কয়েক দিন আগে আবদুল্লাহ আবু সাইদ একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন – হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙ্গালী ১৯৭১ এর পরেই নিজেদেরকে নিজেরা শাসন করছে। একথা যেমন সত্য তেমনি এটাও সত্য যে এর মুলে রয়েছে হাজার বছর ধরে এদেশের মাটিতে বিদেশী সৈন্যদের আনাগোনা। আর্য সৈন্য দিয়ে শুরু তারপর পাঠান, মোঘল, ইংরেজ, পাকিস্তানি এবং সর্বশেষ ভারতীয় সৈন্যরা এদেশের পবিত্র মাটিকে প্রকম্পিত করেছে। ১৯৭২ এর ১৯ মার্চ এই সুদীর্ঘ গ্লানিময় ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটে বাংলাদেশে থেকে সর্বশেষ ভারতীয় সৈন্যর প্রস্থানের মাধ্যমে। যদিও আমরা ছোটখাটো অনেক দলীয় দিবস নিয়ে অনেক মাতামাতি করি কিন্তু মহা-গুরুত্বপূর্ণ এই দিনটি কিভাবে যেন আমাদের অগোচরে চলে গিয়েছে। আমদের প্রকৃত সার্বভৌমত্ব আর স্বশাসন শুরুর এই দিনটি জাতির চেতনায় তুলে আনাই আমাদের লক্ষ্য, সাথে স্মরন করা হাজার বছরের সকল সংগ্রামী ও শহীদের যারা বাংলার মাটিতে বিদেশী শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।
19 March 1972, বাংলাদেশর রাজনৈতিক নেতৃত্ব অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল সর্বশেষ ভারতীয় সৈন্যের বিদায়ের জন্য। যদিও ৭১ সালে ভারতীয় সৈন্যদের আগমন হয়েছিল বন্ধুত্বের আবরণে আমদের সাহায্যকারী হিসেবে, কিন্তু ইতিহাস বলে বিদেশি সৈন্য বেশী দিন বন্ধু থাকে না তারা পরিণত হয় দখলদার বাহিনীতে। একটা নিকট ইতিহাসের উদাহরণ হচ্ছে ইরাক, আমেরিকান সৈন্যরা সেখানে নাকি প্রবেশ করেছিল সে দেশের জনগণকে স্বৈরশাসকের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য। পরবর্তী কাহিনী আমরা কম বেশী সবাই জানি। লক্ষ লক্ষ জীবনের বিনিময়ে শেষ পর্যন্ত ইরাকিরা দখলদার বাহিনীকে বিতাড়িত করতে সক্ষম হয়েছে, কিন্তু তার জন্য দিতে হয়েছে চরম মূল্য। যাই হোক আমাদের প্রসঙ্গে আসি, আমরা কিভাবে এই কঠিন কাজটা সম্পন্ন করেছিলাম এবং ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলাম সেটা পুনর্মূল্যায়ন এখন সময়ের দাবি। আমার হিসাবে ১৬ই ডিসেম্বরের পরে বাংলাদেশর রাজনৈতিক ইতিহাসে এর থেকে কোন গৌরবজনক দিন নাই। হাজার বছরের ইতিহাসে বিবেচনায় আনলে এর গুরুত্ব অপরিসীম। এদিনেই আমরা প্রথম সব ধরনের দখলদারি থেকে মুক্ত হই। গত চারদশক ধরে যদিও রাজনৈতিক ভাবে আমরা অনেক উত্থান, পতন আর ট্রাজেডির সম্মুখীন হয়েছি, কিন্তু দখল মুক্ত বাংলাদেশের ঐতিহ্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছি। এটা আমাদের মতো অসামরিক শান্তিপ্রিয় জাতির জন্য এক সত্যিকারের অর্জন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম ও তাদের নেতৃত্ব যদি বাংলাদেশকে ভারতীয় সৈন্যমুক্ত করতে না পারতেন তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাস সম্পূর্ণ অন্যরকম হত। সম্ভবত সেটা হত কাশ্মীর অথবা সিকিমের মতো।
এ সম্পর্কে web এ তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ পূর্ণ বিবরণী নাই, তারপরেও Wikipedia Bangladesh Armed force এর বিবরণীতে একটা উত্তেজনার আভাস সুস্পষ্ট - “ Independent Bangladesh remained under Indian army occupation and total control for another three months after the war, with an ICS and a Indian army official in every official entity of the Bangladesh government. Quickly realising this as a critical situation, Sheikh Mujibur Rahman made a unilateral public demand to Indira Gandhi regarding the absolute, unconditional, and unequivocal withdrawal of all Indian officials and forces from Bangladesh. U.S. President Nixon also made clear to the Indians that they must leave Bangladesh. India withdrew its personnel within 2 days 17 to 19 March 1972.” -
