যুক্তরাষ্ট্র-প্রবাসী রইস ভূঁইয়া শুধু ক্ষমাই করেননি, উল্টো তাঁর হত্যাচেষ্টাকারীর মৃত্যুদণ্ড মওকুফের জন্য নিজেই এখন সোচ্চার। শুরু করেছেন হিংসা আর বিদ্বেষমুক্ত এক পৃথিবী গড়ার আন্দোলন। আর এরই সুবাদে বাংলাদেশের রইস ভূঁইয়া এখন যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আলোচিত এক নাম।
রইস ভূঁইয়া। এক গর্বিত বাংলাদেশির নাম। ২০০১ সালে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে বিমান হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিমদের প্রতি যে চরম ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষের খড়্গ নেমে এসেছিল, রইস ভূঁইয়া ছিলেন তার অন্যতম শিকার। বাংলাদেশের সিলেট ক্যাডেট কলেজে পড়াশোনা করতেন। তারপর স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন। কিছুদিন নিউইয়র্কে থাকার পর ডালাসে চলে যান একটা গ্যাসস্টেশনে চাকরি নিয়ে। ঘটনাটা ঘটে সেখানেই। মার্ক স্টোম্যান নামের এক শ্বেতাঙ্গ মার্কিন রইস ভূঁইয়াকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। রইস মরতে মরতেও বেঁচে যান। মার্ককে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতের রায়ে তাঁর মৃত্যদণ্ড হয়। ঘটনাটা হয়তো এখানেই শেষ হতে পারত। ঘটনাটি প্রায় অভূতপূর্ব এক মোড় নিল, যখন তাঁর হন্তারককে বাঁচানোর জন্য উঠে-পড়ে লাগলেন রইস স্বয়ং। রইসের ব্যাখ্যা, ‘মার্ক আমাকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তাই বলে তো আমরা তাঁর প্রাণ কেড়ে নিতে পারি না।’ লোকটা বলে কী! সোজা কথায়, রইসের ঘটনা শুনে নড়েচড়ে বসল গোটা যুক্তরাষ্ট্র।
হত্যাচেষ্টাকারীকে বাগে পেয়েও কেউ প্রতিশোধ নেবে না, এমনটা কি হতে পারে? কী অদ্ভুত কথা!
কিন্তু রইস তাঁর কর্মকাণ্ড দিয়ে সমগ্র বিশ্বে তা ভালো করেই বুঝিয়ে দিয়েছেন এত দিনে। এর মধ্যে রইস শুরু করেছেন ‘ওয়ার্ল্ড উইদাউট হেট’ নামে তাঁর সংগঠনের কাজ। মানবতার আরেক নিদর্শন বাংলাদেশের ছেলে রইস ভূঁইয়া। ডালাসে যখন রাত আটটা ছুঁই ছুঁই, তখন নিউইয়র্কে সন্ধ্যা প্রায় সাতটা। কথা হয় তাঁর সঙ্গে।
সেদিন আসলে কী ঘটেছিল?
২১ সেপ্টেম্বর ২০০১। শুক্রবার, দুপুর সাড়ে ১২টা। আমি তখন কাজ করি ডালাস শহরে বাকনার ফুডমার্টের একটা গ্যাসস্টেশনে। ক্যাশে রেজিস্টারের সামনে বসে আছি। হঠাৎ চোখে পড়ল কালো সানগ্লাস পরা সাদা চামড়ার এক মার্কিন (যাঁর নাম পরে জেনেছিলাম মার্ক স্টোম্যান) ঠিক আমার সামনেই বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে। আমি ধরেই নিলাম যে তাঁর ডাকাতি করার মতলব। আমি আগেভাগেই ক্যাশ রেজিস্টার থেকে টাকা-পয়সা যা ছিল. সব তাঁকে দিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলাম। আর বিনয়ের সঙ্গে শুধু বললাম, আমাকে যেন গুলি করা না হয়। কিন্তু হঠাৎ করেই কী যেন হয়ে গেল! কপালের ডান পাশে চিনচিন একটা ব্যথা অনুভব করলাম। সেই সঙ্গে তীব্র যন্ত্রণা। এদিকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। আমি বুঝতে পারলাম যে গুলিবিদ্ধ হয়েছি। ছেলেবেলায় যত দোয়া মুখস্থ করেছিলাম, সব পড়তে শুরু করলাম। সেই