somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমি তুমি তোমরা, সবাই মিলে প্রত্যেকটা শিশুকে হত্যা করছি

১৭ ই জুলাই, ২০১২ সন্ধ্যা ৭:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১।
এবার রাজশাহীতে যাওয়ার পর বেশ কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে, আমার খালাতো ভাই রিজভী তার ইংরাজী খাতা এনে আমার কাছে দিল, পাতায় কিছু শব্দ লেখা ছিল ছোট ভাই এর ভাঙ্গা ভাঙ্গা হাতের লেখায় শব্দগুল কে অত্যন্ত অপরিপক্ক মনে হচ্ছিল, যে শব্দগুলা লেখা ছিল সেগুলার কিছুর অর্থ আমি নিজেও জানিনা, আর যেগুলো পরিচিত ছিল সেগুলো শিখেছি ভারসিটিতে উঠে আর সেগুলোর সাধারনত ব্যবহার হয় প্রফেশনাল পর্যায়ে। ক্লাশ ওয়ানে পড়া ছোট ভাই এর খাতায় এসব শব্দ দেখে আমি অবাক হলাম। তাকে জিজ্ঞেস করলাম তুমি এগুলা জান কিভাবে?

সে বলল , এগুলো আমাদের স্যরেরা পড়ায়। তারপর সে প্রশ্ন করল ভাইয়া, এগুলা আমার কোন কাজে লাগবে? এই শব্দগুলা আমি কোথায় ব্যবহার করবো?

আমি উত্তর দিতে পারিনি, আমি শুধু হা করে তার দিকে তাকায় ছিলাম।

ছয় বছরের একটা শিশু, তার ভিতর কি ঝড়টাই না বয়ে যাচ্ছে তার শিক্ষার মান নিয়ে!! আমাদের শিক্ষা ব্যাবস্থা আসলে কতটা বাস্তব সম্মত? আদৌ কি কিছুটা বাস্তব সম্মত?

২।
তার কিবোর্ড আর মাউস নষ্ট হয়ে গেছে।তাকে নিয়ে আমার আর রিমনের (আমার সমবয়সী ভাই) কিবোর্ড কিনতে যাওয়ার কথা। সকালে সে স্কুলে গেছে, সুতরাং সকালে যাওয়া সম্ভব না, মা খালার কাছ থেকে খোজ নিয়ে শুনলাম রিজভী একটা কোচিং এ পড়ে আর ওর ক্লাসমেট রা নাকি দুইটা কোচিং এ পড়ে, আবার দুই তিনটা প্রাইভেট টিউটর এর কাছে পড়ে। দুপুরে শুনলাম ভাত খেয়েই কোচিং ক্লাশে গেছে, তাই দুপুরেও সম্ভব হলো না, সন্ধায় সে বাসায় ফিরল কোচিং থেকে, ফ্রেশ হউয়ার পর তাকে বললাম চল মার্কেটে যাই।
সে বলল ভাইয়া আমার অনেক হোমওয়ারক আছে, এক ঘন্টা আমি হোমওয়ারক করে নেই তারপর যাই? নইলে শেষ হবেনা।

আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম তার আচরনে!! তাকে অনেক আগে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, এতো পড়াশোনা না করলে কি হয়? একদিন হোমওয়ারক না করলে কি হবে?
সে বলেছিল তাইলে ফার্স্ট হতে পারবো না। তোমাদের মত ভাল যায়গায় থাকতে পারবোনা।

