আমি আর আমার ভাই পিঠেপিঠি। বছর ছয়ের ছোট আমার। মনে হয় যেন এই তো সেদিন আমি বারান্দায় বসে খেলছিলাম, আর বড় ফুপু এসে আমার কোলে পুতুল পুতুল একটা বাবু দিয়ে বলে গেল এইটা নাকি আমার ভাই!!! গোল গোল হাত আর ছোট্ট ছোট্ট পা, এক চোখ পিট পিট করে তাকাচ্ছে। ধবধবে সাদা আর অসম্ভব সুন্দর একটা বাবু। আমার ভাই-এর একটা সাড়ে তিন হাত লম্বা গালভরা নাম দিলো আম্মা-আব্বা। আমি কিন্তু ঠিক করেছিলাম, ওকে আমি সারাজীবন বাবু বলেই ডাকবো।
সেই থেকে আমার ভাই আমাদের বাড়ির বাবু। আজও পর্যন্ত। ছোট্ট বাবুটাকে দেখতে কত লোক আসত আমাদের বাড়িতে, বাবুকে কত্ত কী গিফট দিত!!! সবাই ওকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতো, ওকেই আদর করত।আমার হিংসে হত খুব- কেন সবাই শুধু ওকেই আদর করবে, ওকেই গিফট দিবে? আমি কি কেউ না??একদিন আম্মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম।আম্মা হেসে বলেছিল আমি নাকি চৌরাস্তার ডাস্টবিনে কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ে!!!কথাটা মনের ভিতর গেঁথে গিয়েছিলো।কত রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে যে আকুল হয়ে কেঁদেছি কথাটা মনে করে!! একরাতে আমার কান্না শুনে বাবুরও ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিলো। আমার গলা জড়িয়ে ধরে বাবুটাও কেঁদেছিল খুব। বাবুটা যে আমার আপন ভাই না, ভাবতেই বুক ভেঙ্গে খান খান হয়ে যাচ্ছিল আমার। কী বোকাই না ছিলাম তখন!!!
বাবুর যখন দুই মাস বয়স, আম্মার কলেজের প্রিন্সিপ্যাল এসেছিলেন আমাদের বাড়িতে। বাবুকে দেখে একটা আংটি দিয়েছিলেন, আর আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন- ‘নানুভাই, তোমার আব্বা ফরসা, আম্মা ফরসা, ভাইটা ফরসা, তুমি কালো কেন? ’কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ের কষ্ট বুকে চেপে রেখে উত্তর দিয়েছিলাম- “আমার আম্মুর কালো রঙ পছন্দ তো, তাই। আমার ভাইটা দেখবেন বড় হলে কালো হয়ে যাবে। ”কতই বা বয়স তখন আমার?? ছয় কি সাড়ে ছয়!!! ছয় মাস বয়সে বাবুর নিউমোনিয়া হয়, এখন তখন অবস্থা। আমি নামাজের পাটিতে বসে সারাদিন সারারাত দোয়া করতাম – “আল্লাহ,তুমি আমাকে নিয়ে যাও, কিন্তু আমার ভাইটার যেন কিছু না হয়।”সুস্থ হওয়ার পর আমার সোনারঙ ভাইটা কালো হয়ে গেল—অনেক বেশী কালো। আমার নিজেকে রাক্ষুসি মনে হত সব সময়।
আমার ভাইটা আমার জীবনে দেখা সব চাইতে দুরন্ত শিশু। আমার এক শোকেস খেলনা ছিল, যেগুলো তিন ঝুড়ি ময়লা বানাতে ওর সময় লেগেছিলো মাত্র আড়াই বছর। আমার প্রিয় পুতুল তিথির হাত পা ভেঙ্গে আমাকে কষ্ট দিয়ে বাবু যে কি ভীষণ মজা পেত!! মেলামাইনের মগ গুলা এক আছাড়ে ভেঙ্গে ফেলত। ভেঙ্গে ফেলেছিল বিয়ের পরে পাওয়া আম্মার সবচাইতে প্রিয় ফ্লাস্কটাও। ভুতের ডিম কেনার দুই টাকা নিয়ে বায়না করে চিৎকার করে সারা বাড়ি মাথায় তুলত। আম্মা আবার একটা ব্যাপারে বেশ কঠোর ছিলেন- বাচ্চাদের সব চাহিদা পুরন করতে চেষ্টা করতেন, কিন্তু হাতে টাকা দিতেন না। ওতে নাকি বাচ্চারা নষ্ট হয়ে যায়!
