প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পর্ব
তৃতীয় পর্ব
পূর্ব প্রকাশের পর:
মাসুদের কথা শুনে শিউলি অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
১২.
রাস্তায় বের হওয়ার পর থেকে তার এই ছোট জীবনে সে অনেক মানুষকে দেখেছে। অনেকের কাছে মিনতি করে বলেছে 'একটা ফুল কিনেন না'। কেউ কেউ তার দিকে খারাপ দৃষ্টিতে থাকিয়েছে। কেউ ধমকের সুরে বলেছে 'যা সর্ কইলাম যত্তসব ভিক্ষুকের জাত'। সে কারো কথাতে কখনো রাগ করেনি শুধুমাত্র 'ভিক্ষুক' শব্দটি সহ্য হয়না। কেনই'বা সহ্য হবে সে তো ভিক্ষা করছে না। তাহলে মানুষ কেন তাকে ভিক্ষুক বলবে?
না, তারপরও সে রাগ করে কাউকে কিছু বলে না। তার যেভাবেই হোক ফুল বেঁচতে হবে। হয়ত ভোঁতা হয়ে গেছে তার অনুভূতিগুলো কিংবা সে রেখে এসেছে পাহাড় ঘেষে দাড়িয়ে থাকা বস্তিটায়।
এই প্রথম কেউ তাকে নাম ধরে ডেকেছে, সে কেমন আছে জানতে চেয়েছে। ছেলেটির নাম সে জানে না। সে মাসুদকে আগে দেখেছে কিনা সেটাও মনে করতে পারেনা। নাম না জানা কেউ একজন তার শিউলি নামটি মনে রেখেছে ভাবতে তার ভালই লাগছে।
কিন্তু, সে বুঝতে পারছেনা পরিস্কার জামা কাপড় পড়া ছেলেটি তার বস্তিতে যেতে চাচ্ছে কেন?
তার ছোট মনের চিন্তা তাকে আজ কোন সাহায্যই করছেনা।
বেশ কিছুক্ষণ মাসুদ দাড়িয়ে থাকার পরে.....
: শিউলি, আমি তোমার বাবার সাথে দেখা করব।
কিন্তু, তুমি না চাইলে যাব না।
কি আমাকে নেবে না?
সে কি বলবে বুঝতে পারছেনা তারপরও হুমম বলে সাঁয় দেয়।
তারপর শিউলিকে অনুসরণ করে মাসুদ বস্তির দিকে পা বাড়ায়।
মাসুদকে বস্তির কাছাকাছি আসতে দেখে অনেকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে।
১৩.
শিউলির বাবা মাটিতে শুয়ে ছিলেন। কেউ একজন আসছে বুঝতে পেরে রোগা শরীর নিয়ে উঠে বসার চেষ্টা করেন।
শিউলির বাবা: কে?
: স্লামালাইকুম চাচা
: আপনি কে? কেন এসেছেন?
চাচা আপনাকে দেখতে এসেছি বলে মাসুদ মাটিতে বিছানো পাটিতে বসে পড়ে।
চাচা আপত্তি করেননা।
ইতিমধ্যে শিউলি আবার ফুল বেঁচতে চলে যায়।
: চাচা, কেমন আছেন?
: বাপজান ভাল না। আপনারে তো চিনলাম না..।
: আমার নাম মাসুদ। সামনের কলেজে পড়ি।
আপনি আমাকে তুমি করে বলেন।
তারপর, বেশ কিছুক্ষণ কেউ কোন কথা বলে না।
মাসুদ কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। সে রীতিমত ঘামছে।
: চাচা আমি আসাতে আপনি কিছু মনে করেননি তো?
চাচা এবার চিন্তায় পড়ে গেলেন।
অপরিচিত একটা ছেলে তার কাছে কেন এসেছে?
আবার এটাও ভাবছে বস্তিতে তো কেউ কারো খবর রাখেনা।
এই ছেলেটি তাকে দেখতে এসেছে, চাচা বলে ডাকছে এতে অসন্তুষ্ট হবার তো কিছু নেই। তাছাড়া, ছেলেটি দেখতে ভদ্রঘরের ছেলেই মনে হচ্ছে।
: বাপজান তুমি আইছ খুশী হইছি।
চাচাকে অসুস্থ দেখে মাসুদ জিগ্গেস করে
: আপনি কতদিন ধরে অসুস্থ?
