হিমি আমার বান্ধবী,খুব ছোটবেলা থেকেই ও এত লক্ষী আর সুন্দর ছিল যে,যে কেউ দেখলেই ওর গাল টিপে আদর করে দিত।মোটা সোটা গোল-গাল থাকায় ওকে খেলায় নিলেই বিপদ,বুড়িচুরিতে একদমই দৌড়াতে পারতনা,কিন্তু তার গানের গলা ছিল অসাধারন,অন্ত্যক্ষরা খেলতে বসে ওকে নিয়ে যে আমরা টানাটানি করতাম,তাতো ঠিক।
যে বছর রাজীবরা আমাদের পাড়ায় এলো,সে বছরই হিমির সে কি অসুখ!টাইফয়েড হয়ে প্রায় মরো মরো অবস্থা।স্কুল থেকে ফিরে আমরা কেউই আর মাঠের দিকে যেতামনা।কদিন আগেই যে মাঠ আমাদের হই-হুল্লোড়ে ভরে থাকত,তাও দিন দিন শূন্য হয়ে গেল।বিকেল হলেই আমাদের চেচামেচিতে বাড়ীর বড়রাও বেরিয়ে আসত।মুখোর বিকেল মনমরা ভাব নিয়ে দিন কাটাতে থাকলো।হিমির অতো সুন্দর মিষ্টি চেহারা,মুখ শুকিয়ে এতটুকু,কি মায়া যে লাগতো ! প্রায় সাতাশ দিন অমন রোগে ভুগে হঠাৎ একদিন মাছ দিয়ে পোলাও খেতে চাইলো।ধীরে ধীরে রুচি ফিরে আসছে ওর।ওই সময় একদিন হিমির সব চুল ফেলে দিল ওর মা,এত করুন চেহারার হিমিকে আমরা আগে কোনোদিন দেখিনি।আমরাতো তবু মেনেই নিয়েছিলাম,কিন্তু পাতলা পটকা রাজীবটা এমন দুষ্টু ছিল,যে হিমিকে দেখলেই ওর টাক মাথা নিয়ে খেপাতো।
আমরা রাজীকে যতই আড়ালে বোঝায়,হুমকি দেই,দেখ ভাল হবেনা কিন্তু’ ততই ও আরো বেশি করে ওসব কাজ করে।
ছোটবেলায় সব কিছুই কি দ্রুত আর সহজে ঘটে যায়।বড় অদ্ভুত ব্যাপার,রাজীব এত অল্পদিন হলো পাড়ায় এসেছে অথচ তাকেও আমরা তুই বলি,অবলীলায় ওর গেন্জীতে কালি ছুঁড়ে দেই।সব কিছুতেই ওর ছিল পাকামি,গোল্লাছুট,বদ্দন থেকে শুরু করে মানুষবুড়ী, আঁককষার খেলাতেও ওকে মাথা ঢুকাতেই হবে।নয়ত সব ভন্ডুল করে পালাবে।গায়ের হাড়-মাংস এক হয়ে লেগে থাকলে কি হবে,রাজীটার দম ছিল খুব;এত জোরে ছুটতে পারত!ও হ্যাঁ,কদিনের মধ্যেই ওর নাম ছোট হয়ে রাজী হয়ে যায়।
অল্প কদিনের ভেতর খুব ব্যাথিত হয়ে লক্ষ করলাম,যে রাজী সারাক্ষণ হিমিকে জ্বালাত,সে হিমিই এখন রাজীর ন্যাওটা।হিমির মাথার চুল আবার ঘাড় ছাড়িয়ে নেমেছে,শুকনো মুখে কোথা থেকে একঘর লাবন্য এসে জমা হয়েছে।কিন্তু রাজীটাতো সেই একই আছে,খালি কাজের কাজ যা হয়েছে,তা হল,গলা গেছে ভেঙে,কন্ঠে যে মিষ্টতা ছিল তা আর নাই।লজ্জায় সে এখন কথাও কম বলে।দুষ্টুমিটাও কমেছে,মেয়েদের খেলায় আর তেমন করে ঢুকতে আসেনা।
হিমিও দেখি রাজির কথা শুনলেই একটু একটু লজ্জা পায়।
বাক্যবাগীশ রাজীর এমন অপ্রত্যাশিত পরিবর্তনে আমরা একটু রুষ্টই হই।ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা,ভারত-পাকিস্তান নিয়ে ঝগড়া করার মানুষ তো সেই একটাই ছিল।হিমি এখন আগের চেয়েও সুন্দর গায়,
;আজি ঝর ঝর মুখরো বাদল দিনে.......’’
স্কুলের ফাংসানের দিনগুলোতে রাজীরই টেনশন বেশি হত,হলঘরের বাইরে অস্থির হয়ে ঘুরতো আর দাঁতে নখ কাটতো।এসব দেখে আমরা আড়ালে কত হেসেছি!
দিনগুলো কেমন রোদের পাখায় আর অন্ধকারের গাড়ীতে চড়ে পেরিয়ে গেল বহু পথ।
আমি এখন দেশের বাইরে থাকি।বহুদিন পর পর দেশে আসা হয়।কদিনের জন্য এবার দেশে এসে ভাগ্যক্রমে দেখা হয়ে গেল হিমির সাথে।কলেজ মোড়ের সরু গলিটায় দাড়িয়ে আমরা অতীত নিয়ে গল্প করলাম।হিমি আর আগের মত নেই।শরীরে মেদ জমেছে একটু,দুই সন্তানের মা বলেই হয়ত কথাবার্তায় একটু ভারিক্কি ভাব এসেছে।আগের মত আর জমলোনা কিছুতেই।রাজীর খবর জানতে চাইলাম।স্মিত হেসে জবাব দিল,চাকরীর প্রয়োজনে প্রায়ই দেশের বাইরে যেতে হয় রাজীকে।এখন কানাডায় আছে,ক’দিনের মধ্যেই দেশে আসবে।
সব প্রেমই বিরহে বাঁচে,এমনটাইতো শুনেছিলাম,তা না হলে আর গল্প কিসের!পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক উপাখ্যান তো সবই বিরহ কাব্যই।তবু মাঝে মাঝে এমন মিলন গাঁথাও লোকের সামনে এনে দেখাতে ইচ্ছে করে।রাজী আর হিমির মিলন হয়েছে।সুখে আছে ওরা।সুখ-সংসারের খাবার টেবিলে বসলে নিশ্চয়ই ওদের গল্প হয় বাদাম কটকটির শৈশব নিয়ে।অথবা সেই যে যেবার ঝুঁকে থাকা বাবলার গাছ পেরিয়ে হিমি পুকুরের জলে লাফ দিতে গেল,আর পুরোটা পেরুতে না পেরে গাছের মধ্য দিয়ে ছিঁড়ে খুঁড়ে জলে পড়লো বলে রাজীর বাসার বটি নিয়ে সেই গাছ কাটতে গেলো.......
হিমির কি আগের জন্মের কথা মনে আছে?কোন পূণ্যের বলে রাজীকে এমন কাছে পেল,আমার মাঝে মাঝেই খুব জানতে ইচ্ছে করে! অপাপবিদ্ধ আমিতো আজও অরুকে খুঁজছি........।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ৮:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



