আমরা অনেকেই বিভিন্ন মুভিতে ভ্যাম্পায়ার কিংবা রক্তচোষা টাইপের এক ধরনের মানুষের মত প্রাণী দেখি। যাদের কাজ হল মানুষের রক্ত পান করা। আমার কাছে হাসান সাইদকে এর চেয়েও জঘন্য মনে হয়েছে। মানুষ কতটা নীচে নামলে তার নিজের স্ত্রীর নাক কামড়ে দিতে পারে এবং চোখের ভিতর আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিতে পারে। ইট কাঠের খাচায় থাকা আমরা দিনে দিনে পশুতে পরিণত হয়ে যাচ্ছি।
যে জিনিসগুলো সাধারণত আমরা গ্রামে কিংবা দরিদ্র পরিবারগুলোতে দেখে থাকি বা শুনে থাকি, সেই জিনিসগুলো যখন সমাজের উপরের লেভেলে দেখা যায়, তখন বুঝা যায় যে, উচ্চ সমাজও কত পঙ্কিল এবং নোংরা। একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম, আমাদের সমাজে নারীরা বেশি মাত্রায় নির্যাতিত, এই জিনিসটি অনেকে মানতেই চান না। অথচ , নির্মম সত্য এটি। অস্বীকারের কিছু নেই।
এই ব্যাপারটি নিয়ে এই কয়দিনে ব্লগে জল কম ঘোলা হয়নি। অনেকেই বিষয়টিকে নানাদিকে ডাইভার্ট করে প্রচুর ডাল-পালা এবং শাখা-প্রশাখা গজিয়ে ফেলেছেন। এটা খুবই দু:খের ব্যাপার।
অনেকে আবার প্রশ্ন তুলেছেন, রুমানা ম্যাডামের সাথে যা হয়েছে, সমাজের অবহেলিত কারও সাথে হলেও এমন করে সবাই বিচার চায় কিনা? ব্যাপারটা আপনার-আমার উপরই। একটা বিষয় বুঝা উচিত, একই ধরনের ঘটনার সব কিছু নিয়ে কিন্তু একই ধরনের রিআ্যাকশন দেখা যায় না। এটি একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। যেমনটি হয়েছিল ফেলানিকে নিয়ে। সীমান্তে কিন্তু প্রতিনিয়তই মানুষ মরছে এবং আমরা শুনছি, দেখছি। কিন্তু আমরা কি প্রতিদিনই প্রতিবাদ করছি। না, করছি না। কিছু কিছু ঘটনা আমাদেরকে প্রতিবাদী হতে বাধ্য করে। এখানে দেখার তথা দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারও আছে। পাশাপাশি মিডিয়ার ভূমিকাও আছে। ফেলানীর ছবিটি যদি না প্রকাশ পেত , আমরা কিন্তু অতটা প্রতিবাদী হতাম না, যেমনটা হইনা প্রতিদিনই কোন না কোন সীমান্তে নিহত কৃষকের কথা শুনে। ঝড় সব সময় উঠে না, এটা আমরা সবাই জানি। ফেলানীর চেয়েও নির্মমভাবে মারার রেকর্ডও কিন্তু আছে। লাশ নিয়ে গিয়ে সেই লাশের উপর অত্যাচার করার কিংবা আহত কারও উপরে সিগারেট দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে খোচানোর রেকর্ডও আছে। এই প্রসঙ্গের অবতারনা করলাম শুধু এজন্যেই যে, প্রতিটা ঘটনা নিয়ে কিন্তু আমরা সরব প্রতিবাদ করি না, কিন্তু নীরব প্রতিবাদ ঠিকই করে যাই। তবে হ্যা, অসামঞ্জস্যতা যে নাই, তা নয়। কোন কোন ঘটনা মিডিয়া খুব বেশি হাইলাইট করে , আবার কোনটি অতটা হাইলাইটেড হয় না।
মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। এমন অনেককেই বলতে শুনলাম, এক হাতে তালি বাজে না, কিংবা ইরানী ছেলের সাথে পরকীয়া ব্লা ব্লা ব্লা। অদ্ভুত ! কার সাথে কার সম্পর্ক কিংবা পরকীয়া সেটা আমরা দেখব কেন? সেটা তাদের একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। তিনি যদি নৈতিকতাবর্জিত হন, তার জন্য তিনিই দায়ী। তার মানে এই নয় যে, হাসান সাইদ যা করেছে সেটাকে সঠিক বলে চালিয়ে দিব। কিংবা এটা দিয়ে ওটাকে ডিফেন্ড করব।