সঙ্গে আবছা আবছা সব প্রিয় মানুষের ছবি একে একে আমার চোখের সামনে ভাসছে। আবার দেখি একটা গোরস্থান। বেশ বুঝতে পারলাম, আমি ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। শেষ পর্যন্ত এভাবেই আমার মৃত্যু হবে? আবছা চোখে আবিষ্কার করলাম, বন্দুক হাতে সাদা চামড়ার হন্তারকটা তখনো আমার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে। আমি লুটিয়ে পড়ে গেলাম। আমার নিশ্চিত মৃত্যু হবে দেখে মার্ক স্টোমেন ধীরে ধীরে আমার সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি বাঁচার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে শুরু করলাম। পাশের একটা সেলুনে ঢুকে পড়লাম যদি কারও সাহায্য পাওয়া যায়। কিন্তু তখন সবাই আমার চেহারা দেখে ভীত। আমি এই প্রথম সেলুনের আয়নায় আমার নিজের চেহারা দেখলাম। দেখি আমার মাথা আর মুখ থেকে শুধু রক্তের স্রোত। এক ভদ্রলোক দয়াপরবশ হয়ে ৯১১ ইমার্জেন্সিতে ডায়াল করলেন। এর কিছুক্ষণ পরই অ্যাম্বুলেন্স এসে আমাকে উঠিয়ে নিয়ে গেল। হাসপাতালে আমি বেশি দিন চিকিৎসা নিতে পারিনি। কারণ, তখন আমার কোনো মেডিকেল ইনস্যুরেন্স ছিল না। আমাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। আমি কীভাবে কীভাবে যেন বেঁচে গেলাম।
তারপর মার্ক গ্রেপ্তার হলো?
হ্যাঁ, মার্ক আমাকে ছাড়াও একজন পাকিস্তানিকে গুলি করেছিলেন। সেখানে ভিডিও ক্যামেরার ফুটেজের মাধ্যমে তাঁকে শনাক্ত করা হয় এবং মার্ককে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০০২ সালের ৪ এপ্রিল কোর্টের রায়ে মার্কের মৃত্যুদণ্ড হয়।
মার্কের উপযুক্ত সাজা হওয়ায় আপনি খুশি হননি?
না, মোটেও না। আর তখন আমি শারীরিক ও মানসিকভাবে খুবই বিপজ্জনক অবস্থায় ছিলাম। আমি তখন আমার জীবন নিয়ে খুব ভীত। বাইরে খুব একটা বের হই না। আর সবকিছুতেই খুব সন্দেহ। মনে হয়, এই বুঝি আমাকে কেউ মারতে আসবে, আমাকে মেরে ফেলবে। সবকিছুতেই উৎকণ্ঠা। বিভিন্ন রকম শিক্ষামূলক এবং মনস্তত্ত্ববিষয়ক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সেবা পাওয়ার চেষ্টা করলাম। আর ভাবলাম, জীবনটা যেহেতু ফিরে পেয়েছি, তাই এই জীবনকে দুস্থ আর সাধারণ মানুষের জন্য ব্যয় করব। তাই প্রথমেই ঠিক করলাম, যে আমাকে হত্যা করতে চেয়েছে, তাঁকেই অর্থাৎ মার্ককে বাঁচাতে হবে।
যে আপনাকে গুলি করল তাঁকে আপনি মৃত্যুদণ্ড থেকে বাঁচাবেন—এ রকম ধারণা বা প্রেরণার মূলে আপনার শক্তি কী ছিল?
সত্যি বলতে, অনেক কিছুই কাজ করেছে। আমার মা ছেলেবেলায় আমাকে শিখিয়েছেন যে ‘কেউ যদি তোমাকে আঘাত করে, তাকে তুমি পাল্টা আঘাত করবে না। বরং তাকে ক্ষমা করে দেবে।’ আমার মা-বাবা সব সময় এই কথা বলতেন। আরেকটা বিষয় হলো, ধর্মীয় মূল্যবোধ আমার মধ্যে সব সময় খুব বড় হয়ে কাজ করে। ইসলাম শান্তির ধর্ম, মানবতার ধর্ম। আমাদের ধর্ম কখনোই বিদ্বেষ, ঘৃণা অনুমোদন করে না। আমি আমার হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দিতে চাই। তিনি যদি তাঁর প্রাণ ফিরে পান, তাহলে নিশ্চয় তিনি তাঁর খারাপ কাজগুলো আর করবেন না। এটা আমার দৃঢ়বিশ্বাস। আর ক্ষমার চেয়ে মহৎ আর কী হতে পারে!
