somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শিবুর বন্ধু

২৯ শে অক্টোবর, ২০২০ সকাল ৮:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গাছটা যেন এখনো কি বলতে চায়! বারো বছর হল বট গাছটাকে উপড়ে ফেলা হয়েছে। কিন্তু জন্মের মায়া একেবারে ছাড়তে পারে নি। আবার মাটির টানে, মাটির গভীরে থাকা শিকড় থেকে, একটু একটু করে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। এখন বলা যায় বারো বছরের তরুণ এই নতুন গাছটি।

বৃদ্ধ বটগাছটি এইখানেই ছিল। এইযে যেখানে তরুণ গাছটির গোঁড়া দেখছ, এর চারদিকের কয়েক বিঘা জমির উপর বেশ ভালো রকমের দখলদারি ছিল ওর। বড় বড় ডাল, লতা-পাতায়; একেবারে প্রকাণ্ড। ওপাড়ে ছোট বিল আর এই পাড়ে বেশ বড় রকমের খাল – অন্য দুপাশে কত্ত রকমের ফসলের মাঠ! সব মিলিয়ে – আহা, কি রূপ লাবণ্যই না ছিল গাছটির! ভাবতেই শিবুর চোখে পানি আসে। একটা গাছের জন্য কান্না কিসের? তবুও, শিবুর মন সবসময় মানে না।
গাছটা যখন কাটা হয়, শিবুর বয়স তখন কতই হবে – নয় কি দশ! গ্রামের ছেলে বয়সের তুলনায় জীবন সম্পর্কে একটু বেশিই বুঝত হয়তো। স্কুল থেকে ফিরে সারাটা বিকাল ওই বটতলায় কাটতো। সমবয়সীদের সাথে দৌড়- ঝাঁপ, গাছের লতা ধরে দোল খাওয়া – কি যে মজা!

শিবুর বাবা, বিধুভূষণ মাতব্বর গোছের লোক। বেশ জমি-জমাও করেছেন আড়তদারি করে। বৃদ্ধ গাছটাও সুযোগ বুঝে ওদের জমিতেই আসন গেঁড়ে বসেছিল। সব তো ভালই চলছিল, গোল বাঁধাল ঐ পাড়ার মণ্ডল। বিধুভূষণের বটগাছের এই জমিটার পাশেই শমশের মণ্ডলের আড়াই বিঘা ধানী জমি। বটগাছটার গোঁড়াও একেবারে মণ্ডলের জমির সীমানা ঘেঁষা।
এর আগেও মণ্ডল বলেছে – বিধু দা, গাছটা কি কাটলে হয় না? ডাল- পালার ছায়ায় তো ফসল হওয়া মুস্কিল হয়ে পড়েছে। গাছের গোঁড়াটাও কোনদিন জানি আমার সীমানায় এসে পড়ে।

বিধুভূষণ বিষয়টা ভেবেছে। গাছটার গোঁড়া মোটা হতে হতে সীমানা পেরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আটকানোর তো উপায় নেই। শেষকালে না জানি গাছটা কাটতে হয়! মাস কয়েক পরের কথা, শমশের একেবারে সোজা- সাপটা দাবি নিয়ে এলো – বিধু দা, এবার আর উপায় নেই, গাছটা কাটতেই হবে। গাছেরগোঁড়ার তো অনেকটা আমার সীমানায়। আমি ভাই তোমার জন্য ধানী জমিটা নষ্ট করবো কেন?

বিধুভূষণ প্রথমে একটু অস্বীকার করলেও, গ্রামের মাতব্বরদের কথাতে শেষে গাছটা কাটতেই হল। বিধুর মনে যে কষ্ট লাগে নি – সে কথা বলতে পারি না। গাছ কাটার দিন শিবু খুব কেঁদেছিল, একবারটির জন্যও গাছতলায় যায় নি। কেন যাবে? – প্রিয় বন্ধুটিকে চোখের সামনে টুকরো টুকরো করে ফেলবে আর ও শুধু চেয়ে চেয়ে দেখবে – এই শক্তি কি শিবুর আছে?
শিবুর মা কদাচিৎ গাছতলায় যেতেন, কিন্তু সারাদিন তিনিও মুখে কিছু দিলেন না।
শমশের মণ্ডলও ভীষণ আক্ষেপ করেছিলেন – আহা, এতদিনের স্মৃতিটা এইভাবে নিমেষে হারিয়ে গেল? এই গাছটা তো শুধু শিবুদের ছিল না, এই গাছটা ছিল পুরো গ্রামের।

