমানে জিম্বাবুয়ে। সেখানে লেসিংয়ের শৈশব কাটে। ডরিসের কাজকে মুখ্যত তিনটি ধরনে ভাগ করা হয় : কমিউনিস্ট থিম, সাইকোলজিকাল থিম ও সুফি থিম। ১৯৪৯ সালে লেসিংয়ের প্রথম উপন্যাস দি গ্রাস ইজ সিংগিং প্রকাশিত হয়। ১৯৬২ সালে তার সবচেয়ে আলোচিত উপন্যাস দি গোল্ডেন নোটবুক প্রকাশিত হয়। নারীর অন্তর্গত অভিজ্ঞতা ও যৌন পরিচয় নিয়ে লেখা উপন্যাসটিকে একটি মাইলস্টোন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার অন্যান্য আলোচিত কাজ সিকাস্তা (১৯৭৯), দি মেকিং অফ দি রিপ্রেজেন্টেটিভ ফর দি প্লানেট
এইট (১৯৮২), দি গুড টেররিস্ট (১৯৮৫)।

# ডরিস লেসিংয়ের ইন্টারভিউ #

আপনি পারস্যে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এখন এটা ইরান। আপনার বাবা-মা কিভাবে সেখানে গেলেন?

আমার বাবা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। পরে তিনি ইংল্যান্ডের পক্ষে শক্তভাবে থাকতে পারেননি। তিনি একে ভীষণ সঙ্কীর্ণ অবস্থায় আবিষ্কার করেছিলেন। পরিখার মধ্যে সেনাদের ব্যাপক অনুভূতি হতো আর তারা একে আন্তরিকভাবে মেনে নিতে পারতেন না। ফলে তিনি তার চাকরিদাতা ব্যাংককে বললেন তাকে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেয়ার জন্য। তারা তাকে পারস্যে পাঠিয়ে দিলো। সেখানে আমাদের একটা বড় বাড়ি বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। ছিল বড় বড় ঘর আর খোলা জায়গা, সঙ্গে ঘোড়া। খুব উন্মুক্ত ও খুব সুন্দর। সম্প্রতি আমি জানতে পেরেছি, ওই শহরটি এখন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। সুন্দর সুন্দর ভবন নিয়ে তৈরি সুন্দর এক শহর হিসেবে এটা ছিল সময়ের একটা স্মারক। সবার দৃষ্টির আড়ালে, ভগ্নপ্রায়। এটা আমাদের কাছে কোনো বিষয় ছিল না।
তারপর তারা বাবাকে তেহরানে পাঠালো। খুবই কুশ্রী এক শহর। সেখানে গিয়ে আমার মা খুব খুশি হলেন। কারণ তিনি সেখানে কূটনৈতিক কর্মচারীদের সমাজভুক্ত হতে পারলেন। মা ওই সময়ের প্রতিটি সেকেন্ডের প্রশংসা করতেন। প্রত্যেক রাতে ডিনার পার্টি হতো। বাবা এগুলোকে ঘৃণা করতেন। তিনি আবার পুরনো নিয়ম-কানুনে ফিরে এসেছিলেন। তারপর ১৯২৪ সালে আমরা আবার ইংল্যান্ডে ফিরে এলাম। সেখানে তখন যাকে বলে এমপায়ার একজিবিশন চলছিল। এর ব্যাপক প্রভাবও পড়েছিল। দক্ষিণ রডেশিয়া থেকে তখন ভুট্টা, যব আর স্লোগান ভেসে আসতো, ‘পাচ বছরের মধ্যে তোমার ভবিষ্যৎ তৈরি করো।’ ফালতু ব্যাপার। আর আমার বাবা টিপিকাল রোমান্টিকের মতো লোটাকম্বল গুছিয়ে নিলেন।
যুদ্ধে বাবা পায়ে আঘাত পেয়েছিলেন। ফলে তিনি পাচ হাজার পাউন্ড পেনশন পেলেন। কৃষক হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এক অজানা দেশের উদ্দেশে রওয়ানা দিলেন। ছেলেবেলায় তিনি কলচেস্টারের কাছে ছিলেন। এটা তখন অনেক ছোট শহর ছিল। সেখানে তিনি প্রকৃতপক্ষে একজন কৃষকের ছেলে হিসেবে গ্রামীণ জীবন কাটিয়েছেন। এভাবেই তিনি নিজেকে আবার আফ্রিকার তৃণভূমিতে, রোডেশিয়ায় খুজে পেলেন। তখনকার জন্য তার গল্পটা খুব আলাদা রকমের ছিল না। এটা নিয়ে কখনো কখনো ভেবেছি। কিন্তু সিকাস্তা লেখার সময় আমি বিস্মিত হলাম। দেখলাম সেখানে বহু আহত চাকরিজীবী আছেন। তারা ইংল্যান্ড ও জার্মানি দুই পক্ষেরই। এদের সবাই আহত। কিন্তু তাদের সবাই ভাগ্যবান। কারণ তারা সঙ্গীদের মতো মারা যায়নি।

