এক-এগারোর প্রধান কুশীলব জেনারেল মইন এখন নিউইয়র্কে অবস্থান ভয়ঙ্কর এক সন্ত্রাসীর আশ্রয়ে। আমেরিকার পুলিশের খাতায় ঐ কুখ্যাত সন্ত্রাসীর নাম দীন এম রানা। পেশায় আতর ব্যবসায়ী। ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমান নিষিদ্ধ অস্ত্রসহ ধরা পরে জেল খাটেন রানা। বাংলাদেশের একসময়কার দন্ডমুন্ডের কর্তা জেনারেল মইন এখন এই রানা-র সাথে চলাফেরা করেন- এখানে সেখানে মিটিং করেন, ঘুরে বেড়ান, ডিনার পার্টি খেয়ে বেড়ান। আর পত্রিকায় নিউজ হয়- ক্যামোথোপি নিচ্ছেন।
জেনারেল মইন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন এমন খবর ছাপা হয় বাংলাদেশের সকল পত্রিকায় জুন মাস জুড়ে। মইনের ঘনিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, পুরো গল্পটাই বানোয়াট। গুরুতর অসুস্থতার খবরটি প্রচার করে দেশবাসীর সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করেছেন মইন। আর এতে করে সংসদীয় কমিটির ডাকাডাকি বন্ধ হবে। দু’সপ্তাহ আগে তার চিকিৎসা জালিয়াতির খবরটি আমাদের সূত্রে গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে জেনারেল সাহেব একটু চাপে পড়েন। অতঃপর যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ সংস্থা এনার লাভলু আনসারীকে পয়সা দিয়ে আবার অসুস্থতার ফলোআপ নিউজ করানো হয়। সে খবর ২৪ জুন তারিখে দৈনিক মানবজমিন ছাপে। ওই সংবাদে বলা হয়, দূর সম্পর্কের আত্মীয় চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে বাসায় রেখে কেমোথেরাপি দেয়া হচ্ছে মইনকে। এর আগে ফ্লোরিডায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। ইন্সিওরেন্স ছাড়া তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো হাসপাতালে ভর্তি হতে পারেন নি (বুঝুন, গাঁজাখোরি সংবাদের ধরন!)। তার স্পাইনাল কর্ডের নিচের অংশে ক্ষয় আর মেরুদণ্ডের শেষ প্রান্তে টিউমারের ধরা পড়ে। অপারেশন না করে কেমোথেরাপি দেয়া হচ্ছে।
মইনের অসুস্থতা ও চিকিৎসার গল্পটি খুবই সরল। কিন্তু সত্যটি বড় নির্মম। সূত্র জানিয়েছে, মইন নিউইয়র্কেই আছেন। চট্টগ্রাম নিবাসী জামান নামে এক পরিচিত ডাক্তার তাকে মেডিক্যাল সার্টিফিকেট দিয়েছেন- তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত। কিন্তু ওই সপ্তাহেই মইনকে দেখা গেছে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে। ৭১ নম্বর রোডস্থ জনৈক জুয়েলের বাসায় রাত্রে খানা-পিনা সেরেছেন দীন এ রানার সাথে। সাথে ছিলেন আরো দু’ব্যক্তি। এ খবর জ্যাকস হাইটসে অনেকের মধ্যে জানাজানি হয়ে যায়। ওদিকে এপ্রিলের শেষ দিকে জেনারেল মইন যান আটলান্টিক সিটিতে। বেলীজ ক্যাসিনোতে ৩ দিন জুয়া খেলে ১ লক্ষ ডলার উড়ান। তাকে দেখভাল করেন নোয়াখালীর আবু নাসর। তিনি সাউথ জার্সি মেট্রো আওয়ামী লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট। জানা গেছে, মাঝে মধ্যেই মইন ফ্লোরিডা থেকে প্লেনে করে আটলান্টিক সিটিতে এসে আনন্দ ফুর্তি করে যান।
