Click This Link
সারারাত ঘুম হয়নি লীনার। সকালের দিকে চোখটা একটু লেগে আসলো, কিন্তু তখন আর ঘুমোনোর সময় নেই। নাস্তা বানাতে হবে। উঠলো সে। মনটা বিষিয়ে আছে একেবারে। আসিফ উঠলো। নাস্তা করে বেরিয়ে গেল চুপচাপ। লীনার আজ ক্লাশে যেতে ভাল লাগছেনা। একটা ক্লাশ আজ। না গেলেও খুব বেশি সমস্যা হবেনা।
নাস্তা করা উচিৎ। কিন্তু খেতে ইচ্ছে করছে না লীনার। রাতে ঘুম না হলে একটা বমি বমি ভাব আসে, সেরকমই লাগছিল ওর। শুয়ে পড়লো বিছানায় গিয়ে। নিঃসঙ্গ মানুষের সবথেকে প্রিয় কাজ বোধ হয় স্মৃতিচারন। অথবা স্মৃতির কাছে সবথেকে প্রিয় হয়তবা নিঃসঙ্গ মানুষ!! চোখ বুঁজে তাই সে পুরানো দিনের কথা ভাবতে লাগলো.......................................................
বাবার চাকরীর কারনে অনেকদিন তাদের দাদাবাড়ী গিয়ে থাকতে হয়েছিল। আশপাশের সবাই জানতো লীনার বাবা মায়ের বিবাদের কথা। লীনা আজও মনে মনে অনুশোচনায় পুড়ে মরে "আমার জন্যই বাবা মা নিজেদের সম্পর্ক টাকে টিকিয়ে রেখেছিল জোর করে। যদি আমার জন্ম না হত তারা আলাদা হয়ে যেতে পারতো অনায়াসে! জোড়া তালি দিয়ে ধুকে ধুকে টিকিয়ে রাখা সম্পর্কটা শুধু এই ভেবে যে 'সন্তানটির ভবিষ্যৎ কি হবে?'!!!!" লিনার চোখে জল আসে "আমি কি জন্ম থেকেই তবে অভিশপ্ত?!!"" নাহ এসব কি ভাবছে লীনা? ও কি পাগল হয়ে যাচ্ছে? ওর ছোটবেলায় কোন বন্ধু ছিলনা। বই পড়েই কাটতো সময়। ক্লাশ সিক্স-সেভেন থেকেই রবি বাবু, শরৎ বাবু, বঙ্কিম বাবু, মাইকেল মধুসূদন, সেক্সপীয়র, বার্নাড শ, গ্যেটে,প্লেটো, গ্রীক, মিশরীয় মিথ, ধর্মীয় বই, সব পড়া শুরু করেছিল। সারাদিন বই পড়ত। বই পড়তে পড়তে নিজেকে কখনও লাবণ্য, কখনও অলকা, কখনও দেবী চৌধুরানী ভাবত সে।
ঘরের বাইরে বেরুতে ভাল লাগতো না লীনার। নানান জনে নানান কথা জিজ্ঞেস করতো তার বাবা মা কে নিয়ে। ওসব ওর একবারেই ভাল লাগতো না। অষ্টম শ্রেণীতে বৃত্তি পায় লীনা। টেলেন্টপুলে, মেয়েদের মধ্যে প্রথম, আর সম্মিলীতভাবে ৩য় হয় জেলায়। তার বাব অনেক খুশি। মেয়েকে আরও উৎসাহ দেন তিনি, বেড়াতে নিয়ে যান আরও কত কি! ওসবে লীনার মন ভরতো না। কতবার বলতে চেয়েছে "বাবা, তোমরা আর ঝগড়া কোরনা।" পারেনি। লীনার একটা ভাই আছে। লিয়ন। সেও অমনি মেধাবী। বাবা মায়ের বিবাদ ছেলেটিকে ভীষন ভাবে অন্তর্মূখি করেছে। সারাদিন পড়ার বইয়ে মুখ গুজে থাকে, আর মাঝে মাঝে খেলতে যায়। দুভাই বোনেই ওদের যত গল্প আর আড্ডা।
লীনার তখন এস এস সি পরীক্ষা। লীনার ইতিহাস,রাজনীতি, সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ ছিল বেশি। তাই মানবিক বিভাগেই পড়ে সে। তারপরও স্কুলে সম্মিলীত মেধাতালিকায় প্রথম ছিল সে। এস এস সি পরীক্ষার আগের দিন হঠাৎ বাবা মা ঝগড়া শুরু করে। লীনা হতভম্ব হয়ে যায়। প্রথম পরীক্ষা টা সে কোনমতে দিলেও, দ্বিতীয়টির আগে অসূস্থ হয়ে পড়ে। এক হাতে সেলাইন আর অন্য হাতে লিখে পরীক্ষা দিতে থাকে সে। তারপরও চারটি বিষয়ে এ+ সহ পাশ করে লীনা। আজও সে কষ্ট লীনা ভুলতে পারেনি। আজও ওর মনে দগদগে সেই ক্ষত "কেন আমরা আমাদের আপনজনদের এত কষ্ট দেই? কেন ক্ষমা করতে পারিনা। একই ছাদের নীচে থেকে কেন এতটা পর হয়েই থাকি আজীবন?!!!"
লীনার মন সর্বক্ষন একটা আশ্রয় খুঁজতো, একটা স্বস্তির আশ্রয়। মনটা সারাদিন রাত কোথায় কোথায় যে ঘুড়ে বেড়াতো সে কেবল মনটাই জানে। প্রথমে লীনা মহিলা কলেজে ভর্তি হল। প্রতিযোগীতা নেই, শিক্ষক স্বল্পতা সব মিলিয়ে লীনাকে আবার ভর্তি করা হল আরেকটি কলেজে। এলাকার খুব নাম করা কলেজ, কো-এডুকেশন। বছরের মাঝখানে এসে ভর্তি হওয়া লীনা খুব অস্বস্তি বোধ করতো। তখন পরিচয় হয় রাহির সাথে। দুই বান্ধবীতে যে কত সুখ দূঃখের কথা হত। দূজন দূজনকে ছাড়া কিছুই বুঝতো না। রাহীর এখনও বিয়ে হয়নি। যোগাযোগ নেই এখন লীনার সাথে। ও বোধ হয় খুব ভাল আছে!
হঠাৎ ময়লা নিতে আসা ভ্যানের হুইসেল বেজে ওঠে। লীনা চমকে ওঠে। উঠে যায় ময়লা বের করে দিতে। মাথাটা ঝিম ঝিম করছে। চা খাওয়া দরকার..........................
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই এপ্রিল, ২০১০ সকাল ১১:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



