আশির দশকের মাঝামাঝি। অগাস্ট মাসের একটি রোদে ঝলমল করা দুপুর।
ঢাকা এয়ারপোর্টে নানা লোকের ভিড়। কেউবা টিকিট কাউন্টারের সামনে, লাগেজের ওজন বেশী হওয়াতে কারো মেজাজ খারাপ, স্বামীকে বিদায় জানাতে এসে বৌটির কান্নায় লাল দুচোখ, কেউবা একাকী চেয়ারে বসে অলস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে, কেউবা প্লেনে পড়ার জন্য ব্যস্ত হাতে কিনছে বই এবং পত্রিকা।
বিভিন্ন ধরনের লোক, বিচিত্র তাদের অবস্থা। অন্য সময় হলে আমি এদেরকে দেখে দিব্যি ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতে পারতাম অনায়াসে। মনে মনে বানাতে পারতাম কত রকম মজাদার গল্প।
কিন্তু অগাস্টের বিশেষ দিনের ওই দুপুরটিতে এসবের কোনকিছুই আমার নজরে আসছিল না। আশপাশের মানুষের কোলাহল, তাদের আচার-আচরণ কিংবা এয়ারপোর্টের ঝকঝকে মেঝেতে অকস্মাৎ পা পিছলে পড়ে যাওয়া শিশুটিকে দেখে আমার মুখভাবের বা মনোভাবের কোনটারই তেমন কোন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হচ্ছিল না।
সত্যিকথা বলতে কি আমার ভয়ানক বিরক্ত লাগছিল। আর একঘন্টা পর আমার ফ্লাইট। আমি দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছি আমেরিকাতে। শুধু আমেরিকা বললে পুরোটা বলা হবেনা। আমি আমেরিকার যে কোন জায়গায় যাচ্ছি না। আমি যাচ্ছি হাওয়াই দ্বীপে।
আমার সেদিন আর তর সইছিলনা। কখন উঠবো প্লেনে? কখন পৌছাবো আমার বহুবার স্বপ্নে দেখা সেই দেশটিতে? বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সময়ে সব সময়ে চিন্তা করতাম এই দিনটির কথা। আজ সেই দিনটি এসে হাজির হয়েছে দোরগোড়ায়। তাই আমার আর কোন রকম দেরী সহ্য হচ্ছিল না।
এরই মধ্যে তিনবার আমি জিজ্ঞেস করেছি এয়ারলাইনের লোকদেরকে। "ভাই-প্লেনটা ঠিক সময়ে ছাড়বে তো?" ফ্লাইটটি ছিল থাই এয়ারলাইন্সের। তাদের লোকজনের ব্যবহার ভাল। তারা প্রতিবারই মিষ্টি হেসে বলেছে, "চিন্তা করবেন না। ফ্লাইট ঠিক সময়েই ছাড়বে।"
দেশী এয়ারলাইনসের লোক হলে আমাকে নির্ঘাত দু চারটে কটুবাক্য হজম করতে হোত এতবার তাদেরকে জ্বালানোর জন্যে।
সে আমলে এয়ারপোর্টের ভিতরে যাত্রীকে বিদায় জানানোর জন্যে যে কেউই ঢুকতে পারতো। তাই আমাকে ঘিরে ভিড় করে আছে আমার পরিবারের লোকজন। আমার তাতে আরো বেশী বিরক্ত লাগছে। আরে বাবা-এত ভ্যাজালের কি দরকার? নাহয় আমি বিদেশ যাচ্ছিই, তার জন্যে সবাইকে এয়ারপোর্টে আসবার দরকার টা কি? বাড়ীতে বসে গুডবাই বললে কি আমি মন খারাপ করতাম? তোমাদেরকে এই এয়ারপোর্টে না দেখলে আমি ঝরঝর করে কেঁদে ফেলতাম?
