প্রথম পর্ব
(পূর্ব প্রকাশের পর)
বোনের দিকে তাকাতেই মাসুদ চমকে উঠে....
ফুল হাতে দাড়িয়ে আছে শিউলি।
সে ভাবছে, মেয়েটা এখানে আসল কি করে?
দুই মিনিট চায়ের কাপ হাতে দাড়িয়ে থেকে তার বোন ভাইয়া...য়া চাআ আ আ.....বলে চেঁচিয়ে উঠে।
: হা করে কি দেখছ?
: না কিছু না।
কই শিউলিকে দেখছি না তো (সে মনে মনে নিজের সাথে কথা বলে)
তার বোন 'রেখা' আস্তে করে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে পড়ার রুমে চলে যায়।
মাসুদের একটিমাত্র বোন। ক্লাস সিক্সে পড়ে। পড়ালেখায় সে নিয়মিত।
এই বয়সেই সারাদিন পড়ার টেবিলে বসে থাকে।
(বোনকে নিয়ে একদিন লেখার ইচ্ছা আছে)
৪.
সে মেয়েটিকে নিয়ে আবার ভাবতে থাকে।
তার মা বাবা কি বেঁচে আছে?
বেঁচে থাকলে সে ফুল বিক্রী করছে কেন?
শিউলি যদি আমার বোন হত কিংবা আমার বোন শিউলি?
তাহলে কি তার বোন তাকে জিন্স ধরে বলত....ভাইয়া একটা ফুল কিনেন না।
আর শিউলি এভাবে বলত ভাইয়া চা......
ধ্যাৎ, আমার বোন ফুল বিক্রী করতে যাবে কেন?
কি সব চিন্তা করি।
কিন্তু শিউলিকে কেন এই বয়সে ফুল বিক্রী করতে হচ্ছে?
শিউলির সাথে আরেকটু কথা কি বলতে পারতাম না?
আচ্ছা, আর কি দেখা যাবে না তাকে?
মেয়েটির জন্য আমি কি কিছু করতে পারি না....ইত্যাদি ?
কিছুদিন ধরে মাসুদের মন মেজাজ ভালো ছিল। সেদিন রুমি তার সাথে অনেকক্ষণ কথা বলেছে। এটাই তার মন ভালোর কারণ। রুমিকে তার ভাল লাগে। সে নিজেই বুঝতে পারে এই ভাল লাগা ভালবাসাতে রুপ নেবে না। কারণ কাউকে ভালোবাসার সাহস তার নেই। তবে এই একটু কথা বলতে পেরেই সে আনন্দিত।
কিন্তু, হঠাৎ এমন লাগছে কেন?
এখন কিছুই ভালো লাগছে না। কম্পিউটারে এক এক করে তার প্রিয় সব গান বাজতে থাকে....'স্বপ্নহারা', 'সুরের টানে', 'যেদিন চলে যাব' থেকে শুরু করে 'তবে বন্ধু নৌকা ভেড়াও'।
এখন কোনটাই ভাল লাগছে না তার।
হঠাৎ একটা গান বেজে উঠে.....'নিষ্পাপ আমি, কি করে বলিস, কি করে বলিস কোন অন্যায় আমি করি নাই......'
এই গানটিই এখন মাসুদের ভাল লাগছে।
গানের আওয়াজের সাথে সাথে মাসুদের মনে একটি অপরাধবোধের জন্ম হচ্ছে। তার কিছুই ভাল লাগছে না।
মেয়েটির নির্দোষ চেহারা সে কিছুতেই ভুলতে পারছে না।
সে নিজের আত্নার সাথে অনেক কথা বলতে থাকে।
একটি অবুঝ শিশুর জন্য কিছু করতে না পারার অপরাধবোধ তাকে গ্রাস করছে।
আগামীকাল কলেজ আছে। তারপর আবার হুমায়ুন স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তে যেতে হবে।
তারপর গেলে কি মেয়েটিকে পাওয়া যাবে?
৫.
এসব ভাবতে ভাবতে মাসুদের আজ পড়তে বসা হয় না।
অনেক পড়া ছিল। এস.এস.সি'তে চট্টগ্রাম বোর্ড থেকে থার্ড স্ট্যান্ড করে সে এই কলেজে (ক্যান্ট.পাবলিক কলেজ) ভর্তি হয়েছে।
মাসুদের অনেক ইচ্ছা ছিল চট্টগ্রাম কমার্স কলেজে পড়ার। কিন্তু বাবার অনিচ্ছাতে তার ইচ্ছাটুকু ঠাঁই পায়নি। কমার্স কলেজের 'রাজনীতি'ই ছিল বাবার অনিচ্ছার একমাত্র কারণ।
দু'টি কারণে 'চট্টগ্রাম কমার্স কলেজ' তার ভাল লাগত।
প্রথমত; এই কলেজটি শুধুমাত্র কমার্সের জন্য, দ্বিতীয়ত; কলেজের অসাধারণ রেজাল্ট। এমনও হয়েছে চট্টগ্রাম বোর্ডের বিশজন স্ট্যান্ডের মধ্যে আঠারো'জনই কমার্স কলেজের স্টুডেন্ট।
যাইহোক, ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজে ভর্তি হয়ে তার খুব একটা মন খারাপ হয়নি। সব টিচাররা তাকে অনেক পছন্দ করে।
অবশ্য ক্লাসের সবাই মাসুদকে পছন্দ করে।
ভাল স্টুডেন্ট হওয়ার এই একটাই লাভ, সবাই তার বন্ধু হতে চাই।
আসলে সবাই তার বন্ধুত্বকে নয়, তার নোটের বন্ধুত্ব চাই। কেউ নোট চাইলে সে কখনো না করতে পারে না।
কলেজে শান্ত ও অনেক ভালো স্টুডেন্ট। সে গরীবউল্লাহ সরকারী স্কুল থেকে স্ট্যান্ড করেছে। কিন্তু কেউ তার কাছে নোট চাইতে যায় না। সবার কাছে সে স্বার্থপর হলেও মাসুদের কাছে মনে হয় না। শান্ত'র কাছে নোট' চাওয়ার দরকার পড়েনি বলেই হয়ত। আসলে দরকার না পড়লে মানুষকে চেনা যায় না।
৬.