altনিউইয়র্কে ডি এম রানাকে নিয়ে জেনারেল মইনের চলাফেরায় বাংলাদেশ কম্যুনিটিতে বেশ চ্যাঞ্চল্যের জন্ম দিয়েছে। কে এই রানা? খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০৫ সালের ১২ মে নিউইয়র্কের কুইন্সের গ্রান্ড সেন্ট্রাল পার্কওয়েতে চলন্ত গাড়িতে ষ্টেনগান ও লোডেড গানসহ নিউইয়র্ক পুলিশের হাতে ধরা পড়েন এক ব্যক্তি। তার নাম দীন এ রানা। তিনি “সাপ্তাহিক কাগজ” পত্রিকার চীফ এডিটর। তার সাথে আরো গ্রেফতার হন শহিদুল হক চৌধুরী নামে আরেক ব্যক্তি। পরে রানা-র কুইন্সের বাসা, ব্রুকলেনের অফিস, ও মার্সিডিজ গাড়ি থেকে বিপুল পরিমান অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করে ক্রিমিনাল মামলা করে নিউইয়র্ক পুলিশ। প্রাপ্ত অস্ত্রের মধ্যে ছিলো electronic dart gun, electronic stun gun, gravity knife, switchblades, pillum ballistic knife, metal knuckle knife, cane sword, bludgeon, metal knuckles, chuka sticks, sandbags, sand clubs, and wrist slingshots.
চট্টগ্রাম নিবাসী এই রানা ১৯৮০ সালে আমেরিকায় পাড়ি জমান। রাষ্ট্রপতির জিয়ার শাসনামলে সন্ত্রাস নির্মুলের অভিযানে তার জীবন বিপন্ন হয়ে উঠলে আমেরিকার ভিসা জোগাড় করে ফেলেন রানা। আমেরিকান সমাজে নিজেকে পরিচয় দেন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। মূলত দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আনা আতর ব্যবসা দিয়ে তার জীবন শুরু হলেও তিনি বর্তমানে বিরাট শিল্পপতি। আমেরিকা ও বাংলাদেশে রয়েছে তার নানান ব্যবসা। কক্সবাজারের হোটেল কক্সস ইন, রিগস গ্রুপের আওতায় কসমেটিক্স ও টয়লেটারিজ, মার্কেটিং, ফোর্সেস, হাউজিং, ইন, রিয়েলটি, এভিয়েশন, প্লাস মেনুফ্যাকচারিং, ক্লিনিং, হোটেল লেক ক্যাসেল, হোটেল ডি ক্যাসেল, হোয়াইট ক্যাসেল, মদিনা কর্পোরেশন, ডেল্টা সফট লিঃ, এনসিসি ব্যাংকের পরিচালক, ন্যাশনাল লাইফ ইন্সিওরেন্স ও ইসলামী জেনারেল ইন্সিওরেন্স, হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতাল ইত্যকার নানাবিধ ব্যবসায় নিজেকে জড়িয়েছেন ডি এম রানা। স্ত্রী লতিফা এ রানার সাথে একাধিকবার শেয়ার লেনদেন দেখিয়ে এনসিসি ব্যাংকের পারিচালক পদটি ধরে রেখেছেন তিনি। বাংলাদেশের প্রভাবশালী রাজনীতিক, সমাজের উচ্চবিত্ত ও সামরিক-বেসামরিক আমলাদের সাথে তার ওঠাবসা। বাংলাদেশ থেকে আমেরিকায় আগত হোমড়া-চোমড়ারা তার আতিথেয়তা গ্রহন করে ধন্য হন। প্রয়োজনমত যাতায়াত, হোটেল, বিনোদন, এমনকি আটলান্টিক সিটেতে হাউজির আসরও এর অন্তর্ভুক্ত থাকে।
ওয়ান ইলেভেন পরে দীন এম রানা সেনাপ্রধান-“কাম-দেশের মালিক” জেনারেল মইন ও জেনারেল মাসুদের প্রেরণায় স্বদেশমুখী হন। ২০০৭ সালের ২৪ মে চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠানে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের পিএসও লেঃ জেনারেল মাসুদ উপস্থিত থেকে ডিএম রানাকে সম্বর্ধনা দেয়। জানা যায়, ২০০৬ সাল ব্যাপী ১/১১র বিভিন্ন প্রস্তুতি বৈঠক হয় নিউইয়র্কের কুইন্সের টেংরা রেস্টুরেন্টে। আর এসবের আয়োজক ছিলেন ডি এম রানা।
