(আগের অংশটুকু জন্যে এখান থেকে পড়ে আসতে হবে।)
প্লেন চলছে নির্বিঘ্নে। তেমন কোন ঝাঁকি-টাকি দিচ্ছে না। এখন ভালই লাগছে।
ভ্যাজাল শুধু একটাই। পিছনের সারির খালা আর খালাতো বোনেদের একনাগাড়ে নন-স্টপ কিচির-মিচির।
আমার সিট জানালার কাছে হলে ভাল হোত। নীচের সমুদ্র কিংবা কোন নাম না জানা ভূমিখন্ডের দিকে তাকিয়ে সময় কাটিয়ে দেয়া যেতো। কিন্তু সে গুড়ে বালি। সিট পড়েছে মাঝখানে। তবে ভাল জিনিস একটাই, যে পাশের সিটটি ফাঁকা। এতে করে একটু হাত-পা ছড়িয়ে বসতে পারছি।
থাই এয়ারওয়েজের খাতির-যত্নের অভাব নেই। কিছুক্ষণ পর পরই এসে শুধোয়, কিছু লাগবে কিনা। আমি মুফতে শুধু কোক খাচ্ছি। দেশে থাকতে কারো বিয়ে-টিয়ের দাওয়াতে গেলেই কোক-ফান্টা খাওয়া যেতো। প্লেনের ভিতরে বড় পর্দায় ছবি দেখাবে একটু পরেই। সেটা দেখে হয়তো কিছুটা সময় কাটবে। কিন্তু আর কি করা যায়?
ভাবতে ভাবতে মনে এলো যে এই সময়টা চিঠি লিখে কাটালে কেমন হয়। যা ঘটছে, তাইই লিখে ফেলি ঝটপট। দেশে বন্ধুদের কাছে পাঠালে ওরা পড়ে মজা পাবে হয়তো।
বেল টিপে এয়ারহোস্টেসকে ডাকি। "আমাকে কি একটু চিঠি লেখার কাগজ দেওয়া যাবে?"
সে গাল ভরে হাসে। "নিশ্চয়ই। আমি তোমাকে এক্ষুণি এনে দিচ্ছি।"
কিছুক্ষণ পরে সে এসে আমাকে খান তিনেক থাই এয়ারওয়েজের লেটারহেডওয়ালা চিঠি লেখার কাগজ এনে দেয়। কি সুন্দর কাগজ! ভারী ঝকঝকে। আসবার সময় বন্ধুরা আমাকে একটা খুব সুন্দর কলম উপহার দিয়েছিল। ব্রীফকেস খুলে সেটাই বার করি। এত সুন্দর কাগজের উপর তো আর যেন তেন কলম দিয়ে লেখা যায়না।
সেই সময়টির কথা আমার আজো বেশ ভাল মনে আছে। সামনের সিটের সাথে লাগানো ট্রে টিকে পুরো বিছিয়ে আমি খুব মনোযোগের সাথে লিখছি। খুব সাবধানে লিখছি, যেন হাতের লেখা বাঁকা না হয়, যেন অসাবধানে বানান ভুল না হয়। এত সুন্দর একটা কাগজে লিখছি। সেখানে ভুল বানান বা অসুন্দর লেখা বড্ড বেমানান হবে।
ঢাকা ছেড়েছিলাম বারো তারিখে বিকেলের দিকে। এখন তেরো তারিখ। হাতঘড়িতে সময় দেখে লাভ নেই। সময় বদলে যাচ্ছে ওড়ার সাথে সাথে। একোতু পরে তো বোধহয় দিন-তারিখও বদলে যাবে।
সামনের ট্রের এক কোণায় রয়েছে বুদবুদময় ঠান্ডা কোক। লিখতে লিখতে থামছি কিছুক্ষণ পর পর। এক চুমুক কোক খাই। মাথা জ্যাম হয়ে গেলে একটা সিগারেট ধরাই। বাঁ হাতের আ-ুলে পুড়তে থাকে সিগারেট। আমি আনমনে লিখে চলি।
দেশ ছেড়েছি খুব বেশীক্ষণ হয়নি। এইটুকু সময়ের মধ্যে কতরকমের অভিজ্ঞতা হোল (তার এক-দশমাংশও আজ মনে নেই)। সেগুলোকেই লিখি রসিয়ে রসিয়ে। বন্ধুরা পড়বে এই চিঠি। তারা কি হাসবে আমার আনন্দে? বিষন্ন হবে আমার বেদনায়?
