পূর্বের পর্ব ...
গোসল
অপবিত্রতা দূর করার জন্য শরীরের সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ভালভাবে ধোয়াকে শরীয়ত মতে গোসল বলে। গোসল তিন প্রকার, যথা (১) ফরয, (২) সুন্নাত অথবা মুস্তাহাব (যা করলে অনেক সাওয়াব কিন্তু না করলে গুনাহ নেই) এবং (৩) মুবাহ (যা করলে সাওয়াব নেই এবং না করলে গুনাহ নেই)।
গোসল ফরয হবার কারণ
স্বামী-স্ত্রীর মিলনে, স্বপ্নদোষে বীর্যপাত হলে (স্বপ্নের কথা স্মরণ থাকুক বা না থাকুক শরীরে, কাপড়ে বা বিছানায় বীর্যের চিহ্ন দেখতে পেলে), মেয়েদের হায়েয ও নেফাসের রক্ত বন্ধ হলে, নিদ্রিত হোক বা জাগ্রত অবস্থায় হোক কামভাবে বীর্য বের হলে এবং কেউ ইসলাম গ্রহণকালে অপবিত্র থাকলে গোসল ফরয হয় (মিশকাত)।
সুন্নাত/মুস্তাহাব গোসল
(১) জুমার সালাত, (২) ঈদের সালাত ও (৩) হজ্জ্ব বা ওমরাহ করার জন্য ইহরাম বাঁধার পূর্বে, (৪) আরাফার দিন দুপুরের পর, (৫) ইসলাম গ্রহণকালে অপবিত্র না থাকলে (মিশকাত) গোসল করা সুন্নাত। (৬) মোস্তাহাযা মহিলা (যে মহিলার প্রদর হয়েছে) প্রত্যেক সালাতের জন্য বা যোহর ও আসর মিলে এক গোসল এবং মাগরিব ও এশার জন্য আর একটি গোসল এবং ফজরের জন্য আলাদা গোসল করা সুন্নাত। (৭) অজ্ঞান হবার পর আবার জ্ঞান ফিরে পেলে গোসল করা সুন্নাত, (৮) মুশরিককে (আল্লাহর ইবাদতের সাথে অন্য কিছু শরীককারী) দাফন করে গোসল করা সুন্নাত (তামামূল মিন্নাহ) এবং (৯) মক্কায় প্রবেশের জন্য গোসল করা সুন্নাত। (১০) মুর্দাকে গোসলদানের পর গোসল করা মুস্তাহাব। (১২) ডান দিক থেকে গোসল শুরু করা সুন্নাত। {বুখারী, ইফা ১ম খন্ড, হা/১৬৮; মুসলিস, ইফা ২য় খন্ড, হা/৫০৭, ৫০৮}
মুবাহ গোসল
ধূলাবালি ও ময়লা থেকে শরীর রক্ষা করার জন্য, গরমের তাপ থেকে শরীর ঠান্ডা রাখার জন্য, শ্রান্তি ও ক্লান্তি দূর করার জন্য গোসল করা মুবাহ।
গোসলে তিন ফরয
গোসলের মধ্যে তিনটি ফরয যথা; (১) গড়গড়ার সাথে কুলি করা (তবে রোযাদার ব্যক্তিকে গড়গড়া করতে হবে না), (২) নাকের ভিতর পানি দিয়ে পরিস্কার করা এবং (৩) সমস্ত শরীরের পশমের গোড়ায় পানি পৌঁছে দেয়া অর্থাৎ সমস্ত শরীর ধৌত করা। এ তিনটির কোন একটি ছুটে গেলে গোসল হবে না।
গোসলের পদ্ধতি সম্পর্কিত কয়েকটি হাদীস
(১) ইবনে গিয়াস (র.) ... মায়মূনা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী (স.) এর জন্য গোসলের পানি রাখলাম এবং কাপড় দিয়ে পর্দা করে দিলাম। তিনি দু'হাতের উপর পানি ঢেলে উভয় হাত ধুয়ে নিলেন। তারপর ডান হাত দিয়ে বাম হাতে পানি ঢেলে লজ্জাস্থান ধুলেন। পরে হাতে মাটি লাগিয়ে ঘষে নিলেন এবং ধুয়ে ফেললেন। এরপর কুলি করলেন, নাকে পানি দিলেন, চেহারা ও দু'হাত (কনুই পর্যন্ত) ধুলেন। তারপর মাথায় পানি ঢাললেন ও সমস্ত শরীরে পানি পৌঁছালেন। তারপর একটু সরে গিয়ে দু'পা ধুয়ে নিলেন। এরপর আমি তাঁকে একটি রুমাল দিলাম কিন্তু তিনি তা দিয়ে শরীর মুছলেন না। তিনি দু'হাত ঝাড়তে ঝাড়তে চলে গেলেন। {বুখারী, ইফা ১ম খন্ড, হা/২৫৭}
(২) ইবনে মাহবুব (র.) ... মায়মূনা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স.) জানাবাতের গোসলের জন্য (যৌনকর্ম বা বীর্যপাতের কারণে গোসলের জন্য) পানি রাখলেন। তারপর দু'বার বা তিনবার ডান হাতে বাম হাতের উপর পানি ঢাললেন এবং তাঁর লজ্জাস্থান ধুলেন। তারপর তাঁর হাত মাটিতে ... ... অবশেষে সেখান থেকে একটু সরে গিয়ে তাঁর দু'পা ধুয়ে ফেললেন। {বুখারী, ইফা ১ম খন্ড, হ্/২৬৩, ২৬৪}
(৩) খাল্লাদ ইবনে ইয়াহইয়া (রা.) ... আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদের কারও জানাবাতের গোসলের প্রয়োজন হলে দু'হাতে পানি নিয়ে তিনবার মাথায় ঢালতাম। পরে হাতে পানি নিয়ে ডান পাশে তিনবার এবং আবার অপর হাতে পানি নিয়ে বাম পাশে তিনবার ঢালতাম।