নো, নো-তোমাদের বোঝার বিরাট ভুল হয়েছে। তোমরা ভাবছো যে দেশ ছেড়ে বাইরে চলে আসছি বলে আমার ভীষণ মন খারাপ? তোমরা ভাবছো যে তোমাদেরকে আর দেখতে পাবোনা বলে আমার মনে কষ্ট হচ্ছে? তোমরা ভাবছো যে আমি হাওয়াই নামের এক জেলখানাতে যাচ্ছি বলে আমার ভিতরটা ভয়ে সিঁটিয়ে আছে?
ওয়েল-ইউ অল আর এ্যাবসলুটলি রং।
আমেরিকা হচ্ছে গিয়ে আমার স্বপ্নের দেশ, মোটেও সেটা জেলখানা নয়। আমি যাচ্ছি যেখানে যাবার জন্য প্রতিবছর বাংলাদেশের কোটি কোটি লোক ওপি-ওয়ান আর ডিভি ভিসা পাবার জন্য আবেদন করে। আমি যাচ্ছি সেই দেশের হাওয়াই দ্বীপে। হাওয়াই দ্বীপের নাম শুনেছো নিশ্চয়ই? মনে নেই-জেনারেল নলেজের বইতে প্রশ্ন থাকতো "কোন স্থানে সাপ নাই?", আর তার উত্তর থাকতো, "হাওয়াই দ্বীপে সাপ নাই"।
সেই হাওয়াই দ্বীপে যাচ্ছি আমি। এখানে যাবার জন্যে আমি মনখারাপ করবো কেন? আমি খুশী, খুবই খুশী। শুধু তোমাদের সামনে মুখে মুখে একটা দুঃখী দুঃখী ভাব এনে রেখেছি, যাতে তোমরা আবার আমাকে নিষ্ঠুর না ভাবো।
মনের কথাগুলো বলতে পারছিনা বলে আরো খারাপ লাগছিল। তার উপর আমি অনেকক্ষণ সিগারেট খাইনি। পেটের মধ্যে একটা কেমন খালি খালি ভাব। মুখ বিস্বাদ। কোথাও কি গিয়ে দ্রুত একটান সিগারেট খাওয়া যায়না? আমি এদিক-ওদিক তাকাই জুতমতো একটা জায়গার সন্ধানে।
মা জিজ্ঞেস করলেন,"তুই এতো উসখুস করছিস কেন? খারাপ লাগছে নাকি? দেখিতো তোর কপাল গরম হয়েছে কিনা?"
মা আমার কপাল স্পর্শ করেন। মায়ের হাতের ছোঁয়াটিও কেমন যেন ভাল লাগেনা। আমি কি ছোট বাচ্চা নাকি যে কপালে হাত দিয়ে দেখতে হবে। আমি এখন বড় হয়েছি, একটু পরেই এই দেশ ছেড়ে চলে যাবো বহুদূরের একটা সুন্দর জায়গায়। আচ্ছা ভালো কথা- প্লেনে কি আমাকে কোন খাবার দেবে? কি রকম হবে সেই খাবার? আমি কোনদিন প্লেনে করে দেশের বাইরে যাইনি। ডোমেস্টিক ফ্লাইটে তো কিছুই দেয়না। শুধু দু একটা টফি ছাড়া। ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটে নিশ্চয়ই ভাল কিছু বিদেশী খাবার দেবে।
বাবা একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এবার তিনি কাছিয়ে এলেন। নাহ-এরা সবাই তো দেখি কান্নাকাটির ধুম বসিয়ে দেবে দেখা যাচ্ছে। কি করে বোঝাই যে আমি আসলে মহা আনন্দে আছি।
বাবার পিছনে দুটি পরিচিত মুখ দেখা গেল। জারিফ আর শফিউল। আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্স-সহপাঠী।
"কিরে তোরা এখানে?"
"তোকে গুডবাই বলতে এলাম।"
"তোরা এতো ফরম্যাল হ’লি কবে থেকে? যাকগে- এসেছিস ভালই হয়েছে। একটা ছোটখাট সমস্যা মিটানো দরকার।"
"কি সমস্যা?"