কে জানে? আমি তার তোয়াক্কা করিনে। আমার লিখতে ইচ্ছে করছে, তাই লিখছি।
এরই মাঝে দু'বার খাবার দিয়ে গেল এয়ার হোস্টেস। এবারের খাবারগুলো খেতে অতটা খারাপ লাগলো না। সেটা খাবারের গুণও হতে পারে, আবার আমার ক্রমান্বয়ে খারাপ খাবারে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়াও হতে পারে। সে যাকগে- খেতে যে পারছি এইই বেশী। আমার অতিমাত্রায় কোক-প্রীতি দেখে এয়ার হোস্টেসরা আমাকে আর কোন কিছু জিজ্ঞেস করেনা, চুপচাপ গ্লাসে কোক ঢেলে বিদেয় হয়।
ঘন্টা চারেক কেটে গেছে ইতিমধ্যে। একবার একটু ঘুমানোর চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু তাতে শুধু ঘাড়ে ব্যথাই শুধু হয়েছে, ঘুমের দেখা মেলেনি। বাইরে দিনের আলো কমে আসছে। যদিও ঘড়ির সময় বলছে এখন দুপুর। জাপান এসে পড়বে কিছুক্ষণ পরেই।
একজন এয়ার হোস্টেস হাতে একতাড়া কাগজ নিয়ে আমার সিটের পাশে এসে দাঁড়ায়। কি যেন জিজ্ঞেস করে সে। প্রথমে না বুঝলেও পরে বুঝলাম যে সে আমাকে জিজ্ঞেস করছে যে আমি জাপানেই নেমে যাবো কিনা। আমি ঘাড় নাড়লাম। নাহ্-আমাকে আরো বহুদূর যেতে হবে। বুঝলাম যেসব যাত্রীরা জাপানে যাচ্ছে তাদেরকে সে জাপানের ইমিগ্রেশন ফর্ম বিলি করছে।
আমি আবার লেখায় মন দিলাম। কিন্তু পিছন থেকে এবার একটু উঁচু গলায় কিচির-মিচির কানে এলো। কি হোল আবার থাই খালাম্মার?
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি যে থাই খালাম্মা আর এয়ার হোস্টেস বাক্যালাপ করছেন। থাই ভাষায় কথা হচ্ছে বলে কিছুই বুঝবার উপায় নেই। তবে দেখলাম আলাপের মধ্যেই খালা ব্যাগ থেকে তাদের পাসপোর্ট ইত্যাদি বের করে এয়ার হোস্টেসকে দিচ্ছেন। কেইসটা কি?
খানিক পরে বুঝলাম ব্যাপারটা। খালাম্মা ইংরেজীর কিছুই জানেননা, তার কন্যাদ্বয়ও একই রকম। এখন তারা ইংরেজী ভাষায় লেখা ইমিগ্রেশন ফর্ম কিভাবে ফিল-আপ করবেন? এয়ার হোস্টেস মেয়েটি ভাল ছিল। সে কয়েক সিট পরে বসা একজন থাই ভদ্রলোককে অনুরোধ করলো যেন তিনি খালা এবং তার পরিবারের জন্য ফর্মগুলো পূরণ করে দেন।
তাদের থাই কথোপকথন শুনে আরো একটা জিনিস মনে হোল। থাই ভাষাটিতে "খ" অক্ষরটির খুবই প্রাদুর্ভাব। সর্বক্ষণই যেন তারা "খা-খা" করছে। অনেকটা কাক যেমন "কা-কা" করে সেই রকম।
আমি একটু হেসে লেখায় মন দেই আবার। এক অক্ষর ইংরেজী না জেনেও কি নির্ভাবনার সাথে খালা সাত সমুদ্দুর তের নদী পাড়ি দিচ্ছেন! কি সাহস!