সম্ভবত একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে ভিয়েতনামে কর্মরত আমেরিকানরা দেশে ফেরার পর। তারা এখানকার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন বলে ভাবছে নিজেদের।

লোকে কিভাবে এ ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায় আর তৎক্ষণাৎ মানিয়ে নেয় তা আমি দেখি না। এটা খুব বেশি প্রশ্ন সাপেক্ষ।

সম্প্রতি গ্রান্টা ম্যাগাজিনে আপনার একটি স্মৃতিকথা প্রকাশিত হয়েছে। শিরোনাম থেকে বোঝা যায় এটি আপনার মাকে নিয়ে। কিছু ক্ষেত্রে মনে হয় এটি বরং আপনার বাবাকে নিয়েই বেশি আবর্তিত হয়েছে।

কিন্তু কেউ কি আলাদাভাবে মা-বাবার কথা লিখতে পারে? মার জীবন ছিল বাবার জীবনের প্রতি উৎসর্গ। এভাবেই ওরা বলতে পছন্দ করতো।

আপনার বাবার ভবিষ্যদ্বাণী, বৃহৎ পরিকল্পনা, অ্যাডভেঞ্চারগুলো বিস্ময়কর ছিল...

তিনি ছিলেন চোখে পড়ার মতো একজন লোক। সম্পূর্ণ অবাস্তব এক মানুষ। তিনি এ রকম হয়েছিলেন আংশিকভাবে যুদ্ধের কারণে। তিনি ছিলেন এক দিশাহীন মানুষ, প্রতিযোগিতায় টিকতে পারতেন না। মা-ই ছিলেন মূল সংগঠক। তিনি সবকিছু গুছিয়ে রাখতেন।

আমার মনে হয়েছে তিনি খুব প্রগতিশীল ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কে ভাবতেন।

তার ধারণা ছিল কোনো একটা জিনিস কোনো একটা সময়ের জন্য সত্য। এটা জানার জন্য পবিত্র সোনা বা অন্য কোনো ধাতুর দরকার হয়। এ জন্য তিনি সব সময় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। বলতে গেলে আমি আমার গল্প এলডেরাডোতে তার কথাই লিখেছি। আমরা একটা স্বর্ণময় দেশে বাস করতাম। চারদিকে ছিল ছোট ছোট সোনার খনি।

তার মানে এটা আজব কোনো ব্যাপার ছিল না।

মোটেও না। কৃষকরা গাড়িতে সব সময় শাবল বা খুন্তি রাখতেন। সব সময়ই তারা স্বর্ণময় কোনো পাথর নিয়ে বাড়িতে ফিরতেন।

বাচ্চা বয়সে আপনি কি গল্প বলার আবহের মধ্যে ছিলেন?