ওদের কাঁধে হাত রেখে একটু দূরে সরে দাঁড়াই। "সিগারেট খাইনি অনেকক্ষণ। ভিতরটা খালি খালি লাগছে।"
জারিফ হাসে। "সিগারেটটা ছেড়ে দেয়া যায়না? আর কত রেলগাড়ির মতো ফুস ফুস করবি?"
আমি বিরক্ত হই। "তোর মহা অমৃতবাণী শোনার মত সময় নেই আমার। কিছু করতে পারলে কর, নাহলে দূর হ'।"
এবার শফিউলও হাসে। "এত রাগ কেন বাবু? আচ্ছা-শোন, পাঁচমিনিট পর তুই আর জারিফ ওই কোণের দোকানটাতে আয়। বলবি যে তুই পথে পড়ার জন্য কয়েকটা পত্রিকা কিনতে যাচ্ছিস। আমি সিগারেট কিনে রাখবো। তুই ওখানে আসার পরে আমি আর জারিফ তোকে আড়াল করে রাখবো, আর তুই যত তাড়াতাড়ি পারিস কয়েকটা টান দিয়ে চলে আসিস। নেশাখোর বন্ধুর জন্য এটুকু যদি করতে না পারি, তাহলে আর আমরা কিসের বন্ধু?"
রাগে গা জ্বলে গেলেও কিছু করার নেই। সিগারেট খেতে গেলে এই দুই বান্দার মিচকে হাসি সহ্য করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। শফিউলের কথামতোই গেলাম কোণার দোকানে। আমি সেখানে যেতেই শফিউল আর জারিফ আমাকে আড়াল করে দাঁড়ালো। আমি দ্রুত হাতে সিগারেট ধরাই। সে আমলে যত্রতত্র সিগারেট খাওয়া জায়েজ ছিল (এমনকি প্লেনের ভিতরেও দেদারসে ধূমপান করা যেতো)। (আহা-কোথায় গেল সেইসব সুখের দিনগুলো।)
যাকগে-কেবল দুটো লম্বা টান দিয়েছি, অমনি কানের পাশে শফিউল বললো,"তাড়াতাড়ি কর।"
"কেন এখন আবার কি হোল?"
"তোর ছোট ভাইটা এদিকেই আসছে। মনে হয় তোকে খুঁজতে।"
নাহ- দুনিয়ায় আমার জন্য এক মুহুর্তেরও শান্তি নেই। তাড়তাড়ি আরো দুই টান দিয়ে ফেলে দেই সিগারেটটা। শালা-বেনসন এর আসল আরামই হচ্ছে শেষের ক'টা সুখটানে। এযাত্রায় সেটা আর হোলনা।
ভাইটি আমাদের কাছে এসে বললো, "দাদা- চলো তোমার প্লেনের লোকেরা উঠতে শুরু করেছে। বাবা তোমাকে আসতে বললো।"
যেন আমার হাতে ঘড়ি নেই, যেন আমি জানিনা কখন আমাকে প্লেনে উঠতে হবে। বাপ-মা জিনিসটাই খারাপ। এদের কাছে ছেলেমেয়েদের কখনো বয়েস বাড়েনা। এদের কাছে সবসময়ে বাচ্চার মত ট্রিটমেন্ট পেতে হয়। ভালই হয়েছে যে চলে যাচ্ছি। এই দেশে লোক থাকে! চব্বিশ ঘন্টা শুধু শাসন আর শাসন। আর উপদেশ। এটা করবে না, সেটা করবেনা। মাথা খারাপ হতে দুদিনও লাগবে না।
শফিউল আমার হাতে কয়েকটা পত্রিকা তুলে দেয়। "নে-পথে পড়িস। আর এটাও রাখ।" একটা ছোট্ট প্যাকেটও দেয় সে আমার হাতে।
"কি এটা?"