: বাবারে একবছর ধরে এভাবে আছি। এক পা অবশ হয়ে গেছে। কিছু করতে পারিনা। এর আগে কেউ তার কথা শুনতে চাইনি হয়ত তাই মাসুদকে পেয়ে চাচা তার বেদনাময়ী জীবনের করুণ কাহিনী বলা শুরু করেন।
বউ ও এক মেয়েকে নিয়ে ভালই চলে যাচ্ছিল তার ছোট্ট সংসার। ট্যাক্সী চালিয়ে যা আয় করতেন তা দিয়ে একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। একমাত্র মেয়েকে নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন ছিল। তাই তাকে পড়ালেখা করাচ্ছিলেন। নিম্নবিত্ত পরিবারের সুখী সংসার বলতে যা বুঝায়, সবই ছিল। বিধাতার কাছে তার কোন অনুযোগ ছিলনা। তারপর হঠাৎ একদিন সব কিছু এলোমেলো হয়ে যায়।
১৪.
সেদিন শিউলির মা অন্যান্য দিনের মতই রাতের খাবার নিয়ে অপেক্ষাই ছিল। রাত দশটা বেজে এগারোটা হয় কিন্তু দরজাই টোকা পড়েনা। দেখতে দেখতে বারোটা বাজে। শিউলি কবেই ঘুমিয়ে পড়েছে। শিউলির মা এবার চিন্তা না করে পারে না। রাত যত গভীর হয় শিউলির মার টেনশন বাড়তে থাকে। মানুষটা তো এভাবে কখনো দেরী করে ঘরে ফিরেনা। তাহলে আজ কেন দেরী হচ্ছে?
কোন দুর্ঘটনায় পড়েনি তো?
এভাবে চিন্তা করতেই বুকের ভিতরটাই মোচড় দিয়ে উঠে।
কিসের যেন আওয়াজ পেয়ে দরজা খোলে আঁতকে উঠে শিউলির মা। হঠাৎ করে ঠান্ডা দমকা হাওয়া মুখে লাগে। দমকা হাওয়া কিসের আলামত দিয়ে গেল?
বাইরে কেউ নেই দেখে দরজা বন্ধ করে দেয় শিউলির মা।
ঘুমহীন রাত শেষে সকাল হয়ে যায়। তারপর খবর আসে শিউলির বাবা হাসপাতালে। একটি বাসের ধাক্কায় চুরমার হয়ে যায় একটি ট্যাক্সী। দুমড়ে মোচড়ে যাওয়া ট্যাক্সীর ভিতরে ছিলেন শিউলির বাবা। তারপর গ্গান ফিরে নিজেকে আবিস্কার করেন হাসপাতালের বেডে। সেদিন ট্যাক্সীর সাথেই চুরমার হয়ে যায় চাচার সুখের সংসার। চিকিৎসা, ওষুধের খরচ দিতে দিতে নিঃস্ব হয়ে যান। বেশ কয়েক মাসের ভাড়া বকেয়া হয়ে যায়। তারপর চাচার ঠিকানা হয় এই বস্তিতে।
১৫.
তোমার চাচী মানুষের বাড়ী বাড়ী কাজ করে সংসার চালায়। মেয়েটা স্কুলে যেতে চাই কিন্তু যেতে দিতে পারিনা। আমি ওদের জন্য কিছু করতে পারলাম না। মরে গেলে শান্তি পেতাম বলে চাচা কেঁদে উঠেন।
চাচার কথা শুনে মাসুদের ভেতরটা হু হু করে কেঁদে উঠে। জলে টলমল চোখ নিয়ে সে উপরের দিকে থাকায়।
তার চোখের জল গড়িয়ে মাটিতে পড়বে বলে বলেই হয়ত কিংবা বিধাতার কাছে তার কিছু জানতে চাওয়ার আছে।
হতে পারে দুটোই।
মানুষের দুঃখ দেখতে মাসুদের একদম ভাল লাগেনা। এমনকি পত্রিকায় মানুষের দুঃখ কষ্টের কথা পড়লে তার চোখ জলে ভিজে যায়।
এমন অবস্থায় তো সে আগে কখনো পড়েনি। মাসুদ কি করবে বুঝে উঠতে পারছেনা।
সে জিন্সের পকেটে হাত দিয়ে একটা পাঁচশত টাকার নোট বের করে চাচাকে রাখতে অনুরোধ করে। প্রথমে নিতে না চাইলেও শেষ পর্যন্ত তার এমন মিনতি দেখে অনুরোধ ফেলতে পারেন না।
এই মাসের হুমায়ুন স্যারের টাকা দিবে বলে সে আব্বুর কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছিল।
বাসায় এসে রুমের দরজাটা বন্ধ করে শুয়ে পড়ে। একটি সংসার ভেঙ্গে যাওয়ার করুণ কাহিনী তার মাথায় ঘুরপাক করে। সে কিছুতেই ভুলতে পারেছে না।
এখন সে কি করবে?
চলবে.....
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মে, ২০০৮ ভোর ৬:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



