ইলেকশনের নামে সিলেকশনঃ সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে সরকার
শরীফ হোসাইন মৌন
e-mail: [email protected]
১/১১ এমনি এমনি আসেনি।বহু ডক্টরেটদের গভেষনার নির্যাস, পরাশক্তির অর্থায়ন, প্রথম আলোয়ী প্রপাগান্ডার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল ১/১১। বিএনপি, আ’লীগের পারস্পরিক অসহিষ্ণুতাই ১/১১-র অন্যতম ভিত্তি –এটি পরাশক্তিকে নিষ্পাপ বানানোর স্রেফ একটি প্রচারনা আর কিছু নয়। এই যে,এত সুন্দর সুন্দর নাদুস-নুদুস উচ্ছিষ্টভোগী জ্ঞানীদের এত ত্যাগ-তিতিক্ষা, পরাশক্তির দীর্ঘদিনের রোডম্যাপ,মহাজোটের রক্ত উন্মাদনা,এনজিওদের সুদের জাল বিস্তার,এই যে দূর্নীতির এত সত্য মিথ্যা কল্পকাহিনী; এই সব প্রচেষ্টা মিথ্যা হয়ে যাবে তথাকথিত জনগনের ভোটের মাধ্যমে?এত অলাভজনক খাতে পরাশক্তির এত বেশি বিনিয়োগ? না। আমেরিকা তো গলাধাক্কা না খেলে রনে ভঙ্গ দেয়না। তো গলাধাক্কা ব্যাতীত ভদ্র নিষ্পাপ বালকের মতোই আমাদের সার্বভৌমত্ব আমাদের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাবে? না। আর না বলেই ইলেকশনের নামে সিলেকশনের পথে সাফল্যর সাথে বহুদূর এগিয়ে গেছে আমাদের হামিদ কারজাইরা। সরকারের কর্মকান্ডে একটু অনুসন্ধানী চোখ বুলালেই এ সত্যাসত্য আমরা ধরতে সক্ষম হবো।
ঋনখেলাপি সমাচার:
৩০০টি সংসদীয় আসনে নমিনেশন দাখিল কনের মোট ২৪৬০জন প্রার্থী। এর মধ্যে ঋনখেলাপের অভিযোগে প্রথম পর্যায়ে ৫৫৭জনের প্রার্থীতা বাতিল করেন সিইসি। বিএনপির ৫২জন, আ’লীগের ৩৫ জন, জামায়াতের ৩জন, জাতীয় পার্টির৫৯জন, স্বতন্ত্র ১৮৮ জন এবং অন্যান্য দলের ২২০ জনের প্রার্থীতা বাতিল হয় ঋনখেলাপের অভিযোগে।ঋনখেলাপের দিক দিয়ে মহাজোট সুষ্পষ্ট প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। তাছাড়া জনসমর্থনহীন,তথাকথিত কালোটাকা বিরোধী অতি সত বামপন্থীরা ঋনখেলাপের দিক দিয়ে মহা অসৎ মৌলবাদীদের থেকে অনেক এগিয়ে আছে। এমনকি ভাড়াটে দলীয় দেশপ্রেমিক সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের নেতা এ কে খন্দকার সাহেব ও ঋনখেলাপি! যাই হোক এর ফলে তখন মহাজোটের(!) ৭ টি ও চারদর্লীয়(?) জোটের ৫টি আসন প্রার্থীশূন্য হয়ে পড়ে।
আপিল ও চূড়ান্ত তালিকা:
অদক্ষ আওয়ামী বান্ধব সিইসি প্রতিনিয়ত ডিগবাজি খেতে অভ্যস্ত। ডিগবাজি খান আর সরি বলেন। তাই উনার চূড়ান্ত তালিকা শেষ হয়েও শেষ হয়না। ঋনখেলাপের দায়ে অধিকাংশ মহাজোট প্রার্থীকে বাদ দিয়ে ভুয়া সততার একটা ইমেজ অর্জনের চালাকি আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। সংবিধানকে থোড়াই কেয়ার করে সরকারের প্রত্যক্ষ তত্বাবধানে দিব্যি রাজনীতি করছেন