জীবনের যে পাতা থেকে গল্পটা শুরু করব,সে পাতাটি ভরা নাকি খালি তা নিযে চিন্তা করা টা হযত একটু বোকামিই হয়ে যায়।কারন ঘটনা দিয়ে জীবনটা আগাগোড়া মোড়া বলেই এত সচল আর সব।
অরুর সাথে যেদিন প্রথম পরিচয় হল,দিনটা বেশ অন্যরকম।কিমবা হয়ত অরুর কারনেই দিনটা অন্যরকম আমার কাছে।শীতের শেষ,বসন্তের প্রথম দিন,একটু একটু ঘামে অসস্তি লাগছিল ঠিকই কিন্তু মন্দ না।গাড় খয়েরি রঙের কামিজ আর বাসন্তি স্ট্রাইপের ওড়না সালোয়ার পরেছিলাম সেদিন।বসন্ত তো প্রতি বছর ই আসে,একুশ বছর ধরেই আসছে,তবু এ বসন্ত এমন কি যে আমায় মনে রাখতেই হবে!
'ক্যাম্পাসে ছিল বসন্ত বরণ উৎসব প্রতি বছরের মতই।বান্ধবীরা সবাই মিলে সকালটায় শাড়ী পরেছিলাম বলে এখন সবার মধ্যেই ঢিলে ভাব এসে গেছে,সবার মুখেই ক্লান্তির ছাপ।বন্ধুরা যে যার সঙ্গী নিয়ে ঘুরছে,মাঝে মাঝেই মাঠের একপাশে গোল হয়ে বসে আমাদের গল্পের ঘোড়া ছুটছে।
আমরা যারা সঙ্গীহীন তারা একসাথে রয়েছি,বাদাম,ঝালমুড়ি,আমড়া মাখানো একের পর এক খাওয়া হচ্ছে।একপাশে কনসার্ট চলছে কিন্তু গান প্রায় কেউই শুনছেনা।সেবার ছিল খুব কম বাজেট,সব লোকাল শিল্পী বোঝাই করে এনেছে বলে কর্তৃপক্ষ আমাদের গালি থেকে একমুহূর্ত রেহাই পায়নি....
হঠাৎ রাজীবের সাথে নতুন একটা ছেলে,ছেলেটির চোখে মুখে বুদ্ধির ঝিলিক,ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন বলে সহজেই দৃষ্টি যায়।রাজীবটার এই বয়সেই টাক পড়ে যাচ্ছে বলে দু;খের শেষ নেই।প্রায়ই আমরা বিভিন্ন রকম টিপস দেই চুল পড়া রোধ কর্মকান্ড হিসেবে।কোনোটায় কাজে লাগেনা,উল্টো আরো বেড়ে যায় দেখে আপাতত স্থগিত আছে চুলচর্চা।আজ সারাদিন ওকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছিলনা,আর এখন নতুন পোলা নিয়া কইথ্যাকা আসতেসে আল্লায় জানে।রাগে তো গা জ্বলে যাচ্ছে সবার।
রাজীব কাছে আসতেই এক বন্ধু,''ঐশালা কোন চিপার মধ্যে ঢুকসিলি?তর ফোন অফ ছিল কেন?''বসন্তের শুভেচ্ছা জানানোর আগে আমরা সবাই একচোট নিলাম।ফোনে চার্জ ছিলনা এই অজুহাত তার বহু পুরোনো।
-''লাইফের চার্জ লইয়া টানাটানি আর এ তো মোবাইল!বাদ দে দোস্ত।এইটা আমার খালাত ভাই।আজ আসছে।নিজেরা নিজ দ্বায়িত্বে পরিচিত হইয়া ল।''
বলেই টাকলুটা আমার সদ্য কেনা নতুন সেট টা ছো মেরে নিয়ে নিল,আমি হৈ হৈ করতেই তার সাপ্টা জবাব,মিলাদ না পড়াইয়া তুই নতুন সেট চালাইবি তা তো হইবনা।কি আর করা !সবাইরে আইসক্রিম খাওয়ানোর ওয়াদা করে সেট পুনরুদ্ধার করলাম।ততক্ষনে অরু আমাদের সবার সাথে অনেক সহজ হয়ে গেছে।
সে দিনের বহুক্ষনের আড্ডার মধ্যমনি ছিল অরু।প্রথম দর্শনে প্রেমে পড়ার মত আমি নই,তবু তাই হয়ে গেল।তার কথা,হাসি,চিন্তার গভীরতা......