আমার ভীষণ অপরাধবোধ জেগেছিল, একটা বাচ্চাকে তার নিজস্ব সময়টুকুও দিচ্ছি না। যে বিকালটা একান্ত তার হউয়ার কথা, যে বিকালে তার ক্রিকেট ব্যাট বল নিয়ে বন্ধুদের সাথে 'বিশ টাকার' কাপের ম্যাচ হউয়ার কথা, সেই বিকালটাও তাকে বই ভরতি ব্যগ বয়ে বেড়াতে হয়। যেদিন ঝড় ওঠে সেদিন ওরা ঘুড়ি ওড়ায় না, বা আম কুড়ায় না, সময় পাওয়াতে বেশি করে হোম ওয়ার্ক করাই। যে সময়টা সে ভাত খায় সে সময়টা শুধু তার কার্টুন বা মুভি দেখার সময়। মুভি কে ভাতের ডেজারট হিসেবে খাওয়াই তাদের আমরা।
তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেই ফার্স্ট হতে হবে ফার্স্ট হতে হবে। ফার্স্ট না হলে কোন মুল্য নাই পৃথিবীতে, লক্ষ লক্ষ শিশু ফার্স্ট হউয়ার পিছনে দৌড়াচ্ছে। তাদের ভিতরে মানসিকতা তৈরি করি আমি ফার্স্ট না আমি ভালনা, আমি ফার্স্ট আমি ভাল। তাদের গল্পের বই পড়ার বা মুভি দেখার সময় দেই না, তাতে যে হোম ওয়ার্ক হবে না!! সমাজ তার জন্য একটা সরু গলি তৈরি করে দিয়েছে, তাকে সেই গলি দিয়ে দৌড়াতে হবে, অন্ধের মত দউড়াতে হবে, আকাশ দ্যাখার সময় নাই, আকাশের দিকে তাকানো যাবে না, তাহলেই হোঁচট খাবে।

৩।
আমার চাচাতো বোন প্রমি ক্লাস থ্রী তে পড়ে, সে রাতে আমার কাছে ইংরাজী বই টা নিয়ে এসে প্রশ্ন দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল
দাদা এটা কিভাবে পড়বো?
আমি দেখলাম প্রশ্নটা অত্যন্ত চমৎকার, ক্রিয়েটিভ এবং শিক্ষনীয়। প্রশ্নটা এমন-
তুমি তোমার শিক্ষকের কাছ থেকে একটা রহস্যগল্প শুনতে চাও, এখন তোমাদের কথোপকথন লেখ। একটা শিশুর বিকাশের জন্য চমৎকার একটা প্রশ্ন, শিশু তার মন কে উন্মুক্ত করে কল্পনা করবে তার এবং তার শিক্ষকের কথপোকথন এর দৃশ্য। আমি প্রশ্ন টা দেখেই খুশি হয়ে গেলাম।
তারপর তাকে জিজ্ঞেস করলাম তুমি এই প্রশ্ন পড়বা কেন, নিজে থেকে লেখ- এগুলা পড়ার জিনিস না।
সে বলল- নিজে থেকে কিভাবে লিখব?
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কিভাবে লিখবা মাস্টার সেখাইনি?

সে বলল না , ম্যাডাম কয়েকটা লিখে দিয়েছেন, সুগুলা মুখস্ত করেছি, এটা ম্যাডাম লিখে দায়নি।
আমি আকাশ থেকে পড়লাম!! কি লাভ এমন চমৎকার একটা সৃষ্টিশীল প্রশ্ন দিয়ে? যদি তা মুখস্তই করতে হয়!!
যাহোক, আমি তাকে বোঝালাম কিভাবে কথোপোকথন লিখতে হবে, এটা লেখার জন্য কিভাবে তার চিন্তা এবং কল্পনাকে প্রসারিত করতে হবে। তারপর বললাম তুমি নিজে এটা লেখ তারপর আমাকে দ্যাখাও।
সে লিখে নিয়ে আসলো, কিন্তু মন খারাপ করে নিয়ে আসলো, আমি তার লেখা পড়লাম।
বললাম চমৎকার হয়েছে, মন খারাপ কেন?
সে বলল - দশ লাইন হয়নি যে!!
আমি- দশ লাইন হয়নি মানে? আমি বুঝলাম না।
সে তখন আমাকে বুঝিয়ে দিল- যে কথোপকথন লেখায় দশ মার্কস থাকে, তাই দশ লাইন লিখতে হয় নিম্নে।
!!! কি অদ্ভুত ব্যবস্থা!! একটা শিশুর সৃষ্টিশীলতার মান নির্ণয় করা হচ্ছে লাইন গুনে!! তার লাইন দশটা না হলে তার লেখা ভালো হবে না?