এবং রাজনৈতিক দল বানিয়েছেন ১/১১-র সহায়তাকারী প্রশিকার কাজী ফারুক আহমেদ। ঋনখেলাপের দায়ে উনার প্রার্থীতা বাতিলের ভুয়া নাটকটির সমাপ্তি ঘটে উনার প্রার্থীতা ফেরত পাওয়ার ভেতর দিয়ে। আওয়ামী বিদ্রোহীদের ঋনখেলাপী হিসেবে বাদ দিয়ে প্রকারান্তরে ভোট বিভক্তির হাত থেকে তাদের রক্ষা করে মনোনয়নপ্রাপ্ত একক প্রার্থীকে সুদৃঢ় করা হয়েছে।
সর্বশেষ খবর পর্যন্ত চূড়ান্ত বাতিল ৪৪২ জন প্রার্থী,২৯৯টি আসনে বৈধ প্রার্থী ১৫৩৮ জন।এটাও নাকি শেষ নয়!আরো ৪/৫টি পরিবর্তন হতে পারে। সিইসির এই ভবিষ্যৎবানীর সপ্তাহখানেক পরে আদালতের রায়ে ৪জন মনোনয়ন ফেরত পান। হায়রে স্বাধীন আদালত! তবে জ্যোতিষি হিসেবে সিইসি বাহবা পেতেই পারেন।
বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী সমাচার:
প্রথমেই প্রশ্ন আসে বিদ্রোহী কারা? আর স্বতন্ত্রই বা কারা? বিদ্রোহী প্রার্থীরা হলো মূল দলের মনোনয়ন না পেয়ে ক্ষোভের বহি:প্রকাশ হিসেবে একা একা নির্বাচন করা প্রার্থী।এরা সাধারনত দল থেকে পদত্যাগ করেননা তবে বহিষ্কারের আশংকায় থাকেন। আর স্বতন্ত্ররা আপাত দৃষ্টিতে নির্দলীয় থাকেন।এবারের নির্বাচনে স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী প্রার্থী সংখ্যাধিক্য হবার কারন সিইসির প্রনয়নকৃত আইন তাদের অনুকূলে। বলা যায় নির্বাচন কমিশন এদের নির্বাচন করতে উৎসাহিত করেছেন। যাই হোক বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী বেশী। কারন তাদের প্রকাশ্য সংস্কারপন্থীরা সংখ্যায় ছিল বেশী। মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে তাই স্বতন্ত্র হয়েছেনও বেশী। আওয়ামী লীগের অপ্রকাশ্য সংস্কারবাদীরা দলের নমিনেশন পেয়ে নৌকা প্রতীকেই থাকছেন। তাই আ’লীগের খুশি হবার কারন দেখছিনা বরং তাদের ঘরেই শত্রু বিভীষন!
সংস্কারবাদীদের সম্পর্কে বলার কিছু নেই। পরাশক্তির ভাড়াটে সুশীল সরকারের সুশীলরা দুদলের ভেতর পরাশক্তির অনুকূলে যেসব সুশীল আবিস্কার করেছে তারাই সংস্কারবাদী। প্রথম আলোয়ী মিডিয়া যেহেতু এদের গুনগান গায়,সেহেতু এদের মার্কিন ভক্ততার ব্যাপারে নি:সন্দেহ থাকা যায়।
স্বতন্ত্রদের কোন দল থাকার কথা না। তাদের কোন নির্দিষ্ট প্রতীকও থাকবেনা। তবে কেন স্বতন্ত্ররা একীভূত হয়ে ঢাকায় অফিস ভাড়া করে নির্বাচনী কর্মকান্ড চালাচ্ছে? মান্নান ভূৎইয়া নাকি পরবর্তী প্রধানমন্তী বা সরকারের অংশ হতে যাচ্ছেন-এ নিয়ে বাতাসে গুজব ভাসছে।
নিরপেক্ষতার নমুনা:
প্রথম পর্যায়ে ঋনখেলাপি হিসেবে বাদ পড়াদের মধ্যে বিএনপির গিয়াস কাদের চৌধুরী ও ছিলেন।কারন এ সংক্রান্ত তার অনুকূলে জারিকৃত নিষেধাজ্ঞাটি তিনি নির্বাচন কমিশনে পৌছাতে দেরী করেন ২ মিনিট। অর্থাৎ ৫টা বেজে ২ মিনিট হওয়াতে তা গ্রহনযোগ্য হয়নি। প্রার্থীতা বাতিলের শেষ দিন ছিল ১১ ডিসেম্বর বিকেল ৫টা। কিন্তু শেষ সময় পর্যন্তও আ’লীগ ও জাতীয় পার্টির সমঝোতা না হওয়ায় দুপক্ষের কেউ প্রার্থীতা প্রত্যাহার করছিলনা। স্বভাবতই এতে চারদলের সুবিধা হতো। মহাজোটের ভোট বিভক্ত হয়ে চারদলের পাল্লা ভারী হতো। সিইসির পরিকল্পিত রোডম্যাপ তাতে ব্যাহত হতো। তাই সবাইকে অবাক করে দিয়ে নির্লজ্জের মতো রাত ১০টা পর্যন্ত প্রার্থীতা প্রত্যাহারের সময় বাড়িয়ে দিল।শুধু তাই নয় নিয়মনীতিকে ছেড়া ত্যানার মত লাথি মেরে পরের দিন ময়মনসিংহ-৪ আসনে আ’লীগ প্রার্থী পরিবর্তন করে সিইসির সহায়তায়। শুধু এখানেই শেষ নয়, ১২ ডিসেম্বর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের কথা থাকলেও ১৩ ডিসেম্বর ৪৫ জন প্রার্থীকে প্রার্থীতা বাতিলের ব্যবস্থা করে দেন। যারা সবাই মূলত মহাজোটের।অর্থাৎ মহাজোট ভোট বিভক্তি থেকে রক্ষা পায়। প্রিয় পাঠক!প্রধান উপদেষ্টা,সিইসি, দুদক,সেনা প্রধানের ন্যায়নীতি ও নির্বাচন নিরপেক্ষতা বিষয়ে অধীনস্তদের নির্দেশগুলো খুবই চমৎকার তাইনা?
প্রার্থী শূন্য আসন:
নোয়খালী আসনটি স্থগিতের কারনে নির্বাচন হবে ২৯৯ আসনে। ঐ আসনটি নিশ্চিত বিএনপির ছিল। তবে এটাও নিশ্চিত নির্বাচনে মহাজোট জিতলে উপ নির্বাচনের স্টাইলে ঐ আসনটিতে তারা জিতে আসবে।বাকী আসনগুলোতে কোথাও মহাজোটের প্রার্থী শূণ্যতা নেই।তবে অতি নিরপেক্ষ সিইসির অধীনে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে চারদলের প্রথম দিকে ৬টি আসনে কোন প্রার্থী ছিলনা। তবে আদালতের নির্দেশে ২জন প্রার্থীতা ফেরত পাওয়াতে এ মুহূর্তে ৪টি আসনে তাদের কোন প্রার্থী নেই।বাতিল হবার পথে আছে ১টি। শূন্য প্রার্থী আসন গুলো হলো নওগা-৬, চাদপুর-৪, মৌলভীবাজার-২,ঝিনাইদহ-২। এর মধ্যে চাদপুর-৪ ও ঝিনাইদহ-২ আসনের প্রার্থী বাতিল হয়েছে যথাক্রমে বিদ্রোহী প্রার্থী ও দুদকের অভিযোগের প্রেক্ষিতে। বরিশাল -১ আসনের প্রার্থীর প্রার্থীতা বাতিল হয়েছিল সংস্কারবাদী বিদ্রোহীর আপিলের প্রেক্ষিতে। প্রার্থীশূন্য হওয়াতে নিরুপায় খালেদা বিদ্রোহী প্রার্থীকে সমর্থন দেন। হয়তো তাই সিইসিদের আদালত মূল প্রার্থীর প্রার্থীতা ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। চাদপুর-১ এর বিদ্রোহী প্রার্থী ও মূল প্রার্থীর বিপক্ষে মামলা করেছে।নাটকটি দেখার অপেক্ষায় থাকাই শ্রেয়। তবে একথা বলা যায়যে ভোটের আগেই মহাজোট ৪টি আসনে নিরন্কুশ বিজয়/উপহার লাভ করেছে। হয়তো এসব আগাম ইঙ্গিতেই আওয়ামী৯১(ই)ধারা নিয়ে কোন আপত্তি করেনি।
সীমানা পুনর্নির্ধারন:
আয়তনের ভিত্তিতে মীমাংসিত সর্বদেশে প্রযোজ্য সীমানা নির্ধারন পদ্ধতিকে বাতিল করে কেবল মাত্র আ’লীগের সুবিধা ও নিজেদের রোডম্যাপের স্বার্থে ভারতীয় গোয়েন্দাদের পরামর্শে সীমানা পুনর্নির্ধারন করা হয় জনসংখ্যার ভিত্তিতে। যাতে এমনিতেই কমে যাবে চার দলের আসন।একটা উদাহরন দিলেই বিষয়টি পরিস্কার হবে।মানিকগঞ্জ ছিল বিএনপির ঘাটি এবং আসন সংখ্যা ছিল ৪টি। সীমানা পুনর্নির্ধারন করন আসন কমিয়ে আনা হয়েছে ৩টিতে। বিএনপির ঘাটি মুন্সীগঞ্জেও একই ঘটনা ঘটেছে।কিছু ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের ক্ষতি হলেও সুবিধার পরিমানই বেশি।
না ভোট বিধান:
কোন সংসদীয় আসনে প্রার্থীদেরপ্রাপ্ত ভোটের চেয়ে না ভোট বেশী হয়ে যদি ৫০% অতিক্রম করে অর্থাৎ ৫১% হয় তবে সেখানে পুনরায় নির্বাচন হবে।সরকারের অপছন্দের প্রার্থী যদি নিশ্চিত বিজয়ের পথে থাকে তবে এই না ভোটের পরিমান বেশী দেখিয়ে ইলেকশনের নামে সিলেকশনের রাস্তাটা খোলা রাখাই হচ্ছে।
ইলেকশন নাকি সিলেকশন:
আমেরিকার পরিকল্পিত সন্ত্রাসবিরোধী দক্ষিন এশীয় টাস্কফোর্স এবং জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল দলীয় ইশতেহারে প্রকাশ করে আ’লীগ পরাশক্তির আস্থায় এসেছে। তাছাড়া সর্বোচ্চ সংখ্যক সুশীল সংস্কারবাদী তাদের দলে নমিনেশন পেয়েছে। কাজেই তারা জিতে আসবে,ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ইলেকশন করা বিএনপির দালাল সাইফুর,হাফিজরা,সাদেক হোসেন খোকারা ও জিতে আসবে।জিতে আসবে স্বতন্ত্র মান্নান ভুইয়ারা ও সরকারের স্নেহের চাদরে লালিত এরশাদ । আরো জিতবে পরাশক্তির আস্থাভাজন সাবের হোসেন,আমু,রাজ্জাক,সুরঞ্জিতরা। দুজোটের কেউই সরকার গঠনের মতো পর্যাপ্ত আসন পাবেনা। জোটের বাহিরে কোন দল না থাকায় সরকার গঠনের সমর্থন চাইতে যাবে দালাল বিদেশপন্থী মান্নান ভুইয়াদের কাছে। ভুইয়ারা ইউনূস,কামালদের নিয়ে দাবী দাওয়া জানাবে।সমঝোতার ভিত্তিতে বহিরাঙ্গনে আ’লীগ ,ভেতরে ভেতরে প্রথম আলোয়ী পরাশক্তির অনুকূলে সরকার গঠিত হবে।
ইতিমধ্যে এমন ধাচের একটা জাতীয় সরকারের অনুকূলে জনমত সৃষ্টির জন্য সরকার বান্ধব পত্রিকাগুলো প্রচারনা চালাচ্ছে।ভোটের আগেই সুষ্ঠু নির্বাচনের গুনগান গাওয়া হচ্ছে,মহাজোটকে জিতিয়ে দেয়া হচ্ছে।জবরদস্তিমূলক সরকারের কুশাসনের সমাপ্তি হচ্ছে বলে তাই আমরা যতই আনন্দিত হইনা কেন,আসলে ইলেকশনের নামে সিলেকশনের পথে সরকার বহুদূর এগিয়ে গেল।তবে হ্যা,নিরাশ হওয়া ঠিক নয়। কেননা,সৃষ্টি যখন পরিকল্পনা করে,স্রষ্টা তখন মুচকি হাসে।সকল ষড়যন্ত্র অবিশ্বাস্যভাবে ব্যর্থ হতে কতক্ষন? আমরা বরং সে আশাতেই বুক বাধি।
১৮/১২/০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

