somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আলবদর প্রধান কুলাঙ্গার মুজাহিদের ফাঁসীর রায় আপিল বিভাগে বহাল, আসুন চোখ বুলিয়ে নিই '৭১ -এ তার কুকীর্তির দিকে

১৬ ই জুন, ২০১৫ সকাল ৯:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



কিছুক্ষণ আগে ঘোষিত হয়েছে যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের আপিল বিভাগের চুড়ান্ত রায়। আপিল বিভাগ ট্রাইবুনালের মৃত্যুদন্ডের রায় বহাল রেখেছেন। সুতরাং নাটকীয় কিছু না ঘটলে (রিভিউ বা রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে) এই কুখ্যাত কুলাঙ্গার বেজন্মা আলবদর প্রধান শিগগিরই ফাঁসীতে ঝুলতে যাচ্ছে। এই সেই মুজাহিদ, যে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন মন্ত্রী ছিল, তার গাড়ীতে আমাদের মহান পতাকা উড়িয়েছে, আমরা কিছুই বলতে পারিনি তখন; কয়েক বছর আগে দম্ভভরে সে বলেছিল, "বাংলাদেশে কোন যুদ্ধাপরাধী নেই।" ২০০৯ সালে এই সামহোয়্যারইন ব্লগে যুদ্ধাপরাধীদের কুকীর্তি নিয়ে একটা সিরিজ লিখেছিলাম, আজ তার চুড়ান্ত রায়ের দিনে আসুন আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিই '৭১ সালে এই বেজন্মার কুকীর্তিগুলোর কিছু অংশের দিকে।

আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদঃ

বিগত জোট সরকারের আমলে টেকনোক্র্যাট কোটায় সমাজকল্যাল মন্ত্রী মুজহিদ ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি ও ঢাকায় আল-বদর বাহিনীর প্রধান ছিল। দলের প্রতি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন নির্বিচারে হত্যাকান্ড, লুটপাট, মহিলাদের নিগৃহিত ও ধর্ষণে মুজাহিদ সহায়তা করেছিল। বিজয়ের প্রাক্কালে বুদ্ধিজীবি হত্যায় সে নেতৃত্ব দিয়েছিল।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিবৃতি থেকে তার স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকান্ডের প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৯৭১ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর ফরিদপুরে ইসলামী ছাত্রসংঘের একটি সমাবেশে বক্তৃতাকালে সে ঘোষণা করে যে, ভারতের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার আগে তাদের আসাম(সিলেট সীমান্তে একটি ভারতীয় রাজ্য) দখল করে ফেলা উচিৎ ছিল। সে তার সশ্রস্ত সন্ত্রাসীদের এই কাজে প্রস্তুত হওয়ার জন্য আহবান জানায়। ১৫ই অক্টোবর প্রকাশিত একটি রিপোর্টে মুজাহিদকে উদৃত করে বলা হয়, রাজাকার ও আল-বদর সম্বন্ধে প্রশ্নবিদ্ধ মন্তব্য করার জন্য সে ভূট্টো, কাওসার নিয়াজী ও মুফতি মাহমুদের সমালোচনা করেছিল। “রাজাকার ও আল-বদরের যুবকেরা এবং অন্যান্য সকল স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জাতীয় স্বার্থে ভারতের দালাল ও তার সহযোগিদের হাত থেকে জাতিকে রক্ষার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু সম্প্রতি এটি দেখা গেছে যে এক শ্রেণীর রাজনৈতিক নেতা যেমন জুলফিকার আলী ভূট্টো, কাওসার নিয়াজী, মুফতি মাহমুদ ও আসগর খান এইসব দেশপ্রেমীদের বিরুদ্ধে প্রশ্নবিদ্ধ মন্তব্য করে আসছে।”

মুজাহিদ এই শ্রেণীর নেতাদের কর্মকান্ড বন্ধ করতে সরকারকে আহবান জানায়। এবং একই সাথে সে ছাত্রদেরকে তাদের পড়াশুনায় ফিরে যেতে এবং স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে সেনাবাহিনীকে সাহায্য করার আহবান জানায়।

২৫শে অক্টোবর আরেকটি বিবৃতিতে মুজাহিদ ১৭ই রমজানকে বদর দিবস হিসেবে পালনের আহবান জানায় এবং বলে, “এখন আমরা ইসলাম বিরোধী শক্তির মোকাবেলা করছি। আমরা আজ জাতির স্বার্থে দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার শপথ নেবো।”

