পবিত্রতা সম্পর্কিত জরুরী বিষয়াদি (শেষ ভাগ)
শরীর ও জিনিষের পরিচ্ছন্নতাঃ
(১) জুতায় নাপাকী (অপবিত্র বস্তু) লাগলে মাটিতে উত্তমরূপে ঘষলেই তা পবিত্র হয় যাবে। অনুরূপ নাপাক (অপবিত্র) জায়গা দিয়ে চলার কারণে যদি কোন মহিলার কাপড়ে নাপাকী লাগে সেক্ষেত্রে পবিত্র মাটির উপর দিয়ে চলার সময় কাপড়ের আচল মাটি স্পর্শ করলেই তা পবিত্র হয়ে যাবে।
(২) কোন জিনিসে অপবিত্রতা লাগলে সে অপবিত্র অংশটুকু উত্তমরূপে ধুয়ে নেয়াই যথেষ্ট। সম্পূর্ণ অংশ ধোয়া জরুরী নয়।
(৩) কোন পাত্রে কুকুর মুখ দিলে সে পাত্রটি সাতবার ধুতে হবে। প্রথমে বা শেষে উত্তমরূপে মাটি দিয়ে ঘষে মেজে পানি দিয়ে ধুয়ে নিলেই তা পবিত্র হয়ে যাবে। {বুখারী, ইফা ১ম খন্ড, হা/১৭৩; মুসলিম, ইফা, ২য় খন্ড, হা/৫৪২; তিরমিযী, ইফা ১ম খন্ড, হা/৯১}
(৪) বিড়ালের উচ্ছিষ্ট পবিত্র। বিড়াল কোন পানিতে মুখ দিলে সেই পানি দিয়ে ওযু ও গোসল করা জায়েয। {তিরমিযী, ইফা ১ম খন্ড, হা/৯২}
(৫) অপিবত্র বা জুনুবী (যৌনকর্ম বা বীর্যপাতের কারণে নাপাকী) অবস্থায় মসজিদে অবস্থান করা জায়েয নয়, তবে অতিক্রম করা যেতে পারে।
(৬) যে ঘরে কোন প্রাণীর ছবি ও কুকুর থাকে, সে ঘরে আল্লাহর রহমতের ফিরিশতা প্রবেশ করে না।
(৭) প্রতি সপ্তাহে গোঁফ ছাটা, নখ কাটা, বগল ও নাভীর নিচের লোম পরিস্কার করা সুন্নাত। তবে বগল ও নাভীর নীচের লোম পরিস্কার করার সর্বোচ্চ সময়সীমা ৪০ দিন।
স্বপ্নদোষ ও বীর্যপাতঃ
(১) পেশাবের পূর্বে কিংবা পরে যে গাঢ় সাদা পানি বের হয় তাকে অদী বলে। পেশাবের পর অদী বের হলে যৌনাঙ্গ ধুতে হবে এবং ওযু করতে হবে। গোসল করার প্রয়োজন নেই।
(২) যৌন উত্তেজনার সময় বিনা বেগে পেশাবের রাস্তা দিয়ে আঠা যুক্ত যে পানি বের হয় তাকে মযী বলে। কখনো বিনা অনুভূতিতেও এই পানি বের হতে পারে। মযী বের হলে ওযু ভেঙ্গে যায় বিধায় পুনরায় ওযু করতে হবে। কাপড়ের যে স্থানে লাগে তা এক আঁজলা পানি (দুই হাতের তালুতে যতটুকু পানি ধরে ততটুকু পানি) দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে এবং লজ্জাস্থান ধুয়ে ফেলতে হবে। কাপড়ে মযী (ধাতু) শুকিয়ে লেগে থাকলে তা খুঁটিয়ে ফেলে দিলে চলবে এবং ভেজা থাকলে ধুয়ে ফেলতে হবে।
(৩) উত্তেজনার চূড়ান্ত পর্যায়ে সবেগে যে তরল পদার্থ পেশাবের রাস্তা দিয়ে বের হয় তাকে মনী বা বীর্য বলে। বৈধ বা অবৈধ, যে কোন প্রকারেই সবেগে বীর্য বের হলে গোসল করা ফরয হয়ে যায়।
(৪) বীর্য মুক্ত কাপড় ধোয়ার পরও যদি দাগ পড়ে থাকে তাহলে তাতে ক্ষতি নেই। {বুখারী, ইফা ১ম খন্ড, হা/২২৯, ২৩০}
(৫) স্বামী স্ত্রী একাধিক বার মিলনের ইচ্ছা করলে মধ্যবর্তী সময়ে লজ্জাস্থান ধৌত করে ওযু করে নিলে চলবে।
হায়েয, নিফাস ও ইস্তেহাযাঃ