"দশ শলা বেনসন। এক প্যাকেট কিনতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আর পয়সা নেই। এটা দিয়েই পথের কাজ সেরে নিস।"
"ওয়াও-দশ শলা বেনসন। আমিতো জীবনে কোনদিন তিন-চার শলার বেশী সিগারেট একসাথে কিনেছি কিনা তা মনে পড়ছে না।"
"যাক-বিদেশ যাচ্ছিস। পথে আবার কোথায় সিগারেট পাস কিনা তার ঠিক নেই, দশ শলা দিয়ে অন্ততঃ কিছুটা পথ নিশ্চিন্তে থাকতে পারবি। দশ শলা পকেটে আছে বলে আবার ফুস ফুস করে সবগুলো একবারেই শেষ করে দিওনা।"
ফিরে এসে দেখি ইতিমধ্যেই গ্রুপের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। আরো জনা দুয়েক আত্মীয়ের চেহারা দেখা যাচ্ছে। বুঝলাম, বিদায় নেবার পালা এবার।
বাবা বরাবরের মতো ভুরু কুঁচকে আছেন। মা চিরকালের মতোই শান্ত। আমি হাতঘড়িতে সময় দেখলাম। বেশী সময় নেই আসলে। ছোট ব্রীফকেস আর ব্যাগটা তুলে নেই। বাবা-মায়ের দিকে তাকিয়ে একটু হাসি। যেতে হয় এখন।
বাবা জিজ্ঞেস করলেন, "তোর পাসপোর্ট টিকিট সব ঠিক আছেতো?"
"হ্যাঁ।"
"কই দেখি।"
আমি অবাক হই। "কি দেখবে?"
"তোর পাসপোর্ট আর টিকিট।"
নাহ- এদের জ্বালায় তো দেখি আমাকে দেশান্তরী হতে হবে (যদিও তাইই হচ্ছি)। প্যান্টের পকেট থেকে বার করি জিনিস দুটোকে। বাবা বলেন,"প্যান্টের পকেটে পাসপোর্ট না রাখাই ভাল, ঘামে ভিজে পাসপোর্টের বারোটা বাজতে পারে। বাংলাদেশী জিনিস, তেমন সুবিধার তো আর না।"
আমি আর কথা বাড়াই না।
"আমি যাই তাহলে।"
"ভাল ভাবে যেও। ফি আমানিল্লাহ।"
মা কিছুই বলেন না আমাকে। শুধু অল্প হাসেন একটু। তার মানে, ভাল থেকো। মায়েদের এটাই চিরকালের কথা। যতসব মিডল-ক্লাস আদিখ্যেতা!
আমি আর কথা বাড়াই না। ব্যাগ-ব্রীফকেস বগলদাবা করে রওনা দেই। প্যাসেজের শেষ মাথায় পৌঁছে আমি ফিরে তাকাই। দেখতে পাই যে সবাই কেমন গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছে একসাথে। যেন এই দুঃখের দুঃসহ ভার তারা একা একা নিতে পারবেনা।
আমার আবারও হাসি পায়। কিসের দুঃখ? আমি চলে যাছি বলে? আরে-আমি যাচ্ছি হাওয়াই। সেখানে তো কোন দুঃখ নেই, শুনেছি সেখানে লোকেরা কেবলই হাসে, সেখানে সাগরে জল এত নীল যে বোঝা যায় না এটা পানি নাকি তরল আকাশ। আমার জন্য দুঃখ করোনা।
আমি মুখে একগাল হাসি এনে হাত নাড়ি সবার উদ্দেশ্যে। বাই বাই-আমি চললাম! তোমরাও ভাল থেকো।