৪।
আমি আমার বাসার কুকুরের সাথে খেলছি, শুনলাম চাচী প্রমি কে পিটাচ্ছেন আর চিৎকার করছেন, কি হয়েছে দেখার জন্য গেলাম। ঘটনা এরকম যে চাচী প্রমিকে একটা কবিতা মুখস্ত লিখতে দিয়েছেন, প্রমি সেটা ভুলে গেছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম কবিতা মুখস্ত করতে হবে কেন, বলা হল পরীক্ষার খাতায় কবিতা মুখস্ত লিখতে বলে। যে দেশে ও ভাষায় রবীন্দ্র, নজরুল, সুকান্ত, জীবনানন্দ, মলয়, শামসুর রহমান, গুন, এর মত কবিদের জন্ম সে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কবিতা মুখস্ত করতে হয়!!! কবিদের আত্মহত্যা করা বাকি আছে এখন!! আমি চাচী কে বোঝানোর চেস্টা করলাম, কবিতা মুখস্ত করার জিনিস না, কবিতা অনুধাবন করার জিনিস, ও মুখস্ত করতে পারছে না এটাতে ওর সমস্যা না। চাচী সব বুঝলো কিন্তু এক্টাই কথা, পরিক্ষার খাতায় লিখতে দিলে তখন কি করবে, এম্নিতেই প্রথম সাময়িকী পরীক্ষায় সেকেন্ড হয়েছে, এবার ফার্স্ট হতেই হবে। !!!!

৪।
আমার ভাই রিমন, সে বলল আমাকে ছোট বেলা থেকে বলা হতো 'রিমন কে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার বানাবো' কিন্তু আমার কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হউয়ার সখ ছিল না কখনো। আমার ভিতরে ধিরে ধিরে শব্দটার প্রতি ভয় তৈরি হলো। একটা সময় এমন হয়েছিল যে আমি কম্পিউটার দেখলেই ভয় পেতাম, এই ভয়ে দীর্ঘদিন আমি কম্পিউটার ধরিওনি!!
সুখবর হচ্ছে, আমার ভাই কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হয়নি, সে চার্টার্ড একাউন্টেন্ট হয়েছে। :)
কিন্তু তার ভেতরে যে ভয়টা ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল, সেটা এখনো তাকে তাড়ে। যাহোক, ছোটভাই রিজভীর সিলেবাস দেখে বলেছিল, 'আমি আমার ভাইকে স্কুলে পড়াবোনা, তার স্কুল দরকার নাই, এইসব গাঁজাখুরি জিনিষ শেখানোর জন্য তো ভাইকে স্কুলে পাঠাচ্ছি না, ওর কোন স্কুল লাগবে না ওকে নিজেরা শেখাবো কিভাবে শিখতে হয়'
কিন্তু তা কি সম্ভব? সম্ভব হলেও কয়জন পরিবারের পক্ষে সম্ভব?
-
এভাবে আর কতদিন চলবে? আমার সময়, তোমার সময়, আমার বাবার সময়, এউ বাচ্চাদের সময় আদি থেকে চলে আসছে একই ব্যবস্থা। খালি ঘষে মেজে নতুন রঙ করা হচ্ছে এই যা। আমরা সামাজিক উন্নয়ন এর নামে মানুষের মাঝে যে যন্ত্রের প্রবেশ করাচ্ছি, মানসিক উন্নয়নের নামে মস্তিস্ককে প্যরালাইজড করে দিচ্ছি। আর কতদিন এভাবে চলবে? একটা মেরুদণ্ডহীন শিক্ষাব্যবস্থা কিভাবে জাতির মেরুদন্ড তৈরি করবে? আমাদের সমাজের এতো উঁচু মানুষ, এতো বুদ্ধিজীবী, এতো জ্ঞানী গুনি, তাদের কার কি বোধ হচ্ছে না? আমার তো মনে হয় না যে সবচেয়ে বেশি শিশু নির্যাতন হয় কলকারখানায় । বরং মনে হয় সবচেয়ে বেশি নির্যাতন হয় শিক্ষা ব্যবস্থায়, এমনকি শুধু নির্যাতন নয় এ ব্যবস্থা রীতিমত শিশু হত্যা করে, একটা শিশুর মানসিক বিকাশ কে বন্ধ করে দেয়ার অর্থই তাকে হত্যা করা নয় কি

মুল পোস্ট
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জুলাই, ২০১২ সন্ধ্যা ৭:০০
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×