somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কুর'আন কিভাবে পড়বো ও বুঝবো - ২

১৪ ই জানুয়ারি, ২০১১ রাত ১০:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

[এই পর্বের আগের লেখাটা রয়েছে এখানে: Click This Link ]


..............পূর্বে প্রকাশিত লেখার ধারাবাহিকতায়:

আল্লাহ্ সুবহানাহুওয়া তা‘আলা পবিত্র কুর’আনে বলেছেন:

لَوْ أَنْزَلْنَا هَذَا الْقُرْآَنَ عَلَى جَبَلٍ لَرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُتَصَدِّعًا مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ وَتِلْكَ الْأَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ
“আমরা যদি একটা পাহাড়ের উপর এই কুর’আন নাযিল করতাম, তবে অবশ্যই তুমি সেটাকে বিনয়াবনত দেখতে এবং সেটাকে আল্লাহর ভয়ে (টুকরো টুকরো হয়ে) ভেঙ্গে পড়তে দেখতে। আমরা মানুষের কাছে এধরনের উপমা উপস্থাপন করি, যাতে তারা অনুধাবন করতে পারে।”
(সূরা হাশর, ৫৯:২১)

অথচ কই, যাদের জন্য ও যাদের কাছে এই কুর’আন নাযিল হয়েছে, তাদের মাঝে তো কুর’আন শ্রবণকালে সেই বিনয়, শ্রদ্ধাবোধ বা সমীহভাব জেগে ওঠে না! ইমাম আনোয়ার আল আওলাকি তাঁর এক খুৎবায় বলেন যে, ইসরাইলী রাষ্ট্রীয় রেডিও থেকে নাকি আরবদের জন্য কুর’আন তিলাওয়াত (প্রচলিত অর্থে) সম্প্রচার করা হয়, কারণ ইহুদীরা জানে যে, উদ্দিষ্ট আরবরা কুর’আন বুঝে না বিধায় তাদের উপর কুর’আন কোন প্রভাব বিস্তার করবে না - আর তাই তা সম্প্রচার করা একেবারেই নিরাপদ। আমাদের দেশের অবস্থা আরও করুণ!! আপনি দেখবেন কোন বাজারে দিনের শুরুতে দোকানদার, বারাক্বার (অর্থাৎ বরকতের) জন্য পবিত্র কুর’আনের তিলাওয়াতের একটা ক্যাসেট ছেড়ে দিয়ে অনায়াসে বিকিকিনি চালিয়ে যাচ্ছে - এমনকি ভিডিও সিডির দোকানেও। কিছুদিন আগে দৌলতদিয়া ঘাটের বেশ্যা পুনর্বাসন আন্দোলনের সভা নাকি শুরু হয়েছিল যথারীতি কুর’আন তিলাওয়াত দিয়ে।