আমার ভাইটার ছোটবেলা থেকেই খুব বুদ্ধি। স্কুলে যেত না সে। এই নিয়ে কিছু বলতে গেলে উল্টো অজুহাত যা দিত তার সারমর্ম অনেকটা এইরকম-
আমি স্কুলে আর আব্বা অফিসে থাকে।এখন ও যদি স্কুলে চলে যায়, আম্মা তাহলে একা বাড়িতে যদি ভুতের ভয় পায়!!! বাবুটা ছোট বেলা থেকেই অসুস্থ। নিউমোনিয়ার পর পাঁচ বছর বয়সে হল জন্ডিস। তারপর টাইফয়েড আর ইউরিন ইনফেকশন। রক্তে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস বয়ে নিয়ে চলেছে আজ সাত বছর প্রায়...
আমরা কেউ তাই ওকে কখনো কিছু বলি না, ও চলে ওর মতো। কেউ কিছু আশাও করি না ওর কাছ থেকে। অ্যানুয়াল রেজাল্টের পর যখন আমার রোল ১ আর ওর ৯১ হল, মিস আমাকে খুব বকেছিল, বলেছিল, আমি নাকি স্বার্থপর। খালি নিজেই পড়ি, ভাইয়ের খেয়াল নিই না। মন খারাপ হয়েছিলো খুব। বাসায় এসে রাগ করে আম্মাকে বলেছিলাম ওকে মাছের বড় মাথাটা দিয়ে ভাত দিতে। বাবুর ক্লাস রোল কখনো ৫০ এর ধারে কাছেও আসত না। এই নিয়ে কারো কোনও মাথা ব্যথাও নেই। খালি আমার মানসম্মানে লাগত খুব। টিচাররা কথা শোনাত আমাকে। না পেরে আমি একদিন আব্বাকে বলেছিলাম ওকে অন্য স্কুলে ভর্তি করে দিতে। ছোট্ট ভাইটা আমার!! মনে খুব কষ্ট পেয়েছিল সেইদিন। তারপর একদিন সবাইকে অবাক করে দিয়ে প্রাথমিক বৃত্তিতে জেলায় দশম হয়ে বসলো। আমি গর্ব ভরা বুক আর গম্ভীর মুখে ঘোষণা দিলাম-“ইহা নিছক একটি দুর্ঘটনা ব্যতীত অন্য কিছু নহে।” আমার কথায় সেদিন কেউ হেসেছিল, কেউবা আবার বিশ্বাস করেও বসেছিল। আমার ভাইটা আবারো দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। পরিবারের সবাইকে আনন্দের বন্যায় ভাসিয়ে জে এস সি তে গোল্ডেন এ+ পেয়েছে। আমার এই অসুস্থ অথচ অঘটনঘটনপটীয়সী ভাইটিকে নিয়ে তাই আজ আর কেউ স্বপ্ন দেখুক বা নাই দেখুক, আমি স্বপ্ন দেখি, অনেক বড় হবে ও, এরকম আরও অনেক দুর্ঘটনা ঘটাবে(এমনিতেই সে প্রায় ছয় ফুট লম্বা এখনি, মাথা উঁচু করেও আই কন্টাক্ট করতে কষ্ট হয়, আরও বড় হলে কী হবে কে জানে!!