না। আফ্রিকানরা গল্প বলতো বটে। কিন্তু তাদের সঙ্গে মেলামেশার অনুমতি ছিল না আমাদের। ওইখানে থাকার সবচেয়ে খারাপ দিক ছিল এটা। আমার মনে হয়, শিশু হিসেবে আমার আমার দারুণ সব অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ তৈরি হতে পারতো। কিন্তু সেটা হয়নি, শুধু একটা সাদা বাচ্চা হওয়ার কারণে।
এখন আমি ইংল্যান্ডে এমন কিছু জায়গায় যাই যেগুলোকে বলা হয়, স্টোরি টেলার্স কলেজ। কয়েক বছর আগে একদল মানুষ গল্প বলাকে একটা শিল্প হিসেবে পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করছিল। ভালোই হচ্ছিল। কাজটা কঠিন ছিল। আমি ছিলাম শুধু পৃষ্ঠপোষক। লোকে মনে করে স্টোরি টেলিং হলো কৌতুক বলার মতো একটা ব্যাপার। এ ধারণায় পরিবর্তন আনার দরকার ছিল। যারা এ রকম মনে করতো তাদের নিরুৎসাহিত করতে হয়েছিল।
আরেক দল ভাবতো, স্টোরি টেলাররা হলো এক ধরনের তার্কিকের দল। সব সময়ই কিছু লোক থাকে যারা তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলতে চায়। এটা আপনার জানা। কিন্তু বিপুল সংখ্যক আসল গল্প বলিয়ে এর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। কেউ কেউ আফ্রিকা থেকে এসেছিল। কেউ কেউ পৃথিবীর অন্য জায়গাগুলো থেকে। বিশেষ করে সেই মানুষগুলো, যারা উত্তরাধিকার সূত্রে গল্প বলার ঐতিহ্যকে ধারণ করে। অথবা যারা এ ধারার পুনরুত্থান ঘটাতে চায়। ফলে উদ্যোগটা অব্যাহত আছে। এটা সজীব ও ভালো আছে। যখন লন্ডন বা অন্য কোথাও স্টোরি টেলিং সেশন হয় তখন ব্যাপক লোক সমাগম হয়। ভাবুন এর বদলে লোকগুলো কি করতো? হয় ড্রামা সিরিয়াল ডালাস বা অন্য কিছু দেখতো।

লন্ডনে ফিরে আসার ব্যাপারটা কেমন ছিল? জে জি ব্যালার্ডের কথা মনে পড়ছে আমার। তিনি প্রথমবার সাংহাই থেকে ফিরে খুব বদ্ধতা অনুভব করেছিলেন। তার মনে হয়েছিল সবকিছুই ছোট আর পশ্চাৎপদ।

হ্যা। আমি প্রচ- বদ্ধ, ম্লান আর স্যাতসেতে অনুভব করেছিলাম। সবকিছুই যেন মোড়ানো আর গৃহপালিত। আমি এখনো সে রকমই দেখি। আমার কাছে সুন্দর মনে হয় কিন্তু খুব বেশি সংগঠিত। আমি কল্পনা করতে পারি না, ইংল্যান্ডের এক ইঞ্চি জায়গাতেও অন্য রকম কিছু ঘটতে পারে। মনে হয় না কোথাও কোনো বন্য ঘাস থাকতে পারে।

আফ্রিকার মিথিকাল ল্যান্ডস্কেপে ফেরার জন্য আপনার মধ্যে কি তীব্র কোনো তাড়না বা পিছুটান কাজ করে?

