
এখন যখন তুমি পৃথিবী ঘোরো,তোমার কি ধুলো ওড়া দেখে
আমাদের পথযাত্রার কথা মনে হয়,অরু?
জবাই বিলের নতুন সাঁকোটা যখন হব হব করছিল,তুমি আর আমি অনেকের চোখ
এড়িয়ে জল দেখতে গিয়েছিলাম।সে কি ধুলোর রাজ্য!
আমরা ছিলাম নির্বিকার অথবা শত অপ্রয়োজনীয় কথায় ব্যস্ত,জলের মধ্যে
মাথা উঁচু একটা গাছ,কত কি নামে তাকে ডেকেছি! হিজল অথবা তমাল
যদি হয় গাছটির সত্যিকারের নাম তাতে কিই বা যায় আসে!
আমাদের সেই বিকেলে গাছটি কৃষ্ণের সখার মত।
মাঝে মাঝে মাছরাঙা আর বকগুলোকে ঢিল ছুঁড়ে তুমি উড়িয়ে দিচ্ছিলে,আমি
তো জানি,সে তোমার খিল খিল বন্যায় ভেসে যাবার খেলা...।
একটাই সূর্য সেদিন------
হয়ত প্রতিদিনের মতই,জল লাল করে ডুবে ডুবে যাচ্ছিল।কি জানি!
অমন করে কে দেখেছে আগে!নসিমনের পাড়া মাতানো নাক ডাকার শব্দে
ধুলোগুলো হুড়মুড়িয়ে আমাদের গায়ে এসে পড়েছে,আমরা অযথায় হেসেছি-
গাছ দেখে
পাখি দেখে
জল দেখে...
তারপর এক বিকেলের মত রোজ বিকেলেই জলে সূর্য ডোবা দেখতে
আমাদের কোনো ক্লান্তি ছিলনা।
একদিন হঠাৎ বললে জল পেরিয়ে গোঁসাই গ্রামে নিয়ে যাবে।নৌকায় চড়ে
যখন পা নামিয়ে দিলাম অথৈ জলে,কুমিরে পা নিয়ে যাবে বলে
কি ভয় টায় না দেখালে!
অরু,তুমি যা বলতে আমি এমন করে বিশ্বাস করতাম....
কি যে পাগল ছিলাম আমি!
সেই প্রথম আমার বাবুই পাখির বাসা দেখা হল,সারা গ্রাম জুড়ে প্রতিটা
তালের গাছে এত অসংখ্য শিল্প কুটির,আমি গুনতে গুনতে হয়রান।যেন এ কোন অন্য
রাজ্য,এ কোনো অন্য পৃথিবী!সন্ধ্যে হয়ে আসছিল,
আমার আপত্তি উপেক্ষা করে তুমি নৌকায় এসে বসলে,ইন্জিন
ফটাফট শব্দ তুলে জলের বুকের সব নিস্তব্ধতা ভেঙে
আমাকে নিয়ে ফিরে এল।
কেউ জানেনা,বুকের মধ্যে আমি সেই বাবুইপাখির গ্রাম টাকেও লুকিয়ে এনেছি।
অরু,আমি তোমাকেও সেখানেই রেখেছি।
তখন তোমার নাকের নিচে কচি গোফের রেখা,
তখন তোমার হাত ধরাটাও ভীষণ রকম অপটু,
তখন তোমার চিকন দেহে পুরুষালী চিহ্ন ছিলনা,
তবু তুমিই যুবরাজ-
অরু,তুমিই আমার দেখা প্রথম বীরপুরুষ!টিকটিকি আর তেলাপোকা ভীষণ ভয়
পেতাম বলে কি অবলীলায় তাদের মেরে ফেলতে তুমি,
আমি অবাক হয়ে ভাবতাম,এমনটাতো আগে দেখিনি,আমার জন্য কেউ করেনি এমন!
আর সেই যে সেবার...
তোমার মনে আছে অরু? কবুতরের হাঁড়ীটা এক দুষ্টু বালকের গুলতিতে ভেঙে গেলে
তুমি কি মমতায় ভালবেসে ছোট বাচ্চা দুটির পায়ে তেল-হলুদ লাগাচ্ছিলে!
তোমার উপর দিন দিন নির্ভরতা বাড়ছিলই আমার,সেদিন মুগ্ধতা নিয়ে
তোমাকেই দেখছিলাম।
তারপর,সরিষার ক্ষেত পেরিয়ে একবার যখন ঘুড়ি ওড়াতে ওড়াতে আমরা
মরা পুকুরটার কাছে গেলাম,তখন সন্ধ্যাটা কেমন গুম মেরে ছিল।
বাবলার গাছটার পাশেই মরা পোড়ানো হত,তারপর সেই পুকুরেই লোকজন
হাতমুখ ধুয়ে বাড়ি ফিরতো।তুমি ছিমড়ি পোড়ানোর ছাই দেখিয়ে
আমাকে বললে,' এই দেখো কদিন আগেই হরিদাশ কে পোড়ানো হয়েছে।'
আমি সে রাতেই জ্বরে পড়লাম।সারারাত কি ভয়ঙ্কর দু:স্বপ্নে কাটলো আমার।
যেন তোমায় জোর করে নিয়ে যাচ্ছে কেউ বাবলার তলে,
তারপর পুড়িয়ে ফেলছে তোমার শরীর,তুমিও তেমনি ছাই
হয়ে গেছো নিমেষেই।
সে কি ভয়াবহ রাত,তুমি হারানোর ভয় আমার এতটাই!
অরু,তোমার জন্য চোখের জল কখোনো কমবেনা আমার....
যেদিন কলেজ মাঠে শিশু গাছটার পাশে বললে,ক' দিনের মধ্যেই তোমরা চলে
যাচ্ছো,বাবা বদলী হয়েছে বলে-
আমি বুঝিনি।
সত্যি বলছি আমি বুঝিনি,বাবার বদলী হওয়া মানে---
তোমাকে হারিয়ে ফেলা,
ঝিমঝিম দুপুরগুলোয় নি:সঙ্গের মত তোমাকে ভাবা,
আর বিশেষ দিনে তুমি ছাড়াই জলের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা....।
যে তুমি আমার জলজ্যান্ত কবিতা ছিলে,সে তোমাকেই পঙক্তি বানিয়ে
হারানো বিজ্ঞপ্তি লেখা......
অরু তুমি হারিয়ে গেছো?
অরু তুমি হারিয়ে গেছো!!!
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ৮:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



