২০০২ সালের কথা। হলবর্ন কলেজে বন্ধুদের সাথে ভালই তো যাচ্ছিল সময়গুলো। জাহিদ,জুমন,সোহাগ,লাকি,ফারুক,সামান্তা এত সব বন্ধুদের নিয়ে ইমনের সময় ভাল যাবারই কথা। সবেমাত্র লন্ডনে আসা হয়েছে সবার। দুই মাসের কম বা কিছুটা বেশী। এরই মধ্যে অনেকে পার্ট টাইম কাজ পেয়েছে। আমার মত যারা এখনো কাজ নামক জটিলতা ভাগ্যে জুটাতে পারেনি, তারা লন্ডনের প্রতিটি স্টেশনে স্টেশনে 'মিশন ইমপসিবল'কে পসিবল করার চেষ্টা করে যাচ্ছে ।
প্রতিদিন সেই একই কথা, 'hello there, i am looking for a job, do you have a vacancy here?'
দুই টাকা দামের একটা হাসি দিয়ে দোকানীদের ও একই কথা, 'if you have a CV with you, you can drop it here, we will call you later.'
call you later শুনে খুশী হয়ে বাসায় ফেরা হয় কিন্তু সেই কল আর আসেনা।
এভাবে চলতে থাকে কাজ নামের সোনার হরিণ সন্ধানের কাহিনী। এসব কাহিনী লেখক সমাজের হাতে পৌছালে পর্ব১,২,৩ করে অনেক লেখার পরেও শেষ হত কিনা সন্দেহ।
সপ্তাহে যে তিন দিন কলেজ থাকে সে তিনটা দিন ভালই যায়। ক্লাস শেষে জাহিদের whitechappel এর কাউন্সিল ফ্ল্যাটে চলে আড্ডা, সিনেমা দেখা ইত্যাদি। কিন্তু এভাবে কতদিন চলবে, পার্ট টাইম কাজ একটা খুজে বের করতেই হবে।
এদিকে বাসায় নিজাম ভাই (এলাকার বড় ভাই, যাকে দেশে থাকতে দেখিনি কোনদিন) বলে দিয়েছে দুই সপ্তাহের মধ্যে কাজ একটা না পেলে চলে যেতে হবে রেস্টুরেন্টে। যেখানে অনেকেই স্টুডেন্ট ভিসায় এসে পড়ালেখার নামে দিব্যি কাজ করে যাচ্ছে। শুনেছি এসব রেস্টুরেন্টের মালিকরা (গাভনার বলে, ইংরেজীতে governor ) যাচ্ছে তাই ব্যবহার করে, মুখে কোন কিছুই নাকি আটকায় না, তাও আবার সিলেটি উপভাষায়। এসব শুনে রেস্টুরেন্টে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছার অবশিষ্ট নেই।
হলবর্ন কলেজের একটা সুবিধা ইচ্ছেমত প্রিন্ট আউট নেয়া যায়। তাই CV প্রিন্ট করার কাজটা কলেজ থেকে চালিয়ে দিতাম, সাথে আরো কত কিছু যে প্রিন্ট করতাম। মনে আছে বেশীর ভাগ সময়'ই 'প্রথম আলো' প্রিন্ট করে বিজয়ীর হাসি নিয়ে বাসায় আসতাম আর মুন্না ভাই, নিজাম ভাই, তৌফিক, শফিকে দেখাতাম। তৌফিক,শফি এরা দুজন আমার লন্ডনের প্রথম বন্ধু। শফিকে তো অনেকদিন শফি ভাই বলেই ডাকতাম। সেই শফির সাথে এখনো এক'ই বাসায় আছি।
যাইহোক কলেজের কথায় আসি, কলেজ কতৃপক্ষ আমাদের অপচয়ের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে পরে পৃষ্টা প্রতি নূন্যতম একটা চার্জ বসিয়ে দিয়েছিল।