ভালো কথা। আমি কিন্তু সেখানে থাকছি না। থাকছি কি? এটা অতীত হয়ে যেতে পারবে না। জিম্বাবুয়ের স্বাধীনতার দুই বছর পর অর্থাৎ বছর তিনেক আগে আমি সেখানে গিয়েছিলাম। তখন আমার কাছে স্পষ্ট হয়েছিল, আমি যদি সেখানে যাই তবে অতীতের এক ব্যক্তিতে পরিণত হবো। বর্তমানে আমার একমাত্র কাজ হতো শুধু একটা স্মারক হয়ে থাকা। আমার অবস্থা হলো অনেকটা ‘গ্রামের মেয়ে ভালো করেছে’ ধরনের। সাদা শাসনের সময় আমি ছিলাম খুব বেশি বাজে। আমার জন্য ভালো কথা কারো মুখে আসতো না। আপনার কোনো ধারণাই নেই আমি কি রকম খারাপ ছিলাম। কিন্তু এখন আমি ভালো আছি।

কালোদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই কি আপনি খারাপ ছিলেন?

আমি সাদাদের শাসনের বিরোধী ছিলাম। একটা বিশাল বর্ণ ব্যবধান ছিল। বর্ণ ব্যাবধান শব্দটাই এখন হারিয়ে গেছে। কালোদের সঙ্গে আমার একটাই সম্পর্ক ছিল যে রকম সম্পর্ক হতে পারে একমাত্র চাকরদের সঙ্গে। কালোদের সঙ্গে নির্ভরযোগ্য একটা সম্পর্ক তৈরি করা খুব কঠিন ছিল কারফিউর কারণে যাদের ৯টার আগেই ঘরে ফিরতে হবে অথবা যারা ভয়াবহ দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে। আপনি তো তার মধ্যে নেই।

প্রথম দিকের সময়গুলোতে আপনার মধ্যে কি লেখক হওয়ার কোনো আগ্রহ কাজ করতো? আপনি বলেছেন মায়ের চোখ এড়িয়ে এগুলো আপনি লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করতেন। তিনি কি এগুলো দেখতে চাইতেন খুব?

আমার মা ছিলেন হতাশ এক নারী। তার প্রচণ্ড শক্তি সামর্থ্য ছিল। এ ব্যাপারগুলো আমি ও আমার ভাই পেয়েছি। তিনি সব সময় চাইতেন আমরা কিছু একটা হই। দীর্ঘ সময় জুড়ে তিনি চেয়েছিলেন আমি যেন একজন মিউজিশিয়ান হই। কারণ তিনি নিজে একজন ভালো মিউজিশিয়ান ছিলেন। এটা হওয়ার জন্য যথেষ্ট প্রতিভা আমার ছিল না। কিন্তু প্রত্যেকেরই সঙ্গীতের শিক্ষা থাকা দরকার। তিনি সব সময় আমাদের তাড়া দিতেন। একভাবে এটা খুবই ভালো, কারণ বাচ্চাদের জন্য তাড়ার দরকার পড়ে। তারপর সে হয়তো নিজের জায়গাটা বেছে নেয়। ফলে নিজেকে তো রক্ষা করতে হবে। আমার মনে হয় প্রতিটি বাচ্চার নিজের কাজ খুজে নেয়ার রাস্তাটা বের করে নিতে হয়।
আমি জানতে চেয়েছিলাম আপনি ছোটবেলায় লেখক হওয়ার কথা ভেবেছিলেন কি না।
অন্য অনেক বিষয়ের মতো এটা। আমি হয়তো একজন ডাক্তার হতে পারতাম। আমি হয়তো ভালো কৃষক হতে পারতাম বা অন্য যে কোনো কিছু। আমি লেখক হলাম হতাশা থেকে। আমার মনে হয়, অনেক লেখকই এটা করে থাকেন।

আপনি বিভিন্ন ধারার উপন্যাস লিখেছেন। পাঠকরা কি প্রতারিত বোধ করে যখন তারা দেখে আপনি কোনো একটি ধারার মধ্যে খাপ খেয়ে যাচ্ছেন না? আমি সায়েন্স ফিকশনের ভক্তদের কথা ভাবি। এরা খুব সঙ্কীর্ণমনা ও ক্ষুব্ধ। তাদের ছোট কাবে তাদেরই প্রবেশাধিকার আছে যারা সায়েন্স ফিকশন লেখেন। অন্য কারো নেই।