আবার কিছু এক্সট্রিম ফেমিনিস্ট আছেন, যারা সবজায়গায় পুরুষের দোষ খুজে বেড়ান। পুরুষ এটা করছে, পুরুষ ওটা করছে। সব দোষ পুরুষের। এটা কোন সমাধানের পথ নয়। চিৎকার -চেচামেচি করে আর যাই হোক, সহিংসতা দূর করা যায় না। আপনারা, বেশি বেশি নারীদের স্বাবলম্বী করে তোলার চেষ্টা করুন। তাদের আত্মমর্যাদাশীল করে কিভাবে তোলা যায়, সেগুলো ভাবুন। পয়েন্ট টু পয়েন্ট এগোন। "হেন করেঙ্গা-তেন করেঙ্গা" এমন অনকে কথাই গোলটেবিল বৈঠকে মাইক সামনে নিয়ে বলা যায়। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্র এত সহজ নয়।
পুরুষশাসিত / নারীশাসিত......এ ধরনের চিন্তা-চেতনাগুলো এখন অনেক কমে গেছে। নারীর জন্য সর্বদিক খোলা আছে। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অনেকে সেসকল জায়গায় যোগ্যতম হিসেবে অধিষ্টিত আছে। সামনে আরো পরিবর্তন হবে। সমস্যাটা বেশি হল দরিদ্র সমাজে। সেখানে নারী বেশি অসহায়। ওই জায়গাটায় কাজ করতে হবে বেশি।
রুমানা মনজুরের ঘটনাটা তন্ত্র-মন্ত্রের হিসেবে না ফেলে বরং সোজা চোখে দেখা উচিত। হাসান সাইদ অপরাধ করছে, তার শাস্তি প্রাপ্য। এবং অতি দ্রুত। এখানে পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থার ধুয়া না তুলে বরং আদালতের দিকে দৃষ্টি দেয়া উচিত। কেননা, আদালত যদি অপরাধীকে তার প্রাপ্য শাস্তি না দেয় তবে অন্য কেউ এই ঘটনা ঘটাতে উৎসাহী হবে। আদালতের চোখে তো সবাই সমান। যদিও এইটা শুধু আইনের বইয়েই লেখা আছে। বাংলাদেশে ঘটনার বিচার হয় মুখ দেখে। ক্ষমতার দাপটে বিচারের রায় পাল্টে যায়। বিচার ব্যবস্থা বিলম্বিত হয়। একটা ঘটনাকে নিয়ে বছরের পর বছর বিচার চলতে থাকে। আমাদের দেশের আদালত ব্যবস্থার কদর্যরূপটা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউ বলতে পারবে না। কি আসামীই হোক কি ভিক্টিমই হোক।
পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব আমাদের সমাজে আছে। বেশ ভালভাবেই আছে। এটা নিয়ে কোন দ্বিমত নেই। আমরা শিক্ষা গ্রহণ করি, শুধু সার্টিফিকেটের জন্যই। এর থেকে জীবনবোধ শিখি না, বিবেককে জাগ্রত করি না। আবার অন্যের ক্ষেত্রে ধর্মীয় নৈতিক মান খুজে বেড়াই, কিন্তু নিজের বেলায় সব ভুলে বসে থাকি। এই ধরনের দ্বিচারিতা আমাদের ত্যাগ করতে হবে। নারী-পুরুষ সবার অংশগ্রহণেই সুন্দর সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
নারীরা অবহেলার শিকার। নির্যাতনের শিকার। প্রতিনিয়ত নারীরা নির্যাতিত হয়ে যাচ্ছে। আমাদের চিন্তা-চেতনার পরিবর্তন না হলে, এটা কমবে না। সবাইকে সচেতন হতে হবে, সচেতন করে তুলতে হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