ছোটবেলা থেকেই বাবুর ইলেক্ট্রনিক জিনিসের প্রতি ঝোঁক খুব। আর রিমোট কন্ট্রোল খেলনা কেনার বাতিক। আব্বা সরকারি চাকুরে, তাই সব শখ সব সময় পূরণও হয় না। আমি কিন্তু তাই নিয়ে বাবুকে কখনো মন খারাপ করতে দেখিনি।
বাড়ি গিয়েছিলাম সেদিন। দেখলাম বাবুর মন খারাপ। আম্মা নাকি ওকে বকেছে আগের রাতে। এম পি ফোর টা নাকি খুলে ফেলার পর আর জোড়া লাগাতে পারছে না। আমারও মন খারাপ হয়ে গেল শুনে। নিজের ঘরে চলে এলাম। আমার ঘরে এলেই আমার ক্যামন যেন শান্তি শান্তি লাগে। দশ ফিট বাই সাত ফিট দেয়াল জুড়ে বইয়ের আলমারি, তাক জুড়ে থরে থরে সাজানো প্রায় হাজার তিনেক বই। আহ! কী শান্তি!! দেখেই চোখ ভরে যায়। কেন যেন চোখ চলে গ্যালো উপরের তাকের দক্ষিণ কোনায়। পর পর সাজানো দুটো বই- লোটাকম্বল ০১, লোটাকম্বল ০২। লেখক সঞ্জিবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। নায়িকার নাম মুকুলিকা- মুকু। নায়কের নামটা মনে পড়ে না কিছুতেই—আশ্চর্য তো!!! দুর্নিবার আকর্ষণ নিয়ে বই দুটো নামাই। পাতা ওলটাতে গিয়েই পরক্ষনে আবার রেখে দিই- থাক না!! পড়ে ফেললেই তো গ্যালো আকর্ষণ শেষ হয়ে!! পরে একসময় পড়বো আবার-যখন মন খুব খারাপ থাকবে-কিংবা যখন মুকু হতে ইচ্ছে করবে খুব!এও একধরনের খেলা... নিজের সাথে...আলো আধারির খেলা।
বাবুর ঘরে যাই আবার। অভ্যস্ত হাতে অগোছালো টেবিলটা গোছানো শুরু করি। বইয়ের ফাক গলে একটুকরো কাগজ নিচে পড়ে যায়- রঙটা নীল। কাগজটা তুলে নিয়ে পড়তে শুরু করি- অভিমান ভরা একটা চিঠি। বাবুটা আম্মাকে লিখেছে।কোনও এক ফাঁকে লুকিয়ে হয়ত রেখে দেবে আম্মার হিসাবের খাতার ভেতর। আমার বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে ওঠে। আম্মার ওপর অভিমান করে আমি একসময় রাতের পর রাত চোখের জলে বালিশ ভিজাতাম, আর আমার ভাইটা চিঠি লেখে। আমি মুগ্ধ হয়ে চিঠি পড়তে থাকি। কী গভীর আবেগ মাখা লেখা!! এতোটুকুন বাবুসোনাটার বুকে এত্ত গভীর আবেগ এলো কোত্থেকে???
নাহ! আমার ছোট্ট ভাইটা এবার সত্যিই বোধহয় বড় হয়ে গ্যাছে!!!
এক মাসের ওপর হতে গেল আমি অসুস্থ। প্রতিটা নিঃশ্বাসে আয়ু ক্ষয় হয়। এক পা এক পা করে মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছি। আম্মা খুব করে দেখতে চাচ্ছিল কয়দিন ধরে। তাই বাড়ি গিয়েছিলাম সকাল বেলা। বিকালে চলে আসার সময় আম্মা আমাকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদল, প্রাণখোলা কান্না। আম্মার অস্রুসজল চোখের দিকে খুব অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম আমি। সেখানে কোনও রাগ নেই, নেই অভিমান, বিষাদ বা অনুযোগ। কোনও আদর নেই, স্নেহ নেই, মমতা নেই। আছে শুধু ভালবাসা......... জোয়ারের জলে দুকূল ছাপানো নিখাদ গভীর ভালোবাসা! শান্ত নদীর মতো নিটোল স্নিগ্ধ ভালোবাসা। কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ের জন্যে কোন মায়ের চোখে কি এত ভালোবাসা থাকে???...............
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে অক্টোবর, ২০১১ রাত ২:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