অবশ্যই এটা সঙ্কীর্ণ মনস্কতার ব্যাপার। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের কমিউনিটির সদস্যরা এখন সেই লোকগুলোর দলভুক্ত যারা কম কম্পার্টমেন্টালাইজেশনে বিশ্বাস করে। ব্রিংটনে ওয়ার্ল্ড সায়েন্স ফিকশন কনভেনশনে আমাকে দাওয়াত দেয়া হয়েছিল বিশেষ অতিথি হিসেবে। তারা দুজন সভিয়েট সায়েন্স ফিকশন লেখককেও দাওয়াত দিয়েছিল। অতীতে তারা সমস্যায় ছিল। এখন তারা বাবে গ্লাসনস্ত লেখকদের বেরিয়ে আসার সুযোগ দেবে। আমার মনে কখনোই এ প্রশ্ন জাগেনি যে, আমি সায়েন্স ফিকশন বা অন্য কিছু লিখছি। যখন আমাকে সায়েন্স ফিকশন লেখক হিসেবে সমালোচনা করা হয় তখন বুঝতে পারি আমাকে একটা পবিত্র জায়গা থেকে বিচার করা হচ্ছে। এ কথা সত্য, আমি কোনো সায়েন্স ফিকশন লিখি না। আমি কিছুদিন আগে স্টানিস্লাভ লেমের সোলারিস বইটি পড়েছি। এটা সত্যিকার অর্থে বৈজ্ঞানিক আইডিয়ায় ভরা একটা কাসিক সায়েন্স ফিকশন।
আমার কাছে এর অর্ধেকটা অর্থহীন কারণ সেগুলোর কিছুই আমি বুঝিনি। কিন্তু যেটুকু বুঝেছি তা অসাধারণ। আমি বহু তরুণের সান্নিধ্যে এসেছি, এ দলে অনেক বয়স্কও আছেন যারা আমাকে বলেছেন বাস্তবতার জন্য তাদের হাতে যথেষ্ট সময় নেই। আমি তাদের বলেছি, আপনারা কি হারাচ্ছেন সেটা কি ভেবে দেখেছেন? এটা স্রেফ একটা প্রেজুডিস। কিন্তু তারা এ সম্পর্কে কিছু জানতে চায় না। আমি সব সময়ই মধ্যবয়সী এমন সব লোকের সঙ্গে কথা বলেছি যারা আমাকে বলেছেন, আমি খুবই দুঃখিত। আমি আপনার নন রিয়ালিস্টিক লেখাগুলো পড়তে পারি না। আমি ভাবি, এটা একটা করুণা। এ কারণেই কনভেনশনে সম্মানিত অতিথি হয়ে আমি খুশি হয়েছি। এটা ছিল একটা ভিন্ন ধাচের ঘটনা।

আমি আপনার সিকাস্তায় সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেছি এর আধ্যাত্মিক ব্যাপারগুলো। এগুলো সায়েন্স ফিকশনের ভেতর সঙ্কেত, প্রতীক আকারে গুপ্ত অবস্থায় থাকে। পরে একে সামনে নিয়ে আসা হয়।

আমি ওটা লেখার সময় সায়েন্স ফিকশনের কথা কোনোভাবেই ভাবিনি। আমি জানি না, এটা কোনো বইয়ের শুরুর লাইন হয় কি না, যেমন ধরুন, ১৮৮৩, তমস্কের এক অপরাহ্ণে, বিকাল ৩টায়...। এটা হয়তো কসমিক দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীত কিন্তু এটা আমার পছন্দের একটা সূচনা।

আপনি বহু সুফি গল্প ও প্রবন্ধ সংগ্রহের ভূমিকা লিখেছেন। সুফিজমের সঙ্গে আপনার সংযোগটা কিভাবে তৈরি হলো?