(১) বালেগা স্ত্রীলোকদের প্রত্যেক মাসের কয়েকদিন তাদের রেহেম (জরায়ু) হতে স্বাভাবিকভাবে যে রক্তস্রাব হয় তাকে মাসিক বা হায়েয বলে। কত বছর বয়সে এই রক্তস্রাব আরম্ভ হয় হাদীসে তার কোন উল্লেখ নাই। যে কয়দিন হায়েয থাকবে সে দিনগুলোর জন্য সালাত মাফ, কিন্তু হায়েয অবস্থায় রমযানের রোযা না রেখে অন্য মাসে তা আদায় করে নিতে হবে। {বুখারী ইফা, ১ম খন্ড, হা/৩০০} হায়েযের সাধারণ সময়সীমা পার হয়ে যাবার পরও রক্তস্রাব হতে থাকলে গোসল করে সালাত আদায় করতে হবে। {বুখারী ইফা, ১ম খন্ড, হা/৩০০, বর্ণনাকারী আয়েশা (রা.)}।
(২) হায়েয অবস্থায় কোরআন স্পর্শ করা, সালাত আদায় করা ও রোযা রাখা নিষেধ। তবে দু'আর নিয়তে কোন আয়াত পড়া, আল্লাহর যিকির, ইস্তিগফার, অযীফা করা জায়েয। তাদের জন্য কোরআন মুখস্ত পাঠ করাও জায়েয আছে। তবে উত্তমের খেলাফ বলা যেতে পারে। উল্লেখ্য যে, হায়েযে আক্রান্ত মহিলার কোরআন পাঠ নিষিদ্ধকারী একটি হাদীসও সহীহ সনদে প্রমাণিত নয়।
(৩) হায়েয অবস্থায় সহবাস করা হারাম। তবে হারাম জেনে অধৈর্য হয়ে সহবাস করলে লাল রক্ত প্রবাহের সময় (প্রথম দিকে) হলে এক দিনার এবং হলুদ রক্ত (শেষ দিকে) প্রবাহের সময় আধা দিনার কাফফারা দিতে হবে ও খাঁটি তওবা করতে হবে।
(৪) হায়েয অবস্থায় স্বামীর সাথে এক বিছানায় শোয়া ও অন্যান্য সাংসারিক কাজ সম্পন্ন করা যাবে।
(৫) স্ত্রীলোকের সন্তান প্রসবের পর যে রক্তস্রাব হয় তাকে নিফাস বলে। হায়েয অবস্থায় স্ত্রীলোকদের সঙ্গে যে সব কাজ করা নিষিদ্ধ, নিফাস অবস্থাতেও সে সবই নিষিদ্ধ। নিফাসের সময়ও সালাত মাফ হয়ে যায় কিন্তু রোযা মাফ হয় না, পাক হবার পর বাদ যাওয়া রোযা পালন করতে হবে। নিফাসের সর্বোচ্চ সময়সীমা ৪০ দিন। নিফাসের রক্তপাত বন্ধ হওয়া মাত্রই গোসল করে সালাত আদায় এবং রোযা রাখতে হবে।
(৬) হায়েয ও নিফাস ব্যতীত স্ত্রীলোকের অন্যান্য সময় রক্তস্রাব হলে তাকে ইস্তেহাযা (প্রদর) বলে। মুস্তাহাযা (যারা ইস্তেহাযা হয়েছে) স্ত্রীলোক পবিত্র স্ত্রীলোকের মত। ইস্তেহাযার ক্ষেত্রে অন্যান্য মাসের নিয়মিত দিনগুলোর সংখ্যা বাদ দিয়ে গোসল করে পবিত্র হয়ে সালাত আদায়, সিয়াম পালন ইত্যাদি ইবাদাত করতে হবে। ইস্তেহাযা অবস্থায় প্রত্যেক সালাতের আগে গোসল করা ভালো। নতুবা এক গোসলে দুই সালাত একত্রে আদায় করা যায়। তবে এই হুকুম ওয়াজিব নয়। সন্তান প্রসবের পর মেয়েদের রক্ত ঝরার মেয়াদের (সর্বোচ্চ ৪০ দিন) পরও রক্ত ঝরতে থাকলে গোসল করে সালাত আদায় করতে হবে।
চলবে ...
* ইফা = ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হা = হাদীস
** মুহাম্মদ আবু হেনা সংকলিত ও আকরামুজ্জামান বিন আব্দুস সালাম সম্পাদিত "আমার নামায কি শুদ্ধ হচ্ছে!" গ্রন্থ থেকে মুমিন ভাই-বোনদের উপকারার্থে এখানে প্রকাশিত হলো। উপরোক্ত লেখার কোনো অংশের কোনো কৃতিত্বের দাবীদার এ ব্লগ লেখক নয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