এই পর্যায়ে আমার একটা অভিজ্ঞতা আপনাদের সাথে share করতে চাই। এই তো কিছুদিন আগে সিলেটে আমার দেশের বাড়ীতে যাবার সময় আমরা সদ্য চালু হওয়া বহুল প্রশংসিত আধুনিক এক কোম্পানীর বাসে চড়েছিলাম - আত্মীয় স্বজনের মুখে আরমদায়ক ও স্বল্পদৈর্ঘ্য যাত্রার অনেক সুনাম শুনে ঐ বাসে যাওয়া। যাত্রা শুরু হলো সূরা ইয়াসীনের বাংলা তর্জমা সহকারে তিলাওয়াত দিয়ে। একসময় তিলাওয়াত শেষে টিভি সেটে হিন্দি গান ইত্যাদির ভিডিও শুরু হলো। অনেকদিন ধরে আমার ঘরে টিভি চলেনা বলে এবং বিনোদন জগতের সাথে আমার কোন যোগাযোগ নেই বলে আমি প্রায় ভুলেই বসেছিলাম যে, “আ মরি বাংলা ভাষা” বলে মায়াকান্না কাঁদা বাংলাদেশী বাঙ্গালীদের কাছে হিন্দি ও হিন্দু সংস্কৃতির উপাদান, প্রায় শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের মতই অত্যাবশ্যক - যা বিহনে সাড়ে ৪ ঘন্টার ঐ ‘বি-শা-ল' (!!)সময় অতিক্রান্ত হওয়া বুঝি এক অকল্পনীয় একটা ব্যাপার !!! তাই বুঝি অধীর আগ্রহে অনেকে অপেক্ষা করে ছিলেন যে, কখন ঐ অর্থহীন ও বৈচিত্রহীন একঘেঁয়ে বাক্যালাপ শেষ হয়। গান বাজনা শুরু হতে বাসে যেন প্রাণের স্পন্দন ফিরে এলো - এমনকি হিজাব পরতে সচেষ্ট এক মা, তার বয়ঃসন্ধিতে উপনীত পুত্রের সাথে চটকদার অনুষ্ঠানগুলো নিয়ে আলাপ করতে করতে হাসতে হাসতে যে ভাবে ওগুলো গিললেন, তাতে বোঝা গেলো বাড়ীতেও তারা ‘সপরিবারে’ ওসব উপভোগ করে থাকেন। ঐ একই পরিবারের সাফারী স্যুট পরা (সুন্দর ভাবে ছাঁটা) দাড়ি ওয়ালা আধুনিক ইসলামপন্থী সদৃশ বাবা, সামনের সারিতে একেবারে ঝুলন্ত টিভি সেটটির নীচেই বসেছিলেন তার আত্মজাকে নিয়ে - তার মুখেও কোন অস্বস্তির চিহ্ন দেখেছি বলে মনে করতে পারিনা। সমাজতন্ত্রী কুফরপন্থীরা যে ইসলামপন্থীদের প্রতিক্রিয়াশীল বলে গাল দেয় - সেই অপবাদ বুঝি এতদিনে ঘুচ্লো। আমার সিলেট ভ্রমণের অভিজ্ঞতার সঞ্চয় হয়ে রইলো এমন কিছু রিমেক হিন্দি গানের দৃশ্য, যা দেখে আমি বুঝলাম যে, মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়ে গেছে - নাস্তিক ও কাফিরদের নেতৃত্বাধীন পৃথিবীর সর্ব সাম্প্রতিক যৌন বিকৃতি pedophilia-র উপাদান, আমাদের এই “উদারপন্থী মুসলিম দেশের” মুসলিম ভাই-বোনদের মগজে ইতোমধ্যেই চাঞ্চল্যকর আবেদনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে - ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন!!

মধ্যবয়সে উপনীত হয়ে পবিত্র কুর’আন যখন প্রথমবারের মত অর্থসহ পড়ে শেষ করলাম, তখন এই ভেবে পুলকিত বোধ করেছিলাম যে, একটা অনস্বীকার্য কর্তব্য বুঝি দেরীতে হলেও এতদিনে সমাধা করা গেলো। পরে যখন কোন বিশ্বমাপের ‘আলেমের বর্ণনায় কোন একটা আয়াতের ব্যাখ্যা শুনে মনে হয়েছে যে, ঐ ধরনের বক্তব্য এই প্রথমবারের মত শুনলাম - তখন বুঝলাম যে অর্থসহ কুর’আন পড়া, আর কুর’আনের অর্থ অনুধাবন করা এক ব্যাপার নয়। কিন্তু আমরা যারা দ্বীন শিক্ষায় শিক্ষিত নই, অথচ যে কোন ‘হুজুরের’ উপর যারা আস্থা রাখতে পারিনা, তারা তাহলে কোথায় যাবো? এছাড়া আমরা যারা নিজ চেষ্টায় বহু কষ্টে ইসলাম শিখার ও জানার চেষ্টা করছি, তারা যখন কোন আত্মীয় বা সুহৃদকে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে কোন একটা খারাপ বা পরিত্যাজ্য বিষয় থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে কোন আদেশ বা নিষেধ করছি - তখন সেই আত্মীয় বা সুহৃদ অনায়াসে জাতীয় পর্যায়ের এমন একজন ‘আলেম পেয়ে যাচ্ছেন, যিনি তার সকল কর্মকান্ডকে জায়েজ করে দিয়ে, তার মনের অপরাধবোধ নিমেষেই দূর করে দিচ্ছেন। এভাবেই তাহলে দৌলতদিয়া ঘাটের বেশ্যাদের আন্দোলনের সভায় কুর’আন তিলাওয়াত ও দোয়া করার জন্য ‘হুজুর’ পাওয়া যাচ্ছে, আর এভাবেই তাহলে আত্মস্বীকৃত কাফির হুমায়ুন আজাদের জানাজা পড়ানোর জন্যও লোকের অভাব হয়নি আমাদের এই ‘উদারপন্থী মুসলিম দেশে’ - এভাবেই তাহলে চিত্র-নায়ক ও চিত্র-নায়িকাদের সমন্বয়ে চিত্রায়িত ‘ইসলামী নাটক’কে জায়েজ মনে করেছেন এক শ্রেণীর ‘আলেমরা। আর এভাবেই তাহলে Indian idol বা হিন্দুস্থানী মূর্তির পূজার আয়োজনে “নীরবতা সম্মতির লক্ষণ” - এই সূত্র অনুযায়ী, সায় দিয়েছিলেন, বিলাসিতার স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়া আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়া বিজ্ঞ ইসলাম বিশারদরা।