হঠাৎ মা'র ডাক....মাসুদ খেতে আয়।
: মা আসি
সবাই খেয়েছে?
: হুমম... তুই ছাড়া সবাই খেয়েছে
: তুমি?
: না, আমি পরে খাব
: এইমাত্র তুমি বললে সবাই খেয়েছে, এখন বলছ তুমি খাওনি
: আমি আজকে খাব না, তুই খেয়ে নে।
: তুমি খাবে না আমি খাব এটা কেমন কথা?
: আমার শরীরটা ভাল যাচ্ছে না
: কেন? আজকে ওষুধ খাওনি?
আচ্ছা, মা তুমি এমন কেন?
নিজের প্রতি এত অবহেলা কর কেন?
এখুনি প্লেট নিয়ে আস।
: আচ্চা আসছি, তুই শুরু কর সব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
মাসুদের খেতে ভাল লাগছে না। গরুর মাংস মাসুদের অনেক প্রিয়।
কিন্তু আজ কচু শাক, পেঁপে ভাজি, গরুর মাংস কোন কিছুতেই রুচি নেই।
হাত ধুয়ে মাসুদ খাওয়ার টেবিল থেকে উঠে যাচ্ছে এমন সময় মা চেঁচিয়ে বলে
: কি হয়েছে, উঠে গেলি কেন?
: আর খাব না।
: শরীর খারাপ করেছে নাকি?
: আরে না, এমনি খেতে ভাল লাগছে না।
দেখি দেখি বলে মাসুদের মা তার কপালে হাত দেয়.....
: কই জ্বর তো দেখি না
: আচ্ছা, আমি কি বলেছি আমার গায়ে জ্বর আছে?
: তাইলে.....
: মা, তুমি এখন রুম থেকে যাও তো
আমার অনেক পড়া আছে।
পড়ার কথা শুনলে মা আর তেমন কিছু বলে না।
রুমের দরজা বন্ধ করে সে আবার চিন্তা করতে থাকে।
মাসুদের একটা কথা মনে পড়ে। অনেক ছোট থাকতে বাবা বলেছিল।
: ধর, একটা বিলের পানি শুকিয়ে গেছে, পানির অভাবে অনেকগুলো ছোট ছোট মাছ মরে যাচ্ছে, এমতবস্থায় মাছগুলোকে বাঁচানো তোমার কি উচিত না?
: বাবা, অনেকগুলো মাছ আমি কিভাবে বাঁচাবো?
: আচ্ছা, তুমি কি একটা মাছ ও বাঁচাতে পারবে না?
: তা পারব না কেন
: তাহলে তুমি সেটাই করবে। একটা মাছ অন্তত বাঁচবে।
: হুমম।
ছোট বয়সে 'হুমম' বলে মাথা ঝাঁকানো অনেক সহজ ছিল।
৭.
না, কালকে যেভাবেই হোক মেয়েটির সাথে দেখা করব। কিছু করতে পারব কিনা জানিনা তবে চেষ্টা তো করে দেখতে পারি। সতেরো বছরের ছেলে মাসুদ আর কি-ই-বা করতে পারে? সে কোন রোজগার করে না। অবশ্য করতে হয় না। এই বয়সে খুব কম ছেলেরাই কাজ টাজ করে। বিদেশে হলে সে ভিন্ন কথা। তার মামাতো ভাই সাহেদের কাছে সে শুনেছে বিলেতে নাকি ছেলেমেয়েদের বয়স আঠারো হতেই বাবা-মার বাসা থেকে বের হয়ে যায়। নিজেদের জীনবকে নিজেরা গড়ে। এটা অবশ্য সে মেনে নিতে পারে না। বাবা-মা'র সাথে থাকলে কি নিজের জীবনকে গড়া যায় না? এটা তার কাছে নিতান্তই স্বার্থপরতা মনে হয়। অন্তত সে কখনোই ভাবতে পারেনা বাবা মা'কে ছেড়ে আলাদা হয়ে যাওয়াটা।
সাহেদের কথা এটা নাকি ওদের 'কালচার'। মাসুদ মনে মনে বলে এরকম 'কালচার' এর গোষ্ঠী মারি।
কালকে রাশেদা ম্যাডামের একটা ক্লাস টেষ্ট আছে। একটু ও পড়ে না গেলে মান ইজ্জত কিছু থাকবে না। এসব চিন্তা করতে করতে 'ব্যবসায় নীতি ও প্রয়োগ' বইয়ের পৃষ্টা উলটানো শুরু করে।
চলবে.....
তৃতীয় পর্ব
(দেরীতে দেওয়ার জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আসলে কাজ থাকায় ইন্টারনেটে বসা হয়নি। পড়ার জন্য ধন্যবাদ।)
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মে, ২০০৮ ভোর ৬:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