আমি ইতিমধ্যেই তিন-চার পাতা ভরিয়ে ফেলেছি চিঠি লিখে। সে আমলে আমাদের প্রচুর লিখতে হোত বলে একটানা অনেকক্ষণ লেখার অভ্যাস ছিল। আজকাল হাতে লেখাটা আর হয়ে ওঠেনা বলে যদি কখনো কিছু লিখতে হয় তাহলে দু-চার লাইনের পরেই হাতে ব্যথা করে, আংগুলে টান লাগে। হাতের লেখা বাঁকাচোরা হয়ে যায়। অথচ এককালে যাদের হাতের লেখা সুন্দর ছিল, তারাতো রীতিমতো শিল্পীর মর্যাদা পেতেন। এখন ডিজিট্যাল যুগ। কম্পিউটরের বোতাম টিপেই সব লেখালিখির কাজ চালানো। যুতসই কোন ফন্টের কল্যাণে অতি বাজে হস্তাক্ষর-ওয়ালা লোকের লেখাও হয়ে ওঠে দৃষ্টিনন্দন।
লেখা কাগজগুলোকে একসাথে করে সাজিয়ে রাখি। সে কাজ করতে গিয়ে একটি ছোট্ট অঘটন ঘটে। আমার কলমের ক্যাপটি হাত থেকে নীচে পড়ে গেল। কার্পেটের উপর বারদুয়েক গড়িয়ে সেটা আমার সিটের নীচের দিকে কোথায় যেন চলে গেল।
হায়-হায়, এখন কি হবে? একেতো খুব সুন্দর এই কলমটি, তায় এটা বন্ধুদের উপহার। সেই কলমের ক্যাপ যদি হারানো যায়, তাহলে তো মহা ক্ষতি। সিটের নীচে যতদূর পারি ঘাড় নামিয়েও দেখতে পেলাম না সেটিকে।
তার মানে হচ্ছে উনি গড়িয়ে-টড়িয়ে আরো দূরে কোথায় চলে গেছেন পিছনে। তার মানে উনি আমার পিছনের সারির সিটের আশপাশে কোথাও ল্যান্ড করেছেন। তার মানে উনি আমার থাই খালাম্মার এলাকায় চলে গিয়েছেন।
এখন উপায় একটাই। খাই খালামার সাহায্য দরকার। কিন্তু তখন মনে পড়লো যে খালা ইংরেজী জানেন না। জানেন শুধু থাই ভাষা। আর আমি জানি বাংলা আর কাজ চালানোর মতোন ইংরেজী। আর এদুটোই খালার কাছে সমান দুর্বোধ্য। তাহলে উপায়? উপায় হচ্ছে আকার-ইংগিতে কথা বলা।
আবার চিন্তা করলাম যে খালা যখন বাংলা-ইংরেজীর কোনটাইই জানেননা, তখন তার সাথে বাংলায় বাতচিত করাও যা ইংরেজীতেও কথা বলাও তা। অতএব খামাখা ইংরেজী বলার কোনই প্রয়োজন নেই। বাংলাই সই।
উঠে দাঁড়িয়ে একটু গলা খাঁকারী দিলাম। খালা মাথা নামিয়ে একটা ছবিওয়ালা বই দেখছিলেন। আমার গলার আওয়াজে মুখ তুলে চাইলেন।
আমি একগাল হাসি দিয়ে খাঁটি বাংলায় বললাম,"খালাম্মা-ভাল আছেন?"
খালাও হাসেন আমার হাসি দেখে। মাথা নেড়ে সোৎসাহে বলেন, "খা-খা।" (বা ওই জাতীয় কিছু একটা।) আমার কাছে তার অর্থ দাঁড়ায়,"ভাল আছি, বাবা। শুধু এই পোড়ার বাতের ব্যথাটা ছাড়া আর কোনই সমস্যা নেই।"
আমি মুখে একটু সহানুভূতি ফুটিয়ে তুলি,"আহা- তাহলে তো একনাগাড়ে প্লেনে বসে আপনার বেশ কষ্ট হচ্ছে।"
"খা-খা। (তাতো একটু হচ্ছেই, তা আর কি আর করা বলো। প্লেনে উঠলে এইটুকু ঝামেলা তো সহ্য করতেই হবে।)"
"টোকিও পৌছাতে আর বেশী দেরী নেই খালা। প্লেন থেকে নামবার পর আপনার কষ্ট শেষ।"
"খা-খা। (এই বয়সে কষ্টের কি আর শেষ আছে বাবা? একটা যায় তো আর একটা আসে।)"
"এ কি কথা বললেন খালা? আপনার বয়েস আর কিইবা এমন হোল?"
খালা হাসেন আবার। "খা-খা। (থাক, আমার কথা থাক। তোমার কি অবস্থা?)"
এইই সুযোগ। কলমটি উঁচিয়ে ধরি। মুখে একটা কান্না-কান্না ভাব এনে বলি,"আমার অবস্থা কেরাসিন, খালা। দেখেছেন আমার কলমের অবস্থা?"
খালা ব্যাপারটি ঠিক বোঝেননা। "খা-খা। (কেন, কলমের আবার কি হোল?)"