এরকম একটা সংশয়ের ভিতর, বোধশক্তির যখন অনেকটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় একটা অবস্থা - তখন আমি ধর্মান্তরিত মুসলিম, ভাই Jamaal al-Din M. Zarabozo-র লেখা How to Approach and Understand the Quran বইখানি পড়তে শুরু করি। এসময় আমি আরো জানি যে: এক সময় ওমর (রা.) ভাবছিলেন যে একই নবী এবং একই কিবলা থাকা সত্ত্বেও কেন মুসলিম উম্মাহ বিভিন্ন দলে বিভক্ত হবে। তিনি ইবনে আব্বাসের (রা.) কাছে লোক পাঠালেন এবং এ সম্বন্ধে জানতে চাইলেন। ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন, “হে আমীরুল মু’মিনীন, আমাদের মাঝে কুর’আন নাযিল হয়েছিল ও আমরা তা আবৃত্তি করি এবং আমরা জানি যে, কি নাযিল হয়েছিল। আমাদের পরে এমন মানুষজন আসবে, যারা কুর’আন আবৃত্তি করবে, কিন্তু যারা জানবে না যে কোন পটভূমিতে তা নাযিল হয়েছিল। সুতরাং তারা তাদের মতামত ব্যবহার করবে (কুর’আন ব্যাখ্যার ব্যাপারে)। আর তারা যখন তাদের মতামতের শরণাপন্ন হবে, তখনই তারা মতপার্থক্য পোষণ করবে এবং একে অপরের সাথে যুদ্ধ করবে।”

আজ বুঝি আমরা সেই ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি - যখন সবাই সবার মতবাদ ব্যাখ্যা করতে বা নিজ মতামতকে যথাযথ প্রমাণ করতে, নিজ মনগড়া উপায়ে কুর’আনের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন।

কুর’আনের কাছে যাবার, কুর’আনের ভাষা ও বক্তব্য বুঝবার, কুর’আনের কাছ থেকে দিকনির্দেশনা গ্রহণ করবার এবং কুর’আনের কাছ থেকে উপকৃত হবার সঠিক পন্থাসমূহ কি কি - সে সম্বন্ধে অমূল্য তথ্য ও তত্ত্ব সমৃদ্ধ এই বইখানি পড়া থেকে লব্ধ অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান, বাংলাভাষী দ্বীনী ভাই-বোনদের সাথে ভাগাভাগি করার অদম্য ইচ্ছা থেকেই মূলত এই কাজে হাত দেয়া।

(চলবে ....ইনশা'আল্লাহ্!)
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জানুয়ারি, ২০১১ রাত ৮:৩৬
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×