কাজটা কীভাবে শুরু করলেন?
আমি আগেই বলেছি, জীবন যেহেতু ফিরে পেয়েছি, তাই এই জীবনকে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করার জন্য আমি স্থির করে ফেলেছি। আর সে কারণেই ভাবতে থাকি, কীভাবে সামনের দিকে এগোলে ভালো হয়। আমি প্রথমেই আমার এলাকার (ডালাস) সব ইসলামিক সেন্টার এবং মসজিদের ইমামদের বিষয়টা বলি। তাঁরা সবাই শুনে আমার খুব প্রশংসা করলেন এবং বললেন যে, ইসলাম হলো ক্ষমার ধর্ম, শান্তির ধর্ম, মানবতার ধর্ম।
তাঁরা আরও বললেন, আমি যে কাজ করতে যাচ্ছি, আমাদের ধর্মে তা সম্পূর্ণভাবে অনুমোদন আছে। সত্যি বলতে, তাঁরা সবাই আমাকে খুব উৎসাহ দিলেন। তারপর আমি এসএম বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যান রাইটস বিভাগের অধ্যাপক রিক হেলপেলিনের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি আমাকে বিভিন্ন মানবতাবাদী সংগঠকদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। উত্তর আমেরিকার ইসলামিক সোসাইটি আমাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন মানবতাবাদী সংগঠন আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। ‘ঘৃণা নয়, মানবতায় বিশ্বাসী’—এই স্লোগান সামনে রেখে আমি আমার প্রচারণা শুরু করি। ২০ জুলাই লেথাল ইনজেকশনের মাধ্যমে মার্কের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। কিন্তু আমি সর্বাত্মক চেষ্টা করছি, যেন মার্ককে বাঁচানো যায়। এই লক্ষ্যে আমি একটা ওয়েবসাইট তৈরি করেছি,ঠিকানা:
ww.worldwithouthate.org
নিরলস রইস
রইস ভূঁইয়া এখন দারুণ আলোচিত এক চরিত্র যুক্তরাষ্ট্র-প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে। প্রবাসী তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী পাভেল চৌধুরী বলেন, ‘প্রবাসে মানবতার এক নতুন উদাহরণ গড়ে রইস ভূঁইয়া বাঙালি জাতিকে তুলে এনেছেন মানবতাবাদের স্বর্ণশিখরে। আমরা রইস ভূঁইয়াকে নিয়ে গর্বিত।’
‘মানবতা এখনো মরে যায়নি। রইস তার উজ্জ্বল উদাহরণ,’ বললেন কণ্ঠশিল্পী কাবেরী দাশ।
‘মুসলিমদের প্রতি যে বিদ্বেষ আমেরিকানদের ছিল, রইসের এই কাজের কল্যাণে তা অনেকাংশেই দূর হয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস।’ আশাবাদ ছাত্র সিফাত আহমেদের।
রইস ভূঁইয়ার বাবা মোহাব্বত ভূঁইয়া অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা এবং মা রোকেয়া বেগম গৃহিণী। তাঁরা বর্তমানে ঢাকাতেই বসবাস করছেন।
২০ জুলাই মার্ক স্টোম্যানের মৃত্যুর দিন নির্ধারিত। লেথাল ইনজেকশনের মাধ্যমে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। কিন্তু ঘুম নেই রইস ভূঁইয়ার। মার্ককে বাঁচাতে বিভিন্ন মানবতাবাদী সংগঠকের সহায়তায় তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। রইস তাঁর চেষ্টায় কতটুকু সফল হবেন বা বিফল হবেন, তা হয়তো সময়ই নির্ধারণ করে দেবে। তবে যে কথাটা জোর দিয়ে বলা যায় তা হলো, বর্তমান পৃথিবীতে মানবতার পথ যখন রুদ্ধ, ধর্মীয় উন্মাদনা যখন মানবতার কণ্ঠরোধ করে দাঁড়িয়ে, ঠিক সেই সময় বাংলাদেশের ছেলে রইস ভূঁইয়া আশার স্বপ্ন দেখান, মানবতাবাদী হতে শেখান।
উৎসঃ ছুটির দিনে, প্রথম আলো

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