শিবু ভীষণ মনমরা হয়ে গিয়েছিল তখন। বিধুভূষণও বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন –একমাত্র ছেলেটার না জানি কি হল? গাছটার জন্যই যখন এতো মন খারাপ, তখন তিনি চাইলেই আরেকটা গাছ লাগাতে পারেন। কিন্তু কিছুদিন পর, গাছের গোঁড়ার মাটি থেকে কচি কাণ্ড দেখা গেল। হয়তো অজান্তে রাখা কোন মূল থেকেই আবার নিজেকে প্রকাশ করতে চাচ্ছিল বৃদ্ধ গাছটি। সেই ছোট গাছটিই এখন বারো বছরের বটগাছ, যে কিনা উচ্ছল সবুজ ডাল-পালা বিছিয়ে দিব্যি মাঠের মধ্যে রাজার মত জেগে আছে।

কত দিন ধরে, কত যত্ন- ভালবাসায় শিবু এই বোবা কালা বন্ধুর পাশে থেকেছে। ঝড়- বাদলে শিবুর মনটা আনচান করত – কি, জানি শিশুমত ছোট গাছটির কোন ক্ষতি হয় কিনা?
ঝড়ের রাত্রে শিবুর খুব কষ্ট হত, চোখে ঘুম আসতো না। মনে মনে গাছটাকে বলতো – কাঁদিস নে ভাই, একটু সাবধানে থাকিস। এইতো আর একটু পরেই সকাল হবে, তখন দেখিস – তোকে শক্ত খুঁটির সাথে এমন ভাবে বেঁধে দেব, ঝড় – তুফানেও তোর কিচ্ছু হবে না।
এই যুবক বয়সে শিবুর এসব ভাবলে – একটু হাসি পায় আর গাছটার দিকে তাকালে ভীষণ ভালো লাগে।


সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে অক্টোবর, ২০২০ সকাল ৮:৩৩
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমেরিকায় মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসছে

লিখেছেন শাহ আজিজ, ২৮ শে নভেম্বর, ২০২০ দুপুর ১:৩৯



লেথাল ইঞ্জেকশন এবং ইলেকট্রিক চেয়ারে বসিয়ে মৃত্যুদণ্ডের ধারায় পরিবর্তনের পথে ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকা । নতুন প্রস্তাবনায় বিষাক্ত গ্যাস প্রয়োগ বা ফায়ারিং স্কোয়াডে দণ্ড কার্যকর করার আইনি... ...বাকিটুকু পড়ুন

নোভা কেন আত্মহত্যা করলো?

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৮ শে নভেম্বর, ২০২০ দুপুর ২:৫৩



মেয়েটার নাম নোভা।
বিদেশে থাকে। নোভা বাংলাদেশে বেশ কয়েকবার আগ্রহ নিয়ে এসেছে। কিন্তু তিন মাসের জন্য এলেও, অল্প কয়েকদিন থেকে চলে গেছে। এই দেশ তার ভালো লাগে না।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসলামিক দলগুলো শেখ হাসিনাকে বাজিয়ে দেখছে

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২৮ শে নভেম্বর, ২০২০ রাত ৮:২৬



দেশের অবস্হা দেখে মনে হচ্ছে, রাজনৈতিকভাবে শেখ হাসিনা ঠিক আগের মতো শক্তিশালী নন; দেশের ইসলামিক দলগুলো এই ধরণের সময়ের জন্য অপেক্ষা করছিলো। ইসলামিক দলগুলো শেখ হাসিনার পক্ষে কখনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি বাংলাদেশ বলছি

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৮ শে নভেম্বর, ২০২০ রাত ৯:২৬



প্রিয় দেশবাসী,
কিছুদিন যাবত অত্যন্ত বেদনা নিয়ে লক্ষ্য করছি ভাস্কর্য বনাম মূর্তি নিয়ে সবাই আলোচনা করছেন সমালোচনা করছেন। কেউ ধর্মের পক্ষ নিচ্ছেন, কেউ আধুনিকাতার পক্ষ নিচ্ছেন, কেউ হয়তো শিল্পমনার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ মায়াময়

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৯ শে নভেম্বর, ২০২০ সকাল ১১:২৯

এ পৃথিবীটা বড় মায়াময়!
উদাসী মায়ায় বাঁধা মানুষ তন্ময়,
অভিনিবিষ্ট হয়ে তাকায় প্রকৃতির পানে,
মায়ার ইন্দ্রজাল দেখে ছড়ানো সবখানে।

বটবৃক্ষের ছায়ায়, প্রজাপতির ডানায়,
পাখির কাকলিতে, মেঘের আনাগোনায়,
সবখানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×