ওহ্, একটা কথা বলাই হয়নি যে, আমরা সবাই তখন 'ইংলিশ কোর্স' করছিলাম। আসল কথা কেউ এই কোর্সে ভর্তি হয়ে আসিনি। সবাই বিভিন্ন কোর্স নিয়ে এসেছিলাম কিন্তু কলেজ কতৃপক্ষ কিছু বাড়তি আয়ের জন্যে নানা অজুহাতে আমাদের এই মরার কোর্স ধরিয়ে দিয়েছে। আমি এসেছিলাম 'Foundation in Business' কোর্স নিয়ে। আমি ইংরেজীতে খুব একটা ভাল ছিলাম না বলে ইংলিশ কোর্স'টা মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু জাহিদ, ফারুক'সহ আরো অনেকে ভাল ইংরেজী পারদর্শী হওয়া স্বত্তেও তাদেরকে বাধ্য হয়ে ইংলিশ কোর্স'টা নিতে হয়েছিল। এটা ছিল ওদের জন্য একদিকে অপমানজনক অন্যদিকে প্রতারনামুলক ও। কেননা, এই কোর্সের নামে কলেজ কতৃপক্ষ ভাগিয়ে দিয়েছে দুই হাজার পাউন্ড, বাংলাদেশী টাকায় তিন লাখ টাকার সমপরিমান।
এবার আসি টিচার পর্বে। আমাদের টিচারের নাম ছিল keith পুরো নামটা ঠিক মনে নেই এখন। আমি যখন বলতাম স্যার....সে বলত 'নো স্যার, জাস্ট কিথ'। পরে বলা শুরু করলাম মিষ্টার কিথ, তখন ও সে বলত 'নো মিষ্টার প্লিজ, জাস্ট সে কিথ। কিথ'কে কি আর বলতে পারি যে, আমাদের দেশে আমরা টিচারদের নাম ধরে ডাকিনা...স্যার বলতে বলতেই গলা শুকিয়ে ফেলি। আচ্ছা, যে ছেলে স্কুল, কলেজের বারো'টি বছর টিচারদের 'স্যার' বলে আসছে, সে কিভাবে এত সহজে বলবে 'কিথ'।
যাইহোক, কিথের কথায় বলি। কিথ' আমার দেখা অসাধারন একজন টিচার। তার ফ্রেন্ডলি টিচিং রীতিমত আমাদের মুগ্ধ করেছিল। কত গল্প সে আমদের সাথে করেছে....এমনকি তার জাপানীজ্ গার্লফ্রেন্ড নিয়ে।
এতটুকু পড়ার পরেও শিরোনামের সাথে মিল খোজে পাচ্ছেন না তাই তো...? ধৈর্য রাখুন, এ তো গেল নায়কের(ইমন) পরিচয়পর্ব। তারপর....
জাহিদের সাথেই আমার সবচে ভাল বন্ধুত্ব। আমরা দুজন চট্টগ্রামের বলেই হয়ত। আমি আর জাহিদ সব সময় একসাথে কলেজে যেতাম। কলেজে গেলে আমরা অনেকক্ষণ ইন্টারনেটে বসে থাকতাম। কাজের কাজ কিছুই না, সারাদিন খালি চ্যাট করতাম।
তারপর, জাহিদের ভালবাসার গপ্পো শুনতাম। এদের প্রেম কাহিনী তো প্রথমে আমি বিশ্বাস'ই করিনি। তার গার্লফ্রেন্ড থাকে ম্যানচেষ্টারে। মেয়ে বাঙ্গালী মাগার এখানকার born and brought up, যে বাংলাদেশেই যায়নি কখনো। সেই পূর্বের চট্টগ্রাম থেকে সাত সমুদ্র তেরো নদীর এপারের ম্যানচেষ্টার। তাহলে, এটা কিভাবে সম্ভব?
ধীরে ধীরে শুনেছি সেই অসম্ভবের গল্প। ইন্টারনেটে পরিচয় হয়েছিল ওদের। পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব, তারপর ভাল লাগা, ভাল লাগা থেকে ভালবাসা। এভাবে চলে তিন বছর।
তার ইন্টারনেট প্রেমের গপ্পো শুনে আমি কেন জানি কৌতুহলী হয়ে উঠলাম। ভাবতাম ইস্ আমি যদি করতে পারতাম। এরপর থেকে সারাদিন ইন্টারনেটে বসে থাকতাম। তারপর একদিন 'বিডিচ্যাট' নামের সাইটে গিয়ে যেসব ফিমেল নিক দেখেছি র্যানডম 'হাই/হ্যালো' বলা শুরু করলাম।
আমার advisor হিসেবে পাশে ছিল জাহিদ। সে ছিল 'চ্যাট এক্সপার্ট'। একজনের সাথে ভালই কথা বলে যাচ্ছি...নিক ছিল 'মেঘলা'। মেঘলা নিকের অন্তরালের রমনীর নাম 'নিশা'। আসলে রমনী নাকি রমন(ছেলে) সেটা কিভাবে বুঝব। এ কোন জটিলটায় পড়লাম....। যাইহোক আপাতত নিশা'র নেশায় মগ্ন প্রেমিক ইমন। তারপর
তারপর.....আগামীকাল দেখুন।
চলবে...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