"কলমের ক্যাপটা খুঁজে পাচ্ছিনা, খালা। টুক করে আমার সিটের নীচে পড়লো, সেটা দেখলাম। কিন্তু তারপর ক্যাপটা যে কোথায় গড়িয়ে চলে গেল। আর খুঁজে পাচ্ছিনা। বন্ধুদের উপহারের জিনিস এটা।"
খালাও বেশ হাহাকার করে ওঠেন। "খা-খা। (আহারে-এত সুন্দর কলমের ক্যাপটা হারিয়ে গেল। কি ভয়ানক দুঃখের ব্যাপার।)"
"ক্যাপটা মনে হয় খালা আপনাদের দিকেই গিয়েছে। যদি একটু কষ্ট করে খুঁজে দেখতেন।"
খালা এবার একটু রেগেই যান মনে হয়। "খা-খা-খা। (কষ্ট? কষ্টের কথা আবার কোথথেকে এলো? তোমার জিনিসটি খোঁজার কাজ কষ্ট হবে কেন? তুমি কি আমার পর? এতবড় কথা তুমি তোমার খালাকে বলতে পারলে?)"
আমি একটু দেঁতো হাসি দেই। থাই খালা আমার কথায় রেগে যাবেন ভাবিনি।
আমার থাই খালাতো বোনেরা এতক্ষণ চোখ বড় বড় করে আমাদের আলাপ শুনছিল, আর বোধহয় ভাবছিল যে বাংলা আর থাই ভাষার কথোপকথন এতক্ষণ ধরে কিভাবে চলছে। তাদের সে আনন্দে হঠাত্ বাধা পড়লো। কেননা আমার থাই খালা তাদেরকে চোখের ইংগিতে কলমের ক্যাপটিকে খুঁজতে বলেছেন। তারা দুবোন মুহুর্তের মধ্যে সিট থেকে নেমে হামাগুড়ি দিয়ে ক্যাপটি খোঁজার কাজ শুরু করে দিল।
কিছুক্ষণ পরে একজন বিজয়ীর বেশে আবির্ভূত হোল আমাদের সামনে। তার হাতে আমার হারিয়ে ফেলা বস্তুটি।
আমার চেয়ে খালাই যেন খুশী হন বেশী। "খা-খা। (কি এবার খুশী?)"
আমিও একগাল হাসি। "খুব খুশী খালা, খুব খুশী। থ্যাংক ইউ খালা।"
এবারে খালা আদেশ করেন। "খা-খা। (তাহলে এবার চুপ করে নিজের সিটে বসে পড়ো। সিটবেল্ট বাঁধার বাতি জ্বলছে কিন্তু। এয়ার-হোস্টেস দেখতে পেলে বকা দেবে। আমরা বোধহয় টোকিও এসে পড়লাম)।"
টোকিওতে নেমে যান আমার থাই খালাম্মা। আমার হাতে সময় কম বলে কোনমতে "খোদা হাফেজ" ছুট লাগালাম। পরের প্লেনটি ধরতে হবে। হাতে সময় মাত্র পঁচিশ মিনিট।
সে আমলে টোকিও এয়ারপোর্ট খুবই কঠিন জায়গা ছিল। কেউ ইংরেজী বোঝেনা, বলতে পারাতো দূরের কথা। কোনমতে টিভি স্ক্রীনে সাইন দেখে-টেখে দৌড় লাগালাম। যখন এসে প্যান-এ্যামের কাউন্টারে পৌছুলাম, তখন তারা প্রায় প্লেনের দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে। বাবা- ভাগ্যিস ফ্লাইটটা মিস হয়নি। নিজের সিটে বসে লম্বা নিঃশ্বাস নেই। বিদেশযাত্রার যে এত ঝামেলা তাতো আগে জানতাম না।
প্লেন টেকঅফ করার একটু পরেই সন্ধ্যা নেমে এলো বাইরে। এবারে আমরা প্যাসিফিক পাড়ি দিচ্ছি। প্রায় আট-ন' ঘন্টার ফ্লাইট। ঘুমানো উচিত, কিন্তু ঘুম আসবেনা মনে হয়। আবার চিঠি লেখাতেই ফিরে যাওয়া ঠিক করি। কিন্তু ইতিমধ্যে থাই এয়ারওয়েজের দেওয়া কাগজ শেষ। বেল টিপে ডাকলাম এয়ারহোস্টেসকে।
সে এলো দশ মিনিট পর। তার চোখেমুখে বিরক্তি। "কি চাও?"
আমি থতোমতো খেয়ে যাই। একি ব্যবহার? মিনমিন করে বলি,"একটু লেখার কাগজ পাওয়া যাবে?"