প্লেনের ভিতরে ঢুকেই কয়েকটা ধাক্কা খাই। প্রথমেই নাকে আসে একটি চমৎকার সুগন্ধ। নিশ্চয়ই কোন দামী এয়ার ফ্রেশনার হবে। সুগন্ধের সাথেসাথে আসে এয়ারকন্ডিশনারের শীতল বাতাস। আহা- শরীর জুড়িয়ে যায় যেন। দরজার ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে একজন সুশ্রী এয়ারহোস্টেস। টিপিক্যাল বোঁচা বোঁচা থাই চেহারা, কিন্তু গালভর্তি হাসিটির কল্যাণে তার যাবত ত্রুটি ঢাকা পড়ে যায়। ঠিক কি বলে আমাকে স্বাগত জানিয়েছিল, তা ঠিক তখন বুঝতে পারিনি। (আমি ইংরেজী এমনিতেই কম বুঝি, আর থাই অ্যাকসেন্টের ইংরেজী বোঝারতো প্রশ্নই আসেনা।) তবে সে পাশের ট্রে থেকে আমার হাতে তুলে দিয়েছিল একটি ছোট্ট উপহারের ব্যাগ, ব্যাগটির উপরে পিন দিয়ে আঁটা একটি তাজা অর্কিড।
হ্যাঁ-একেই বলে ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট! প্লেনের যেদিকেই তাকাই সেখানটাই যেন ঝকঝক করছে। থাই এয়ারওয়েজের অতিথীসেবার সুনাম রয়েছে জগৎ জুড়ে। সেদিন প্রথম বুঝতে পেরেছিলাম যে কেন এই সুনাম। প্লেনের লোকেরা যাত্রীদেরকে মহা সমাদরে যার যার আসনের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। হাসিমুখে শুনছে যাত্রীদের শত আবদার। এই প্রসংগে বলে নেই যে প্লেনে উঠে উদ্ভট আবদার করায় আমাদের জুড়ি নেই। যথাসময়ে তার কয়েকটা উদাহরন দেয়া হবে।
আমার আসনটি ছিল জানালার পাশেই। হাতের এবং কাঁধের পোটলাপুঁটলি জায়গামতো রেখে ভালকরে আয়েশ করে বসলাম। সে আমলে খুব বেশি লোক দেশের বাইরে যেতো না (মধ্যপ্রাচ্যযাত্রীরা বাদে অবশ্য), তাই প্লেনে অনেক আসনই ফাঁকা থাকতো। আমার পাশের সিটদুটিও ফাঁকা ছিল সেদিন। যাক- একটু হাত-পা ছড়িয়ে যাওয়া যাবে।
কোমরে সিটবেল্ট লাগাতে গিয়ে হাসি পেলো হঠাৎ। বহুকাল আগে পড়া (খুব সম্ভবতঃ শংকরের লেখা) একটি বইয়ে পড়েছিলাম একটি নারীসঙ্গলিপ্সু যুবকের কথা যে প্লেনে উঠে কখনোই সিটবেল্ট বাঁধতো না। ফলে এয়ারহোস্টেস এসে তার সিটবেল্টটি বেঁধে দিতো। সেই সুযোগে যুবকটি এয়ারহোস্টেসের সাথে আলাপ জমিয়ে ফেলতো। কতলোকের কত রকম স্টাইল।
প্লেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই। রোদে ঝলমল করছে রানওয়েটি। এয়ারপোর্টে বহু লোকের ভিড়, তারা হাত নাড়ছে প্লেনের উদ্দেশ্যে।
আর কতক্ষণ বাকী রে বাবা? যদিও প্লেনের ভিতরের ঠান্ডা বাতাসে শরীর জুড়িয়ে এসেছে ইতিমধ্যে, তবুও টেক অফ না করা পর্যন্ত যেন কোন কিছুতেই মন বসাতে পারছিনা।
ও পাইলট ভাই-নোঙ্গরটা তোলেন না! চলেন যাই।
আমার মনের কথাটিতে সায় দিয়েই যেন নড়ে ওঠে প্লেনটি। আস্তে আস্তে সে গড়ানো শুরু করে। যাক-বাবা রওনা দিলাম তাহলে। ঢাকা থেকে আমি যাচ্ছি ব্যাংকক এ। সেখানে রাতটি থাকবো একটি হোটেলে। পরদিন সকাল বেলায় আবারো থাই এয়ারওয়েজ এ উড়বো। ব্যাংকক থেকে টোকিও। সেখানে প্লেন বদল হবে। এবারের উঠবো প্যান-অ্যাম এর প্লেনে। এই এয়ারলাইনটি এখন আর নেই (তাহলে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন কত আগের কথা বলছি)। টোকিও থেকে একটানে হনলুলু। হাওয়াই এর রাজধানী। আমার শেষ গন্তব্যস্থল।
