অনুষ্ঠিত নির্বাচন এবং আমাদের উপলব্দি
শরীফ হোসাইন মৌন
হঠাৎ করে জনগনের খুব গুনগান গাওয়া হচ্ছে। তবে জনগন খুশি হতে পারছে বলে মনে হচ্ছেনা। জনগন বুঝে গেছে যখনই জনগন জনগন বলে মাতম করা হয় তাতে জনগনের সংশ্লিষ্টতার লেশ মাত্র থাকেনা, অতীতেও ছিলনা, আছে শুধু জনগনের দোহাই দিয়ে স্বার্থসিদ্ধির অপকৌশলের পথ আবিস্কার । জনগনের দোহাই দিয়েই তো স্বাধীনতা ভুলুন্ঠিত হয়েছে আফগানিস্তান ও ইরাকের, ভুলুন্ঠিত হচ্ছে পাকিস্তান কিংবা ফিলিস্তিনে। আমাদের দেশেও তেমনি ১/১১-র আবির্ভাব ঘটে জনগনেরই দোহাই দিয়ে। যাকগে সেসব কথা। আমাদের দেশের জনগন খুব ‘সচেতন’, এইরুপ একটা গুনগান গাওয়া হচ্ছে প্রচার সর্বস্ব আওয়ামী নেতৃত্ব ও মিডিয়া থেকে। কারন জনগন আওয়ামী লীগের ভাষায় বিগত চারদলীয় জোটের দুঃশাসন হতে দেশকে মুক্ত করার জন্য দলে দলে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে ব্যালট বাক্স ভরে দিয়েছে। ভারতীয় মিডিয়ার ভাষায় মৌলবাদী ভারতবিদ্বেষী জামাতকে (জামায়াত) চূর্ন-বিচূর্ন করে ভারত বন্ধু হাসিনাকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। সোজা কথায় স্বাধীনতার ‘স্বপক্ষ শক্তি’ আওয়ামী লীগকে ক্ষমতার স্বাদ দিয়েছে। তাই জনগন খুবই সচেতন। যদি আ’লীগ না জিতে হেরে যেত তবে এ মূর্খ জাতি আর কোনদিনই সচেতন হতনা! বড় চমৎকার যুক্তি।
এতসব গুনগান ও হাওয়া প্রদানের ভেতর দিয়ে যে সত্যকে লুকানো হচ্ছে, যে আলোচ্য বিষয়টিকে আলোচনার বাহিরে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে তা হলো ১/১১-এর অবৈধ ফসল ফখরুদ্দিনের বৈধতা প্রদানের সমঝোতায় ডিজিটাল কারচুপির মাধ্যমে একটি পাতানো নির্বাচনের সফল বাস্তবায়ন। মাত্রতো সপ্তাহ খানেক হতে চলেছে নির্বাচন শেষ হলো, এরই মধ্যে বিভিন্ন স্থানে পরিত্যক্ত অবস্থায় ব্যালট পেপার, ব্যালট পেপারের মুড়ি, কোটি কোটি টাকা গচ্চা দিয়ে কেনা কানাডিয়ান ‘স্বচ্ছ’ ব্যালট বাক্স উদ্ধারের খবর আমরা পত্র-পত্রিকায় পাচ্ছি। আরো তো বহুদিন পড়ে আছে। দেখা যাক, জনগনের ‘সচেতনতার’গুনগান গাওনেওয়ালাদের অন্দর মহলের আর কী কী খবর বেরিয়ে আসে। কিন্তু এতেই কেন যে আমাদের ত্রিরত্ন সিইসি মহোদয়দের আঁতে ঘা লেগেছে তা বোঝা গেলনা। তিনি ফরমান জারি করলেন যার কাছে এই রুপ ব্যালট পেপার পাওয়া যাবে আর যে এর সন্ধান দেবে উভয়কে আইনের হাতে সোপর্দ করা হবে। যার কাছে পাওয়া যাবে তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করার কারন না হয় বোঝা গেল কিন্তু যে এর সন্ধান দেবে তাকে কেন আইনের হাতে সোপর্দ করা হবে তা কিন্তু বোঝা গেলনা। ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের’ ভুয়া ইমেজের যে ইমারত উনারা গড়েছেন তার এক টুকরো ইটও তারা খসে পড়তে দিতে চাননা তা বেশ বোঝা গেল। কিন্তু বক্তব্যের মধ্যে কেমন যেন বাকশাল বাকশাল গন্ধ টের পাচ্ছি আমরা ‘অচেতন’ জনগন।