যুদ্ধের দিনগুলোতে মুজাহিদ ঢাকার ফকিরারপুল ও নয়াপল্টনের বিভিন্ন স্থানে বসবাস করতো। তবে সে বিশেষ করে ১৮১, ফকিরারপুলের জনৈক ফিরোজ মিয়ার বাসায় বসবাস করতো। জাতীয় পার্টি নেতা আবদুস সালাম, সাংবাদিক জিএম গাউস, মুক্তিযোদ্ধা ও কলামিস্ট মাহবুব কামালের সাক্ষ্যমতে এই ফিরোজ রাজাকার বাহিনীর একজন কমান্ডার ছিল।

ফিরোজের বাড়ীটি স্থানীয় রাজাকারদের সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হতো, এখানে তারা গোপন বৈঠকে বসে তাদের কর্মপন্থা ঠিক করতো। এই বাড়ীতে বিভিন্নরকম কাজের সুবিধা ছিলঃ স্থানীয় সদরদপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হতো, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও নির্যাতন কক্ষ। স্থানীয় লোকদের মতে, বহু লোকদের ঐ বাড়ীতে চোখ বাঁধা অবস্থায় ধরে নিয়ে যাওয়া হতো এবং ঐ বাড়ী থেকে নির্যাতনের আর্তনাদ শোনা যেত। মুজাহিদ ছিল পালের গোদা।

সাংবাদিক জিএম গাউস বলেছেন, তিনি মুজাহিদকে একটি ইসলামিক সংগঠনের নেতা হিসেবে জানতেন। সে ফকিরাপুল এলাকার একজন ভাড়াটে ছিল এবং মুক্তিযুদ্ধের বহু আগে থেকে তার সংগঠনে স্থানীয় ছাত্রদের সংগ্রহে জড়িত ছিল। যুদ্ধ ঘোষণার সাথে সাথে সে রাজাকার বাহিনীর একটি বিশাল দল গঠন করে, যারা শুধুমাত্র তার কাছে জবাবদিহি করতো। তারপর মুজাহিদ ফিরোজ মিয়াকে তার নবগঠিত বাহিনীর কমান্ডার নিয়োগ করে এবং তাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য অস্ত্র সংগ্রহ করতো। সংগঠনটির অস্ত্রভান্ডার ও তহবিলের জন্য মুজাহিদ ছিল একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। সেপ্টেম্বরের পর থেকে, যখন পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পরাজয় শুরু হল, মুজাহিদ সাধারণ স্বাধীনতাকামী বাঙ্গালী হত্যা কৌশল পরিবর্তন করে ধর্মনিরপেক্ষ বাঙ্গালী বুদ্ধিজীবি ও পেশাজীবি হত্যা কৌশল অবলম্বন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে চিহ্নিত শিক্ষাবিদদের হত্যার পেছনে মুজাহিদ ছিল অন্যতম নেতা।

গাউস যা বলেছেন আবদুস সালাম তার পুনরুল্লেখ করেছেন। সালাম মুজাহিদকে জামাতের একজন কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং এই পদের কারণে তার কর্মকান্ডসমূহ সমগ্র ঢাকাশহর ব্যাপী বিস্তৃত ছিল। সালাম বলেন, “আমি ফিরোজের বাড়ী থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দলিল ও ছবি উদ্ধার করি। এই প্রমাণগুলোর মধ্যে ছিল ঢাকায় কাজ করা রাজাকারবাহিনীর তালিকা। তাদের বিভিন্ন কাজের ছবি ও তাদের জীবন বৃত্তান্তও ছিলো প্রমাণের মধ্যে। পরে আমার বাসায় পুলিশি হামলার পর প্রমাণগুলো হারিয়ে যায়। যুদ্ধের পর ফিরোজের বাড়ীটি মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অস্থায়ী ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করা হতো।”

কলামিস্ট মাহবুব কামাল ফিরোজের বাড়ীটিকে ভূ-গর্ভস্থ একটি কারাকক্ষ ও ষড়যন্ত্রের স্থল হিসেবে বর্ণনা করেন। রাজাকারদের সশ্রস্ত সন্ত্রাসীরা এই বাড়ী থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ীতে হামলা করতো। তিনি বলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা জোবেদ আলীর বাসায় কয়েকবার অভিযান চালানো হয়েছিল। “তারা আমার এক বন্ধ নাজু’র বাসায়ও কয়েকবার তল্লাশী চালায়, ’৭১ এর আগষ্ট থেকে নাজুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলনা। আমরা বিশ্বাস করলাম যে নাজু নিশ্চয়ই ফিরোজ ও তার দোসরদের হাতে নিহত হয়েছে।” কামাল আরো বললেন যে, ’৭১ সালে তাঁর এক চাচাতো ভাই চাকুরী খুঁজতে এসে তার বাসায় থাকতো। মহসিন নামের তার সেই চাচাতো ভাই নামাজ পড়ার জন্য স্থানীয় মসজিদে যেতো, সেখানে মুজাহিদ তাকে রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেয়ার জন্য বলে। পরে কামালের পরিবার মহসিনকে মুজাহিদের দল থেকে বাঁচানোর জন্য তাকে গ্রামে ফেরত পাঠাতে হয়েছিল।