প্লেনটি এবার বোধহয় দৌড়াবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। চুপ করে একটু দাঁড়িয়ে যেন দম নিচ্ছে। কোন এক জমাট বাঁধা শক্তির বলে থরথর করে কাঁপছে প্লেনটি। আমি আমার আসনের হাতলটি জোরে চেপে ধরি। এইবার প্লেনটি ছুটতে শুরু করলো।
জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। দ্রুত সরে যাচ্ছে সবকিছু। গাছপালা, বাড়িঘর, গাড়ি, মানুষ সবকিছু। আমার মজা লাগতে থাকে।
এমন সময় কেমন যেন হালকা হয়ে যায় সবকিছু। প্লেনটি উড়াল দিলো।
হঠাৎ নাভিমূলে টান লাগে। বুঝতে পারি কি যেন একটা কিছু ছিঁড়ে গেল। দেশের সাথে বাঁধা-পড়া নাড়িটি কে যেন হ্যাঁচকা টানে সরিয়ে দিল।
মুহুর্তের মধ্যে বুকের ভিতর হু হু করে কেঁদে ওঠে কোন এক মানুষ। এ তুই কি করলি? দেশকে পর করে দিলি? যে মা তোকে এত স্নেহে, এত মায়ায় ঘিরে রেখেছিল, তাকে তুই আজ ত্যাগ করলি? এতই লোভ তোর? এতই উচ্চাশা?
কান্নাকে ছাপিয়ে গর্জে ওঠে আরো একজন। সে বলে,"তবে শুনে রাখ বিশ্বাসঘাতক- ভাল করে শুনে রাখ। এই পবিত্র মাটির কসম, তুই আর কোনদিন দেখবি না সুখের মুখ, দেখবি না কোনদিন স্বস্থির চেহারা। তোর মধ্যে লুকিয়ে আছে ভয়াবহ একজন যে তোকে শুধু অন্যের দুয়ারে নিয়ে যাবে। ঘরের পথ তুই ভুলে যাবি, এই মাটির গন্ধ তুই খুঁজে ফিরবি, মায়ের মুখটি তোকে আজীবন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াবে।"
আমি চমকে উঠি। কে কথা কইছে আমার ভিতর? স্বরটির জলদগম্ভীর গলাটি আবার শোনা যায়, "এই মাটি তোকে অভিশাপ দিচ্ছে। আজ থেকে তোর নির্বাসন শুরু হোল। আজ থেকে তুই নির্বাসিত।"
আমি দু'হাতে মুখ ঢেকে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলি।
চোখের পানিতে অস্পষ্ট হয়ে যায় সবকিছু। প্লেনের ঝকঝকে অবয়ব, জানালার বাইরের সুনীল আকাশ, সুদৃশ্য বিমানবালা। সব সবকিছু ঝাপসা মনে হয়। মিলিয়ে যায় সব আনন্দ, সব উত্তেজনা।
বুকের ভিতর শুধু অবশিষ্ট থাকে একটি হাহাকার।
"এ আমি কি করলাম! এ আমি কি করলাম!"
(বাকী অংশ পরের পর্বে)
(নতুন সিরিজটি লেখা শুরু করলাম। আশাকরি আপনাদেরকে সাথে পাবো এই যাত্রায়ও। যেমনটি পেয়েছিলাম আগের সিরিজের সময়।
তবে এবারে ব্যক্তিগত ব্যস্ততার মাত্রা অনেক বেশী বলে পর্বগুলো পোস্ট করতে হয়তো কিছুটা দেরী হবে। তার জন্যে আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