সম্প্রতি বাংলাদেশে রাজনৈতিক ময়দান উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পরবর্তী করনীয় ঠিক করার জন্য জেনারেল মইন বেশ তৎপর হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশ থেকে হরহামেশা রাজনীতিবিদ ও গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তিরা নিউইয়র্কে আসে। ফ্লোরিডায় বসবাস করে মইন এসব ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ করে উঠতে পারেন না। আর এ কারনেই জেনারেল মইনের দরকার হয়ে পড়ে নিউইয়র্কে থাকার। কিন্তু নিউইয়র্কের বাংলাদেশ কম্যুনিটির লোকজন অতি মাত্রায় রাজনীতিপ্রবণ হওয়ায় যে কোনো সময় ১/১১র ক্ষতিগ্রস্থরা তার ওপরে আক্রমন করতে পারে এমন আশংকা থেকেই মইন নিরাপত্তার জন্য বেছে নেন ডি এম রানাকে। ‘জাগো বাংলাদেশ’ সূত্রে মইনের আরেক সহচর ডাঃ মাসুদের সাথেও রয়েছে রানার ঘনিষ্ট সম্পর্ক। এরা একই তরিকায় কমিউনিটি ওয়ার্ক করে থাকে। ২০১১ সালের ওয়াশিংটন ফোবানার সেক্রেটারী ছিলেন ডাঃ মাসুদ, অন্যদিকে ২০০৮ সালের নিউইয়র্ক ফোবানারা প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন ডি এম রানা।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তনয় সজীব ওয়াজেদ জয়ের সাথে রয়েছে ডি এম রানা-র বিশেষ সম্পর্ক। পারস্পরিক স্বার্থে ও জেনারেল মইনের তদবীরে ১২০০কোটি টাকা মুল্যমানের ডিজিএফআইর নেটওয়ার্কিংয়ের কাজটি দেয়া হয়েছে ডিএম রানাকে। রানা-র সাথে শেখ হাসিনার সম্পর্কের আরেকটি মাধ্যম হলেন নিউইয়র্কবাসী বাংলাদেশী লবিষ্ট গোলাম মেহরাজ। জনাব মেহরাজ শেখ হাসিনার খুবই ঘনিষ্ট। ইনি অনেক কামেল মানুষ। বসুন্ধরার শাহ আলমকে অতি উচ্চ মূল্যে শেখ হাসিনা ও জয়ের ঘনিষ্ট করে দিয়েছেন। বর্তমানে গোলাম মেহরাজ ও শাহ আলম কংগ্রেসম্যানদের লবিইংয়ের মাধ্যমে শেখ হাসিনার ওপর হিলারী ক্লিনটনের রাগ কমানোর জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। ওদিকে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি ওয়ার্কার্স পার্টির প্রধান রাশেদ খান মেনন পক্ষকালব্যাপী সফরে এখন নিউজার্সি রয়েছেন। এই রাশেদ খান মেননের কমিটিই ২০০৭ সালের ২১ আগষ্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত সেনা-ছাত্র সংঘর্ষ নিয়ে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ ও সেনাপ্রধান জেনারেল মইনকে বার বার তলব করছেন। পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, ফখরুদ্দিন ও মইনকে দায়ী করে রিপোর্ট দিতে যাচ্ছে মেনন কমিটি। চলতি সফরে রাশেদ খান মেননের সাথে জেনারেল মইন সাক্ষাতের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আর সেটা সফল হলে সব কিছু ম্যানেজ হবার সম্ভাবনা প্রবল।
(কপি -পেস্ট : ইউকেবিডি নিউজ)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