(৪) আয়েশার (রা.) বর্ণনায় আছে যে, প্রথমে রাসূল (স.) দুই হাত ধোবার পর সালাতের ওযুর মত ওযু করতেন। তারপর ভিজে হাত দিয়ে মাথার চুলগুলো খেলাল করতেন, তারপর মাথায় তিন আঁজলা পানি দিয়ে সর্বাঙ্গ ধুতেন।
(৫) আয়েশা (রা.) বলেন, রাসূল (স.) ফরয গোসলের পর আর ওযু করতেন না {তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ প্রভৃতি}। বরং গোসলের শুরুতে যে ওযু করতেন সেটাকেই যথেষ্ট মনে করতেন। তবে গোসলের শেষ দিকে ঐ ওযু যদি নষ্ট হয়ে যায় বা কাপড়ের ভিতর দিয়ে লজ্জাস্থানে হাত লেগে যায় তাহলে আবার ওযু করতে হবে।
ফরয গোসলের নিয়ম
(১) প্রথমে উভয় হাত তিনবার ভাল ভাবে ধুয়ে নিতে হবে।
(২) অতঃপর ডান হাত দিয়ে বাম হাতে পানি ঢেলে লজ্জাস্থান (ও যেসব জায়গায় নাপাকী লেগে আছে) ভালভাবে ধোবার পর মাটিতে ঘষে বা সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে।
(৩) তারপর পা ধোয়া বাকী রেখে সালাতের ওযুর ন্যায় ওযু করতে হবে। তবে মাথা মাসেহ করতে হবে না; বরং মাথায় পানি ঢেলে দেয়াই যথেষ্ট। হাফেজ ইবনে হাজার বলেন, আমি রাসূল (স.) এর ফরয গোসল সংক্রান্ত কোন হাদীসে ওযুর সময় রাসূল (স.) এর মাথা মাসেহ করার কথা পাইনি (ফাতহুল বারী)। এই জন্য মালেকী মাযহাবের লোকেরা এর থেকে দলিল গ্রহণ করেছেন এই মর্মে যে, জানাবাতের ফরয গোসলের ক্ষেত্রে মাথা মাসেহ করা বিধি সম্মত নয়। ইমাম আবু দাউদ, ইমাম আহমদকে এই প্রশ্নটি করেছিলেন, "ফরয গোসলের ওযুতে জুনুবী ব্যক্তি মাথা মাসেহ করবে কি?" তিনি বলেছিলেন, "সে মাথা মাসেহ করবে কেন, সে তো মাথায় পানিই ঢেলে দিয়েছে।" (মাসায়েলে ইমাম আহমদ)। ইমাম নাসাঈ এই জন্যই তার সুনান গ্রন্থে "জানাবাতের ওযুতে মাথা মাসাহ পরিত্যাগ করণ" শীর্ষক অধ্যায়ে যে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন তার অংশ বিশেষ হল, এমনি কি যখন তিনি মাথার পর্বে পৌঁছিলেন তখন তিনি মাথা মাসেহ না করে তাতে পানি ঢাললেন {নাসাঈ}। আলবানী হাদীসটির সনদ সহীহ বলেছেন। সূত্রঃ নাসায়ে নববী (উর্দূ) এবং তাখরীজে সালাতুর রাসূল (উর্দূ)।
(৪) তারপর তিনবার মাথায় পানি ঢেলে চুলের গোড়ায় আঙ্গুল চালিয়ে মাথার চুলগুলো ভালভাবে নেড়েচেড়ে ধুতে হবে এবং সমস্ত শরীর ঘষে মেজে এমনভাবে গোসল করতে হবে যেন কোথাও এক লোককূপ পরিমাণ স্থানও শুকনো না থাকে। পানিতে ডুব দিয়েও গোসল করা যায়।
(৫) পরিশেষে গোসলের স্থান থেকে সরে গিয়ে পা ধুয়ে নিতে হবে।
(৬) কাপড় দিয়ে শরীর না মুছাই ভাল তবে কখনো ইচ্ছা করলে মুছা যেতে পারে।
(৭) গোসলের পর যদি শরীরের কোন জায়গা শুকনো থেকে যায় তাহলে সেই শুকনো জায়গাটা ভিজে হাত বুলিয়ে নিলে যথেষ্ট হবে, পুনরায় গোসল করতে হবে না।
(৮) স্ত্রীলোকদের চুল খোপা বাঁধা অথবা বেণী গাঁথা থাকলে তা গোসলের সময় খোলার প্রয়োজন নেই। আটঁ সাট অলংকার এবং ঐ সব অলংকার যা ছিদ্র করে পরা হয় যেমন নাকের বালি, কানের রিং বা দুল ইত্যাদি থাকলে সে সব নাড়িয়ে চাড়িয়ে তার নীচে এবং ছিদ্রের মধ্যে পানি পৌঁছাতে হবে।
দ্রষ্টব্যঃ ফরয গোসলের পর দ্বিতীয় বার ওযু করার কোন প্রয়োজন নেই।
চলবে ...
* ইফা = ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হা = হাদীস
** মুহাম্মদ আবু হেনা সংকলিত ও আকরামুজ্জামান বিন আব্দুস সালাম সম্পাদিত "আমার নামায কি শুদ্ধ হচ্ছে!" গ্রন্থ থেকে মুমিন ভাই-বোনদের উপকারার্থে এখানে প্রকাশিত হলো। উপরোক্ত লেখার কোনো অংশের কোনো কৃতিত্বের দাবীদার এ ব্লগ লেখক নয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