সব মিলিয়ে কেমন যেন!আমার পরিচিত ভুবন,আমার সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল।এমন না যে এই প্রথম আমি প্রেমে পড়ছি,এমনও না যে এ সকল বৈশিষ্ট সম্পন্ন
ছেলে অতি বিরল।কিন্তু সেদিন থেকে প্রতিদিন আমার মনে হতে লাগলো,আমি এমন কারোর অপেক্ষায় ছিলাম।আমি হয়ত অরুর অপেক্ষাতেই ছিলাম।
দিনটি অন্যরকম হয়ে গেল আমার কাছে,একুশ বছরের এত এত দিনের মধ্যে খুব বিশেষ একটি দিনের মর্যাদা পেয়ে গেল হঠাৎ করেই।আমি একা একাই ভাবি বসন্ত তবে এসেই গেল।
আমার জীবনের সেরা প্রাপ্তি অরু।তাকে ভাবতে আমার ভাল লাগে।খুব সাধারন অথচ এমন অসাধারন কেউ,তার জন্য আমার পড়াশোনা গোল্লায় গেল।আমি খেতে পারিনা,ঘুমুতে পারিনা,সারাক্ষন কেমন মরে যাই মরে যাই লাগে।এত কান্না আমার কোথায় ছিল কে জানে।গান শুনলে কান্না লাগে,বন্ধুদের আড্ডায় যে আমি এত উচ্ছল ছিলাম,সে আমিই বিষাদকন্যা নামে পরিচিত হয়ে গেলাম।
কাউকে বলতে পারিনা।এমন কি আমার এত কাছের সবচেয়ে ভাল বন্ধু আমার বেডমেট স্বর্নাকেও না।কি জানি,এত জড়তা তো আমার আগে ছিলনা।
অরু কমিউনিজম এ বিশ্বাসী।বিশ্ব মানবতার পক্ষে এমন করে কাউকে বলতে আমি আগে শুনিনি।আমি হাঁটি চলি বলি আর পরিবর্তিত হয়ে যায়।আমার বিলাসিতা কোথায় আত্নগোপন করে!আমি নিজেকে অরুর সামনে উপস্থাপন করব বলে আমূল নতুন হতে চাই।
আমার দিন রাত যে অরুকে ভেবে কাটে,অরু কি তার ছিটেফোটাও কল্পনা করতে পারে?আমার অসহ্য লাগে।আমি ছটফট করি,অথচ তার নাম্বার টা চাইলেই পায় তবু চাইতে পারিনা। একদিন বহু রিহার্সালের পর রাজীব কে বললাম অরুর নম্বরটা দেতো।আমার অপরাধীর মত মুখ দেখেই কি না জানিনা টাকলুটা বেঁকে বসল।কেন তার নম্বর দিয়ে কি হবে?পরপুরুষের সাথে কিসের কথা?হেন তেন হাবিঝাবি মেলা কথা।বহু কষ্টে কান্না দমন করছি,আমি এসবের কি জবাব দেব!
হঠাৎ করে ষড়যন্ত্রীর মত মুখটা আমার কানের কাছে এনে বলল,তুই শেষ।আমি চমকে মুখ তুলে তাকাতেই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কুচুক্রীর মুখ দেখলাম।''সবাইকে বলে দেব,তুই অরুর নম্বর চাইছিস''
কিন্তু সে বলেনি,কদিন পর এক বান্ধবীর নম্বর খুঁজতে গিয়ে কন্টাক্ট লিস্টে দেখি অরুর নম্বর,টাকলুটা কখন সেভ করে দিয়েছে।
ফোন হাতে নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকি,সাহস হয়না ফোন দেয়ার।কি বলব,কিভাবে বলব,সে কি ভাববে,এমনি সব ফালতু কারনে কথা বলা হয়না আমার।
এভাবেই মাসখানেক কেটে যায়।হঠাৎ বহু আকাঙ্খিত ফোনটি আসে।যদিও স্বপ্নে বহুদিন দেখেছি তার সাথে কথা বলছি,কিন্তু সে ফোন দেবে কখনোই ভাবিনি।আমি চূড়ান্ত রকমের থতমত খেয়ে ফোন রিসিভ করি,তার মুহূর্তের কথা আমার সব জড়তা কাটিয়ে দেয়।পরে তার কাছেই শুনলাম আমাদের টাকলু সাহেব তাকে আমার নম্বর দিয়ে বলেছেন আমি নাকি কথা বলতে চেয়েছি,খুব জরুরী।অরু আমার কাছে জরুরী কথাটা কি জানতে চাই।
আমি এই সেই কথা বলে পাশ কাটাই।তার আদর্শের কথা শুনি,মুগ্ধ হই।এখন আমাদের প্রায় কথা হয়,রাজ্যের সব কথা,দেশের বর্তমান অবস্থা,সাম্প্রতিক ইস্যু,মানবতাবাদ......
আমার উন্নতি বলতে যা হয়েছে তা হল আমি এখন খুব মনোযোগ দিয়ে খবরের কাগজ পড়ি।কিন্তু আসল কথাটা বলা হয়না কিছুতেই।না হোক,এখন অরু হাজার কথা বলে আর আমি মনে মনে একটাই কথা বলি,পৃথিবীর সব মানুষকে নিযে তার চিন্তা,আর আমার চিন্তা ভাবনা পৃথিবীর একটা মানুষকে ঘিরেই,একটা মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।আমি কি কখনো বলতে পারব,''অরু তোমাকে ভালবাসি!''
আমার কি কখনো বলা হবে......!?!
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ৮:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



