Click This Link
চা খেয়ে লীনা একটা বই নিয়ে বসলো। ২ পৃষ্ঠা পড়েই বিরক্তি লাগলো ওর। কোথাও কি ঘুরে আসবে? না থাক। চুপ করে ঝিম মেরে বসে থাকতে ভাল লাগছে। বারান্দায় গিয়ে চেয়ারে পা তুলে দুই হাঁটুর মাঝে মাথা রেখে বসে থাকলো লীনা.................................
নুতন কলেজে ভর্তি হয়ে লীনার খুব অস্থির লাগতো, রাহির সাথে কলেজে যেত, আবার ফিরতো। ক্লাশের মাঝের সময়টুকুতে কমন রুমে বসে থাকতো। সাবজেক্টের অমিল থাকায় রাহির ক্লাশ থাকতো এক সময় লীনার অন্য সময়। কমনরুম থেকে বের হওয়ার সময় প্রায়ই লীনা খেয়াল করতো সুন্দর লাজুক ধরনের একটা ছেলে দাঁড়িয়ে থাকতো, তার সাথে আরও একটি ছেলে থাকতো। প্রথম প্রথম লীনা এতটা না বুঝলেও কিছুদিন পরে বুঝলো ছেলেটি দাঁড়িয়ে থাকতো ওর জন্যই। পরে জানলো ছেলেটার নাম সুমন। সাথের বন্ধুটির নাম মুজাহিদ।ছেলেটি কেন এমন হা করে তাকিয়ে থাকতো তা যে কেউ বুঝবে, লীনাও বুঝতো। সুমনের চোখ আর মুখে এমন একটা মায়া ছিল চাইলেও এড়ানো খুব কঠিন। কিন্তু লীনা তো তার থেকেও কঠিন!!
একদিন যুক্তিবিদ্যা ক্লাশ থেকে বের হওয়ার সময় হঠাৎ বাণিজ্য বিভাগের পলাশ নামের একটা ছেলে এসে লীনার হাতে গুঁজে দিল একটা চিরকুট। সবকিছু এত দ্রূত ঘটলো যে লীনা কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না। স্যার তখনও সামনেই আছে, চিরকুট টা না পড়েই লীনা ওটা ধরিয়ে দিল স্যারের হাতে। স্যার সুমনকে ডেকে অনেক কথাই বলেছিলেন সেদিন। তবুও সুমন পিছু ছাড়েনি লীনার। তারপর প্রায় একমাস কেটে গিয়েছিল।লীনা আর পারেনি। ধরা দেয় সুমনের আহ্বানে। সুমন ছাত্র হিসেবে ভাল ছিলনা মোটেও। ব্যাপারটা এক-দেড় মাসের মধ্যে প্রিন্সিপাল স্যার, যিনি কিনা লীনার বাবার বন্ধু জেনে গেলেন। ফলাফল যা হওয়া উচিৎ তাই হল। বাবার আহ্লাদী মেয়ে লীনা বাবার মনে কষ্ট দিতে পারলো না। আজও মনে আছে লীনার। কি কষ্ট টাই না হচ্ছিল সেদিন "মন, আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি পারবো না।" তারপরই সেই ভয়ংকর উচ্চারণ "বাবার জন্য আমি তোমার মত ১০০ জনকে ছাড়তে পারি অনায়াসে, কিন্তু কোন কিছুর জন্য বাবাকে কষ্ট দিতে পারবো না। এমনকি তাতে যদি নিজে কষ্ট পাই আজীবন"!!
সেদিন সুমন বুঝেছিল লীনার নিরুপায় প্রার্থনা। কিছুই বলেনি সে। তারপর পাশ করে বেরিয়ে গেল লীনা। তিনটি বছর লীনা কাটিয়েছে অসহনীয় যন্ত্রনা নিয়ে। ছটফট করেছে রাতের পর রাত। সারাদিন রাত চোখের সামনে একটি মুখ!! পাগল পাগল লাগতো লীনার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় লীনা। অশান্তি অসস্তিতে ক্লাশ করতে পারতো না, অসূস্থ হতে থাকলো বারবার। একটি বছর শেষ হল। আবার ১ম বর্ষে ভর্তি হল লীনা। এর মাঝে একবার জড়িয়ে পড়েছিল বাম সংগঠন বলে পরিচিত একটি সংগঠনের সাথে। উদ্দেশ্য ছিল মানুষের জন্য কিছু করা। হিপোক্রেসিকে বরাবর ঘৃনা করা লীনা অবাক হয় দেখলো নীতির কথা চিৎকার করে বলা মানুষগুলো নিজেরাই কতটা নীতিহীন!!! সেখান থেকেও বেরিয়ে আসে লীনা। কোথাও শান্তি নেই। আসলে মানুষ যতই বলুক "মানুষের জন্য কিছু কর" যে মানুষ নিজে সদা সর্বদা অশান্তির আগুনে জ্বলে অপরের কথা ভাবতে তার কতক্ষন ভাল লাগে?!!
রোজ রাতে লীনা ডায়রীর পাতায় কত কথা লিখতো----ওর সুখ, দুঃখ, হাসি, কান্না, ক্ষোভ, রাগ, অভিমান!!
ডায়রীর কথা মনে হতেই লীনা সোজা হয়ে বসলো। হঠাৎ লীনার পুরোনো দিনের ডায়রী পড়ার সখ হল। উঠে গিয়ে ধূলো জমা ডায়রীটা টেনে বের করলো সেলফ থেকে....................
০৩-০১-২০০৬
" আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি?!! সারারাত শুধু লাশের স্বপ্ন দেখি। কিছুদিন হল বড্ড পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। দূরে কোথাও। কেউ চিনবেনা সেখানে আমাকে, কেউ না। একটাই জীবন! অথচ সেটাই বড় বেহিসেবী রকমের আগোছালো আমার। আমার খুব কাঁদতে ইচ্ছে করে, কারও গলা জড়িয়ে। সে আমার মাথায় হাত বুলাবে, কিন্তু কান্না থামাতে বলবেনা। আমি কাঁদব আর কাঁদব...................কেঁদে কেঁদে মনের বায়বীয় ব্যাথাগুলোকে তরল করে ঝরিয়ে দিব! তেমন দিন বুঝি আসবেনা আমার জীবনে। আচ্ছা যদি কখনও নিজেকে শেষ করে ফেলি, তবে কি খুব অন্যায় হবে? খুব কি অবিচার করা হবে সবার প্রতি? কি জানি? আমি বোধ হয় সত্যিই পাগল হয়ে যাবো একদিন!!"
আর পড়তে ভাল্লাগছেনা। গোসল করতে উঠে গেল লিনা। খাওয়া হয়নি সকালে। গোসল করে খাওয়া দরকার।
একটা কাক তারস্বরে কা কা করে চিৎকার করছে বিদ্যুতের তারে বসে...............
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই এপ্রিল, ২০১০ সকাল ১১:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