Click This Link
কেন সেদিন ভারতীয় সৈন্য এদেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিল তা নিয়ে ব্যাপক গবেষণার দরকার আছে। তবুও আমি এখানে একটি ঐতিহাসিক কার্যকরণের(Historical Reasoning) প্রয়াস চালাব। নিকট ভবিষ্যতের অসফল বিদেশি দখলদারিত্বের ইতিহাস যেমন ভিয়েতনাম, ইরাক, আফগানিস্তান ইত্যাদি ; আবার অন্যদিকে সফল দখলদারিত্বের উদাহরণ যেমন চেচেনিয়া,কাশ্মীর, সিকিম ইত্যাদি একই সাথে পর্যালোচনা করলে আমরা কিছুটা স্বচ্ছ ধারনা পেতে পারি।
অসফল দখলদারিত্বের পিছনে নিম্নোক্ত কারণ গুলো কম বেশি সবার ক্ষেত্রই বিদ্যমান –
১. দেশের জনগণের উল্লেখযোগ্য অংশ সামরিক প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। যেমন ইরাকের একটা বিশাল সেনাবাহিনী ছিল যারা সম্মুখযুদ্ধে আমেরিকার কাছে পরাজিত হলেও নি:শেষিত হয়নি, বরং সাধারণ জনগণ আর প্রতিবেশী দেশের আরব যোদ্ধাদের নিয়ে ভয়ংকর insurgent এ পরিণত হয়েছিল। মূলত তাদের প্রতিরোধের মুখেই আমেরিকার দীর্ঘ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হয়নি এবং ইরাক থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে বিদায় নিয়েছে।
২. জনগণের মধ্যে প্রবল রাজনৈতিক চেতনার উম্নেষ এবং বিদেশি দখলদারিত্বের প্রতি চরম বিতৃষ্ণা। যা মূলত শক্তিশালী ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি রাজনৈতিক চেতনার জন্মদেয়, সুতরাং যোদ্ধা সরবরাহের পাইপ লাইন কখন বন্ধ হয় না।
৩. যুদ্ধটাকে অতিরিক্ত খরচ সাপেক্ষে(Both financial and human cost) পরিণত করা, যার পিছনে আগের দুটি কারণই মূল ভূমিকা রাখে। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী এবং শক্তিশালী দেশ আমেরিকার পক্ষেও ইরাকে সেই খরচ বহন করা সম্ভব হয় নাই।
সফল বৈদেশিক দখলদারিত্বের পিছনের কারণ গুলো ঠিক উপরের কারণ গুলোর উল্টো-
১. সামরিক ভাবে দুর্বল মানবগোষ্ঠী। কাশ্মীর এবং সিকিমের জনগণের তেমন কোন সামরিক অভিজ্ঞতাই ছিল না। সুতরাং সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের তেমন কোন প্রচেষ্টাই হয়নি। চেচেন জাতি যোদ্ধা হলেও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সুতরাং সামরিক ভাবে সক্ষম হওয়া অসম্ভব, তারপরও তাদের প্রতিরোধ উল্লেখযোগ্য।
২. দেশর জনগণের মধ্যে অস্বচ্ছ ও দুর্বল রাজনৈতিক চেতনা। দেশ যখন দখল হচ্ছে তখন দেশের মানুষের কোন প্রতিক্রিয়াই হয় না। উদাহরণ আমরা নিজেরাই, ইংরেজরা(বিদেশি) যখন নবাব সিরাজদৌলাকে(বিদেশি!) বন্দি করে নিয়ে যাচ্ছিল তখন সমবেত কৃষকরাও যদি একটা করে বাঁশ নিয়েও নবাবের জন্য এগিয়ে যেত তাহলে বাংলা তথা ভারতের পরবর্তী দুইশত বছর ইংরেজের গোলামি করতে হয় না।
৩. অসামরিক জনগোষ্ঠী আর দুর্বল রাজনৈতিক চেতনা দখলদারিত্বকে খুবি সস্তা এবং আকর্ষণীয় করে তোলে যেকোনো বিদেশি শক্তির কাছে। আর এখানেই বর্তমান বাংলাদেশের ভয়।
এখন আসুন ৭২ এর প্রেক্ষাপট মিলিয়ে দেখি –
১. হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙ্গালী প্রথমবারের মত একটা নিজস্বজাত সামরিক শক্তির অধিকারী হয়েছিল, সে শক্তির নাম মুক্তিবাহিনী। সামরিক শিক্ষার সাথে প্রত্যক্ষ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা একটা মানুষকে যেমন পরিবর্তন করে তেমন আর কোন কিছুই করতে পারে না। একদল অস্ত্রহীন কৃষক অথবা ছাত্র যখন অস্ত্র চালানো শিখে, যখন সে সম্মুখ যুদ্ধে শত্রুকে বাহিনীকে পরাজিত করে, তারপরে তার যে পরিবর্তন হয় সেটা স্থায়ী। একদল দুর্বল ভীরু কাপতে থাকা মানুষ থেকে একদল শক্তিশালী দুর্ধর্ষ যোদ্ধার উদ্ভব আগুনে-পোড়া ফিনিক্স পাখির পুনর্জন্মের গল্পের থেকেও হাজার গুন অনুপ্রেরণাদায়ী।
২. ৭১/৭২ সালে সমগ্র বাঙালীজাতি রাজনৈতিক চেতনার চরমে অবস্থান করছিল। নিজের দেশকে স্বাধীন করা আর সেদেশের মাটিতে প্রথমবার গর্বভরে পদচারণার অনুভূতি আমরা শুধু কল্পনাই করতে পারি।
৩. ভারতীয় সামরিক এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের বুদ্ধির কোনদিন অভাব ছিল বলে শোনা যায়নি। এটা তাদের কাছে স্পষ্ট ছিল যে সক্রিয় মুক্তিবাহিনী এবং তাদের সমর্থনকারী এদেশের জনগণ কখনও কোন দখলদারি বাহিনীকে দীর্ঘদিন সহ্য করবে না, তা সে যতই বন্ধুত্বের দাবিদার হোক। আমরা জানি বিভিন্ন জায়গায় ভারতীয় বাহিনী মুক্তিবাহিনী চ্যালেজ্ঞের(challenge) সম্মুখীন হচ্ছিল। মেজর জলিলের বিখ্যাত ঘটনা কম বেশী সবাই জানে। ভারতীয় বাহিনীর দিন গোনা শুরু হয়েছিল, কারণ একটা দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করার ক্ষমতা যেমন হানাদার পাকিস্তানের ছিল না তেমন তদানীন্তন ভারতেরও ছিল না। সর্বশেষ বঙ্গবন্ধু এবং তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব অসাধারণ বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছিলেন, যা আজকালকার রাজনৈতিক নেতৃত্বর মধ্যে দারুণ অভাব।
তো – এই হল একটা মোটামুটি বিবরণ। এখন প্রথম কাজ হচ্ছে এই দিনটাকে ধুলোময়লা থেকে উদ্ধার করা। বাঙ্গালী জাতির এই কঠিন সময়ে এই দিনটি সামরিক এবং রাজনৈতিক চেতনা বিকাশে অপরিসীম গুরুত্বের দাবি রাখে। ১৯৭১ সালের ১৬ –ই ডিসেম্বরে ভারতীয় এবং পাকিস্তানি বাহিনীর যৌথ ষড়যন্ত্রে পাকিস্তানি বাহিনী আমাদের প্রধান সেনাপ্রধানের কাছে আত্মসমর্পণ না করায় যে ঐতিহাসিক প্রহসনের জন্ম হয়েছে, যার জন্য আজও আমদের শুনতে হয় ৭১ নাকি স্রেফ একটা ভারত পাকিস্তানের যুদ্ধ, মুক্তিবাহিনীর ভূমিকা নাকি নগণ্য, ভারতই নাকি আমদের স্বাধীন করে দিয়েছে। 19 March 1972, প্রমাণ করেছিল বাংলার মাটিতে তখন মুক্তিবাহিনীর উপর কোন শক্তি ছিল না। এদিনেই বাঙ্গালী জাতির পূর্ণ জন্ম(complete birth) হয়।
১৯ মার্চ ২০১২-এ এই দিনের ৪ দশক পূর্তি হবে। আসুন আমরা গর্ব এবং ব্যাপক উদ্দীপনার সহিত এই দিনটা পালন করি। আমাদের সার্বভৌমত্ব চিরজীবী হোক।
নোট: এই দিনটির একাটা স্বতন্ত্র নাম দরকার। এটা খুবই তাড়াতাড়ি এবং জরুরি ভিত্তিতে করা দরকার। নিচে কিছু নাম দেওয়া হল (আপনারাও প্রাসঙ্গিক নাম প্রস্তাব করুন) -
১. সার্বভৌমত্ব দিবস (sovereignty day )
২. স্বশাসন দিবস (self ruling day )
৩. গ্লানি মুক্তি দিবস (যদিও এই নামটা আমার পছন্দ হয়নি তবুও এর মধ্যে একটা সত্যতা আছে)
৪. ভারত/ভাদা খেদাও দিবস
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১২ সকাল ১০:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