আমাদের দেশের জনগনের থেকেও অতি সচেতন শিক্ষিত গনতান্ত্রিক আমেরিকাতে ৭০% ভোট পড়ে কিনা সন্দেহ। সংবিধান বহির্ভূত ফখরুদ্দিনদের দুই বছরের রাজত্বে ৪৫ টাকার মোটা চাল খেয়ে হঠাৎ আমরা এত 'সচেতন' হয়ে গেলাম যে সারা বাংলাদেশে প্রায় ৯০% ভোট প্রদান করা হলো।এমনকি ৮৮টি আসনে ভোট গ্রহনের হার ৯০% থেকে ৯৫% পর্যন্তও উঠেছে। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত।সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো রাজশাহী-৫ আসনে একটি কেন্দ্রে ভোট গ্রহনের হার ১০৫% ও অতিক্রম করেছে! কুড়িয়ে পাওয়া ব্যালট পেপারের ভোট যোগ করলে অনেক কেন্দ্রেই প্রদত্ত ভোটের হার ১০০% অতিক্রম করার সম্ভাবনা রয়েছে। সিইসিদের ভয় বোধ হয় এখানেই। ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের’ কাহিনী এখানেই শেষ নয়। এই সব সংসদীয় আসনে ভোটের হিসাব কষলে দেখা যায় প্রতি মিনিটে প্রায় ৪/৫ টি ভোট পড়েছে। যা এক অবিশ্বাস্য ঘটনা।অবশ্য আমাদের সিইসি মহোদয় ড: শামসুল হুদা নির্বাচনের ক’দিন পূর্বে নিজেকে অলৌকিক ক্ষমতাধর বলে স্বীকার করেছিলেন। হতে পারে তার সেই অলৌকিক ক্ষমতার বলেই বাংলার জনগন হঠাৎ এত সচেতন হয়ে উঠল যে ভোট প্রদানের হার ১০০% অতিক্রম করল।
ইতিপূর্বে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে যে কারচুপির ঘটনা ঘটত,জালভোট পড়ত, কিংবা দাঙ্গা-হাঙ্গামা ঘটত তার সবই ছিল মূলত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে। তাই তা সহজে সবার নজরে পড়ত এবং প্রচার হয়ে প্রতিরোধের মুখে পড়ত। কিন্তু সব মিলেও তা ৯৫% ভোট প্রদানে পৌছাতো না। এবার নিচের দিকে সব কিছু প্রায় সুষ্ঠু থাকলেও অলৌকিক ক্ষমতাধর সিইসি উপর থেকে যে ‘অসুষ্ঠুতার’ প্রলেপ জড়িয়েছেন তা দেরীতে হলেও আস্তে আস্তে সবার নজরে আসছে। আর হ-য-ব-র-ল নেতা-পাতি নেতাদের কারচুপির তুলনায় ডক্টরেটবৃন্দের অলৌকিক ক্ষমতার কারচুপির শৃঙ্খলাবোধ চমৎকার থাকবে এতে আশ্চর্য কী! এ মুহূর্তে পাঠক, নির্বাচন পূর্ব ১/১১-র কারিগরদের বক্তব্যগলো আর নির্বাচন পরবর্তী ফলাফলকে মিলিয়ে নিতে পারেন।
নির্বাচনে ভোট প্রদানের উচ্চ হার সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে ড: হুদা বলেন,লঞ্চে চড়ে, বাসে চড়ে শহর থেকে গ্রামে গিয়ে লোকজন ভোট দিতে গেল,এমন দৃশ্য তিনি নাকি আর জীবনে দেখেননি! দেখার চোখ যদি আল্লাহ কাউকে না দিয়ে থাকেন তাতে আমাদের অবশ্য বলার কিছু নেই। নির্বাচনের পূর্বেই সুপরিকল্পিতভাবে সরকার বান্ধব সুশীল মিডিয়াগুলো প্রচার চালিয়েছিল যে এবার ভোট বেশি পড়বে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে পাল্টে দেবার শ্লোগান নিয়ে বিঞ্জাপন করা পত্রিকাটি অগ্রগন্য। অতি ভোট পড়ার গোপন রহস্য নিয়ে সিইসির পাশাপাশি এই গুটিকয়েক মিডিয়াকে জিঞ্জাসাবাদ করা যেতে পারে।
তবে হ্যাঁ, সবকিছুর পরেও জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী মূল্যবোধের স্বপক্ষের শক্তিকে এ ডিজিটাল কারচুপিকে মেনে নিতে হচ্ছে। বলা উচিত মেনে নিতে তারা বাধ্য হচ্ছেন।আজ আফ্রিকার কোন দেশে যদি এরুপ কোন ইলেকশনের নামে সিলেকশন ঘটত তবে তা নির্ঘাত গৃহযুদ্ধের রুপ ধারন করত। সেসব দেশে প্রতিটি দল-উপদলের অধীনস্ত সেনাবাহিনী থাকে। তাহলে এ কথাই আজ বলা শ্রেয় যে, ‘জনগন সকল ক্ষমতার উৎস’ ,তথাকথিত গনতান্ত্রিক এ বেদবাক্য আজ হুমকির মুখে। ক্ষমতার উৎস অন্য কোথায় নিহিত, এই উপলব্দিই সুশীল সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের একমাত্র অর্জন।
05/01/2009
E-mail: [email protected]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