ফকিরারপুল শহরতলির স্থানীয়দের মতে, ফিরোজ ৩০০যুবকদের সমন্বয়ে রাজাকারবাহিনী গঠন করে এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনকারী সাধারণ লোকদের হত্যা ও নির্যাতনের জন্য তাদের নিয়োগ করে। স্থানীয়রা আরো জানায় যে, ফিরোজের বাড়ীতে মহিলাদের নির্যাতন করা হতো। একজন শীর্ষস্থানীয় ফুটবল খেলোয়ার, যাকে ফিরোজের লোকেরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল, তিনি বলেন, তাকে সেই বাড়ীতে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল। তিনি আরো জানান, তিনি ফিরোজের বাহিনী দ্বারা দিনে-রাতে বহু যুবমহিলাকে ধর্ষিত হতে দেখেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পর কয়েকবছর আত্নগোপনে থাকার পর, অন্যান্য রাজাকার সহযোগীদের মতো মুজাহিদ আবার ফিরে আসে এবং ১৯৭১ সালের অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে শুরু করে।১৯৭৮ সালের সাপ্তাহিক বিচিত্রার একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, মুজাহিদ আবদুস সোবহান নামের একজন প্রতিপক্ষের ছাত্রনেতাকে হত্যায় নেতৃত্ব দেয়। কয়েকবছর আগে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে রাজত্ব করা বাংলা ভাই এর বাহিনী সৃষ্টিতে মুজাহিদ অন্যতম শীর্ষ ভূমিকা পালন করেছিল বলে যে কেউ বাজী ধরতে পারে।

সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই জুন, ২০১৫ সকাল ১০:৩২
১২টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মানুষ ও ধর্ম

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৩ ই এপ্রিল, ২০২১ বিকাল ৫:১৪



আমি ৫ম শ্রেণীতে পড়ার সময়, দুরের এক গ্রামে একজন কলেজ ছাত্রীর সাথে দেখা হয়েছিলো, উনি কায়স্হ পরিবারের মেয়ে, উনাকে আমার খুবই ভালো লেগেছিলো, এটি সেই কাহিনী।

৫ম শ্রেণীতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসন্ন ইদে মুক্তির অপেক্ষায়----- রম্য

লিখেছেন শাহ আজিজ, ১৩ ই এপ্রিল, ২০২১ সন্ধ্যা ৬:৪১



সেই পাক আমল থেকে আমাদের মোড়ের টোল ঘরের দেয়ালে নতুন পোস্টার সাটা হত । আসিতেছে আসিতেছে রাজ্জাক- কবরী বা মোহাম্মদ আলী - জেবা অভিনীত সেরা ছবি --------------।... ...বাকিটুকু পড়ুন

খোশ আমদেদ মাহে রমজান

লিখেছেন নূর মোহাম্মদ নূরু, ১৩ ই এপ্রিল, ২০২১ রাত ৮:০৪


খোশ আমদেদ মাহে রমজান। বাংলাদেশের আকাশে পবিত্র রমজান মাসের চাঁদ দেখা গেছে। ফলে আগামীকাল বুধবার থেকে মাসব্যাপী শুরু হচ্ছে সিয়াম সাধনা। মঙ্গঙ্গলবার (১৩ এপ্রিল) ইসলামী ফাউন্ডেশনের গণসংযোগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

‘মানবিক স্বামী’ এবং গণমাধ্যমের দেউলিয়াপনা…

লিখেছেন নান্দনিক নন্দিনী, ১৪ ই এপ্রিল, ২০২১ রাত ২:০১



বহু অঘটনের এই দেশে ঘটনার ঘনঘটা লেগেই থাকে। বর্তমানের নিভু নিভু এক ঘটনার কর্তা ব্যক্তি মামুনুল হক। রাজনীতিবিদ এবং আলেম। তিনি যে ক্রমশ বিশাল এবং জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

নির্বাসিত এক রাজপুত্রের গল্প

লিখেছেন জুন, ১৪ ই এপ্রিল, ২০২১ সকাল ১০:৫২



এক দেশে এক রানী আছেন যিনি নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের অধীনে দীর্ঘ ৭০ বছর ধরে দুনিয়ার বহু দেশ সহ নিজ দেশ শাসন করে চলেছেন। সেই রানীর স্বামী ,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×