আপনি জানেন, আমি এ বিষয়ে কথা বলতে অপছন্দ করি। কারণ যা-ই বলি তা-ই কিশে ও আত্মপ্রচারমূলক হয়ে যায়। আমি যা কিছু বলতে চাই তা হলো, এ ধারাগুলোর মধ্যে আমি একটা ঘরানার সন্ধানে ছিলাম। সবাই মানে যে, একজন শিক্ষকের দরকার হয়। আমি একজনকে খুজছিলাম। কিন্তু কাউকেই পছন্দ করতে পারলাম না। কারণ সব গুরুই কোনো না কোনো ধরনের মধ্যে পড়েন। তখন আমি শাহ নামের লোকটির কথা শুনলাম। তিনি একজন সুফি, তিনি সত্যিকার অর্থে আমাকে মুগ্ধ করলেন। ফলে ষাটের দশকের শুরু থেকে আমি তার সঙ্গে যুক্ত হলাম।
এর সবকিছুকে অল্প কথায় বলা মুশকিল। কারণ এটা হলো সেই অভিজ্ঞতা যা আপনি অর্জন করেছেন। আমি এ বিষয়ে একটা ব্যাপার খেয়াল করতে
২৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

করোনা নিয়ে আমাদের আবেগি বাঙ্গালি মুসলমান

লিখেছেন মোঃ সাকিবুল ইসলাম, ৩১ শে মার্চ, ২০২০ বিকাল ৪:৩৭

আমদের দেশের আবেগি মুসলমান গুলো খুবই বুদ্ধিমান। সারাজীবন ধর্ম করম করবে না কিন্তু মসজিদে গেলে যে করোনা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকবে এই খবর বললে, বা যুক্তি দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

‘ব্রোকেন অ্যারো’ – আমেরিকা যখন পারমাণবিক বোমা হারিয়েছিল

লিখেছেন মোটা ফ্রেমের চশমা, ৩১ শে মার্চ, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:১৭


১৯৫০ সালে একটা আমেরিকান বি-৩৬ বোম্বার প্লেন প্রশিক্ষণ চলাকালীন কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় বিধ্বস্ত হয়। সেসময় বিমানটা একটা মার্ক ফোর পারমাণবিক বোমা বহন করছিল। বিধ্বংসী ক্ষমতার কথা বললে এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

করোনা ভাইরাসের অশুভ ঠেকাতে কেন মঙ্গল শোভাযাত্রা নয়?

লিখেছেন রিদওয়ান হাসান, ৩১ শে মার্চ, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:৫২

বাংলাদেশে প্রতিবছর ‘বাংলা নববর্ষ’ বা ‘পহেলা বৈশাখ’ নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে পালিত হয়, যার মধ্যে বর্তমানে উল্লেখযোগ্য একটি হচ্ছে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। এই মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রতি বছর বাংলা নববর্ষের প্রথম... ...বাকিটুকু পড়ুন

ওমর ইশরাক

লিখেছেন মোহাম্মদ আলী আকন্দ, ৩১ শে মার্চ, ২০২০ রাত ১০:১০

ওমর ইশরাক
এই মানুষটাকে চিনে রাখুন।



কোন বাংলাদেশিকে যদি প্রশ্ন করা হয়, গুগলের সি ই ও কে? সবাই এক কথায় বলে দিবে ইন্ডিয়ার অমুক।
কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয় মেডট্রনিক (Medtronic)... ...বাকিটুকু পড়ুন

মৃত্যু ভীতিকে জয় করুন, এক অপার আনন্দের এক সন্ধান পাবেন

লিখেছেন শের শায়রী, ৩১ শে মার্চ, ২০২০ রাত ১১:০৯



মৃত্যুকে নিয়ে কেন মানুষ এত ভয় পায়? এই ব্যাপারটা আমার মাথায় কখনো বুঝে আসে না। তবে যাদের অঢেল টাকা পয়সা আছে জীবনের বর্তমান সুখকে উপভোগ করতে পারছে তারাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×