মৌসুমী নিম্নচাপের প্রভাবে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে উপকূলের কয়েকটি জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রাণ হারিয়েছে এক শিশু। প্লাবিত হয়েছে উপকূলের দু'শতাধিক গ্রাম ও চর। পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটার সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সারাদেশের যোগাযোগ। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও মংলা সমুদ্র বন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে। সারাদেশের নদী বন্দরগুলোতে ২ নম্বর নৌ হুঁশিয়ারি সংকেত ঘোষণা করেছে আবহাওয়া অফিস।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্ন চাপটি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় খুলনার রায়মঙ্গল নদী আববাহিকা অতিক্রম করতে শুরু করেছে। শুক্রবার ভোর নাগাদ এটি উপকূলের দিকে উঠে ক্রমশ দুর্বল হয়ে যাবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্র। সাগরে সকল মাছ ধরার ট্রালারকে উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, মৌসুমী নিম্নচাপটি চট্টগ্রাম থেকে ২৯৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিম, কক্সবাজার থেকে ২৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিম ও মংলা সমুদ্র বন্দর থেকে ১৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছে। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আজ মধ্যরাতে নিম্নচাপটি খুলনা-বরিশাল অঞ্চল অতিক্রম করতে পারে। চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর সতর্কতা সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, জোয়ারের পানিতে কঙ্বাজার শহরের পশ্চিম কুতুবদিয়া পাড়ায় আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে লিজা মনি (১০) নামে এক শিশু মারা গেছে। নিম্নাঞ্চলীয় ৫০টির বেশি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
হুমকির মুখে পড়েছে কুতুবদিয়া দ্বীপের বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প। জানা গেছে, সবচে' বেশি ক্ষতি হয়েছে কুতুবদিয়া উপজেলায়। এখানে ৩টি ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা পানির নিচে রয়েছে।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহি অফিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মৌসুমী নিম্নচাপের প্রভাবে সৃষ্ট এ জলোচ্ছ্বাসে কুতুবদিয়া, ধলঘাটা ও টেকনাফে নির্মাণাধীন প্রতিরক্ষা বাঁধে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানান, পটুয়াখালীতে বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে থেমে থেমে বৃষ্টির সাথে দমকা বাতাস ও ঝড়ো হাওয়া বইছে। উত্তাল হয়ে ওঠেছে বঙ্গোপসাগর। সাগরে মাছ ধরার শত শত ট্রলার মৎস্য বন্দর আলীপুর-মহিপুর, ঢোশ এবং গলাচিপার চরমোন্তাজ ও মৌডুবির উপকূলে নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে পটুয়াখালীর অভ্যন্তরীণ সব রুটে লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে নৌ-বন্দর কর্তৃপক্ষ।
এদিকে জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে পটুয়াখালী শহরসহ নিম্নাঞ্চল। জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে শহরের রাস্তা-ঘাট, ঘর-বাড়ি ও দোকান-পাট। শহরের পুরান বাজার, চকবাজার, কাঠপট্টি, ফৌজাদারি পুল এলাকা, সদর রোড, লঞ্চঘাট, নিউমার্কেট এলাকার রাস্তায় ২-৩ ফুট পানিতে প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি অবস্থায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। স্বাভাবিকের চেয়ে ৪ থেকে ৫ ফুট পানিতে তলিয়ে গেছে পটুয়াখালীর শতাধিক চরাঞ্চল ও উপকূলীয় জনপদ।
অস্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে পটুয়াখালী-কুয়াকাটা মহাসড়কের কলাপাড়া, হাজিপুর ও মহিপুর এবং পটুয়াখালী-বরিশাল সড়কের লেবুখালী ফেরি ও পটুয়াখালী-বাউফল সড়কের বগা ফেরির গ্যাংওয়ে তলিয়ে গেছে। এর ফলে পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটার সঙ্গে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বেলা ১১টা থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ফেরির দুই পাড়ে আটকা পড়েছে পর্যটকদের গাড়িসহ অনেক যানবাহন। দুর্ভোগে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ।
পানিতে তলিয়ে গেছে ফসলি জমি। চরম দুর্ভোগে পড়েছে চরাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ। চর ওয়াডেল, পাতার চর, চর কুকরি-মুকরি, আন্ডার চর, মৌডুবির চর, জাহাজ মারার চরসহ উপকূলের শতাধিক চর প্লাবিত হয়েছে।