তিনি মুখ ঝামটা দিলেন। "না, কাগজ-টাগজ নেই কিছু।"
বুঝলাম আমেরিকান প্লেন কোম্পানীর সার্ভিস খুবই বাজে। (আজো আমার সেই ধারণার পরিবর্তন হয়নি।) ব্রীফকেস হাতড়ে কাগজ খুঁজি বাধ্য হয়ে।
কিছুক্ষণ পরে বুঝতে পারি যে বাইরের নেমে আসা অন্ধকারের মতোন আমার শরীরেও নেমে আসছে ক্লান্তি। প্লেনের ভিতরের বাতি নিভিয়ে দেয়া হয়েছে ইতিমধ্যে। সবাই ঘুমানোর আঞ্জামে ব্যস্ত। আমিও চোখ বন্ধ করে ফেলি। নিদ্রাদেবী বোধহয় আমার সিটের পিছনেই ঘাপটি মেরে বসে ছিলেন। আমার চোখ দুটি বন্ধ হতেই তিনি আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন।
যখন ঘুম ভাংলো, তখন দেখি বাইরে সুর্য্যের আলো। সকাল হয়ে গেছে। এরই মধ্যে রাত শেষ হয়ে গেল?
স্পীকারে ঘোষণা হোল যে আমরা কিছুক্ষণ পরেই নামবো হনলুলু এয়ারপোর্টে। নীচে তাকিয়ে দেখি কোথাও কোন মাটির চিহ্ন নেই, শুধু পানি আর পানি। এই বিশাল প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে কোথাও বিন্দুর মতো জেগে আছে হাওয়াই দ্বীপমালা। আমাদের পাইলট সাহেব হনলুলু খুঁজে পাবেনতো এই দিগন্ত-বিস্তৃত জলরাশির মধ্যে?
ব্যাংকক ছেড়েছিলাম তেরো তারিখ সকালে। হনলুলু নামবোও তেরো তারিখ সকালে, কোথায় গেল মাঝের একটি দিন? যে দিনটির স্মৃতি আজো উজ্জ্বল হয়ে আছে মনে। আমার নাম-না-জানা থাই খালাম্মার স্মৃতি। কলমটি আজ আর নেই। আরো দশটি জিনিসের মতোই কোথায়, কখন যেন হারিয়ে গেছে সেটি।
এর পরের কথাগুলো আজ অত ভাল মনে নেই। কেমন যেন ঘোরের মধ্যেই প্লেনটি নামলো, আমি ইমিগ্রেশন আর কাষ্টমস পার হলাম। বাইরে এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে অনেক লোকের ভিড়, তারা তাদের প্রিয়জনকে রিসিভ করতে এসেছে। সেদিকে তাকাইনা। আমার তো প্রিয়জন নেই এখানে।
হঠাত্ মনে হয়, যে আমি তাহলে এখন আমেরিকায়। কতকালের স্বপ্ন ছিল এখানে আসার, শেষমেশ এখানে এসে পৌছুলাম তাহলে! কিন্তু যে রকম খুশী লাগবে ভেবেছিলাম, তার এক কণাও খুশী লাগছেনা।
কাঁধে কে যেন হাত রাখলো। আমি ফিরে তাকাই। একজন দীর্ঘকায় ভদ্রলোক। গায়ের রং দেখে মনে হচ্ছে উনি আমাদের দিকের লোকই হবেন।
"তুমিই নির্বাসিত?"
অনেক দিন পর যেন বাংলা শুনলাম। কানে মধুর হয়ে বাজলো কথাগুলো।
"হ্যাঁ- আমিই সেই লোক।"
"আমার নাম শামস। আমি তোমাকে নিতে এসেছি। তোমাকে যারা স্কলারশিপটি দিয়েছে, আমিও সেই প্রতিষ্ঠানে আছি।"
ঘাম দিয়ে যে জ্বর ছাড়লো। "সালাম-আলাইকুম, শামস ভাই। আপনাকে দেখে আমার খুব ভাল লাগছে।"
শামস ভাই হাসেন। "আমি জানি। তিন বছর আগে আমিও একদিন তোমার মতো এমনি ভাবেই নেমেছিলাম এখানে। ওয়েলকাম টু হাওয়াই। আলোহা।"
"আলোহা জিনিসটা কি শামস ভাই?"
"আলোহা একটা হাওয়াইয়ান শব্দ। মানে ওয়েলকাম। আবার এর অন্য মানে হচ্ছে গুডবাই।"
বাহ-একই শব্দের দুই মানে। কেন জানিনে আমার কাছে মনে হোল শব্দটি বড়ই যথার্থ আমার জন্যে। মনে মনে বললাম, "আলোহা বাংলাদেশ। বিদায় আমার জন্মভূমি।"
সেই মুহুর্ত থেকে নীলরঙ্গা জলরাশি বেষ্টিত একটি দ্বীপে আমার নির্বাসনের কাল শুরু হোল।
(এরপর নতুন পর্ব)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