ভোলা প্রতিনিধি জানান, ভোলার মেঘনা ও তেতুলিয়া নদীতে বিপদসীমার অন্তত ২ থেকে আড়াই ফুট ওপর দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এতে ভোলার বেড়িবাঁধের বাইরের এবং বিভিন্ন চরাঞ্চলের হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ড-১ এর নির্বাহি প্রকৌশলী মো. হারুন উর রশিদ জানান, পূর্ণিমার প্রভাবে অতিরিক্ত জোয়ারের ফলে আজ বৃহস্পতিবার ভোলার মেঘনার বিভিন্ন পয়েন্টে জোয়ারের পানি বিপদ সীমার ২ থেকে আড়াই ফুট ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিনি জানান, দৌলতখান উপজেলার মেঘনা নদীতে বিপদসীমা হচ্ছে ৩ দশমিক ৪০ মিটার, কিন্তু সেখানে ৪ দশমিক ১০ মিটার ওপর দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবাহিত হচ্ছে। অপর দিকে খেয়াঘাট এলাকায় বিপদসীমা হচ্ছে ২ দশমিক ৯০ মিটার, কিন্তু সেখানে প্রায় ৩ দশমিক মিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে অতিরিক্ত জোয়ারের পানিতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ভোলার নিম্নাঞ্চলসহ অন্তত শতাধিক চরের কয়েক হাজার পরিবার।
টেকনাফ প্রতিনিধি জানান, পূর্ণিমার প্রভাবে সৃষ্ট জোয়ার ও প্রবল বর্ষণে টেকনাফ উপজেলার ২০টি গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ফলে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে সহস্রাধিক পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নারী শিশুসহ প্রায় ১০ হাজার মানুষ। অতি জোয়ারে প্লাবিত হয়ে নাফনদী সংলগ্ন চিংড়ি ঘের, রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেঙে গেছে বেড়িবাঁধের কয়েক কিলোমিটার অংশ। জালিয়া পাড়া, নাজির পাড়া, শাহপরীরদ্বীপ দক্ষিণ পাড়া বেড়িবাঁধের ভগ্নাংশ দিয়ে জোয়ারের পানিতে প্রতিনিয়ত কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়ে আসলেও এবার পূর্ণিমার অতি জোয়ারে টেকনাফ পৌরসভার জালিয়া পাড়া, চৌধুরীপাড়া, সদর ইউনিয়নের খাংকার ডেইল মৌলভীপাড়া, নাজির পাড়া, সাবরাং ইউনিয়নের মগপাড়া, আছারবনিয়া, ঝিনাপাড়া, নয়াপাড়া, শাহপরীরদ্বীপ জালিয়াপাড়া, দক্ষিণ পাড়া, পশ্চিম পাড়া, হ্নীলা ইউনিয়নের পূর্ব নাইক্ষ্যংখালী, হোয়াবরাং, জ্বলদাস পাড়া, পূর্ব লেদা, হোয়াইক্যং ইউনিয়নের উলুবনিয়া, লম্বাবিলসহ প্রায় ২০টি গ্রামের নিচু এলাকায় অস্বাভাবিকভাবে জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেয়েছে।
জারিয়াপাড়া, খাংকারডেইল, নয়াপাড়া, শাহপরীরদ্বীপ ঘুরে দেখা গেছে এসব এলাকার শত শত পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এসব এলাকার পানিবন্দি লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে জরুরি ত্রাণ ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা না হলে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। অপরদিকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় দ্রুত এসব এোকায় মেডিকেল টিম প্রেরণ হয়ে পড়েছে।
বরগুনা প্রতিনিধি জানান, গত কয়েকদিন ধরে বরগুনাসহ উপকূলীয় এলাকায় ঝোড়ো আবহাওয়া বিরাজ করছে। সাগর উত্তাল থাকায় হাজার হাজার ট্রলার নিরাপদ আশ্রয় রয়েছে। জোয়ারের পানি বেড়ে যাওয়ায় জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বেড়িবাঁধের বাইরের বাসিন্দারা বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছে।
জেলার আমতলী উপজেলার চাওড়া ইউনিয়নের পশ্চিম ঘটখালী গ্রামে ৫শ' মিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে ১০টি গ্রাম পানিতে প্লাবিত হয়েছে। নিম্নচাপ ও অস্বাভাবিক জোয়ারের কারণে পায়রা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বাঁধ ভাঙার ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয়রা জানায়।
নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ ও পূর্ণিমার প্রভাবে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বেড়িবাঁধ না থাকায় জোয়ারের পানি ডুকে ডুবে গেছে উপজেলার নিঝুমদ্বীপ, বয়ারচর, ক্যারিংচর, ঢালচর, দমারচর, নলেরচর, চরবাশার, জাহাজ্জারচর এলাকার অধিকাংশ ঘরবাড়ি। এতে ক্ষতি হয়েছে শতশত একর জমির ফসল। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বহু মানুষ। এলাকায় প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে উকূলের হাজার হাজার মানুষ। পানিবন্দি অনেক পরিবারের সদস্যরা সাইক্লোন সেন্টারে আশ্রয় নিয়েছে। জোয়ারের প্রভাবে কোনো কোনো এলাকার রাস্তার উপর দিয়ে ১০ ফুট পরিমাণ পানি প্রবাহিত হচ্ছে। দ্বীপের মোল্লা গ্রাম ও মুন্সিগ্রামে বাতাসের প্রভাবে বেশ কয়েকটি কাঁচা ঘরবাড়ি বিধস্ত হয়েছে। এসব এলাকায় কোনো আশ্রয় কেন্দ্র না থাকায় জনসাধারণ আতঙ্কে রয়েছে। বুধবার রাত থেকে শুরু হওয়া লঘুচাপে বৃহস্পতিবার রাত ৯টা পর্যন্ত উপকূলে ভারী বর্ষণ অব্যাহত রয়েছে।
হাতিয়া উপজেলা নির্বাহি অফিসার হারুন উর রশিদ জানান, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং করা হয়েছে।
(শীর্ষনিউজ)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

